দার্জিলিং আজ যেমন দেখা যায় সবসময় এমন ছিল না। শহরটি গড়ে উঠেছিল ধাপে ধাপে। আধুনিক দার্জিলিং ব্রিটিশদের সৃষ্টি। কিন্তু শহরটির রয়েছে একটি অতীত ইতিহাস। অবশ্য ব্রিটিশদের হাতে শহরটি গড়ে ওঠার আগের দার্জিলিংকে একটা অজপাড়াগাঁ বললে ভুল হয় না। দার্জিলিং তখন সাধারণ একটি জনপদের বেশি কিছু ছিল না। তার ওপর জায়গাটি ছিল কখনো সিকিম, কখনো নেপালের দখলে। এ সময় দার্জিলিং শাসন করত নেপাল ও সিকিমের গোর্খারা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দার্জিলিং মূলত সিকিমের রাজার একটি ছোট রাজ্য হিসেবে গণ্য হতো। এরপর সিকিমের রাজা নেপালের গোর্খাদের সঙ্গে কয়েকবার যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়ে ব্যর্থ হন। উনিশ শতকের শুরুর দিকে তিস্তা থেকে তেরাইয়ের বিশাল অংশ গোর্খাদের দখলে চলে আসে।

১৮১৬ সালের আগ পর্যন্ত সিকিমের অনেকখানি অংশ নেপালের দখলে ছিল। এ সময় রঙ্গমঞ্চে ব্রিটিশদের আগমন হয়। তারা গোর্খাদের বিরুদ্ধে দুবার সৈন্য প্রেরণ করেন। প্রথম অভিযানটি ১৮১৩ সালে করা হয়। পরেরবার জেনারেল অকটারলেনিকে প্রধান করে পাঠানো দলটি গোর্খাদের পরাজিত করলে ১৮১৬ সালে সেগৌলিতে একটি চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুসারে নেপালের দখল করা চার বর্গমাইল জায়গা তারা সিকিমকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশরা এখানে নিজেদের দুটি উদ্দেশ্য সাধন করেছে। প্রথমত, নেপালের শক্তি খর্ব এবং দ্বিতীয়ত, সিকিমের আনুগত্য অর্জন। এ কৌশল অনুসারে ১৮১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিতালিয়া নামক স্থানে একটি চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুসারে সিকিমকে সরাসরি ব্রিটিশ শাসনে না এনে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে রাখা হয়।

সেগৌলি চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা নেপালের কাছ থেকে কয়েকটি পাহাড়ি এলাকা দখলে নেয়। প্রতিটি জায়গা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচু। এগুলো হলো আলমোড়া (৫ হাজার ৫১০ ফুট), মিসৌরি (৬ হাজার ৬০০ ফুট), নৈনিতাল (৪ হাজার ৪০৭ ফুট) ও সিমলা (৭ হাজার ৭৫ ফুট)। ব্রিটিশরা যেহেতু কলকাতার গরম নিয়ে বিব্রত ও বিপর্যস্ত ছিল, তারা একটি বা একাধিক ‘আবাসযোগ্য’ জায়গার খোঁজ করছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়ের ওপরের এ জায়গাগুলো তারা পছন্দ করে। এ রকম অবস্থায় নেপাল ও সিকিমের মধ্যকার বিবাদ মেটাতে ক্যাপ্টেন লয়েড এবং সিভিল সার্ভিসের অফিসার জে ডব্লিউ গ্র্যান্ট চুংটং সফর করেন। জায়গাটি বর্তমান দার্জিলিংয়ের পশ্চিম দিকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। সেখানে গিয়ে তারা জায়গাটি পছন্দ করে ফেলেন।

পরের বছর গ্র্যান্ট আবার আসেন এখানে। সঙ্গে ছিলেন বাংলার ডেপুটি সার্ভেয়ার জেনারেল জেডি হারবার্ট। এ সময় তারা অঞ্চলটিকে স্বাস্থ্যাবাস হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে লয়েডকে দায়িত্ব দেয়া হয় সিকিমের সঙ্গে আলোচনা চালাতে। কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয় যে সিকিম চাইলে টাকা কিংবা সমপরিমাণ জমি গ্রহণ করতে পারে। দীর্ঘ আলোচনা শেষ হয় ১৮৩৫ সালে। বৃদ্ধ রাজা সিকিমপুত্তি বার্ষিক ৩ হাজার টাকায় জমিটি ব্রিটিশদের দিতে রাজি হন। পরে দাম বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়। উল্লেখ করা ভালো, অঞ্চলটি দৈর্ঘ্যে ২৪ ও প্রস্থে পাঁচ-ছয় মাইল ছিল। অথাৎ মোটামুটি ১৪০ বর্গমাইল। বার্ষিক মাত্র ২০ টাকা রাজস্বের জমি ছাড়তে এত সময় কেন নেয়া হলো তা রহস্য। তবে জমিদানে রাজা ইচ্ছুক ছিলেন না সেটা বোঝা যায়। ছয়-সাত বছরের আলোচনার পর ১৮৩৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দানপত্র স্বাক্ষরিত হয়। দানপত্রে লেখা ছিল—


The Governor general, having expressed his desire for possession of the hill of Darjeeling on account of it’s cool climate, for the purpose of enabling the servants of his Government, suffering from sickness, to avail themselves of its advantages, I the Sikimputtee Rajah, out of friendship for the said governor general, hereby present Darjeeling to the East India Company, that is, all the land south of the great Rangit river, east of the Balasun, Kahail and Little Rangit rivers and west of Runghnu and Mahandi river.

পরের বছর শুরু হয় এলাকার জরিপ। লয়েডকে স্থানীয় এজেন্ট করে কোম্পানি। ১৮৩৯ সালে লোকাল এজেন্ট পদটি বিলুপ্ত করে সুপারিনটেনডেন্ট পদ সৃষ্টি করে ডা. আর্থার ডি ক্যাম্পবেলকে অঞ্চলটির দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি দীর্ঘ ২২ বছর ওই পদে বহাল ছিলেন। এ বছর থেকেই লর্ড নেপিয়ার দার্জিলিং শহরের পত্তনের কাজ শুরু করার নির্দেশনা লাভ করেন। এ সময় শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং এবং কারগোলা ঘাট থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত দুটো রাস্তা তৈরির দায়িত্ব নেপিয়ারকে দেয়া হয়। ততদিনে সিমলার পত্তন হয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৯ সালে দার্জিলিংকে ‘ভবিষ্যতের সিমলা’ বলে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এ রাস্তা তৈরি হয়েছিল। শহরকে গুছিয়ে নিতে বেশ সময় লাগে। কেননা এ সময় ওই অঞ্চলে কাজ করার মতো কুলি পাওয়া যাচ্ছিল না। কুলি ও অন্যান্য শ্রমিকের অভাব ছিল দেরি হওয়ার কারণ। পরবর্তী সময়ে আশপাশের অঞ্চল থেকে কুলিদের আনানো হয়। সেকালের হিসাব অনুসারে দেখা যায় ৫০০ কুলির জন্য মাসিক বরাদ্দ ছিল ৪০০ টাকা। অর্থাৎ প্রত্যেক কুলির মাসিক আয় ছিল ৮০ পয়সা।

কুলিরা যা-ই পাক না কেন, ব্রিটিশরা তাদের মনমতো জায়গা পেয়ে গিয়েছিল। তারা সম্ভবত ভারতের মধ্যে ‘ছোট এক টুকরো ইংল্যান্ড’ খুঁজে পেল। কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এক বছর সেখানে থেকে এলাকাটির ভালোমন্দ সম্পর্কে একটি রিপোর্ট দিতে হবে। দেখা গেল সে রিপোর্টে দার্জিলিং সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য নেই। ১৮৩৭ সালের ১২ আগস্ট ‘ইংলিশ ম্যান’ পত্রিকার লেখা থেকে জানা যায়, স্থানটিতে বসবাসের ব্যাপারে লোকেরা যথেষ্ট উৎসাহী। সুতরাং সেখানে ভারতীয় (বিশেষত হাজারিবাগ থেকে আসা) কুলিদের হাতে ইংরেজ স্টাইলের বাড়ি, বাগান ও গির্জা তৈরির কাজ শুরু করার অনুমতি দেয়া হলো। ঘরবাড়ি তৈরির আগে একটি হোটেল তৈরি করা হয়। ১৮৪০ সালের ৮ এপ্রিল প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় ৩১ মার্চ দার্জিলিংয়ে একটি হোটেল তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

বলা বাহুল্য, হোটেল ও ঘরবাড়িগুলো ইংল্যান্ডের মতো করে তৈরি করা হয়েছিল। প্রকাশিত খবরের বর্ণনায় লেখা হয়েছে, ‘ঘরগুলোয় বেশ আলো ছিল, আর প্রতি ঘরে দু-দুটো করে আগুন পোয়ানোর জায়গা থাকায় ঠাণ্ডায় একেবারেই কাছে ঘেঁষতে পারেনি। চিমনির সঙ্গে লাগানো থার্মোমিটারে পারা উঠেছিল ৬৫ ডিগ্রিতে (ফারেনহাইট)।’ আরো প্রকাশ করা হয়েছে এ উপলক্ষে একটি কেক তৈরি করা হয়, যার ওপর লেখা ছিল ‘দার্জিলিং হোটেল, ৩১ মার্চ ১৮৪০।’ দার্জিলিং হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক ওয়ারম্যান ও তার স্ত্রী। প্রকাশিত সংবাদে তাদের সুচারু কাজের প্রশংসা করা হয়।

সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্য কেবল সংবাদ প্রচার ছিল না। এর মাধ্যমে মূলত দার্জিলিংয়ে লোকজন আহ্বান করা বা আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়। শহর পত্তন ও হোটেল তৈরির পর এক মাস পর্যন্ত এখানে লোক সমাগম হয়নি। দার্জিলিং থেকে লেখা হয় ‘প্রাসাদ নগরী’ থেকে এখনো তেমন কেই আসেনি। তবে ব্রুস, রাসেল ও স্মিথরা আসছিলেন। দার্জিলিংয়ে এ সময় চমত্কার রাস্তা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এজন্য কোম্পানিকে পাঠানো চিঠিতে ডক্টর ক্যাম্পবেল, লেফটেন্যান্ট নেপিয়ার ও মন্টগোমারিকে কৃতিত্ব দেয়া হয়। ততদিনে দার্জিলিংয়ে একটি স্কুলও করা হয়েছিল। বাড়িগুলোর কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে হেপার ও মার্টিন পরিশ্রম করেছেন বলে জানানো হয়। দার্জিং শহর যে বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠেছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত আশ্বস্ত করা হয়েছিল।

শহর পত্তনের জন্য যা যা প্রয়োজন, অর্থাৎ বাড়িঘর, রাস্তা, স্কুল এমনকি উপসনালয় হিসেবে গির্জাও তৈরি হয়েছিল। একটি হাসপাতালের কাজ এগিয়ে যাচ্ছিল। বাজার বসানো হয়েছিল। সেখানে ইউরোপীয় জিনিসপত্র পাওয়া যেত। অর্থাৎ এখান থেকে বোঝা যায় দার্জিলিং তৈরি করা হয়েছিল পুরোপুরি ইউরোপীয় বান্ধব করে। মূলত ইউরোপীয়ও না, আদর্শ ব্রিটিশ শহর হিসেবে।

প্রকাশিত এ খবর থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় ১৮৪০ সালের ১৪ মে পর্যন্ত দার্জিলিংয়ে পর্যটক হিসেবে গিয়েছিলেন মাত্র একজন মানুষ। জনহীন রাস্তায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। ২৬ মে প্রকাশিত একটি খবর অনুসারে দার্জিলিংয়ে ইউরোপীয়দের সংখ্যা ছিল মোটের ওপর মাত্র ২৮ জন। এমন হওয়ার কারণ ছিল সেকালে রাস্তাঘাট তথা যাতায়াত ব্যবস্থা। দার্জিলিং যাওয়া বেশ কঠিন একটি ব্যাপার ছিল। কিন্তু তা বলে দার্জিলিংয়ে শহর বসানোর সিদ্ধান্তটি কদাপি ভুল ছিল না। পরবর্তী সময়ে পথঘাট ভালো করে তৈরি হতে না হতে দার্জিলিংয়ে মানুষের আগমন বাড়তে থাকে। এরপর একটা সময় দার্জিলিং হয়ে ওঠে ভারতের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র এবং ব্রিটিশদের সামার ক্যাপিটাল।

 

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক