১২-১০-৫১
কাল
একাদশী গেছে,
আজ মা
পথ্য করলেন,
অন্ন নয়,
অন্য কিছু।
সমররা সদলবলে
কালিম্পং বেড়াতে
গেল জিপে
করে। আমাকেও
আমন্ত্রণ জানাল,
কিন্তু মায়ের
শরীরের কথা
স্মরণ করে
সম্মত হতে
পারলাম না।
ওরা তিস্তা
ভ্যালি ঘুরে
কালিম্পং বেড়িয়ে
এল। সারাদিন
যেখানেই যাই
মনটা পড়ে
থাকে বাড়ির
দিকে, কিছুই
ভালো লাগছে
না। ডাক্তারকে
কল দিয়ে
এলাম, ঠাণ্ডা
যদি বুকে
বসে থাকে
তবে সমতলে
নিয়ে যেতে
হতে পারে।
তার মানে
দার্জিলিং ভ্রমণ
শুরুতেই সারা
হবে। প্রতিবেশীরা
ভরসা দিলেন
শীঘ্রই সামলে
উঠবেন। ফুলদি
ও সবিতা
পালা করে
গরম জলের
ব্যাগ ও
ভিক্স মালিশ
করতে লাগল।
১৩-১০-৫১
মা
সামলে উঠেছেন
এটাই সবচেয়ে
বড়ো খবর।
ভোর বেলা
উঠে শুভা,
চন্দন, মুকুল
ও চণ্ডীবাবুকে
নিয়ে মহাকালের
মন্দির দেখতে
গেলাম অবজারভেটরিতে।
কাঞ্চনজঙ্ঘার কুয়াশা
ঢেকে রেখে
দিলো দৃষ্টিকে।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা
করার পর
আবছা আলোয়
ফুটে উঠল
পাহাড়ের দৃশ্য।
খান দুয়েক
ফোটো তুললাম।
কাল সকালে
সূর্যোদয় এর
চেয়ে অনেক
উপভোগ্য হয়েছিল।
কাল বেরিয়েছিলাম
আমি ও
সবিতা। ম্যালের
পাশ দিয়ে
যে রাস্তাটা
চলে গেছে
জলাপাহাড়ের দিকে,
সেইটে ধরে
খানিক দূর
এগিয়ে গিয়ে
একটা বাংলো
প্যাটার্ন বাড়ির
সামনে বসে
দেখছিলাম সূর্যোদয়।
সূর্য ঢাকা
ছিল ঘন
মেঘের আড়ালে,
উত্তর দিকটা
ছিল পরিষ্কার।
কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারশৃঙ্গ
অস্পষ্ট আলোয়
যাচ্ছিল দেখা।
হঠাৎ দেখি
কাঞ্চনজঙ্ঘার একেবারে
চূড়ায় লেগেছে
লাল আলো।
সমস্ত চরাচর
অন্ধকার, আমরা
দাঁড়িয়ে আছি
আলো-আঁধারে,
সূর্য তখনও
দিগ্বলয়ের নীচে,
কিন্তু লাল
হয়ে উঠল
কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষদেশ।
ক্রমে সে-আলো
ছড়িয়ে পড়ল
নিকটস্থ অন্যান্য
পর্বতশৃঙ্গে; কাব্রু,
জন্নু, নারসিং
ইত্যাদি। আজ
সে-দৃশ্য
দেখা গেল
না। কুয়াশায়
দিগিদগন্ত ঢাকা।...
...গাড়ি
ততক্ষণে পৌঁছেছে
বাতাসিয়া লুপে।
আমরা অবতরণ
করলাম। সগর্জনে
গাড়ি আবার
রওনা দিল।
‘বাহ্বারম্ভে
লঘুক্রিয়া’—উদ্ভট
শ্লোকটা যিনি
রচনা করেছিলেন
তিনি নিশ্চয়ই
দার্জিলিঙে আসেননি।
না হলে
অজাযুদ্ধ ঋষিশ্রাদ্ধের
সঙ্গে D. H.
Railway-র
ট্রেনটাও যোগ
করে দিতেন
ওই শ্লোকে।
গর্জন যতটা
হয়, গতি
হয় না
তার চতুর্থাংশ...
...নৈশ
আহার সমাধা
করে টাইগার
হিলের পথে
আমাদের যাত্রা।
দলে আমরা
উনিশ জন।
তার অর্ধেক
স্ত্রী, অর্ধেক
পুং। ফরাসি
মহিলা চল্লেন
সর্বাগ্রে, আমরা
মাঝে এবং
সর্বশেষে শ্রীযুক্ত
সেন।...
...ঘুম
ভাঙল সমরের
ডাকে। রাত
তখন তিনটে।
কম্বল ছেড়ে
বাইরে এসে
দেখি সাদা
জ্যোত্স্নায় ভরে
গেছে প্রকৃতি।
বাইরে তখন
প্রচণ্ড ঠান্ডা।
গায়ে চড়িয়েছি
যথাক্রমে জুতা,
মোজা, গরম
উলের লং
আন্ডারওয়ার, গরম
প্যান্ট; ঊর্ধ্বাঙ্গে
গেঞ্জি, সার্ট,
দুটো সোয়েটার—তদুপরি
মিলিটারি অলস্টার,
কান মাথা
ঢেকেছি কম্পাটারে।
মাথার উপর
চড়িয়েছি শেখ
অবদুল মার্কা
সাদা গরম
টুপি...
ডাকবাংলো থেকে আরও পাঁচ-ছয়শো ফুট উপরে উঠতে হবে। ডাকবাংলোর গায়ে লেখা আছে ৮০০০ ফুট। সুতরাং চূড়া হবে ৮৫০০ ফুট। পথে দুটো মোটর আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। টাইগার হিলের চূড়ায় গিয়ে যখন উঠলাম তখন ভোর হব-হব। সাড়ে চারটে বাজে। উপরে উঠে সকলের মুখ শুকাল। পূর্ব দিগন্ত ঘনপুঞ্জ মেঘে ঢাকা। সর্বসমেত প্রায় দেড়শো লোক রয়েছে উপস্থিত। অধিকাংশেরই হয়েছে শীতভোগ ও অর্থব্যয়। আমাদের শীত ও শ্রম। কায়মনোবাক্যে সকলে প্রার্থনা করতে লাগল মেঘকে সরে যেতে। আমিও নিমিলিত নেত্রে প্রার্থনা করতে লাগলাম।





