মহামতি সম্রাট আকবরের ‘নবরত্ন সভা’র অন্যতম রত্নরাজা বীরবল। প্রকৃত নাম মহেশ দাস। আকবর তাঁকে প্রথমে রাজা, পরে বীরবল উপাধি প্রদান করেন। মোগল নথিতে নবরত্নদের যে তালিকা পাওয়া যায়, তাতে সবার আগে বীরবলের নাম, পরে রাজা মানসিংহ, রাজা টোডরমল ও অন্যান্য রত্নের নাম রয়েছে।
আমরা অনেক সময়ই বীরবল ও মোল্লা দোপিয়াজাকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। মোল্লা দোপিয়াজা বীরবলের মতো ঐতিহাসিক চরিত্র; আকবরের নবরত্ন সভার বিশিষ্ট রত্ন এবং বীরবলের সমসাময়িক। আরবে জন্ম তাঁর, হুমায়ুনের এক সেনাপতির সঙ্গে ভারতে আসেন এবং তাঁর আকর্ষণীয় কথাবার্তার জন্য আকবরের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁকে ঘিরেও রয়েছে বহু কৌতুকপূর্ণ জনপ্রিয় কাহিনী। আকবরের নবরত্নের চিত্রমালায় তাঁর বহুচিত্র থাকলেও তাঁর প্রকৃত নাম কী ছিল, তা আজও অজানা। সম্ভবত এ কারণেই বীরবল ও মোল্লা দোপিয়াজাকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে কিছু অনাবশ্যক বিভ্রান্তি।
বীরবল শুধু আকবরের প্রিয়পাত্র ছিলেন না, একাধারে তিনি সুকবি, সুগায়ক, সুরসিক এবং দৌতকর্মে সুনিপুণ। এছাড়া বহু মোগল অভিযানের নেতৃত্বদানকারী জয়ী সেনাপতি। জীবনের শেষ যুদ্ধটিতেও মোগল বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে প্রাণপণ লড়াই করে যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন আকবরের এই প্রিয় সভাসদ। ইতিহাসের কি বিচিত্র পরিহাস! আকবর ও বীরবলকে ঘিরে যেসব জনপ্রিয় গল্প আজো প্রচলিত, তা থেকে মনে হয় বীরবল যেন নিছক এক কৌতুকপ্রিয় সভাসদ, যিনি সম্রাটের মনোরঞ্জনকারী এ সুদক্ষ বিদুষক ছাড়া আর কিছুই নন। তাঁর এই বহুল পরিচিত ভাঁড়ের তকমাটা একবার ছুড়ে ফেলে ইতিহাস ঘাঁটলে প্রশ্ন জাগে— এ কোন বীরবল? এ যেন এক অচেনা বীরবল, যিনি তরবারি হাতে মোগল বাহিনীর সেনাপতি যুদ্ধ জয়ী হয়ে রাজধানী ফিরছেন, বাদশাহকে রাজকাজে পরামর্শ দিচ্ছেন, বিক্ষুব্ধ রাজাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করছেন। ইতিহাস আরো বলে, বাদশা কোনো দিনই তাঁকে বিদুষকের পদে নিয়োগ দেননি। বীরবলের বিদুষক চরিত্র নিয়ে নানা গল্প, যা এখনো শোনা যায়, তা মূলত বেশির ভাগই কল্পনাপ্রসূত। আরো মজার কথা, এসব গালগল্প প্রচলিত হয় আকবরের রাজত্ব অবসানের ১০০ বছর পরে, লোকমুখে।
বীরবল মাত্র দু হাজারী মনসবদার হলেও তাঁর মর্যাদা ও প্রতিপত্তি এ দিয়ে মাপা যায় না। কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে রক্ষিত আকবরের নবরত্ন চিত্রে দেখা যায়, বীরবল ঠিক আকবরের পরের স্থানে রয়েছেন। সম্রাটের সঙ্গে বীরবলের সম্পর্ক অত্যন্ত হূদ্যতাপূর্ণ ছিল, যদিও বয়সে তিনি সম্রাটের চেয়ে ১৪ বছরের ছোট। সম্রাটের কাছ থেকে একটি দোতলা বাড়ি পেয়েছিলেন তিনি, যা বাদশাহী প্রাসাদের সীমানার মধ্যে ছিল। তিনিই একমাত্র সভাসদ, যিনি সম্রাটের প্রাসাদের চত্বরে বসবাসের অধিকার পান। উল্লেখ্য, বাদশাহর প্রাসাদের সাতটি দরজার একটির নাম ছিল বীরবলের দরজা। দরবারের রক্ষণশীল ও প্রভাবশালীদের চক্ষুশূল হতে বীরবলকে কোনো অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়নি, তা বলা বাহুল্য। তাঁর অবমূল্যায়নের জমি প্রস্তুত হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে দরবারের ঈর্ষার কারণে।
বীরবল-দূষণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য হলেন তাঁর সমসাময়িক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও ধর্মশাস্ত্রবিশারদ মোল্লা আবদুল কাদের বদায়ূনি, যিনি বীরবলকে ঘোর অবিশ্বাস করতেন। যদিও তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, বীরবল ‘প্রচুর ক্ষমতাবান ও প্রতিভাধর’। তাঁর বিদুষক অপবাদের বীজটি প্রথম রোপণ করেছিলেন ঐতিহাসিক আবদুল কাদের বদায়ূনি। এক বিচিত্র অসুয়ায় তাড়িত হয়ে বদায়ুনি সারা জীবন বীরবলকে হেয় করতে ক্লান্তিহীন অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন। বীরবলের শাহী দরবার থেকে খোদ শাহী প্রাসাদ পর্যন্ত ছিল অবাধ গতিবিধি। তাঁর এই প্রভাব এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের জন্য অনেকেই তাঁকে বিষ নজরে দেখতেন। তাঁর কবিত্ব শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট আকবর তাঁকে ‘কবিরায়’ উপাধিতে সম্মানিত করলে এই ঈর্ষার আগুনে নতুন করে ঘৃতাহুতি পড়ে। বদায়ূনি এবং আরো অনেকেই সম্রাট আকবরের ‘দীন-ই-এলাহী’-কে কেন্দ্র করে মনে মনে বিক্ষুব্ধ ছিলেন। তাদের একাংশের ধারণা, সম্রাটের এই নতুন ধর্মমত প্রচলনে শাস্ত্রজ্ঞ বীরবলের ভূমিকা ও অবদান নেহাত কম নয়। বীরবলই নাকি এই নতুন ধর্মমতের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়তে সাহায্য করেছিলেন সম্রাটকে। বীরবলের বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষের তূণীতে আরো একটি নতুন তীর জুড়তে বেশি সময় লাগেনি। যখন দেখা গেল বীরবলই একমাত্র হিন্দু, যিনি নিজে এই ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
ফলে আকবর-বীরবলের সখ্য এবং তাদের যে গভীর বোঝাপড়া রয়েছে তা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে অনেকের কাছেই। তাঁর প্রতি বাদশাহ অপার স্নেহ নিয়ে ইতিহাসে বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। একবার শাহী পিলখানার একটি হাতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। হাতিটা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছিল আর সবাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছিল। হঠাত্ হাতির সামনে পড়ে গিয়েছিলেন বীরবল, অন্যদের ছেড়ে দিয়ে হাতি তাঁর দিকে তেড়ে যায়। কিছুতেই পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। মৃত্যু যেন সম্মুখে ছুটে আসছে। এ সময় সম্রাট আকবর নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে এসে উপস্থিত হলেন তাঁর বন্ধু ও পাগলা হাতির মাঝখানে, হাতি বাধা পেয়ে হকচকিয়ে গিয়ে সরে গেল, প্রাণে বেঁচে গেলেন বীরবল।
তাদের এই বন্ধুত্ব নিয়ে বদায়ূনি কটাক্ষ করে বলেছেন, বাদশার দশা যেন ‘মন্তু শদমতুমন্ শুদী/ মন্তন্ শুদম্ তু-জান শুদী।’— ‘আমি তুমি হলাম, তুমি আমি হলে। আমি শরীর হলাম, তুমি প্রাণ।’
বাদশাহর এত ঘনিষ্ঠ হলে যা হওয়ার তা-ই হলো, শত্রু বাড়ল কবিপ্রবরের।
বদায়ূনি তো প্রকাশ্যে বলে বেড়াতেন— বীরবল অযোগ্য। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়েও নানা রকম কটূক্তি করতেন— বীরবল নিয়মিত গণিকালয়ে বিচরণ করেন, নাবালিকা গণিকায় তাঁর প্রধান আগ্রহ, এও রটাতে দ্বিধা করেননি তিনি। এসব প্রচার-প্রচারণার একটাই উদ্দেশ্য— সম্রাটের কানে এহেন অসামাজিক ক্রিয়াকলাপের খবর পৌঁছলে সম্রাট যেন তাঁর ধর্মপ্রাণ বন্ধুর প্রতি রুষ্ট হন।
শুধু মুখে অপপ্রচার করেই ক্ষান্ত হননি, লেখায়ও এ প্রয়াস অব্যাহত রেখেছিলেন বদায়ূনি।
সবাই জানেন, একজন সভাকবি বা যোদ্ধার তুলনায় মর্যাদার মাপকাঠিতে বিদুষক বা ভাঁড়ের গুরুত্ব যথেষ্ট কম। তাই ঐতিহাসিক বদায়ূনি তাঁর লেখায় কবিরায়কে ‘বিদুষক’ হিসেবে বর্ণনা করতেন। আরো বলতেন, ‘অভিশপ্ত, অধার্মিক, কুকুর’ ইত্যাদি। এসব কটূক্তিতে অবশ্য সম্রাট ও তাঁর সভাকবির সম্পর্কে চিড় ধরেনি কখনো। তবে বীরবল হাসি-মশকরায় মোল্লাদের নাকাল করে ছাড়তেন, সেজন্য বদায়ূনির অসন্তুষ্ট হওয়ারই কথা।
বাদশাহ অবশ্য অচিরেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর সভাকবি শুধু সুকণ্ঠ গায়কই নন, কাব্যপ্রতিভার সঙ্গে তাঁর রয়েছে রণক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা। ১৫৭২ সালে সম্রাট তাঁর প্রিয় সভাকবিকে এক বিশাল মোগল সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে অভিযানে পাঠালেন। যোদ্ধা-কবিকে দায়িত্ব দেয়া হলো শের আফগান কোয়ালি খানকে তার বড় ভাই হাকিম মির্জার আক্রমণ থেকে বাঁচানোর। সম্রাটের আস্থার পূর্ণ সম্মান রক্ষা করে কবিপ্রবর যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরে এলেন রাজধানীতে। সম্রাট আকবর খুশি হয়ে তাঁর এই প্রিয় বন্ধুটিকে ‘বীরবল’ উপাধি দিলেন। মহেশ দাস থেকে ব্রহ্মকবি, তারপর মোগল সম্রাটের ‘কবিরায়’ (কবিসম্রাট), পরে ‘রাজা’, এবার ভূষিত হলেন ‘বীরবর’ উপাধিতে। সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে পরে বীরবর হয় ‘বীরবল’। (বিনোদ ঘোষাল) কলকাতা।
আকবরের সভায় বীরবল একেবারে বন্ধুবিহীন ছিলেন তা নয়, আবুল ফজলের মতো প্রভাবশালী এবং সম্রাটের অনুগ্রহভাজন সভাসদ ছিল তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ও বিশ্বস্ত বন্ধু। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে লিখেছেন— বহুযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীরবল। বীরবলের আত্মিক গুরুত্ব ও উদারতাকে শ্রদ্ধা করতেন আবুল ফজল। বীরবল নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্রাটের পছন্দ-অপছন্দ, মন-মেজাজ খুব ভালোভাবে বুঝতে পারতেন। সম্রাট তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে প্রায়ই মূল্যবান উপহার পাঠাতেন। সম্রাটের বিশ্বাসভাজন হওয়ার কারণে রাজা-মহারাজা, আমির-উমরাহ ও সেনাপতিরা বীরবলের প্রীতিলাভের আশায় মূল্যবান উপহার দিতে কার্পণ্য করেননি। সম্রাটও বিক্ষুব্ধ রাজাদের কাছে বীরবলকে প্রায়ই দূত হিসেবে পাঠাতেন তাদের ক্ষোভ নিরসনের জন্য। বীরবল তাঁর বাক্যালাপ ও পরিশীলিত ব্যবহার দিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারদর্শী ছিলেন।
‘কোটি কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষে যুদ্ধের কাজ তিনি তাঁর সুমধুর কথাবার্তাতেই সেরে ফেলতেন। ১৫৭৫-৭৭ খ্রি. তাঁকে এমনি দৌতকাজে ডোলাপুরের বায়লুনকবের কাছে পাঠানো হয়েছিল’— (আকবর/রাহুল সাংকৃত্যায়ন। অনুবাদ আশরাফ চৌধুরী, চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা)।

২.
আকবর কাবুলের অধীশ্বর, কাশ্মীরের প্রভু।
কাশ্মীরের পশ্চিমে হিমালয়ের মনোরম উপত্যকাগুলোর মধ্যে অন্যতম সোয়াত উপত্যকা। তবে এ উপত্যকায় যাওয়ার পথ দুর্গম এবং ভয়াবহ। এখানে স্বাধীনচেতা আফগানরা দীর্ঘদিন ধরে মোগল শাসনের বিরোধী। সোয়াত উপত্যকা নিজের অধিকারে নিতে মনস্থ করে সেনাপতি জৈন খানকে যুদ্ধাভিযানের হুকুম দিলেন বাদশাহ। শাহী ফৌজ সমতলে যুদ্ধে অভ্যস্ত, তাদের পক্ষে এই চড়াই-উতরাইয়ের দেশে তেমন বিশাল জয়ের গৌরব অর্জন করা সম্ভব হয়নি। যদিও আফগানরা মোগলদের সঙ্গে অযথা শক্তি ক্ষয় না করে পার্বত্য অঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে শত্রুর অপেক্ষা করতে লাগল। জৈন খান তখন আরো সৈন্য চেয়ে পাঠালেন। দরবার থেকে সৈন্যের সঙ্গে একজন দক্ষ আমিরকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো— আবুল ফজল নিজে যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। বীরবলও অনুরূপ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। বাদশাহ অবশ্য বীরবলকে এই দুর্গম অঞ্চলে যুদ্ধকাজে আফগানদের শায়েস্তা করার জন্য পাঠাতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু বন্ধুর প্রার্থনা ফেলতে পারলেন না, শেষে গুটি চালনা করা হলো। তাতে বীরবলেরই নাম উঠল, সুতরাং অনুমতি না দিয়ে সম্রাটের উপায় ছিল না। বীরবলের এ যুদ্ধযাত্রা তাঁর মনে হয়তো শঙ্কার সৃষ্টি করেছিল, তাই তিনি আদেশ দিলেন বীরবলের বাহিনীর সঙ্গে বাদশাহর তোপখানাও যাবে। বীরবলের যাওয়ার সময় আকবর তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘বীরবল শীঘ্র ফিরে এসো।’ ইতিহাস বলে, প্রচুর সৈন্য ও যুদ্ধসামগ্রী দিয়ে বীরবলকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন সম্রাট। বীরবল আটক দুর্গ থেকে সোয়াত উপত্যকার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে সোয়াতের (বর্তমানে পাকিস্তানে) চাকদরা অঞ্চলে পৌঁছলেন। চাকদরায় বীরবল ও আবুল ফাতাহ প্রায় একই সময়ে কিন্তু পৃথকভাবে উপস্থিত হলেন। চাকদরা সোয়াত উপত্যকার ঠিক মাঝখানে— তখন সোয়াতের করাকর পাহাড় ও বুনের অঞ্চল মোগলদের দখলের বাইরে, বাকি অংশ আকবরের অধিকারভুক্ত।
বীরবলের সঙ্গে জৈন খানের আগে থেকেই একটু মনকষাকষি ছিল। কিন্তু স্বয়ং বাদশাহ যখন তাঁকে মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধাভিযানে পাঠিয়েছেন, তখন জৈন খান তাঁকে স্বাগত জানানো বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করলেন। নিজের শিবিরে জাঁকজমক করে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন তিনি। হাকিম আবুল ফাতাহ, বীরবল ও জৈন খানের সম্মিলিত শক্তি আফগানদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কার্যকর হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু এ সম্মিলন মতভেদ বৃদ্ধির কারণ হয়ে ওঠে, তাদের মধ্যে সমন্বয় ও কৌশলগত পন্থা নিয়ে বিতর্ক অভিযান প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে। বীরবল নিজের সৈন্য নিয়ে এগিয়ে গেলেন। জৈন খান এবং অন্য সেনাপতি ফৌজ ও যুদ্ধসামগ্রী নিয়ে পেছনে পেছনে চললেন। ‘পথ দুর্গম, সংকীর্ণ উপত্যকা আর সামনে উঁচু পাহাড়, খাড়া চড়াই’, এমন সময়— উপরে-নিচে, ডানে-বাঁয়ে থেকে একযোগে আফগানরা আক্রমণ শুরু করে। বাদশাহী ফৌজ যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে চলল। বীরবল নিরাপদ শিবির স্থাপন করার জন্য সম্মুখে এগিয়ে চললেন। আর মাত্র চার ক্রোশ পথ অতিক্রম করলেই শিবির স্থাপনের উপযুক্ত স্থান পাওয়া যাবে। যেখানে রাতে আফগানরা অতর্কিত আক্রমণে সক্ষম হবে না। কিন্তু এই চার ক্রোশ সমতলের পথ নয়, পার্বত্য পথের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্গম ও কঠিন পথ। পথ এত সংকীর্ণ যে, দু-তিনজন মানুষ বড় কষ্টে একসঙ্গে যেতে পারে। একে তো দুর্গম রাস্তা, তা আবার হাতি-ঘোড়া নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। ফলে মোগল সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও তাদের পূর্ণ সামরিক শক্তি আফগানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। বহু শাহী সৈনিক নিহত হলো সেই সংকীর্ণ গিরিপথে। অপরিসর রাস্তায় মানুষ, ঘোড়া, হাতির মৃতদেহ পড়ে পথ বন্ধ হয়ে গেল। ইউসুফ জাই এই দুর্ভাগ্যজনক পরাজয়ে মোগলদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিয়েছেন। আফগানদের হামলায় আট হাজার সৈন্য সেই যুদ্ধে মারা যায়, বীরবলও নিহত হলেন। অনেক খুঁজেও মরদেহের স্তূপের ভেতর থেকে বীরবলের দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঐতিহাসিকদের মতে— এ যুদ্ধ ছিল আকবরের সবচেয়ে বড় সামরিক ব্যর্থতা এবং সেনা ধ্বংসের ঘটনা। বীরবলের এই মর্মান্তিক পরাজয়ে ও মৃত্যুর পেছনেও চক্রান্তকারীদের হাত ছিল বলে মনে করা হয়। জৈন খান ও আবুল ফাতাহ প্রাণ বাঁচিয়ে আটক দুর্গে এসে পৌঁছতে পেরেছিলেন সেই যাত্রায়।
৩.
বীরবলের মৃত্যুর শোকে ভেঙে পড়েন আকবর। দুদিন-দুরাত তিনি নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন, কয়েক দিন আহার-নিদ্রা, দরবারে বসা— সব কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। মা মরিয়ম মাকানী অনেক বোঝালেন। অবশেষে মায়ের অনুরোধে তিনি খাবার মুখে তুললেন। তবে তিনি সেনাপতি জৈন খান ও ফাতাহর ওপর ভীষণ রুষ্ট হয়েছিলেন। সম্রাটকে তাদের সালাম জানাতেও নিষেধ করে দিয়েছিলেন। দরবার-ই-আকবরীর রচয়িতা শামসুল উলামা হাসান মুহাম্মদ আজাদ লিখেছেন—
—“বীরবলের মৃত্যুর পর আকবর এমন অস্থির ও শোকাভিভূত হন যে তা দেখে লোকে অবাক হয়ে গিয়েছিল। অমন আলিম-ফাজিল, সংবেদনশীল, সাহসী নেতা এবং দরবারী পরাক্রমশালী অনেকে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে আকবরের সম্মুখেই প্রাণত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু এমন কী কারণ ছিল যে বীরবলের মতো কারো মৃত্যুতেই তিনি এত বিহ্বল হয়ে পড়েননি। আলেকজান্ডারের সঙ্গে অ্যারিস্টটলের নাম যেমন উচ্চারিত হয়, ঠিক তেমনি আকবরের সঙ্গে বীরবলের নাম। কিন্তু যদি খ্যাতির দিক দিয়ে বিচার করা যায়, তাহলে মনে হবে বীরবল তাঁর কাছে অ্যারিস্টটলের চেয়ে অনেক বেশি।’
(উদ্ধৃতি ‘আকবর’— রাহুল সাংকৃত্যায়ন/অনুবাদ আশরাফ চৌধুরী)
আকবরের শোকের বড় কারণ, বীরবলের মতো সবসময়ের এমন বিশ্বস্ত বন্ধু তিনি বোধহয় আর পাবেন না। বারবার দুঃখ করে বলেছেন, বন্ধুর মরদেহটি যদি খুঁজে পাওয়া যেত তাহলে তাঁর শেষকৃত্য করার সুযোগ পেতেন। শেষে আক্ষেপ করতে করতে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন, ‘বীরবলের মতো ধর্মপ্রাণ মানুষকে দাহ করার প্রয়োজন হয় না। এখন তিনি সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত, পবিত্র, নির্লিপ্ত।’
বীরবলের মৃত্যুতে সম্রাট আকবর বিখ্যাত মোগল ওমরাহ খান খানান আবদুর রহিমকে তাঁর মনঃকষ্টের বর্ণনা দিয়ে এক বিষাদমাখা পত্র লিখেছিলেন। বাদশাহর এ চিঠির ভাষা থেকে বোঝা যায়, রাজা বীরবল তাঁর হূদয়ের কত কাছে ছিলেন। বীরবলের আনুগত্যের প্রশংসায় ভরা সেই চিঠিতে আকবর তাঁর বন্ধুকে স্মরণ করে দু’ছত্র কবিতা লিখেছিলেন। এর ইংরেজি ভাষ্য এইচ বেভারিজের কৃত্য মাথির-উল-উমারা থেকে নেয়া।
ছত্রটি নিম্নরূপ—
‘What heart is there that bleeds not for this sorrow, Whose eyes are not blood-shot from this grief.’
বীরবলের মৃত্যুর পরও বদায়ূনির রোষ কমেনি। তার লেখনী তখনো বীরবল-দূষণে, ব্যঙ্গে তীব্র। তিনি লিখতে দ্বিধা করলেন না— ‘বীরবল যুদ্ধ থেকে কাপুরুষের মতো পালিয়ে উত্তর ভারতের সাধু-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ভিড়ে গেছেন।’ এরপর নানা জনে নানা রকম খবর নিয়ে আসতে থাকে বাদশার কাছে। কেউ বলে, তাঁর মৃত্যুর খবর সত্য নয়।
তিনি সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। তাঁর সঙ্গে কথাও নাকি বলেছে কেউ কেউ। আকবর নিজে বলেন— তিনি (বীরবল) বিষয়-সম্পত্তিতে অত্যন্ত উদাসীন এবং সংকোচপ্রবণ ব্যক্তি ছিলেন। পরাজয়ের কারণে যদি তিনি সাধু-সন্ত হয়ে যান, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবু গুজব কিছুতেই শেষ হয়নি। আকবর যখন লাহোরে তখন খবর এল, বীরবল কাগড়ায় লুকিয়ে আছেন। খোঁজ করতে লোক পাঠানো হলো। কিন্তু বীরবলকে খুুঁজে পাওয়া গেল না। কালিঞ্জর বীরবলের জায়গির ছিল, সেখানে বীরবলের পূর্বপরিচিত এক ব্রাহ্মণ জানাল— বীরবল ব্রাহ্মণের নজর এড়াতে পারেনি, তিনি জীবিত, তবে আত্মগোপন করে রয়েছেন।
এই ব্রাহ্মণ মিছে মিছে এক পথিককে বীরবল বানিয়ে নিজের কাছে বন্দি করে রেখেছিল। এরই মধ্যে বাদশাহর কাছ থেকে আদেশ এল— অবিলম্বে এই বীরবলকে দরবারে হাজির করতে। এবার ব্রাহ্মণের হুঁশ হলো। নকল বীরবলকে পাঠালে তার সব জারিজুরি বের হয়ে যাবে, তাই এই নিরীহ পথিককে মেরে ফেলে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেয়া হলো। এবং এক নরসুন্দরকে দরবারে পাঠানো হয়। সে জানায়, তেল মালিশ করার সময়ও শরীর দেখে তিনি যে বীরবল, তা বুঝতে পারে সে। বীরবলের দ্বিতীয়বার মৃত্যুর খবর পাওয়ায় দরবারে দ্বিতীয়বার শোক পালন করা হয়। সম্রাটের কাছে যথাসময়ে বীরবলের খবর কেন পাঠানো হয়নি, এ অপরাধে কালিঞ্জারের নায়েব ও অন্য কর্মচারীদের কয়েদ করা হলো। পরে অর্থদণ্ড দিয়ে তারা জেল থেকে ছাড়া পায়।
মৃত্যুর পরও ঠগ, প্রতারক, ভীরু হিসেবে অপরাধের বোঝা বইতে হয়েছে অসীম প্রতিভাবান বীরবলকে। আরো পরিতাপের বিষয়, সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা বীরবলের প্রতি সবসময় সুবিচার করেননি। তাঁর কৃতিত্বের বিস্তারিত উল্লেখও করা হয়নি।
তবে সুখের বিষয়, আকবরের বহু পরে মোগল শাসনের প্রায় শেষের দিকে লেখা মোগল বীর ও খ্যাতনামা আমির ওমরাহদের জীবনী ‘মাথির-উল-উমারা’য় রাজা বীরবলকে উন্নত ভাগ্যের অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এইচ বেভারিজ সাহেব কর্তৃক এ গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদে বীরবল সম্পর্কে নিচের উক্তিটি প্রাণিধানযোগ্য—
‘In fine Rajah Birbar was among the singular of the age for liberality and generosity, and was famed for his gifts.’
তীক্ষ বুদ্ধি বীরবলের দোষ-ত্রুটি যে ছিল না, তা নয়; কিন্তু তাঁর মেধার যথাযোগ্য সমাদর না হয়ে সমসময়ে তাঁর ভাগ্যে জুটেছে ঈর্ষার আগুনে তৈরি নানা অপবাদের ধারালো আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার যন্ত্রণা। কালস্রোত সেই প্রক্রিয়াকে শুধু এগিয়ে দিতে সহায়তা করেছে, তাঁকে উপহাস আর নিন্দা-পঙ্কের আবর্তে ঠেলে দিয়েছে প্রবল বিদ্বেষে।





