প্রাচীন রোমে সম্রাটরা যুদ্ধ জয় করে ফিরলে তাদের বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করা হতো। এ চর্চার শুরুর দিকে শুধু সম্রাটরাই এ সম্মান পেতেন। প্রাচীন যুগের শেষ ও আদি মধ্যযুগে এ চর্চা আরো বিস্তৃত হয়। রোম তার রাজা, বড় কর্মকর্তা এবং ধীরে ধীরে বিশপদের জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে দিতে শুরু করে। ৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে শার্লমাইন বা চার্লস দ্য গ্রেট রোমে লাল গালিচা সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। সেটা ছিল খ্রিস্টান রীতিতে চোখ ধাঁধানো বরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতে রোম থেকে ৩০ মাইল দূরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শার্লমাইনকে অভ্যর্থনা জানান এবং তাকে রোমে নিয়ে আসেন। এরপর রাস্তার দুই পাশে এক মাইলের মতো পথে দুই পাশে দাঁড়ানো ছিল শিশু ও মিলিশিয়ারা। এ পথের শেষে পোপ ও অন্যরা ব্যাসিলিকার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে শার্লমাইনকে গ্রহণ করেন। ধারণা করা হয় এ বরণরীতি চালু হয়েছিল ৩২৬ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টিনের আমলে। তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এ আনুষ্ঠানিকতার প্রবর্তন করেন।
লাল কার্পেটের এ যাত্রা অবশ্য আরো প্রাচীন। সেই গ্রিকদের যুগে। লাল গালিচার প্রথম রেফারেন্সটি পাওয়া যায় আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে রচিত এক গ্রিক ট্র্যাজেডিতে। আগামেমনন নাটকে গ্রিক নাট্যকার এসকাইলাস প্রথম জানান লাল গালিচার কথা। ট্রোজান যুদ্ধে জয়ী আগামেমননকে অভ্যর্থনা জানাতে তার স্ত্রী রানী ক্লাইটেমনেস্ট্রা লাল গালিচা বিছিয়ে দেন। এতদিন এ সম্মান বরাদ্দ ছিল শুধু দেবতাদের জন্য। স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা স্বামীকে দিয়ে এ সীমা লঙ্ঘনের অপরাধ করিয়েছিলেন তাকে হত্যার পটভূমি রচনা করতে। সে আরেক গল্প।
লাল রঙ প্রাচীন গ্রিসে শুধু দেবতা ও স্বর্গীয় ধারণাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। আগামেমনন তাই শুরুতে ইতস্তত করেছিলেন লাল গালিচায় হাঁটতে। তারপর জুতা খুলে পা রাখেন সে গালিচায়।
রোমান যুগের পরে আধুনিক সময়ের আগে লাল গালিচা এবং তার ব্যবহারের উদাহরণ খুব সহজলভ্য নয়। রেনেসাঁ আমলে পশ্চিম ইউরোপে অভিজাতদের মধ্যে লাল গালিচার ব্যবহার ছিল। বিশেষত রেনেসাঁ যুগের চিত্রকর্মে লাল গালিচা ও শতরঞ্জির দেখা পাওয়া যায়। এগুলোয় প্রাচ্যের নকশা দেখা যেত। লাল গালিচা দেখা যেত দেবতা, সন্ত, অভিজাতদের চিত্রে। লাল রঙ তৈরি তখন খুব কঠিন ছিল। অ্যাজটেক ও মায়ারা তাদের পোশাকে লাল রঙ ব্যবহার করত। লাল তখন মর্যাদা, রাজকীয় সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের প্রতীক।
খ্রিস্টানদের কাছে লাল যিশুর রক্তের প্রতীক। খ্রিস্টীয় প্রতীকবাদে এ রঙ তাই গুরুত্বপূর্ণ। কার্ডিনালরা লাল রঙের আলখাল্লা ব্যবহার করেন। পোপ ইনোসেন্ট টু (১১৩০-৪৩) ডিক্রি জারি করেছিলেন যে শুধু পোপ, কার্ডিনাল ও চার্চের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা লাল আলখাল্লা পরতে পারবেন। মধ্যযুগে ইউরোপীয় শাসকরা লালকে তাদের পোশাক, মেঝের কার্পেট ও অন্যান্য সজ্জায় ব্যবহার করতেন। এটা ছিল তাদের শাসনের ধর্মীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠার অংশ।
রেনেসাঁ আমলের চিত্রকর্মে যে লাল গালিচা দেখা যেত তা বাস্তব সমাজের প্রতিরূপ হিসেবেই হাজির হতো। কোনো চিত্রকর্মে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কোনটি সেটা বোঝাতে তার পায়ের কাছে থাকত লাল গালিচা। আবার অনেক সময় গালিচা না ব্যবহার করে শতরঞ্জি দেখা যেত। উদ্দেশ্য একই। মুখ্য চরিত্রের পায়ের নিচে থাকত লাল শতরঞ্জি।
প্রাচীন গ্রিস থেকে মধ্যযুগের ইউরোপ—সম্মান দেখাতে যে কার্পেট বিছিয়ে দেয়া হতো তা কেন লাল? এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞদের দুটো মত দেখা যায়। ওপরের আলোচনা থেকে সেগুলো সম্পর্কে এতক্ষণে পাঠক ধারণা করে নিতে পারবেন নিশ্চয়। প্রথমত, গ্রিকদের কাছে কিংবা পরবর্তী খ্রিস্টীয় সংস্কৃতিতে লাল রঙের ধর্মীয় ও পৌরাণিক মর্যাদা। আর মধ্যযুগে লাল ছিল সবচেয়ে দামি রঙ। তাই এ রঙের ব্যবহার অভিজাত ঘরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এজন্য লাল গালিচা চাইলেও অন্যদের ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। তুরস্কে তখন লাল রঙ পাওয়া ছিল পরিশ্রমসাধ্য। রুবিয়া গাছের শিকড় পিষে তা থেকে লাল রঙ তৈরি করা হতো। আর আমেরিকায় এ রঙের মূল জোগান আসত কোচনিল কীট থেকে। এ পোকা পিষে ফেললে লাল রঙের গুঁড়ো পাওয়া যায়। সেখানে অ্যাজটেক ও মায়ারা এ রঙ ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে স্প্যানিয়ার্ডরা এ অঞ্চল দখল করলে তাদের হাত ধরে কোচলিন লাল ইউরোপের মাটিতে হাজির হয়। পরে কৃত্রিম রঙ আবিষ্কারে লাল রঙের প্রাপ্তি সহজলভ্য হলেও লাল কার্পেট এখনো মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছে।
অমিত রহমান: লেখক






