শীতকাল আমার প্রিয় ছিল, এই স্যাঁতসেঁতে বৃষ্টিভেজা লন্ডনে হাড়কাঁপানিয়া শীতপ্রধান জলবায়ুতে সেই কথা মনে পড়লেও কান্না পায়। নানাবাড়িতে ছাদে ছিল শীতের সবজিবাগান, ছাদে মাটির চুলা গড়ে আমার নানি পিঠা বানাতেন, তার পাশে বসে থাকলে পাওয়া যেত সিন্দুকে তোলা চাদর-ভ্যাসলিন স্নো- জাম্বাক আর খেজুরগুড়ের সম্মিলিত গন্ধ। আকাশ ভরে উঠত নয়নতারা রঙা বিকালের আলোয়, ফিরোজা হয়ে উঠলে চাঁদ উঠত, শুক্রগ্রহও উজ্জ্বল হয়ে উঠত। নির্মেঘ আকাশে তারার প্রদীপমালিকা। ফুটফুটে জোছনা— মিটমিটে জোনাকি আর গভীর কুয়াশা সাঁতরে নানা-নানির বাড়িতে পৌঁছলেই চাল সিদ্ধ করার-গুড় পাক দেয়ার-খড় নাড়বার নিবিড় সুগন্ধে অবগাহন, সরস্বতী পূজার পরের নতুন জোড়া ইলিশ ভাজা আর কাচকলায় রাঁধুনি-ফোড়নের পাতলা ঝোল। শহরতলীর পথের পাশে বা ফেরিঘাটে লাল ধুলোয় খাবি খেতে খেতে সকালের সরভাসা চা খাওয়া আর খোলাজালি পিঠা বানানোর সময় গ্রামীণ নারীর তত্পরতা দেখা... শীত মানে কৃষ্ণদামপুর চরে একটুখানি কলাই শাকের ক্ষেত, জলশীর্ণ গড়াই নদীর রেখা, মরে আসা ইছামতীর তীরে বুকভাঙানিয়া ব্রজবাবুর ঘাট, চষাক্ষেতে বসে থাকা যুবকের সংঘ, নাড়াপোড়া মাঠের ওপর দিয়ে বোঁ বোঁ শব্দ করে ওড়া ঢাউস ঘুড়ি। সন্ধ্যাবেলার টিমটিমে আলো জ্বলা বাজারে পাটের বস্তাগন্ধী চালের দোকান, অপর্যাপ্ত আলোয় ঝিলমিল করছে রাতের বাজারের ঢালাই লোহা রঙা মাছ, ডাঁই করা আছে শীতের স্যাপ গ্রিন নলডোগ শিম আর ডার্ক পার্পল সিঁদুরকোটা আলু। শীতের সন্ধ্যা মানে শ্রীকুণ্ডেশ্বরীর সামনে অলস সিগ্রেটের নীলচে ধোঁয়ায় পেকে ওঠা বুড়োদের সভা। আমাদের শীতের বেলা মানে রোদের রঙ মিহি লালচে, কুয়াশার ভেতরে সূর্যোদয়ের আলোর ঝালর, শুকনো ধুলো উড়ানো বাতাস।
বুদ্ধদেব বসু শীতকাল বিষয়ে তার ‘হঠাৎ-আলোর ঝলকানি’তে প্রায় কঁকিয়ে উঠেছিলেন— ‘ ...সবচেয়ে আমি ভয় করি এই শীতকে, যখন তিনটে বাজতেই ঘরের মধ্যে অন্ধকার হয়ে আসে... এই ধোঁয়া, আকাশের এই অনস্তিত্ব, বিষাক্ত সর্পিল এই পরিমণ্ডল। সবচেয়ে বিশ্রী লাগে বিকেল থেকে হঠাৎ যখন রাত্রি হয়ে যায়। ইংরেজিতে হলে বলতুম ‘রাত্রি পড়ে’...রাত্রি পড়ে, কলকাতায় এই শীতে, আকাশ থেকে যেন ঝুপ করে কিছু খসে পড়ে, একটা নোংরা স্যাঁতসেঁতে কম্বল, যার নিচে সমস্ত সৃষ্টি চাপা পড়ে যায়। সব রেখা মিশে যায়, হারিয়ে যায় সব সূক্ষ্মকোণ, রঙের আভা যায় মিলিয়ে।’ শীতের ‘শাদা’ শরতের মতো অমল-ধবল নয়, এর ‘কালো’ও বর্ষার নিবিড় অন্ধকারের পুঞ্জ নয়— যার ছায়ায় দিব্যি মন মেলে দেয়া যায়— এ হলো— ‘কোনো আদিম সরীসৃপ অস্পষ্টভাবে, অন্তহীনভাবে কেবলই নিজেকে প্রসারিত করে চলেছে... বেরিয়ে এসেছে প্রেতের দল, আমারই কল্পনার সৃষ্টি— পৌষ তাদের ডাক দিয়েছে... কোনোকালে অর্ধ-অনুভূত কোনো আতঙ্ক, দু-বছর আগেকার চাপা-পড়া হতাশা, কোনো দিবানিদ্রার দুঃস্বপ্ন, শৈশবের কোনো অবচেতন ভীতি। এরা সবাই সম্পূর্ণীকৃত, পুনরুজ্জীবিত এই পৌষের স্পর্শে।’ (বুদ্ধদেব বসু)
যদিও জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন— ‘এইসব শীতের রাতে আমার হূদয়ে মৃত্যু আসে’, তবু হেমন্ত এবং শীতের কবি তিনিই; তার ব্লিজার্ডের তাড়া খেয়ে নামা হাঁস আমি দেখি ধূসর আকাশে, শীতে ঝড় হয় এ মুল্লুকে। শীত নিয়ে কত কাব্য করেছেন কোলরিজ-কিটস-হুইটম্যান-ইয়েটস, শীতের তেরচা আলো নিয়ে অসামান্য কবিতা লিখেছেন এমিলি ডিকিনসন, এতটুকু অনাদর করেননি রিক্ততার দৃশ্যমান ইঙ্গিতগুলোর। কিন্তু এসব কবিতার ডানার তলায় আমি এতটুকু শান্তি পেলাম না বিলেতে প্রথম শীতের সংকাশে। কোথায় গেল ‘সুয্যিমামার বিয়েটা’? শীতপ্রধান দেশগুলোতে শীতকাল শুরু হলেই সেখানকার মানুষের ভেতরে অস্থিরতা বাড়ে, বাড়ে বিষণ্নতা, অভিবাসী এশীয়দের বাড়ে ভিটামিন ডির অভাবজনিত ব্যাধি বা ব্যাধির উপসর্গ... এসব কিছুই না জেনে ধূসর বাড়িঘর, ইঁদুররঙা পিচঢালা রাস্তা, মেঘ চোঁয়ানো জোছনা আর ফ্যাকাশে শাদা আকাশের নিচে আমি আত্মহত্যার প্রয়াস পেতে লাগলাম। রৌদ্র যে আমার কী, সূর্য যে আমার কে, সেসব এমন করে বুঝব কে জানত! কোথায় ফেলে এসেছি সৌরকরোজ্জ্বল সকাল আর মাঘসংক্রান্তির রাত, তারায় নির্মিত অনন্ত আকাশগ্রন্থি, মুনিয়ার বাসায় শীত আর শিশিরের জল, সার্কাসের ব্যথিত সিংহের ভেসে আসা হুংকার, মেঠো ইঁদুরের গর্তের খুদ শীতের আর্তি মাখা যত কিছু, পশ্চিমের বারান্দায় কালো আলোয়ান গায়ে দিয়ে আমি যা কিছু ভাবতাম পাশের দালানের পেছনে টিমটিমে একটা বাতি আর তার ঝিনুক আকারের ঢাকনির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে। প্রথম যৌবনের প্রদীপ্ত যাত্রা ছিল বাংলাদেশে, সে বাতির তেল কমে আসবার তিল তিল যাত্রা বিলেতে। এই লন্ডন আমার পড়াশোনা-চাকরি-সন্তান উৎপাদন ইত্যাদি বড় মাইলফলকের সঙ্গে নিবিড় করে জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে কিন্তু যথেষ্ট আপন হয়নি। কেন তার উত্তর জানি না, লন্ডন উেকন্দ্রিক, প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা শিল্পী কোনো এক নারীর মতন কখনো আপন হয় না, শুধু তার তাড়না টের পাওয়া যায়, শুধু তার শিরঃপীড়া টের পাওয়া যায়। তার পথে পথে একটি আশ্চর্য সবুজ কাকাপোর মতো, না টিয়া, না পেঁচা কাকাপোর মতো, সহজ শিকার কাকাপোর মতো, উড়তে ভুলে যাওয়া বিলুপ্তপ্রায় কাকাপোর মতো হেঁটে বেরিয়েছি আমি। কে যেন আমার মাথায় ওষুধ-বড়ি টিপে দিয়েছিল, টি-টি করে উড়ে এলাম কোনো দেশে... কিংবা আমি হয়তো নুহ নবীর জাহাজ থেকে ডাঙার সন্ধানে উড়িয়ে দেয়া দাঁড়কাক, কোনো এক রহস্যময় কারণে আর কোনোদিন ফিরে আসব না জাহাজে।
শীতকাল এ দেশে আসূর্যমান একটি বড় উৎসবকে ঘিরে, তার নাম ক্রিসমাস। দুই মাস আগে থেকে আলোকসজ্জায় ছেয়ে যায় প্রধান সড়কগুলো, গ্রামাঞ্চলের পানশালায়ও লাগে লাল-সবুজ আলোর ছোঁয়াচ, শীতকালীন ভবঘুরে-কেন্দ্র খোলা হয়, যেখানে গৃহহীনদের জোটে বিনামূল্যে গরম খাদ্য আর মাথা গুঁজবার ঠাঁই, দর্শনীয় স্থানে ভেঙে পড়ে ট্যুরিস্ট, ভাগ্যবান পর্যটকের মন রোমাঞ্চিত হয় প্রথম তুষারপাত দেখার নিবিড় পুলকে। হিমায়িত টার্কি এসে ছেয়ে যায় সুপারশপগুলো, একদা এসব দেশে যেসব বাড়িতে উনুন ছিল না, সেসব বাড়ির দাসীরা বেকারিতে ক্রিসমাসের টার্কি বা হাঁস দিয়ে যেত বেক করার জন্য, পাখিটার পেটে গুঁজে দিত আধখানা তাস, বাকিটা বেকারকে দিত, পরে বেক করা পাখি ফিরিয়ে নিত তাসের টুকরো মিলিয়ে। ক্রিসমাস মানে আরো একবার জিমি স্টুয়ার্টের ‘ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ’, আরো একবার শার্লক হোমসের ভূমিকায় জেরেমি ব্রেট অভিনীত ‘দ্য ব্লু কার্বাঙ্কল’, আবার ‘ফেয়ারিটেইল অব নিউইয়র্ক’ গানটি ঝাঁ ঝাঁ শব্দে বাজছে শপিং মলে। এলভিস প্রিসলির ‘ব্লু ক্রিসমাস’ নয়, বিং ক্রসবির ‘হোয়াইট ক্রিসমাস’ নয়, ডিন মার্টিনের ‘লেট ইট স্নো’ বাজছে রেডিওতে, টেলিভিশন আবার সম্প্রচার করছে চার্লস ডিকেন্সের নভেলগুলো ভিত্তি করে নির্মিত মুভি, পছন্দের একখানা উপন্যাস হাতে করে পায়ের ওপর শাল মেলে সোফায় আধশোয়া হয়ে সময় কাটাচ্ছে লোকে। ক্রিসমাস এসব দেশে পারিবারিক সম্মেলনের মরসুম, কাকে কী দেয়া হলো, কে কী হারাল, কে কী ফিরে পেল এসব খতিয়ান মেলানোর মরসুম। ক্রিসমাসের তিক্ততা বা মিষ্টি স্মৃতি বা মুনাফা শীতের বাকি মাসগুলোয় এসব মানুষকে পরিব্যাপ্ত রাখে, ব্যস্ত রাখে। শীতের মাসগুলোয় মানুষ ছাদের নিচে থাকে বেশি, তাই যেমন সম্পর্কের টানাপড়েন বাড়ে, তেমনি আবার মানুষ মানুষের মুখোমুখি হয় বেশি, বাক্যের আদানপ্রদানও হয় বেশি, এই সম্মিলন কখনো সম্পর্কের পুরনো উষ্ণতাকেও ফিরিয়ে আনে হয়তো। জানি না, আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের এসব ভাববার সময়-সুযোগ থাকে না।
প্রথম কালো কালো টাওয়ার ব্লকে তুর্কিদের ডিজাইন করা হুহু হাওয়ার বাড়িগুলোর একটিতে এক কামরার ঘর, তার পর সিঁড়ির সামনের বারান্দাকে ঘর বানিয়ে অবৈধভাবে ভাড়া দেয়া একটি কামরা। পূর্ব লন্ডনের এসব ভাড়াবাড়ি পেরিয়ে উত্তর লন্ডনে এসে আমি বাসা পেতেছিলাম। প্রথম যে ঘরটিতে ছিলাম, সেখানে প্রবাহিত জলের কল ছিল না, উঠান পার হয়ে আরেকটি বাড়িতে গিয়ে কাজ সারতে হতো। ঘরটির অর্ধেকের ব্যবহার টুলশেড হিসেবে, সকালে কেউ কেউ সেখানে ঢুকে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে যায়। ওভারকোট পরে না ঘুমোলে নিশ্চিত নিউমোনিয়া। ইস্ত্রি চালালে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। প্লাস্টিকের গামলায় করে পানি এনে থালাবাসন ধুয়ে রাখি। এক রাতে আওয়াজ শুনে মনে হলো চোর এসেছে ঘরে, প্রথম উসখুস, তারপর প্রকাণ্ড শব্দে প্রায় বিস্ফোরণ, প্রাণভয়ে চিত্কার করে উঠে টের পেলাম টুলশেডের একখানা তাক ওজনদার রঙের ডিবে ও বালতিসহ ভেঙে পড়েছে। সকালে টুলশেড ছেড়ে আরেকটি ঘর ভাড়া নিলাম, সাহসের দুর্নাম আমায় কেউ দিতে পারবে না, সাহস আছে মানে কল্পনা নেই। বাড়ির বাইরে ব্ল্যাকস্টক রোডের স্টুডিও ফ্ল্যাটটাই আমার প্রথম বাড়ি, প্রথম সত্যিকারের সংসার। তার জিরে-ধনের বয়াম অব্দি আমার কত চেনা, কত ক্লেশের কথা লেখা আছে তাদের ঝাঁজে। সিঁড়ির মেজানাইনের জানালা দিয়ে গলে নিচতলার বাথরুমের ছাদে যাওয়া যায়, সেই একচিলতে ছাদে চেয়ার পেতে বসে গোগ্রাসে বই পড়তাম আমি, এল্ডারবেরি গাছটায় পেয়ালা আকারের মঞ্জরিতে ছেয়ে যেত যার ঘ্রাণ ভারী মধুর, নানা পাড়াতুতো বিড়ালের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হতো, যেগুলো অবিশ্বাস্য পটুতায় কাঠের বেড়া পার হতো হেঁটে, দূরে স্কটিশ দুর্গের মতো দেখতে ভিক্টোরিয়ান ওয়াটারবোর্ড পাম্পিং স্টেশনের চূড়া দেখা যেত। এসবই পূর্ব লন্ডনের অবৈধ ভাড়াটে হওয়ার চেয়ে, রান্নার ক্রম পাওয়ার অপেক্ষার চেয়ে, টয়লেট আর স্নানে যাওয়ার দেরির চেয়ে, বারোয়ারি ফ্রিজের জিনিস লোপাট হয়ে যাওয়ার চেয়ে ঢের ভালো। হেঁটে গেলে ৫ মিনিটের ভেতরেই বিশাল পার্ক, সেখানে ক্যারিবীয় একটি দল প্রতি বিকালে বাদ্যযন্ত্র বাজানো প্র্যাকটিস করে, হাঁস চরে, পায়ের তলা দিয়ে মেদিনী কাঁপিয়ে যায় পাতালের রেল। একটু দূরেই ইস্ট আর ওয়েস্ট রিজার্ভয়ার, আরো দূরে ওয়ারউইক রিজার্ভয়ার, ভোররাতে ভেসে আসত গাঙচিলের ডাক। স্প্রিংফিল্ড পার্কের টিলার ওপর থেকে দেখা যায় লি নদীর ওপর দিয়ে চলেছে নৌকাবাইচ, দূরে ট্রেনলাইন ধরে চলছে ট্রেন। নদী পার হওয়ার সুন্দর সাঁকো, নদীর ধার ঘেঁষে ঘেঁষে আবাসিক বোট আর বোটের ছাদে লাল লাল ফুল ছাওয়া টব, নদী পার হলে ওয়ালথামস্টোর বিপুল জলাভূমি। লাল কাদামাটির পথ। উদাস বিছুটি আর ব্ল্যাকবেরির ঝোপগুলো থেকে এসে কত গ্রীষ্মদিনে ব্ল্যাকবেরি পেড়েছি আর বিছুটির ঘা খেয়েছি। কপারমিল খাল চলেছে লি নদীর থেকে বেঁকে ঝিকিমিকি, সেই নদীর পাড়ের কাছে স্বচ্ছ জলে একদিন দেখেছি অনেকগুলো মৃত ম্যাকারেল মাছ। আমার বাড়ির বাইরে পা দিলেই চমত্কার এনফোর লাইব্রেরি, তুর্কি আর সোমালিতে গিজগিজ করছে জায়গাটা, প্রবল শীতেও গ্রীষ্মদিনের সন্ধ্যায় পথে জড়ো হয়ে রাজা-উজির মারার অভ্যাস এরা বজায় রেখেছে। জিলিপি-গজা-হালুয়া- সিরায় ফেলা প্যাটিস এ রকম দেখতে কিছু উত্তর আফ্রিকান মিষ্টান্নের দোকান, জলপাই বেচার দোকানে কত রকম জলপাই, কোনোটার বিচি আছে কোনোটার নেই, কোনোটার বিচির বদলে ফুটো করে রসুন ঢুকিয়ে দেয়া, কোনোটায় রসুনের বদলে এক ফালি পিমিয়েন্টো ঢোকানো। মরোক্কান তাজিন রাঁধবার চিমনি আকৃতির রঙিন পাত্রগুলো সাজানো সারি সারি। সারিবদ্ধভাবে সাজানো নানা রকমের তুর্কি এবং গ্রিক ছাগদুগ্ধের পনির। কিছু দূর পরপরই নাপিতের দোকান, সেখানে সেন্টিমিটারখানেক বড় হলেই লোকে চুল কাটতে আসে, তুর্কিরা-আরবরা এবং উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর পুরুষরা নানা ঢঙে ভুরু চাছে, দাড়ি কামায়, সিঁথিও কামায় এবং মাথা বানায়। মারপিট লেগেই আছে, পুলিশের গাড়ি আসছেই। আর আছে পানশালা এবং শিশা-বার। রাত্রিবেলা সেই দোকানগুলোর ভেতরকার গলি দিয়ে বাড়ি আসার সময় মত্ত আরবদের পাল আমাকে অভিবাদন এবং কুর্নিশ করে মাঝখানে জায়গা ছেড়ে দেয়, পুরুষের সমুদ্রের ঢেউ দুই ভাগ হয়ে গেলে আমি সেই পথ দিয়ে পার হই মুসা নবীর মতো।
কত বেলার খিদে তখন কেবল সস্তা টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান দেখে পার করেছি, নীল হয়ে আসা পাউরুটির গা থেকে মোল্ড ফেলে বাকিটা খেয়েছি, সেই গল্প অর্ধাহারীর- সেসব এমন কিছু নয়, জগতে এর চেয়ে আরো বড় বেদনা আছে, অনিশ্চয়তা আছে। ফ্রেঞ্চ শেফ আলুর প্যানকেকের গোলায় চেপে দিচ্ছে কাঁচা স্যামন আর ক্যাভিয়ার, প্যানকেকের তাপে তাপে হয়ে যাবে মাছটুকু, দেখলেই মনে পড়বে ইলিশ-চিতইয়ের কথা। অ্যাভোকাডোর পাতা আর হ্যাবানেরো মরিচ দিয়ে মেক্সিক্যান শেফ রাঁধছে শীতের আকাশের মতো নীল নীল দাঁড়ার কাঁকড়া, গরুর মাংসের পিঠালির মতো করে মেক্সিক্যান গোমাংস রান্নার শেষে মিশিয়ে দিচ্ছে রোস্টেড মেইজের গুঁড়ো। সেন্ট ক্লেমেন্টস ড্রিংকের লেবু-কমলালেবু-মিন্ট আর স্পার্কলিং ওয়াটার গোলানো দেখলেই মনে পড়ে যেত ইস্কুল থেকে ফিরেই স্টিলের গ্লাসে করে খাওয়া লেবুর শরবতের কথা, ফি দিন খেতাম। শেফ বোঝাচ্ছে কাটিং ম্যাটের তলায় টি-টাওয়াল দিয়ে রাখলে সেটা নড়বে না, আমি ভাবছি শিলপাটার তলায় দু-ভাঁজ করে রাখা চটের বস্তার কথা, যেন না নড়ে, যেন শব্দ কম হয়। বলতেই পারব না কবে স্বয়ংক্রিয় মন শিখে ফেলেছে কোন মাংসের সঙ্গে যায় রোজমেরি, কোনটির জন্যে ওরিগেনো, কে ভালোবাসে টারাগন-—স্বাদে মিঠে হার্ব। কার সঙ্গে যায় সালসা ভেরদে আর চিমিচুরি সস। শিটাকে মাশরুমের কাণ্ডটুকু ফেলে দিতে হয় আর গরম জলে সামান্য চিনি যোগ করে তাতে মাশরুমটা ভিজিয়ে রাখতে হয়, প্রগাঢ় স্বাদের কালো মাশরুম সে। কেমন করে ভ্যানিলার একটি শটী চিনির বয়ামে পুরে রাখলে ক’দিনেই সব চিনি হয়ে যায় ভ্যানিলা-সুগার। তামার পয়সাগুলো এক-দেড়শ জমলে তবেই মাংস কিনতে যেতাম আমি, আর আমাকে দেখে বেজার হতো কসাই। আইনত তামার পয়সা ফিরিয়ে দিতে পারে না সে, কিন্তু এ তো শুধুই পয়সা, কে এতক্ষণ গুনবে, কে-ই বা এই পয়সাগুলো আবার ফিরিয়ে দেবে বিবিধ খদ্দেরকে! আমার রান্নাঘরে কী কী ব্যবহার করতাম? কী নয়? আলেপ্পো পেপার থেকে শুরু করে ভিনেগারে ভাসা কেপার অব্দি, ভিনেগারের চুকাটুকু গোল করে কুমির-সবুজ রঙ দিয়ে তৈরি করলে যা হবে, তার নাম কেপার, একেবারে চতুরতার স্বাদ। কাঁচাবাজার নেই তো কী, নানাভাবে সস্তা জিনিসকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাঁধার সব উপকরণ হাজির। সস্তা ছিল স্প্যাগেটি এবং অন্যান্য পাস্তা, মারিনারা সসযোগে পাস্তা ছিল নিত্যদিনের খাদ্য, পোলকমাছ সস্তা ছিল, বরফের মাছ এক প্যাকেট কিনলে আধখানা মাছ দিয়েই দুইবেলার পাস্তা হয়ে যেত। বেকিংয়ের উপাদান সস্তা ছিল, এই আটা-ময়দা-সুজি-চিনি এবং একসময় ডিম, অতএব আমি প্রচুর বেক করতাম। চকোলেট কেক, ফ্রুট কেক, ভিক্টোরিয়া স্পঞ্জ, বিসকোটি, শর্টব্রেড। কোনোটার ওপর মেরাং জমিয়ে বেক করতে হবে, কোনোটার গোলায় দিয়ে দিতে হবে কেটলির গনগনে গরম জল। লেমন কার্ড কে বলে কেবল কেকবিস্কুটে দেয়ার বস্তু? লেমনকার্ড মেখে বা লাইমজেলি মেখে চিকেন রোস্ট করতাম, মিষ্টিটুকুর সঙ্গে হালকা পাঞ্জা লড়তে দিতাম কাগজীলেবুর রস। সুইট পিকালিলি ডাচরা এনেছিল তাদের উপনিবেশ থেকে, রোস্টেড মিটে মেখে সেটি খেতে ভালো। একলার সেই রান্নাঘরে অনেক ভূতে মারে ঢেলা, একেবারে কালো জানালাটার ওপাশ থেকে, নাশপাতি গাছটা আর এল্ডারবেরি গাছটা গলাগলি দুই ভাই হয়ে আছে যেখানে সেইখান থেকে। মনে আছে একদিন পার্ল অনিয়নের (গুলি পেঁয়াজ) পিকল দিয়ে মাংস রেঁধেছি, সেদিনই ঘটেছে এমন দুর্ঘটনা যে আর কোনোদিন সেই আচার আসেনি বাড়িতে। যেন গুলি পেঁয়াজ পথ দেখিয়ে আনে দুঃখকে, যেন আচার জানত আমার নিগ্রহের কথা কিন্তু আগেভাগে জানায়নি।
পিকাডেলি লাইনের শেষ মাথায় যেখানে কাঠপায়রা লাল লাল বেরি ঠোকরায় আর ঘুঘু চরে, সেখানে একটা বাড়িতে দ্বিজেন কাকা (দ্বিজেন শর্মা) আর দেবী কাকী এসে উঠতেন, মেয়ের বাড়ি, পেছনের বাগানের অজস্র ঝোপঝাড় কিছু উন্মূল করে কিছু রেখে বাগান করেছিলেন কাকা। রোদ নিস্তেজ হয়ে আসার আগ অব্দি আমরা সেই বাগানে বসে কত গল্পই করতাম। ‘হ্যাঁ রে, যতগুলি গাছের নাম লিখেছিস, সবগুলি তুই চিনিস তো?’... বাগান ঘুরে ঘুরে কাকার গাছ চেনানো। গ্রামের মানুষ কেমন করে শহরে এল, কারা কারা রয়ে গেল, কারা সমস্বত্ব হয়ে মিশে গেল, কারা মধ্যস্বত্বলোভী হয়ে রইল, কাদের দস্যুরা ধরে নিয়ে যেয়ে কোন বিকিকিনির বাজারে নগদ মূল্যে বেচে দিয়ে এল... গল্পের শেষ নেই। তারপর দেবী কাকীর ডাক শুনে কিচেনে এসে শাদা ভাতের সঙ্গে খেতাম চিকেন সসেজ দিয়ে আলু-গাজর-মটরশুঁটির ডালনা। তুর্কি জলপাইয়ের আচার। চটজলদি রাঁধা খাদ্য। পরিপাটি আয়োজন, তার চারপাশে উন্মুখ সুহূদ, অন্যের জীবনের কোনো উত্থান-পতনের অন্বয়সাধনে যাদের ঝোঁক নেই, এমনি শোভন অথচ উদার, তীক্ষদৃষ্টি অথচ মায়াময়। ভালোবাসার কেন্দ্রে ঘূর্ণিঝড়ের চোখের মতন বায়ুবেগহীন একখানা স্থান আছে, সেখানে পরস্পরের সঙ্গে থাকতে চাওয়ার ইচ্ছা ছাড়া, সান্নিধ্য কামনা ছাড়া আর কিছু নেই। দ্বিজেন কাকা এবং দেবী কাকীর মাঝখানে সেই ঘূর্ণির চোখটা বিরাজমান ছিল, টংকে কেন্দ্রে রেখে ঘূর্ণায়মান পায়রার কথা আমাকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছে কে! বিকালের আকাশে যেগুলো ঘুরত অস্তগামী সূর্যের আলো পেটে মেখে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম আলোর পেটিকা আর নীলে পায়রা, তারা কি জোড় না বেজোড় এসব গুনতাম। জোড় হলে কাল পরীক্ষায় ভালো করবই, বেজোড় হলে করব না নির্ঘাত। হাঁসের দল যেত ভোরবেলা ঊষার আলো মেখে আর সেগুলোর সম্মিলিত শিস ছিল আশ্চর্য মঞ্জীরধ্বনি... আকাশ দিগন্তের কাছে অদ্ভুত নীল হয়ে এল, ছাদগুলোয় শালু কাপড়ের লাল লেপ মেলার দিন এল, আমাদের শীতকাল... গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কাছে পরাজিত, অপসৃয়মাণ এক অপূর্ব ঋতুবিলাস।





