লাল গালিচা সংবর্ধনা। প্রায় সবাই বাগধারাটির সঙ্গে পরিচিত। মর্যাদাপূর্ণ আসরে গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে বরণ করে নিতে এমন সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। কিন্তু এ বাগধারার জন্ম হলো কীভাবে? তার উত্তর পেতে যেতে হবে ৮৫ বছর পেছনে। ১৯৩৮ সালে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘লাল গালিচা সংবর্ধনা’ বাগধারাটির উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ট্রেন। নিউইয়র্কের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মালিকানাভুক্ত ট্রেনটির নাম ছিল ‘টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেড’। এটি প্রথম যাত্রা করেছিল ১৯০২ সালে। নতুনরূপে পুনরায় এর যাত্রা হয় ১৯৩৮ সালে। সে বছর যাত্রীদের অভ্যর্থনা জানাতে প্লাটফর্মে লাল গালিচা বিছিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। অবজারভেশন কার থেকে ইঞ্জিন রুম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সে গালিচা। এর আয়তন ছিল একটি ফুটবল মাঠের সমান। টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেড ট্রেনের জন্য বিশেষভাবে গালিচাটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। যাত্রীদের জন্য ট্রেন কর্তৃপক্ষের এমন অভিনব আয়োজন বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। হয়েছিল দারুণ জনপ্রিয়। টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত টোয়োন্টিথ সেঞ্চুরি লিমিটেডের একটি বিজ্ঞাপনে এ লাল গালিচাকে ‘ম্যাজিক কার্পেট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। সেই থেকে শুরু। নিউইয়র্ক থেকে প্রতিবার যাত্রার সময় যাত্রীদের দেয়া হতো লাল গালিচা সংবর্ধনা। ১৯৬৮ সালে ট্রেনটি শেষবারের মতো যাত্রা করেছিল। সে পর্যন্ত কখনই এ নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
দুটি শহরের মধ্যে যাতায়াত করত টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেড। নিউইয়র্ক থেকে শিকাগো। শিকাগো থেকে নিউইয়র্ক। সন্ধ্যা ৬টায় নিউইয়র্কের ম্যানহাটন পৌরসভা থেকে ছাড়ত এ ট্রেন। পরের দিন সকাল ৮টায় শিকাগো পৌঁছত। নিউইয়র্ক থেকে যাত্রার সময় কেবল যাত্রীদের লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হতো। শিকাগো থেকে নিউইয়র্কে ফেরার সময় তেমন কোনো আয়োজন ছিল না।
টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেডের যাত্রীরা অধিকাংশই ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, পুঁজিপতি ও তারকা অভিনয়শিল্পী। এটি মূলত ছিল অভিজাত শ্রেণীর ট্রেন। তাই ট্রেনটি ‘ট্রেন অব দ্য টাইকুনস’ নামে পরিচিত ছিল। নিউইয়র্কের কেন্দ্রীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘দ্য মোস্ট ফেমাস ট্রেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে অভিহিত করে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। ট্রেনটিতে সে সময়ের সবচেয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো ছিল। রিগলে, ব্লেয়ার, বার্ড ও ফিল্ডের মতো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বসেরা সব ব্র্যান্ডের মালিক ও কর্মকর্তারা এ ট্রেনের নিয়মিত যাত্রী ছিলেন। বেডরুম স্যুইট, কমপার্টমেন্ট ও ড্রয়িং রুমগুলো তাদের দখলেই থাকত।
টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেডের নির্ধারিত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কখনো গাফিলতি করেনি। তাই বিলাসপ্রিয় ভ্রমণকারীদের কাছে এটিই ছিল একমাত্র পছন্দ। এ ট্রেনের কোনো বিকল্প সে সময় ছিল না। ট্রেনটির ডাইনিংয়ের জন্য নির্ধারিত বগির নাম ছিল ‘সেঞ্চুরি ক্লাব’। টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেডের ১৯৩৯ সালের এক মূল্যতালিকা থেকে জানা যায়, যাত্রীরা স্টার্টার হিসেবে রাশিয়ান ক্যাভিয়ারে ভাজা এক ধরনের টোস্ট খেতে পারতেন। এ খাবারের নাম ‘ক্যানাপে’। এটি খাওয়ার জন্য একজন যাত্রীকে ১ ডলার ৭৫ সেন্ট গুনতে হতো। এর সঙ্গে আরো ৬০ সেন্ট যুক্ত করে তারা গরু বা খাসির স্টেকের স্বাদ নিতে পারতেন। তবে যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ‘আপেল পাই’ ও ‘ফ্রেঞ্চ ভ্যানিলা আইসক্রিম’।
‘ব্রডওয়ে লিমিটেড’ নামে আরেকটি ট্রেন ছিল টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেডের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। উভয় ট্রেনই ব্যবসায়ীদের যাত্রী হিসেবে পেতে চাইত। প্রতি বছর এ দুটি ট্রেন পুঁজিপতি, সেলিব্রিটি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে বিজ্ঞাপন দিত। এসব বিজ্ঞাপনের পেছনে তারা হাজার হাজার ডলার খরচ করত। এ প্রতিযোগিতায় টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেডই প্রায় সময় বিজয়ী হতো। উপহার হিসেবে পুরুষ যাত্রীদের কার্নেশন (এক ধরনের তীব্র গন্ধযুক্ত ফুল) এবং নারীদের সুগন্ধি উপহার দেয়া হতো। সব যাত্রীকে বিনামূল্যে পত্রিকা সরবরাহ করা হতো।
লাল গালিচা সংবর্ধনা বাগধারাটির উৎপত্তির সঙ্গে জড়িত ট্রেনটির নকশা করেছিলেন হেনরি ড্রেইফুস। এর বগিগুলোর রঙ ছিল নীল ও ধূসর। ড্রেইফুসের নকশা করা টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি লিমিটেডই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকালের সবচেয়ে বিখ্যাত যাত্রীবাহী ট্রেন।
আরমান মুরাদ: লেখক






