ঋণ পরিশোধ
তখন বাদশাহ আকবরের রাজত্বকাল। দিল্লীতে তাঁর রাজধানী।
বাদশাহ আকবর ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান। রাজ্য চালাবার দক্ষতাও তাঁর ছিলো যথেষ্ট। যদিও নিজে তেমন বিদ্বান ছিলেন না, তবুও বিদ্বান ব্যক্তিদের খুবই কদর করতেন তিনি। গুণী, জ্ঞানী, বিদ্বান ও বুদ্ধিমান লোকদের জাতি-ধর্ম বিচার না করে নিজের দরবারে পরম সমাদরে ঠাঁই দিতেন তিনি। আবুল ফজল, মোল্লা দোপিঁয়াজা, রাজা মানসিংহ, খান খানান, গঙ্গ, ফৈজী, তানসেন, বীরবল ও তোডরমল— এ নয়জন বিশেষ জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন তাঁর দরবারের সভাসদ। তাঁদের ভেতর গীতশিল্পী, মহাবীর, রাজনীতিবিদ, হাস্যরসিক, ইতিহাসবিদ— সবাই ছিলেন। তাই তাঁদের নজনের এ দলটিকে বলা হতো নবরত্ন।
বাদশাহ আকবরের এ নবরত্নের মাঝে একজন ছিলেন এক গরীব ব্রাহ্মণ। তিনি ছিলেন হাস্যরসিক আর গল্প বলে খুব আসর জমাতে পারতেন। যতোই দিন যেতে লাগলো বাদশাহ এ ব্রাহ্মণের ওপর ততোই খুশি হয়ে উঠলেন।
একদিন বাদশাহ আকবর সেই ব্রাহ্মণের গল্প শুনে বললেন, তোমার গল্প শুনে আজ যেমন হেসেছি, তেমন জীবনে কোনোদিন হেসেছি বলে তো মনে পড়ে না! তুমি যা বখশিস চাইবে তাই দেবো তোমায়। কি চাও তুমি?
ব্রাহ্মণ তখন বাদশাহকে কুর্নিশ করে বললেন, শাহানশাহ সত্যিই যদি গরীবের ওপর খুশি হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার জল্লাদকে হুকুম করুন আমার পিঠে চাবুকের একশ ঘা মারার জন্যে। তাই হবে আমার মনের মতো বখশিস।
বাদশাহ এ কথা শুনে তাজ্জব হয়ে চেয়ে রইলেন ব্রাহ্মণের দিকে। আমীর ওমরাহ্ যাঁরা ছিলেন তাঁরাও অবাক হলেন! কে কবে শুনেছে চাবুকের ঘা চেয়ে নিতে বখশিস হিসেবে?
বাদশাহ পুনরায় বললেন, তুমি কি চাও ঠিক করে বলো। চাবুকের ঘা কি কখনো বখশিস হতে পারে? নিশ্চয়ই তুমি তামাশা করছো!
ব্রাহ্মণ করজোড়ে বললেন, হুজুরের সঙ্গে হাসি-তামাশা করবো, তেমন বেয়াদব আমি নই জাঁহাপনা। হয়তো আমিই প্রথম ব্যক্তি যে জাঁহাপনার কাছে এমন আজব ধরনের বখশিস চেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু আমি সত্যিই বলছি, একান্ত যদি আমাকে বখশিস দিতেই হয় তবে যা চেয়েছি তাই দিন। আর তা যদি না দিতে চান তবে কিছুই দেবেন না জাঁহাপনা।
বাদশাহ কিছুতেই রাজি হন না নির্দোষী একটা লোকের পিঠে চাবুক মারার হুকুম দিতে। বখশিস দিতে চেয়ে সাজা কি করে দেবেন তিনি?
দরবারে নানা রকম লোকই ছিলো। কেউ কেউ ছিলো ভালো আবার কেউ ছিলো হিংসুটে। অল্পদিন হলো ব্রাহ্মণ এসেছেন শাহী দরবারে। কিন্তু এরই ভেতর তিনি বাদশাহর প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছেন! তাই ব্রাহ্মণের এ সৌভাগ্যে হিংসুটে সভাসদরা হিংসে করতো সেই ব্রাহ্মণকে। হিংসেয় জ্বলেপুড়ে মরতো তারা। তাদেরই একজন টিপপনী কেটে বললো, হয়তো বামুন ভেবেছে চাবুকের পিটুনি খেয়ে ওর বুদ্ধি খুলে যাবে। তাই চাবুকের পিটুনি খেতে চাইছে।
ব্রাহ্মণ সেই হিংসুটে সভাসদের দিকে ফিরে বললেন, সত্যিই তাই। সে জন্যেই ওস্তাদ তার শাগরেদদের বেতের পিটুনি দেন। কোনো কোনো লোক পিটুনি খেয়েই শেখে। রোগ সারাতে পিটুনি যে কেমন ভালো ওষুধ, একটু পরেই তা দেখতে পাবেন।
বাদশাহ দেখলেন উপায়ন্তর নেই। ব্রাহ্মণ নাছোড়বান্দা। কিছুতেই তাঁর কথার নড়চড় হতে দেবেন না। অবশেষে বাধ্য হয়েই তিনি ব্রাহ্মণের পিঠে চাবুক মারার হুকুম দিলেন।
জল্লাদ এসে বেচারা ব্রাহ্মণকে চাবুক মারতে শুরু করলো— শপাং শপাং। এভাবে পঞ্চাশ ঘা মারার পর হঠাত্ ব্রাহ্মণ হাত উঠিয়ে বললেন, থামো, থামো, আর নয়।
বাদশাহও বললেন, থামাও থামাও। আর মেরো না। এবার বুঝি বামুনের সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে!
ব্রাহ্মণ বললেন, শাহানশাহ! সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে বলে চাবুক মারা থামাতে বলিনি। আসলে এবার আমার ঋণ পরিশোধের পালা। আমার এক বন্ধু আছে। তার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি আমার বখশিসের অর্ধেক আমি দেবো তাকে। আমার সেই বন্ধুটিকে এবার ভেতরে আসতে অনুমতি দিন। সে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্রাহ্মণের কথা শুনে আবার সবাই অবাক হয়ে চেয়ে রইলো তাঁর দিকে। বাদশাহ ভাবলেন, একটা রহস্য নিশ্চয়ই আছে এর ভেতর। তাই অনুমতি দিতে বিলম্ব হলো না তাঁর। ব্রাহ্মণ তখন বাইরে গিয়ে ডেকে নিয়ে এলেন দরজায় পাহারারত বিশালদেহী এক প্রহরীকে। এনে বললেন, এই যে আমার সেই বন্ধু জাঁহাপনা। আমার বখশিসের অর্ধেক প্রাপ্য এ বন্ধুটির।
প্রহরীকে দেখে বাদশাহ আকবর তাজ্জব হয়ে গেলেন। ব্যাপার কি? তাঁর প্রহরী কি করে বিদেশী ব্রাহ্মণের বন্ধু হতে পারে?
ব্রাহ্মণ তখন সব কথা বুঝিয়ে বললেন বাদশাকে। বললেন, দিল্লী থেকে অনেক দূরে কালপী নামের এক গ্রামে আমার বাস। অত্যন্ত গরীব মানুষ আমি। বরাবর জাঁহাপনার গুণগ্রাহিতার কথা শুনে আসছি, কিন্তু শাহী দরবারে হাজির হবার সুযোগ কখনো হয়নি আমার। একবার তাই খুব ইচ্ছে হলো দিল্লী আসতে। তারপর সত্যিই একদিন পায়ে হেঁটে দিল্লী এসে হাজির হলাম। অনেক দূর হেঁটে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েছি কিন্তু মনে তবু অপার আনন্দ। এতোদিনে মনের বাসনা পূর্ণ হলো— দিল্লী এলাম।
এক পা দু-পা করে শাহী মহলের দিকে ভয়ে ভয়ে এগোচ্ছি। দেউড়ীর কাছে আসতেই পথ আগলে দাঁড়ালো হুজুরের বিশালবপু এই প্রহরী। ধমক দিয়ে সে বললো, কোথায় যাচ্ছো?
আমি চমকে গেলাম। মিনতি করে বললাম, অনেক দূরদেশ থেকে পায়ে হেঁটে এসেছি শাহানশাহ আকবরকে একটি বার চোখে দেখবো বলে। অনুগ্রহ করে আমাকে দরবারে ঢুকতে দাও।
আমার এ কথায় দারোয়ানের মন ভিজলো না। অনেক টাকা বখশিস চেয়ে বসলো। বখশিস না পেলে কাউকেই নাকি সে দরবারে ঢুকতে দেয় না।
এদিকে আমার সঙ্গে ছিলো না একটিও কানাকড়ি। কি বখশিস দেবো প্রহরীকে? অবশেষে ভাবতে ভাবতে হঠাত্ এক বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। বললাম, আমার কাছে যে কিছু নেই তা তো দেখতেই পাচ্ছো। তবে হ্যাঁ, আশা আছে বাদশাহর দরবারে ঢুকে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারলে কিছু পুরস্কার পাবো আমি। আমি যা কিছু পাই, তার অর্ধেক দেবো তোমাকে ওয়াদা করছি।
আমার এ প্রস্তাবে হুজুরের দয়ালু প্রহরী রাজি হলো। রাজি হয়ে আমাকে দরবারে ঢুকতে দিলো। সে অবধি দরবারে যাতায়াত করছি। এতোদিন হুজুরের নেক নজর আমার ওপর পড়েনি বলে ঋণ শোধেরও কোনো উপায় হয়নি। এদিকে এ প্রহরীর দিন কেটেছে আশায় আশায়। জাঁহাপনার দয়ায় আজ আমার সে ঋণ পরিশোধের সুযোগ এসেছে।
এটুকু বলে ব্রাহ্মণ হতভম্ব প্রহরীর দিকে চেয়ে বললেন, বাদশাহ খুশি হয়ে আজ আমাকে একশ ঘা বখশিস দিতে রাজি হয়েছেন। তার অর্ধেক আমি নিয়েছি। এবার বাকি অর্ধেক তোমাকে দেবার পালা।
ব্রাহ্মণের কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই প্রহরীর নামে নালিশ করলো। তারাও প্রহরীকে বখশিস দিয়েই দরবারে ঢুকেছে।
এসব কথা শুনে বাদশাহ গেলেন ভীষণ চটে। তিনি হুকুম দিলেন, ওকে আচ্ছা করে পঞ্চাশ ঘা চাবুক মেরে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দাও।
চাবুকের পিটুনি দেয়ার কথা শুনে যে লোকটা ব্রাহ্মণকে ঠাট্টা করেছিলো, এবার তার দিকে ফিরে ব্রাহ্মণ বললেন, চাবুকের ঘা খেয়ে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বাড়ে কিনা প্রহরীকে দেখে শিখে নিন জনাব।
সেদিনই প্রহরীকে চাবুক মেরে তাড়িয়ে দেয়া হলো।
এ ব্রাহ্মণ লোকটিই ছিলেন বিখ্যাত হাস্যরসিক মহাজ্ঞানী বীরবল।
দরবারের অনেকেই বীরবলকে ভালবাসতো। বাদশাহও সেদিন থেকে তাঁকে নবরত্নের একজন করে নিলেন। তাঁকে অনেক টাকা বখশিস দিলেন আর দিলেন একটি জায়গীর এবং ‘রাজা’ উপাধি।

মনের কথা
একদিন যমুনার তীরে এক বাগান বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাদশাহ আকবর সূর্যাস্তের শোভা দেখছিলেন। বীরবল পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি হঠাত্ জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা জাঁহাপনা! সূর্য পশ্চিম দিকে অস্ত যায় কেনো বলতে পারেন?
বাদশাহ দেখলেন, এ প্রশ্নের সঠিক জবাব দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি কথাটা উড়িয়ে দেবার জন্যে বললেন, ভারী তো একটা প্রশ্ন! যে কোনো মূর্খ লোকও এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে।
সঙ্গে সঙ্গে বীরবল বললেন, ঠিক সে জন্যেই জাঁহাপনাকে প্রশ্নটা করেছি। বাদশাহ আকবর তেমন লেখাপড়া জানতেন না। তবে বুদ্ধিমান ছিলেন। তাই ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেও তিনি হাসতে লাগলেন।
একদিন দরবারে এসে বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তোমরা এখন মনে মনে কি চিন্তা করছো, তা কেউ বলে দিতে পারো?
উপস্থিত সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন। তারা ভাবলেন, যার যার নিজের স্বার্থের চিন্তাই তো প্রধান চিন্তা। কিন্তু বাদশাহর কাছে তা বলবেন কেমন করে? তাই তারা চুপ করেই রইলেন। কিন্তু বীরবল বললেন, সবার মনেই এক চিন্তা জাঁহাপনা। সে চিন্তা কি হতে পারে তাও বলে দিতে পারবো আমি।
বাদশাহ বললেন, উপস্থিত সকলের মনের চিন্তা এক হতেই পারে না। তুমি অদ্ভুত কথা শোনালে হে বীরবল!
বীরবল বললেন, আমার কথা ঠিক কিনা হুজুর এখখুনি তা যাচাই করে দেখুন। আমি বলছি, এ মুহূর্তে সবাই ভাবছেন— বাদশাহর উন্নতি হোক, রাজ্যের সবাই সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকুক। সবার মনে এ চিন্তা কিনা হুজুর আমীর ওমরাহদের জিজ্ঞেস করেই দেখুন।
বীরবল জানতেন, জিজ্ঞেস করলেও এ কথার বাইরে কেউ কিছু স্বীকার করতে সাহস করবেন না। ফলে তাই হলো। উপস্থিত সবাই একবাক্যে বলে উঠলেন, বীরবল ঠিকই বলেছেন জাঁহাপনা। রাতদিন আমাদের মনে শুধু ঐ একটিই চিন্তা। আপনার ও আপনার রাজ্যের মঙ্গল ছাড়া আর কি-ইবা চিন্তা করতে পারি আমরা!
বীরবলের বিচার
বীরবলকে অনেক সময় কাজীর কাজও করতে হতো। বাদশাহ নিজেও সময় সময় অনেক মামলা-মোকদ্দমা মিটানোর ভার দিতেন বীরবলের ওপর। তাছাড়া জটিল কোনো ব্যাপার দেখলে কাজী নিজেও ছুটে আসতেন বীরবলের কাছে পরামর্শ নেয়ার জন্যে। কারণ, দিল্লীর শাহী দরবারে আসবার আগেও বীরবল অম্বরের রাজা ভগবান দাসের রাজদরবারে এসব কাজ করেছেন।
একদিন এক ঘি বিক্রেতা এলো বীরবলের কাছে। এসে বললো, হুজুর, কিছুদিন আগে এক বন্ধুর দরকারের সময় তাকে কিছু টাকা ধার দিয়েছিলাম। একটা-দুটো টাকা নয়— এক হাজার টাকা। এখন সে পাওনা টাকাটা ফেরত দিতে অস্বীকার করছে।
বীরবল জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কোনো লিখিত রসিদপত্র আছে কি? অথবা টাকাটা দেয়ার সময় কেউ দেখেছে কি?
আজ্ঞে না, তেমন কোনো প্রমাণপত্র রাখিনি আমি। আমরা ব্যবসায়ীরা অনেক সময় লেখাপড়া ছাড়াই টাকা লেনদেন করে থাকি। কখনো তাতে গোলমাল বাধে না হুজুর। বিশ্বাস করুন, আমি একটুও মিথ্যে বলছি না। আমার বন্ধু হয়েও লোকটা কিনা আজ আমাকে ঠকাবার মতলব করছে!
বীরবল বললেন, বেশ, তোমার যা বক্তব্য একটা কাগজে লিখে দিয়ে যাও। আমি কি করতে পারি তোমাকে পরে জানাবো।
লোকটা বীরবলের কথামতো সবকিছু লিখে তার নিচে সই করে দিয়ে বাড়ি চলে গেলো। পরের দিন বীরবল আসামীকে ডেকে পাঠালেন।
সে চতুর লোকটা এসেই বলে উঠলো, কি ভাগ্যি আমার— হুজুর আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন!
হ্যাঁ ডেকে পাঠিয়েছে। এ কাগজখানা পড়ে তোমার কি বক্তব্য আছে তা বলো অমাকে।
এই বলে বীরবল অভিযোগপত্রটি তুলে দিলেন লোকটির হাতে। কাগজটি পড়ে এবার সে বললো, দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার বন্ধু হয়ে সে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে নালিশ করে গেছে!
বীরবল বললেন, দুনিয়াটাই আজকাল এ রকম হয়ে গেছে। এ লোকটা তাহলে তোমাকে টাকা ধার না দিয়েই বলছে ধার দিয়েছে?
ঠিক বলছেন হুজুর। আমাকে সে ধার দেয়নি। আমি বরং অনেকবার তাকে টাকা ধার দিয়ে উপকার করেছি! সেই উপকারের পরিশোধ করছে সে আমার নামে মিথ্যে নালিশ করে। খোদার মেহেরবানিতে আমার কারবার ভালো চলছে কিনা, তাই এ হিংসে!
তাহলে এ অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যে? পুরোপুরি মিথ্যে হুজুর। শুরু থেকে শেষ অবধি মিথ্যে। আমি তার টাকা কখ্খনো হাত দিয়ে ধরিনি। তাছাড়া এতো টাকা সত্যিই যদি সে ধার দিয়েই থাকবে, তাহলে তার কাছে কোনো রসিদ নেই কেনো? নিশ্চয়ই সে একটা রসিদ চেয়ে নিতো।
বীরবল বললেন, হ্যাঁ, রসিদের কথা আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু রসিদ দেখাতে পারেনি।
তাহলে বুঝতেই পারছেন হুজুর আসল ব্যাপারটা। এ সবই মিথ্যে। আমার অনিষ্ট করার জন্যেই চতুর লোকের এক কারসাজি। ভয়ঙ্কর চতুর লোক সে।
বীরবল বললেন, ব্যাপারটা শুনে আমারও সে রকমই মনে হয়েছিলো। তবুও নালিশ যখন হয়েছে তখন তোমাকে না ডেকে পারিনি। যাক গে, তোমাকে একটু কষ্ট দেয়া হলো। কিছু মনে করো না ভাই।
না না হুজুর, এ আর তেমন কি কষ্ট— বলতে বলতে লোকটি চলে গেলো।
পরের দিন বীরবল দু’টিন ঘি আনালেন বাজার থেকে। তার এক টিন দিলেন সেই বিক্রেতা লোকটিকে। অন্য টিনটি দিলেন অপর জনকে। দুজনকে দুটি টিন ঘি দিয়ে বলেন, ঘিটা কিনেছিলাম খাবার জন্যে। কিন্তু খাঁটি মনে হচ্ছে না বলে বিক্রি করতে চাইছি। দুজনে দু’টিন ঘি বিক্রি করে টাকাটা আমাকে দিয়ে যেও।
ঘিয়ের টিন দুটি দুজনে ঘাড়ে করে বাড়ি ফিরে গেলো। নিজের নিজের বাড়িতে গিয়ে দুজনেই তারা টিনের ঘি কড়াইতে ঢেলে গরম করে নিলো। কড়াইতে ঢালতে গিয়ে দেখা গেলো টিনের তলায় ঘিয়ের ভেতর পড়ে রয়েছে একটা সোনার মোহর। দুজনেই একটা করে মোহর পেলো।
প্রথম লোকটি মোহরটি পেয়েই দৌড়ে গেলো বীরবলের কাছে। গিয়ে বললো, এ মোহরটা ভুলে বোধ হয় ঘিয়ের টিনে রাখা হয়েছিলো হুজুর। ঘি কড়াইতে ঢালতে গিয়ে দেখলাম টিনের তলায় এটা পড়ে আছে।
লোকটিকে ধন্যবাদ দিয়ে বীরবল তার হাত থেকে মোহরটি নিয়ে রেখে দিলেন জামার পকেটে। তিনি বুঝতে পারলেন, আর যাই হোক, এ লোকটি অসত্ হলে মোহরটা নিজেই রেখে দিতো— ফেরত দিতে ছুটে আসতো না। দেখা যাক অন্য লোকটি কি করে।
দ্বিতীয় লোকটি কিন্তু মোহরটা আত্মসাত্ করার লোভ সামলাতে পারলো না। সে তার ছেলেকে ডেকে বললো, টিনের ভেতর পেলাম এ মোহরটা। যত্ন করে রেখে দিস্। যখন আমি চাইবো তখন দিবি। অনেক টাকা পাওয়া যাবে মোহর ভাঙালে।
ঘি বিক্রি করে পরের দিন দুজন লোকই বীরবলের কাছে এলো টাকা দিয়ে যেতে। প্রথম লোকটির টাকা নিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বীরবল বিদায় দিলেন। তারপর দ্বিতীয় লোকটিকে বললেন, তোমার বোধহয় ভুল হয়েছে। তুমি মাত্র এক মণ ঘিয়ের টাকা এনেছো। টিনে যে দেড় মণ ঘি ছিলো!
না হুজুর, এক মণই ছিলো টিনে! বাড়ি গিয়েই তো আমি নিজে ওজন করে দেখেছি। আমার ছেলেও ছিলো কাছে দাঁড়িয়ে।
আত্মপক্ষ সমর্থন করে বললো সে। তখন বীরবল বললেন, তাহলে কি আমারই ভুল হলো? হতেও পারে। দাঁড়াও আমি হিসেব করে দেখে আসছি এখ্খুনি। এই বলে তিনি বাড়ির ভেতর গেলেন। গিয়েই চাকরকে দ্বিতীয় লোকটির বাড়ির ঠিকানা দিয়ে বললেন, ওর বাড়িতে গিয়ে ওর ছেলেকে ডাকবি। ডেকে এখানে আসতে বলবি। আসবার সময় ওর বাবার মোহরটা যেনো নিয়ে আসে। ওটা ওর বাবার খুব দরকার ওকে বলিস।
একটু পরেই ছেলেটিকে নিয়ে চাকর ফিরে এলো। ছেলেকে সেখানে দেখে লোকটি মনে মনে বিস্মিত হলো। বীরবল হঠাত্ ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, কই, মোহরটা এনেছো তো?
হ্যাঁ, এই তো মোহর।
বলেই ছেলেটি মোহর বের করে দিলো বীরবলের হাতে। বীরবল বললেন, মোটে একটি? কেনো, তোমার বাবা কি দুটি মোহরের কথা বলেননি?
বিস্মিত ছেলেটি ওর বাবাকে উদ্দেশ করে বললো, দুটি মোহরের কথা কখন বললে বাবা? টিনের ভেতর পেয়ে তুমি তো একটা মোহরই আমাকে রাখতে দিলে!
লোকটি বুঝতে পারলো, সে এবার হাতেনাতেই ধরা পড়ে গেছে। ফাঁকি দেয়ার আর কোনোই উপায় নেই। তবুও শেষ চেষ্টা করে সে বললো, তুই একটা বেহদ্দ গাধা! ঘিয়ের টিনে মোহর থাকে কখনো শুনেছে কেউ?
ছেলেটি এবার আরো বিস্মিত হয়ে বললো, বাঃ! ঘিয়ের টিনে মোহরটা পেয়ে তুমি আমাকে রাখতে দিলে না? এখনই সে কথা ভুলে গেলে?
লোকটি তখন রেগে উঠে বললো, তুই স্বপ্ন দেখছিস। এখন আমার মনে পড়েছে একটা লোক সেদিন মোহরটা দোকানে এসে দিয়েছিলো বটে। সেটাই তোকে রাখতে দিয়েছিলাম।
এবারে বীরবল আর কথা না বলে পারলেন না। তিনি বললেন, স্বপ্ন তুমিই দেখেছো। তোমাকে পরীক্ষা করার জন্যে আমিই মোহরটা রেখেছিলাম টিনের ভেতর।
অসত্ লোকটা আমতা আমতা করে বললো, তাহলে আসল কথাটা ভুলে গেছি। অন্যের টাকা আমি কেনো রাখতে যাবো? ওরে খোকা, এখ্খুনি দিয়ে দে হুজুরের মোহরটা।
বীরবল ছেলেটির হাত থেকে মোহরটি নিয়ে বললেন, আমার মোহর ফেরত্ দিলে, কিন্তু তোমার বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেয়া সেই হাজার টাকা ফেরত্ দেবে না?
ছেলেটি তা শুনেই বলে উঠলো, এখনো তুমি সে টাকা ফেরত্ দাওনি বাবা? তুমি তো বলেছিলে কবেই নাকি টাকাটা শোধ করে দিয়েছো!
লোকটি ছেলের ওপর ভয়ানক রেগে গেলো। বললো, তুই চুপ কর বোকা ছেলে কাঁহাকা?
বীরবল কিন্তু তাকে চুপ করতে দিলেন না। তিনি ছেলেকে সব খুঁটে খুঁটে জিজ্ঞেস করলেন। ছেলেটিও যা জানতো সব খুলে বলে ফেললো। তখন বীরবল বললেন, তোমার চেয়ে তোমার ছেলে দেখছি বেশি সত্। তোমার উচিত তোমার ছেলের কাছ থেকে সততা কাকে বলে শিখে নেয়া। একটা মোহরের লোভ সামলাতে পারোনি— এক হাজার টাকার লোভ সামলাবে কেমন করে? এখন সত্যি কথাটা বলে ফেলো।
তারপর কি হলো বুঝতেই পারছো। হাতেনাতে ধরা পড়ে লোকটা তখন সবকিছু স্বীকার করতে বাধ্য হলো।





