এদোয়ার্দো গালিয়ানো। ভাষান্তর: আলীম আজিজ
স্বীকারোক্তি
উরুগুয়ের সব শিশুর মতো আমিও একজন ফুটবল খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলাম। এবং খেলাটা আমি ভালোই খেলতাম। আদতেই সাংঘাতিক ছিলাম, কিন্তু সেটা শুধু রাতের বেলায়, যখন ঘুমাতাম। দিনের বেলায় আমি নিজের দেশের একটা কোনো ছোট ফুটবল মাঠও মাড়িয়ে দেখিনি। সমর্থক হিসেবেও আমি অনেক প্রত্যাশাই জলাঞ্জলি দিয়েছি। হুয়ান আলবের্তো স্কেফিনো আর হুলিয়ো সেসার আবাদায় খেলত পিনিয়রোলের হয়ে, শত্রু দল। আমি ছিলাম ন্যাসিওনালের অনুগত সমর্থক, আর ওদের ঘৃণা করার জন্য যা যা করতে হয়, আমি সব করেছি। কিন্তু ‘এল পেপে’ স্কেফিনোর সুনিয়ন্ত্রিত একেকটা পাস দিয়ে দলকে যেভাবে খেলাত, মনে হতো স্টেডিয়ামের সর্বোচ্চ চূড়া থেকে সবকিছু দেখতে পাচ্ছে সে। আর ‘এল পারদো’ মানে আবাদায়, ইউরোপীয় লোককথার সেই এক এক পদক্ষেপে সাত-লিগ সমান দূরত্ব পেরোনোর মতো এমন দ্রুতগতিতে ছুটত, বলটাকে এমনভাবে নিয়ে ছুটে যেত অন্য প্রান্তের একেবারে সাদা স্পর্শরেখা পর্যন্ত, আগু-পিছু করে, একবারের জন্যও কি বলের দিকে কি বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের দিকে তাকাত না পর্যন্ত যে। ফলে ওদের না পছন্দ করে উপায় ছিল না। এমনও মনে হতো, এই বুঝি ওদের সমর্থনে লাফিয়ে উঠি।
বছর গড়িয়ে গেছে, শেষ পর্যন্ত নিজেকে আমি মেনে নিতে শিখেছি: আমি এক ফুটবল ভিক্ষুক। আমি পথে নেমেছি, দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে, স্টেডিয়ামে ঢুকে প্রার্থনার মতো বলেছি: ফুটবল ‘অনন্য কীর্তি, খোদার ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন।’
যখন ভালো ফুটবল হয়, আমি তখন ওই অলৌকিকতাকেই ধন্যবাদ জানাই এবং আমি তখন থোড়াই কেয়ার করি কোন দল বা কোন দেশ খেলছে।
ফুটবল
ফুটবলের ইতিহাস হলো মাধুর্য থেকে কর্তব্যের পথে এক বিষণ্ন যাত্রার নাম। খেলাধুলা যখন একটা শিল্পে পরিণত হলো, আনন্দ থেকে অঙ্কুরিত হওয়া খেলাকে তার শিকড়সহই উপড়ে ফেলা হলো। দুনিয়ার একটি শতাব্দীরই ইতি ঘটল। পেশাদার ফুটবল দণ্ডাদেশ জারি করে জানিয়ে দিল, এগুলো সব অর্থহীন, আর এখানে অর্থহীনের মানে হলো অলাভজনক। কারণ ওই উন্মত্ত আবেগ থেকে কারো কোনো আয় হয় না। ক্ষণিকের জন্য একজন মানুষের শিশুর মতো ওই বেলুন নিয়ে খেলায় মেতে ওঠা, বেড়াল যেমন সুতোর বল পেলেই মত্ত হয়ে ওঠে, কিংবা ওই ব্যালে নাচিয়ের মতো যে সুতোর বল কিংবা বেলুনের চেয়েও হালকা একটা বল নিয়ে ছোটাছুটি করে, এগুলো সব কারণ, অথচ ওই বেলুন নিয়ে শিশুর মতো উচ্ছল হয়ে ওঠা মানুষটা জানেই না যে, সে কোনো কারণ ছাড়াই খেলছে, তার খেলায় কোনো ঘড়ি নেই কিংবা কোনো রেফারিও নেই, সে খেলছে নিজের আনন্দে।
খেলাটা এখন প্রদর্শনী হয়ে গেছে, কয়েকজন মুখ্য চরিত্র থাকবে আর থাকবে অসংখ্য দর্শক, ফুটবল এখন শুধু দেখার। আর এই প্রদর্শনীই এখন বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক এক ব্যবসা। ফুটবল আয়োজন এখন শুধু খেলার জন্য নয়, বরং খেলাকে ব্যাহত করার জন্যই।
পেশাদার খেলার কলাকৌশল ফুটবলে বিদ্যুদ্গতি আর পাশবিক শক্তির প্রবর্তন ঘটিয়েছে, ফুটবল থেকে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে আনন্দকে, হত্যা করা হয়েছে অলীকতাকে, আর দুঃসাহসিকতা পরিণত করা হয়েছে অপরাধীতে।
সৌভাগ্যবশত মাঠে এখনো তুমি কদাচ এমন দু-একজন উদ্ধত, বদমাশকে দেখতে পাও, যে ওই চিত্রনাট্য পাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভুল করে হলেও নতুন চিত্রনাট্য রচনায় ড্রিবলিং করার দুঃসাহস দেখিয়ে কাটিয়ে চলে যায় গোটা প্রতিপক্ষের সবকটা খেলোয়াড়কে, রেফারিকে, স্ট্যান্ডের দর্শক জমায়েতকে। আর এ সবকিছু সে করে শুধু ফুটবলের সেই হারানো নিষিদ্ধ মুক্তি অভিযানের পরম উল্লাসটুকুকে বুকে জড়িয়ে ধরার প্রত্যাশায়।





