আজকাল কোনো জায়গা নির্দিষ্ট করে খুঁজে পেতে হলে আগে খোঁজা হয় ‘ল্যান্ডমার্ক’। সেটা হতে পারে জনপ্রিয় কোনো মিলনস্থল। হতে পারে প্রাচীন কোনো স্থাপনা। এ ধারা নতুন নয়। বরং কোনো কোনো এলাকা এমনকি শহর পরিচিত হয় এমন বিখ্যাত জায়গা বা স্থাপনার জন্য। আগ্রার ক্ষেত্রে সে সম্মান নিঃসন্দেহে নিয়েছে তাজমহল। বাদশাহ শাহজাহান নির্মিত এ মকবরা পৃথিবী বিখ্যাত। মোগল আমলে আগ্রা সেজেছিল একদম নতুন করে। নানা কারণে সে সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এ নগরকে শহর করে তুলেছিলেন মোগল বাদশাহরা। আগ্রা তখনো তার নিজের স্বাতন্ত্র্য নিয়েই ভারতে পরিচিত ছিল, কিন্তু ভারতের অন্য অনেক শহরের মতোই আগ্রাও সমৃদ্ধ হয়েছিল মোগল বাদশাহদের শাসনের অধীনে এসে।

আগ্রার ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলে একটু পেছন থেকেই শুরু করতে হয়। মোগল আমলে সমৃদ্ধ হলেও আগ্রার পত্তন বহু আগে। রীতিমতো ঐতিহাসিক শহর আগ্রা। তবে নাম ছিল ভিন্ন। মহাভারতের সময়ে আগ্রার উল্লেখ রয়েছে কৃষ্ণ প্রসঙ্গে। বৃন্দাবনের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষ্ণের লীলা হতো তার একটি ছিল অগ্রবন। লীলাক্ষেত্রে বহু বনের মধ্যে অগ্রবন অন্যতম এবং এ অগ্রবনই পরবর্তীকালের আগ্রা। তবে আগ্রার নাম নিয়ে আরেকটি মত রয়েছে। একসময়ে আগ্রায় প্রচুর পরিমাণে লবণ উৎপাদন হতো। লবণ তৈরির পাত্রের নাম ছিল ‘আগর’ এবং এ থেকেই আগ্রা নামের উত্পত্তি। পরবর্তীকালে টলেমি তার লেখায় এ জনপদের নাম উল্লেখ করেন। মহাভারতের যুগের জনপদটি সুলতানি আমলে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিকান্দার লোদি জনপদে নগর পত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে মোগল আমলে রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে আগ্রা।

ভারত বরাবরই কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আর কৃষির জন্য প্রয়োজন উর্বর ভূমি। গঙ্গা-যমুনার দোয়াব ছিল সেই উর্বর ভূমি। কিন্তু তাছাড়া দোয়াব অঞ্চলে আগ্রার ছিল স্থানিক গুরুত্ব। উত্তর ও পশ্চিম ভারতের সঙ্গে পূর্ব ভারতের সংযোগসূত্র বা মাধ্যম হিসেবেও কাজ করেছে আগ্রা। ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, মোগল আমলে যমুনা নদীতে বেশকিছু ঘাট ছিল এবং সেসব ঘাট নৌপথে পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতো। এ কারণেই মোগল আমলে আগ্রা হয়ে উঠেছিল রাজধানী। আগ্রা থেকে উৎপাদন, বাণিজ্য ও শাসনে সহায়তা হবে বলে বুঝতে পেরেছিলেন তারা। রাজধানী স্থাপনে মোগলদের শহর বাছাই সম্পর্কে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ পেরি অ্যান্ডারসন লিখেছেন, The fate of the Islamic cities was normally determined by that of the state whose fortune had conferred their prosperity on them. আগ্রা ভবিষ্যতে সেই সাফল্যের স্থান হবে বলে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন মোগল শাসকরা।

বাবর যখন ভারতে মোগল শাসনের সূচনা করেন, তখন তার শাসনের প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল দিল্লি। পরবর্তীকালে শাসনের কেন্দ্র সরে আসে। বাবর প্রথমে তার রাজধানী আগ্রায় স্থাপন করেন। দিল্লিতে শাসন প্রতিষ্ঠা করার পর পরই তিনি আগ্রার প্রতি মনোযোগী হন। তবে শহরটি জয় করেছিলেন হুমায়ুন। হুমায়ুন পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভের পর দখল করেছিলেন আগ্রা। মোগলদের স্থাপনা ও নগরের অন্যতম আকর্ষণ ও বিশেষত্ব ছিল চারবাগ ঘরানার বাগান। এ ধরনের প্রথম মোগল বাগানটি যমুনার তীরে নির্মাণ করেন বাবর। তিনি আগ্রাকেই তার প্রশাসনিক কেন্দ্র করতে চেয়েছিলেন। বাবরের পর স্বাভাবিকভাবেই হুমায়ূনের বাদশাহি। কিন্তু স্বল্পকালীন শাসনে তিনি আগ্রা নিয়ে ভাবনার সময় পাননি। আগ্রাকে শাসনের কেন্দ্র করেছিলেন আকবর।

আকবর তার নিজের হাতে শাসনক্ষমতা তুলে নেয়ার পর আগ্রাকে রাজধানী করেন। একে একসময় আকবরাবাদ নামও দেয়া হয়েছিল। সবারই জানা, আকবর শহর বা নগর পত্তন করতে ভালোবাসতেন। সিক্রিকে গড়েছিলেন তিনি নিজের পরিকল্পনামাফিক। এ ধারা শুরু হয়েছিল আগ্রা থেকেই। ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আগ্রাকে রাজধানীর মর্যাদা দেন এবং এ সময় থেকে আগ্রায় নতুন করে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়। আকবর বিচার-বিবেচনা করে স্থির করেছিলেন যে আগ্রায় রাজধানী হলে আশপাশের অঞ্চল শাসন করা সহজ হবে। ১৫৬০-৭১ পর্যন্ত আগ্রাই ছিল তার রাজধানী। এরপর তিনি সিক্রিতে রাজধানী স্থানান্তর করেন। কিন্তু এর আগেই আগ্রায় স্থাপিত হয় আকবরের রাজধানী। তিনি সেখানে তৈরি করেন প্রাসাদ। আগ্রা কেল্লার কথা কে না জানে। পাশাপাশি রাজধানী হওয়ার কারণে আগ্রায় অন্যান্য বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে। র্যালফ ফিচ ১৫৮৫ সালে তার আগ্রা ভ্রমণ সম্পর্কে লেখেন, Agra is a very great city, and populous, built with stone, having fair and large streets with a fair river running by it.

রাজধানী ঘোষণা করার পর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নির্বাহের জন্য বাদশাহ আকবর এ শহরের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের পরিবল্পনা করেন। বাদশাহি আগ্রার কেন্দ্র হয়ে ওঠে আগ্রা কেল্লা। বাদলগড় নামের পুরনো কেল্লার সংস্কার করান আকবর। ১৫৬০-এ কাজ শুরু করে ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় চার হাজার শ্রমিক এ কেল্লার কাজ করেন। ৯৪ একর ভূমির ওপর নির্মিত এ কেল্লার দুটো দরজা—দিল্লি দরওয়াজা ও লাহোর দরওয়াজা। লাহোর দরওয়াজার অন্য নাম অমর সিং দরওয়াজা। লাল ইটের তৈরি এ কেল্লাই মোগল আমলের পরবর্তীকালের অন্যান্য কেল্লা ও স্থাপনার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এখানেই পরবর্তী সময়ে তৈরি হয়েছে আকবরি ও জাহাঙ্গীরি মহল। শাহজাহানের সময়ে আগ্রাতেই তৈরি হয়েছে মুসম্মন বুর্জ। আগ্রাকে সাজাতে সাজাতেই আকবরের মনে নতুন একটি নগর পত্তনের পরিকল্পনা জাগে। তিনি আগ্রার মূল শহর থেকে ৩৬ কিলোমিটার (প্রায়) দূরে সিক্রিতে নগর গড়ে তোলেন। এখানেই ছিল বীরবলের মহল, যোধা বাই নামে পরিচিত মরিয়ম-উজ-জামানীর মহল এমনকি আকবরের বিখ্যাত ইবাদতখানা। সিক্রি আলাদা একটি নগর হয়ে উঠেছিল কিছুদিনের জন্য, কিন্তু আদতে তাকে আগ্রারই একটি অংশ বললে খুব একটা ভুল হয় না।

শেখ সেলিম চিশতির খানকাহকে কেন্দ্র করে পত্তন করা সিক্রি থেকে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে আকবর পুনরায় তার রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তর করেন। আগ্রা কেল্লা ফের হয়ে ওঠে মোগল প্রশাসনের কেন্দ্র। দিল্লির মীনা বাজারের মতো না হলেও আগ্রায় গড়ে ওঠে বাজার, বিপণি কেন্দ্র, সেনাছাউনি। যমুনা নদী এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। আকবরের মৃত্যুর পর ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের অভিষেকও এই আগ্রা কেল্লাতেই হয়েছিল। ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জাহাঙ্গীরের মূল রাজধানী ছিল আগ্রা (বাদশাহর ভ্রমণের সময় ভ্রাম্যমাণ রাজধানী ছিল মোগল সংস্কৃতি)। জাহাঙ্গীর তার তুজুকে আগ্রার ইতিহাস ও আকবরের সময়ে এ শহরের নানা স্থাপনা তৈরির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো লেখেন, ‘শহরের পশ্চিম অংশ দুই ক্রোশ দীর্ঘ এবং এক ক্রোশ বিস্তুৃত; পূর্ব দিকে শহরের দৈর্ঘ্য এক ক্রোশ এবং প্রস্থে আধ ক্রোশ। ইরাক, খোরাসান বা মাওয়ার-উন-নহরের যেকোনো শহরের তুলনায় এর স্থাপনাগুলো বৃহৎ ও সংখ্যায়ও বেশি। বেশির ভাগ বসতিই তিন কিংবা চারতলা করে নির্মিত।’

জাহাঙ্গীর নিজেও আগ্রার উন্নতি সাধন করেছিলেন। নিজের জন্য মহল তৈরি ও সংস্কারের পাশাপাশি তিনি তৈরি করেন ‘ন্যায়ের জিঞ্জির’। সোনার তৈরি এ শিকলে ৬০টি ঘণ্টা বাঁধা ছিল, যার এক প্রান্ত শাহ বুর্জে এবং অন্য প্রান্ত যমুনার তীরে বাঁধা ছিল। আগ্রার অন্যতম একটি দর্শনীয় বস্তু হয়ে উঠেছিল এ শিকল।

বলা হয় শাহজাহানের আমল ছিল মোগল আমলের স্বর্ণযুগ। এ সময় আগ্রায় তিনি নির্মাণ করেন মুসম্মন বুর্জ। সুউচ্চ এ মিনার থেকে যমুনার তীরে তাজমহল দেখা যায়। মার্বেল পাথরে তৈরি এ স্থাপনাতেও তাজমহলে ব্যবহূত ‘পিয়েত্রা ডুরা’ নকশা দেখা যায়। ১৬৩১-৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ বুর্জ নির্মাণ করেন শাহজাহান। এছাড়া তিনি তৈরি করেন শিশমহল বা কাচের প্রাসাদ। সিরিয়ার হালেব থেকে কাচ এনে দেয়াল ও ছাদে তা বসিয়ে এ স্থাপনা তৈরি করা হয়। শাহজাহান একাই নন, আগ্রাকে স্থাপনা উপহার দিয়েছিলেন তার কন্যা জাহানারা বেগমও। তার নির্দেশনা, অর্থায়ন ও আগ্রহ থেকে আগ্রায় নির্মিত হয় জামে মসজিদ। ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়ে এর কাজ শেষ হয় ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে।

আগ্রার সবচেয়ে বড় সম্পদ নিঃসন্দেহে তাজমহল। স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে শাহজাহান নির্মিত তাজমহলের কথা নতুন করে কিছু বলার নেই। ৪২ একর জায়গার ওপর নির্মিত এ মকবরা ও সংলগ্ন বাগান পৃথিবীর অন্যতম সেরা সৌন্দর্যের স্থাপনা। ওস্তাদ আহমেদ লাহোরীর নকশায় নির্মিত তাজমহল আগ্রাকে এক নামে পরিচয় করিয়ে দেয় বিশ্বের কাছে। এ কারণে আগ্রা হয়ে উঠেছে তাহমহলের শহর। আওরঙ্গজেব ক্ষমতা লাভ করে তার রাজধানী দিল্লিতে সরিয়ে নেন। এরপর আগ্রার জৌলুশ কিছুটা কমে গেলেও যমুনা নদী, নদীপথে বাণিজ্য ও তাজমহলের সৌন্দর্যের জন্য আগ্রা আজও চির তরুণ।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক