রবিন ক্রেসওয়েল
অনুবাদ: শওকত হোসেন
সিরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী আদোনিস ১৯৫৬ সাল থেকে প্রথমে বৈরুত ও পরে প্যারিসে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। ২০১১ সালের মার্চে গোটা সিরিয়ায় বিভিন্ন শহর ও নগরে গণবিক্ষোভ শুরু হলে দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত কবি আদোনিস— আশির কোটায় তার বয়স ও পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন— বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানাতে ইতস্তত করেছেন। এর আগে তিউনিসিয়া ও মিসরের গণবিক্ষোভকে স্বাগত জানালেও সিরিয়ার পালা এলে পিছিয়ে গেছেন তিনি। ২০১১ সালের মে মাস নাগাদ এক হাজারের মতো বিক্ষোভকারী প্রাণ হারায় এবং সরকারি ট্যাংক বেশকিছু শহরে বোমাবর্ষণ করার পর প্রকাশিত একটি নেতৃস্থানীয় আরবি পত্রিকা আল-হায়াতে প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়তে আদোনিস লেখেন, ‘আমি কখনই উপাসনালয় থেকে শুরু হওয়া কোনো বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিতে রাজি হব না।’ বিরোধীদের তিনি বাথপন্থী বাশার আল-আসাদের শাসনের চেয়েও খারাপ হয়ে দাঁড়াবে বলে মত দিয়েছেন। আদোনিসের মূল্যায়ন শাসকগোষ্ঠীর তরফ থেকে আসা বুলির প্রতিধ্বনি তোলায় অনেক পাঠকই হতাশ হন। ৬০ বছর ধরে অক্লান্তভাবে আরব জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বিপুল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে এসেছেন তিনি। আরবি ভাষার উল্লেখযোগ্য বেশকিছু বিপ্লবী কবিতারও রচয়িতা তিনি। দামাস্কাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট দার্শনিক সাদিক জালাল আল-আযম ‘মুক্তি, পরিবর্তন, বিপ্লব, প্রগতি ও আধুনিকতাবাদী মানুষ’ আদোনিস ‘গোড়া থেকেই সিরীয় বিপ্লবের নিন্দা না জানালেও খাটো করে দেখায়’ বিস্মিত হয়েছেন। ফরাসি ভাষায় (পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে প্যারিসে বাস করছেন তিনি) দেয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাত্কারে তিনি দাবি করেছেন, ‘আরব সমাজের মতো কোনো সমাজে লেইসিতে (কট্টর ধর্মনিরপেক্ষতার ফরাসি প্রতিশব্দ) ভিত্তিক না হলে বিপ্লব ঘটানো অসম্ভব।’ ইসলামিক স্টেট ধরনের খেলাফতের আবির্ভাবের বহু আগেই আদোনিস রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে ধর্মতত্ত্বের মৈত্রীকে এ অঞ্চলের গভীরে প্রোথিত বিপদ বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
২০১২ সালে আরবিতে প্রকাশিত ও বর্তমানে খালেদ মাত্তাওয়ার (ইয়েল) তর্জমায় ইংরেজিতে সুলভ আদোনিসের দীর্ঘ একটি কবিতা হলো কনসার্তো আল-কুদস।
আদোনিসের আরো অনেক দীর্ঘ কবিতার মতো কনসার্তো আল-কুদস মধ্যযুগীয় বিভিন্ন উৎস— বিশেষত জেরুজালেমের আরব ইতিহাসবিদ— এবং সেই সঙ্গে ধর্মীয় টেক্সট ও আধুনিক কথাকাহিনী থেকে নেয়া উদ্ধৃতিতে ঠাসা একটি কৌতূহল জাগানো নির্মাণ। গদ্যের সঙ্গে পালাবদল করছে পঙিক্ত এবং মাঝেমধ্যেই পৃষ্ঠার চূড়ায় কবি মালার্মের (আদোনিসের ওপর অন্যতম প্রধান প্রভাব বিস্তারকারী) ঢঙে বিভিন্ন বাক্যবন্ধ ছড়িয়ে দেয়ায় কবিতাটি টেক্সচুয়াল নোট হয়ে উঠেছে। রচনার শিরোনামে সংগীতের উপমা কবির একান্ত কণ্ঠস্বরের বেসুরো একক গানের পটভূমির খাতিরে সমবেত উদ্ধৃতি ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। ঐকতানের অংশগুলো জেরুজালেমের স্বর্গীয় কিংবদন্তিকে ধরে রাখলেও আদোনিস এর পার্থিব ইতিহাসের ওপরই জোর দিচ্ছেন। তার জেরুজালেম একটি ‘স্বর্গীয় খাঁচা’, কাঁটাতার আর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া বাড়িঘরের বিরান ভূমি, যেখানে আবর্জনার ঢিবির চূড়ায় ‘লাশ আর বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ’ ছড়িয়ে থাকে। এ কবিতা ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত হারিয়ে যাওয়া স্বর্গের কথা ভেবে বিলাপ নয়, বরং পৃথিবীর বুকে কোনো জায়গা অন্য জায়গার তুলনায় বেশি পবিত্র হওয়ার ধারণার বিরুদ্ধে অভিযোগ।
আদোনিসের আসল নাম ছিল আলি আহমেদ সাঈদ এসবার। ১৯৩০ সালে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার লাতাকিয়ার দক্ষিণে কাসাবিন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পরিবার আলাওয়াইত গোত্রের হলেও আদোনিস কখনই গোত্রীয় পরিচয় দাবি করেননি। কিশোর বয়সে সোস্যাল সিরিয়ান ন্যাশনালিস্ট পার্টিতে (এসএসএনপি) যোগ দিয়েছিলেন। প্যান আরব বাথ পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এ দলটি। যদিও দুটি দলই সেকুলারিস্ট আদর্শ ধারণ করে। এসএসএনপির ক্যারিশম্যাটিক নেতা, একজন গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিস্টান আন্তুন সা’দা তাঁর ভাষায় সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ফিলিস্তিন নিয়ে ‘বৃহত্তর সিরিয়া’র পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সা’দা ও তার অনুসারীদের চোখে সিরিয়া একটি ভূমধ্যসাগরীয় জাতি। আরব মুসলিমরা নিকট প্রাচ্যের কিংবদন্তিতে প্রোথিত একটি সভ্যতার অতিসাম্প্রতিক স্তরমাত্র। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে আলি আহমেদ গ্রিক-ফোনেশীয় মৃত্যু ও পুনরুত্থানের বৃক্ষ দেবতার নামানুসারে আদোনিস ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। সিরীয় জাতীয় নবজন্মের ওপর বেশকিছু কবিতা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। বিশের কাছাকাছি বয়সের একজন কবির পক্ষে বেশ রুচিশীল আলঙ্কারিক কবিতা ছিল সেগুলো। নতুন নাম আদোনিসের একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ভূমধ্যসারগীয় পরিচয় (গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল যে, আদোনিস অসিরীয় রাজা থেইয়াসের ছেলে ছিলেন) আলিঙ্গন এবং যেকোনো সংকীর্ণ আরব পরিচয় প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়েছিল।
এসএসএনপির উগ্রবাদীদের হাতে জনৈক সিরীয় সেনা কর্মকর্তা হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় সদস্যদের ধরপাকড় শুরু হলে ১৯৫৬ সালে আদোনিস সিরিয়া থেকে লেবাননে পালিয়ে যান। এর আগের বছরটি কারাগারে কাটিয়েছিলেন তিনি— ‘নির্যাতন ও সত্যিকার নরকের একটা বছর।’ পরে একে এভাবেই উল্লেখ করেছেন। বৈরুতে রাজনৈতিক অতীত ঝেড়ে ফেলে একজন আভা-গার্দ কবি হিসেবে নিজেকে পুনরাবিষ্কারের লক্ষ্যে আদোনিস যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। এ সময়ের স্মৃতিকথায় পরে যেমন লিখেছেন, তার চোখে বৈরুত ছিল ‘সূচনার শহর’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দশকগুলোয় লেবানিজ রাজধানী এর আগে কায়রোর দখলে থাকা আরব বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের কেন্দ্রের জায়গা নিয়ে নেয়। সদ্য তেল-অর্থে সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বৈরুত প্রধান পছন্দ ছিল।
১৯৫৭ সালে আদোনিস একটি বর্ণাঢ্য কসমোপলিটান সাময়িকী শি’র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দেন। আমেরিকান সাময়িকী পোয়েট্রি থেকেই এ নামটা ধার করা হয়েছিল। শি’র আরবি ভাষায় আধুনিক কবিতার পক্ষে একটি আদালতে পরিণত হয়। এখানকার অবস্থান থেকে আদোনিস গদ্য কবিতার পক্ষে ইশতেহার লেখেন, সে সময়ের বিচারে এক বিপ্লবী অবস্থান, কেননা ইসলাম-পূর্ব সময় থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের আরবি ভাষায় প্রায় সব কবিতাই নির্দিষ্ট ছন্দে রচিত হতো। শি’র ডব্লিউবি ইয়েটস, এজরা পাউন্ড ও টিএস এলিয়েটসহ ইউরোপীয় কবিদের আরবি তর্জমা প্রকাশ করে; খোদ আদোনিস পল ক্লদেল, সেন্ট-জন পার্সে ও ইভস বোনেফয়ের কবিতা অনুবাদ করেছেন।
বৈরুতে অবস্থানের গোড়ার দিকেই আদোনিস জাতীয়তাবাদী ধরনের কবিতা রচনা থেকে সরে আসেন। এরপর তিনি সেই কবিতাগুলো লিখতে শুরু করেন যেগুলো তাকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সম্মানিত ও বিতর্কিত কবিতে পরিণত করে। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘আঘানি মিহইয়ার আল দিমাশকি’ (‘মিহইয়ার অব দামাস্কাস’ নামে ইংরেজিতে আদনান হেদতার ও মাইকেল বিয়ার্ড অনূদিত) তার সেরা রচনা হিসেবে বিবেচিত। সংকলনের নায়ক মিহইয়ার এক কিংবদন্তিসুলভ চরিত্র, বিরান জমিনে ঘুরে বেড়ানো নির্বাসিত এক নতুন ধর্মবিশ্বাস প্রচারক।
এসব কবিতায় আদোনিসের ব্যবহূত ভাষা শাস্ত্রীয় ঘোর সৃষ্টি করে:
শোকার্ত হাওয়ার জন্য
অমার্জিত কিন্তু তামার মতো জাদুময়
কবিতা উৎসর্গ করে
নতুন দুনিয়ার পরিবেশে
ধ্বংসস্তূপের গভীর থেকে উঠে আসছে সে।
মন্দির তোরণের মাঝখানের ভাষা বোঝে সে
বিচিত্র শব্দরাশির বীর সে।
কোনো কোনো পাঠকের কাছে আপন পরিবেশ থেকে মিহইয়ারের বিচ্ছিন্নতা— ভূমধ্যসাগীয় মন্দির-তোরণের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা— এক ধরনের উসকানির মতো মনে হয়। আরব জাতীয়তাবাদীরা বিশেষ করে আদোনিস ও তাঁর শি’রের বিরুদ্ধে (যাদের অনেকেই সাবেক এসএসএনপি সদস্য) নিজস্ব সাহিত্যিক ঐতিহ্য অস্বীকারের অভিযোগ এনেছেন। আরব সংস্কৃতির ‘ঐক্য’ রক্ষায় উদগ্রীব এ ধরনের সমালোচকদের কাছে গদ্য কবিতার মতো আমদানি করা ধরন নব্য-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সেনাদল মাত্র। আদোনিস ও তার অনেক সহকর্মীরই সংখ্যালঘু পটভূমি থেকে আসার বিষয়টি কোনো কাজে আসেনি— এ গোত্রগুলোকেই ইউরোপীয় শক্তিগুলো ঐতিহাসিকভাবেই মিত্র হিসেবে খুঁজে থাকে। বিশিষ্ট ইরাকি কবি নাজিক আল-মালাইকা শি’রকে ‘বৈরুতে আরবি ভাষায় ইউরোপীয় চেতনাধারী সাময়িকী’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সমালোচকরা যে ঐতিহ্যকে রক্ষার দাবি করছেন, সেটা সম্পর্কে তাদের ধারণার ঘাটতি তুলে ধরাকেই নিজের মিশনে পরিণত করেন আদোনিস। পরের ১২টি বছরের মতো সময় আরবি কবিতা, দর্শন ও আইন শাস্ত্রে ডুবে ছিলেন তিনি। ফলাফল এক জোড়া বিশ্বকোষ জাতীয় প্রয়াস: তিন খণ্ডের অ্যান্থলজি অব অ্যারাবিক পোয়েট্রি (১৯৬৪-৬৮), ষষ্ঠ থেকে ঊনবিংশ শতকের কবিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এতে; এবং চার খণ্ডের ঐতিহাসিক সমালোচনা, দ্য ফিক্সড অ্যান্ড দ্য ট্রান্সফর্মেটিভ (১৯৭৪)। দুটি কাজেই আদোনিস খোদ ধ্রুপদী ঐতিহ্যের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি ‘আধুনিক’ প্রতি-সংস্কৃতি আবিষ্কারের দাবি করেছেন। আব্বাসীয় কবি, সুফি শেখ, শিয়াবাদী ধর্মবিদ ও আন্দালুসীয় দার্শনিকদের রচনায় তিনি সনাতন ধারার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনকারী ভিন্নমতালম্বীদের ঐতিহ্য খুঁজে পেয়েছেন। তার মতে ঐক্যবদ্ধ ঐতিহ্য বলে কিছুর অস্তিত্বহীনতার প্রমাণ মেলে এখানেই। বরং অতীতের ভেতরই আরো অনেক অতীত রয়ে গেছে এবং সেগুলোর কোনোটা হয়তো আজকের দিনেও উপকারী হতে পারে।
১৯৭৫ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধের সূচনা বৈরুতের ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্যের অবসান ঘটায়। ওই যুদ্ধ মুসলিম, খ্রিস্টান ও দ্রুজ সম্প্রদায়কে পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত করে। অচিরেই বাইরের শক্তি হস্তক্ষেপ করে বসে। লেবাননি রাজধানী বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতার বদলে সহিংস ধর্মান্ধতার সমার্থকে পরিণত হয়। এখানে আশ্রয়সন্ধানী বুদ্ধিজীবীরা এবার নতুন আবাসের খোঁজে নেমেছিলেন। ১৯৮৫ সালে, আদোনিস যে বছর প্যারিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, দ্য বুক অব সিজ প্রকাশ করেন তিনি। তার তিন দশকের আবাসের উদ্দেশ্যে তিক্ত বিদায়ী কবিতা। গোষ্ঠীগত সহিংসতায় বদলে যাওয়া একটা শহরের স্মৃতিচারণ জেরুজালেম সম্পর্কিত তার পরের কবিতায় প্রভাব ফেলেছে:
হত্যাযজ্ঞ শহরের চেহারা বদলে দিয়েছে— এ পাথরটা
শিশুর মাথা—
আর এ ধোঁয়া মানুষের ফুসফুস থেকে বেরোনো।
প্রতিটি জিনিস তার নির্বাসনের কথা উচ্চারণ করে।
ঐক্যের ধারণাই তার কাছে— সমরূপতা— বিতৃষ্ণা জাগায় তার। কনসার্তো আল-কুদস প্রশ্ন তুলেছে, ধর্মীয় গোড়ামির নিশ্চয়তাকে ভর্ত্সনা করার জন্যই নানা প্রশ্নে ভরপুর এ কবিতা।
কবিতাটি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি বিরোধের ক্ষেত্রে আদোনিসের সবচেয়ে আবেগঘন বিবৃতিও বটে (এটা তার প্রজন্মের আরব বুদ্ধিজীবীদের বিপরীতে তার এড়িয়ে চলা একটি প্রসঙ্গ। যদিও অনেকদিন আগেই ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের প্রতি নিজের স্পষ্ট অসন্তোষের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।) একটি স্মরণীয় অনুচ্ছেদে আদোনিস প্যাগান জাতিগুলো সম্পর্কে বিশেষভাবে লেভিটিকাসের বিতৃষ্ণ পঙিক্তর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘তোমরা এমনকি তাহাদের তোমাদিগের পুত্রগণের নামে সম্পত্তি হিসাবে গ্রহণ করিবার জন্য তাহাদিগকে তুলিয়া দিতে পারিবে; তাহাদিগকে স্থায়ী দাস হিসাবে ব্যবহার করিতে পারিবে’ এবং তারপর আধুনিক উপমা স্পষ্ট করে তুলতে হাবাক্কুকের একটি অনুচ্ছেদে পাল্টা বক্তব্য খুঁজে বের করেছেন: ‘যেজন রক্তপাতের মাধ্যমে শহর নির্মাণ আর অবিচারের মাধ্যমে তাহা প্রতিষ্ঠা করিবে, তাহাকে ধিক।’ কবিতার অন্যান্য অংশ ১৯৬৭ সালে মরোক্কান কোয়ার্টারের ধ্বংস (পশ্চিম প্রাচীরের কাছে যাওয়ার পথ সুগম করতে ভেঙে ফেলা হয়) এবং ওয়াদি হিলবা মহল্লার নিচে সুড়ঙ্গ নির্মাণের কথা স্মরণ করছে। আদোনিসের কাছে ধ্বংস ও বিচ্ছিন্নতার এ ইতিহাস তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মেরই উত্তরাধিকার। অবৈধ বসতি ও আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নকরণ ধর্ম ও রাজনীতির মিশেল বিপদের সাম্প্রতিক নজির মাত্র।
আধুনিকতাবাদী বহু কবির মতো আদোনিস অচল ঘোষিত ঐতিহ্য থেকে সাহিত্যিক কর্তৃত্ব ধার করেছেন। তার জেরুজালেম কবিতার কথক একজন হালের পথপদর্শক, সতর্ককারী হিসেবে তিনি জানেন যে, তার পাপের ফর্দ নিশ্চিতভাবেই উপেক্ষিত হবে। পুরনো নিয়ম ও আরবীয় আদলের কথা না ভেবে ‘কনসার্তো’র ভাষার অবিরাম উচ্চ স্বর, জোরালো পুনরাবৃত্তি ও সহিংস উপমা— পড়া অসম্ভব। এ অঞ্চলে ব্যবহূত বিভিন্ন ভাষা থেকে আলাদা আরবি ভাষা একটি সাহিত্যিক ভাষা হওয়ার কারণে অংশত আরবির কাছে আলঙ্কারিক জাঁক যেভাবে নিজস্ব, ইংরেজির বেলায় তা নয়। মাত্তাওয়ার অনুবাদ আদোনিসের বিচিত্রতম গতির সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য সংগ্রাম করছে, কিন্তু সেগুলোর বাঙ্ময়তা ও ক্রোধ ঠিকই ফুটে উঠেছে:
ধ্বংসস্তূপ এখনো ঈশ্বরের পৃথিবীর নিত্যকার খাদ্য
ভবিষ্যদ্বাণীও কি অবরোধে পরিণত হবে?
সেগুলোর শব্দে কি সুড়ঙ্গ খোঁড়া হবে?
সেগুলোর দৃষ্টি কি ক্ষেপণাস্ত্র আর বোমায়,
গ্যাস আর ফসফরাসে ভেঙে পড়বে?
‘কনসার্তো’ বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হতে পারে। শেষের দিকে জেরুজালেম এক ধরনের নারকীয় বিষণ্নতা লাভ করেছে, যা কোনো আলোই ঢুকতে দেয় না। দুই পৃষ্ঠা শেষে আমরা পড়ি:
কিন্তু ইমরু-উলকায়েস বাইজান্টাইনের পথে
এদিকে চলেছেন!
তার পাজোড়া বাইত আল-মাকদিসের চৌকাঠ স্পর্শ করার আগেই,
তিনি পড়ছেন, ভূমধ্যসাগরীয় তীরে রক্তপাত,
এর সূচনা থেকে এক বিধ্বংসী ইতিহাস তুলে ধরেছে...
দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়ে, ইমরু-উলকায়েস বলেন,
“আদিতে ছিল বাণী।
বাণীর আদিতে ছিল ‘রক্ত’।”
ইমরু-উলকায়েস (সাধারণভাবে ইমরু’ আল-কায়েস নামেই বেশি পরিচিত) ষষ্ঠ শতকের আরবীয় সর্বেশ্বরবাদী রাজপুত্র। অংশত প্রতিবেশী গোত্রের হাতে বাবার মৃত্যুর বদলা নেয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কারণেই বিখ্যাত হয়ে আছেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, প্রতিশোধ নেয়ার জন্য রাজপুত্র এতটাই ক্ষেপেছিলেন যে, বাইজান্টাইনের শাসক ক্রিশ্চান সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সাহায্য পর্যন্ত কামনা করেন তিনি। কোনো কোনো আরবের চোখে এটা ইমরু’ আল-কায়েস নামটিকে বহিঃশক্তির সঙ্গে সহযোগিতার সমার্থকে পরিণত করে।
তবে রাজপুত্র তার আদিরসাত্মক কবিতার জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। এমনকি সাম্প্রতিক মানদণ্ডেও এগুলোর কোনো কোনোটা বেশ রগরগে। যেমন তার সর্বাধিক পরিচিত কবিতা মুয়া’লাক্কা’ বা ‘ঝুলন্ত গাথা’য় কবি শিশুর যত্ন নেয়া এক নারীর সঙ্গে হাওদায় দৈহিক মিলনের বর্ণনা দিয়েছেন। আদোনিসের কবিতায় রাজপুত্র আমরা যে রক্তরঞ্জিত ইতিহাস পড়তে যাচ্ছি, তার সাক্ষী। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, ইমরু’ আল-কায়েস একজন সর্বেশ্বরবাদী, সর্বগোত্রীয় সহযোগী ও প্রেমের কবি, স্রেফ জেরুজালেম ‘হয়ে এগিয়ে চলেছেন’। একেশ্বরবাদের রাজধানীতে তার স্থান নেই। অচিরেই আদোনিসের কবিতা থেকেও বিদায় নিয়েছেন তিনি।





