না  শক্তিতে, না কৌশলে। আর ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয় সম্রাট আকবরকে। ফলে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিলেন হামযাবান। শ্বশুর মাওলানা নিজামুদ্দিন লারীকে পাঠালেন বার্তা দিয়ে। আকবর নিজেও এড়াতে চাচ্ছিলেন সংঘাত। সরনাল ও পাটান এরই মধ্যে অধিকারে চলে এসেছে। শিগগির তাকাতে হবে বাংলার দিকেও। ফলে শান্তির প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো। বলতে গেলে রক্তপাতহীনভাবেই বন্দরনগরী সুরাটে প্রতিষ্ঠিত হলো মোগল আধিপত্য। ঠিক পরদিন বিজয়ীর বেশে দুর্গে প্রবেশ করলেন সম্রাট আকবর। দিনটি ১৫৭৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। সম্রাট নিজেই দুর্গের দায়িত্ব তুলে দিলেন কিলিজ মুহাম্মদ খানের হাতে। নির্দেশনা দিলেন ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের। নিশ্চিত করা হলো নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কর্মপ্রণালি। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় গুজরাট অভিযান।

তপতী নদীর তীরে অবস্থিত সুরাট। উর্বর ভূমি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চালুক্য রাজবংশের সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। গুজরাটের উপকূলবর্তী নগরী হিসেবে সুরাটকে উদ্ধৃত করেছেন টলেমি ও হিউয়েন সাং। আরবরা উল্লেখ করেছেন সুরবায়া নামে। গুজরাটের সুলতান প্রথম মাহমুদ শাহ (১৪৫৮-১৫১১) অঞ্চলটিকে নিজের রাজ্যভুক্ত করে নিলে সুরাটের সুরতেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ক্যাম্বের পাশাপাশি সুরাটও পরিণত হয় বাণিজ্যের তীর্থস্থানে। ১৫১৪ সালে পর্তুগিজ পর্যটক বারবোসা সুরাটকে বলেছেন, ‘সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের পীঠস্থান, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ও রাজস্বের প্রধান উৎসের একটি, মালাবারসহ বিভিন্ন বন্দরের জাহাজ নোঙর করে এখানে।’ স্বাভাবিকভাবেই ১৫৭৩ সালে সম্রাট আকবর যখন সুরাট দুর্গ অধিকার করেন, ওই অঞ্চলের তাত্পর্য তার অজ্ঞাত ছিল না। আর তার প্রমাণ দেখা যায় দ্রুততম সময়ের মধ্যেই। মোগল যুগে সুরাটের চালচিত্র তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ কূটনীতিক স্যার থমাস রো (১৬১৫-১৬১৯), ইতালীয় সংগীতজ্ঞ পিয়েত্রে দেলা ভেলে (১৬২৩-২৫), জার্মান পর্যটক ম্যানেদেলসো (১৬৩৮-৩৯), ফরাসি চিকিৎসক বার্নিয়ার (১৫৫৯-৬৬), টাভেরনিয়ার (১৬৪১-৬৮) ও থেবেনট (১৬৬৬-৬৭), ইংরেজ সার্জন জন ফ্রেয়ার (১৬৭৪-৮১) ও জন অভিংটন (১৬৮৯-৯২)। আলোচিত হয়েছে আবুল ফজলের আইন-ই আকবরি ও আলি মুহম্মদ খানের মিরাত-ই আহমদি গ্রন্থেও। দেখা যায়, মোগল যুগে সুরাট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। হজযাত্রীরা প্রতি বছর এ বন্দর ব্যবহার করার কারণে সুরাটের আরেক নাম হয় ‘বন্দর-ই মুবারক’ বা পবিত্র বন্দর। সম্রাট নিজে সেখানকার মুত্সুদ্দি ও কিলাদার নিযুক্ত করতেন। প্রথমজন রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কার্যাবলি পরিচালনা করতেন। দ্বিতীয়জনের দায়িত্ব ছিল সামরিক বিষয়াবলি ও নগর প্রতিরক্ষা। কাগজপত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আহমেদাবাদে থাকলেও সেখানকার সুবাদারের কাছে সুরাটের কিলাদার দায়বদ্ধ ছিল না বললেই চলে। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট স্বাধীনতা পেতেন তিনি। বন্দর ও আশপাশের অঞ্চল থেকে স্থানীয় গভর্নর বা হাকিমরা রাজস্ব উত্তোলন করতেন। হাকিম ও রাজস্বদাতাদের মধ্যস্থতা করত স্থানীয় অভিজাতরা। তাদের বলা হতো মুসতাজিরান। প্রতি বছর সুরাট থেকে ৪ লাখ রুপি যুক্ত হতো মোগল রাজকোষে। সপ্তদশ শতকেই গুজরাট সুবা ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্বে অন্য সুবার থেকে এগিয়ে যায়। এর এ অবস্থানের পেছনে প্রধান ভূমিকায় ছিল বন্দর নগরী সুরাট। ঐতিহাসিক শিরিন মুসভির দাবি অনুসারে, গুজরাট সুবার মোট রাজস্বের ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ আসত ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে। সেখানে কেবল সুরাট থেকেই আসত ২৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

সুরাটের সবচেয়ে বড় পরিচিতি বহু সংস্কৃতির মিলনস্থল হিসেবে। বিভিন্ন সময়ের ব্যবধানে হিন্দু, মুসলিম, ইহুদি, আরব, তুর্কি, পারসিক ও আর্মেনীয় বণিকদের বাসভূমি গড়ে উঠেছিল এখানে। পেশা হিসেবে অধিকাংশই ছিল বণিক, নাবিক, কৃষক, তাঁতি ও নির্মাণশিল্পী। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা রাজস্ব, হিসাবরক্ষণ ও অর্থনৈতিক বিষয়াদি সামাল দিত। মুসলমানদের প্রাধান্য ছিল প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে। ব্যবসা, নির্মাণ ও শারীরিক শ্রমের পেশাগুলোয় দেখা যেত পারসিকদের প্রাধান্য। সমৃদ্ধির কারণে ভারতে আসা বিদেশীদের কাছেও সুরাট আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ইংরেজ, ডাচ ও ফরাসিরা মোগল সম্রাটের ফরমান নিয়ে সুরাটে কুঠি নির্মাণ করেছিল। ইতিহাসে হাজি কাসিম ও হাজি জাহিদ বেগ নামের দুই মুসলমান এবং বীরজি ভোহরা নামের এক হিন্দু বণিকের সন্ধান পাওয়া যায়, ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পত্তি অর্জন করেছিলেন তারা। ১৬৬৪ সালে শিবাজি সুরাট আক্রমণ করলে তাদের সম্পত্তি লুণ্ঠিত হয়। সুরাট উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যকার পণ্য সরবরাহের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহূত হতো। কাশ্মীর, লাহোর ও আগ্রা থেকে পণ্য বের হতো সুরাট হয়ে, আবার ইউরোপ ও চীন থেকে পণ্য ভারতে প্রবেশ করত সুরাট হয়েই। রফতানি পণ্যের মধ্যে প্রাধান্য নিয়ে অবস্থান করেছে স্বর্ণ, তুলা, শিম, ডাল, চিনি ও তামাক। থাকত সুতি ও রেশমি বস্ত্রও। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সাগুফতা পারভিন দাবি করেন, ‘উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে চীন পর্যন্ত নারী ও পুরুষের বস্ত্রের জোগান দিত গুজরাট।’ সুরাট হয়ে ভারতে বেশি আমদানি হতো ইউরোপীয় বিলাসজাত পণ্য। বিভিন্ন প্রকার ধাতব পণ্যও থেকেছে আমদানির তালিকায়।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংযোগবিন্দু ছিল সুরাট। এজন্যই মোগল আমলে সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চল। সাম্রাজ্যের রাজধানী ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে পণ্য আসত। মসুলিপট্টম ও বাংলার সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল স্পষ্ট। ভারতে প্রবেশ করার পরপরই বন্দরের গুরুত্ব টের পায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। মোগল দরবারে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয় স্যার উইলিয়াম হকিন্সকে। দিল্লির মসনদে তখন আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীর। ১৬০৮ সালে সম্রাটের কাছ থেকে বাণিজ্যের অনুমতি নিয়ে সুরাটে আসেন হকিন্স। তবে পথের কাঁটা হিসেবে সামনে দাঁড়ায় পর্তুগিজরা। এতদিন একচেটিয়া বাণিজ্যে নতুন প্রতিযোগীকে ভালোভাবে নেয়নি তারা। ফলে ঘটনা যুদ্ধের দিকে গড়ায়। ১৬১২ সালে সংঘটিত যুদ্ধটি সুভালির যুদ্ধ নামে ইতিহাসে সুপরিচিত। যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ইংরেজরা ভারতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে। ঠিক পরের বছরই সুরাটে স্থাপন হয় ব্রিটিশ বাণিজ্য কুঠি। মোগল সম্রাটও এরপর পর্তুগিজদের চেয়ে ইংরেজদের বেশি কদর করতে থাকেন। অবশ্য ডাচরা সম্রাট আকবরের সময়ই ১৬০২ সালের দিকে বাণিজ্যের অনুমতি পেলেও বাণিজ্যে কিছুটা দেরি হয়। ১৬১৬ সালে প্রতিষ্ঠা হয় তাদের প্রথম বাণিজ্য কুঠি। সুরাটের মাটিতে ফরাসি কুঠি স্থাপন হয়েছে ১৬৬৮ সালে। ১৬৬৬ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাদের সেখানে কুঠি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন। অন্যদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে দেরিতে এলেও মিশনারি, পর্যটক ও বণিকেরা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুততম সময়ে। খুব অল্প সময়েই তারা ভারতে বাণিজ্যিক পরাশক্তি হিসেবে পরিণত করে নিজেদের। পর্যটক বার্নিয়ার, টাভেরনিয়ার ও থেবেনট ছিলেন ফরাসি। নগরীর গুরুত্ব ও বিবরণ তুলে ধরেছেন প্রত্যেকেই। ইউরোপীয়দের আগমনে সুরাটের নগরায়ণ ত্বরান্বিত হয়। দুর্গে সবসময় ২০০ মোগল সৈন্য মোতায়েন রাখা হতো। ১৬২৭ সালে থমাস হার্বার্ট যখন সুরাট ভ্রমণ করেন, তখন গোটা নগরীকে মাটির দেয়ালে পরিবেষ্টিত দেখতে পান। মারাঠাদের প্রথম আক্রমণের পর সম্রাট আওরঙ্গজেব বর্ধিত করেন সুরাটের প্রতিরক্ষা। ১৬৭৪ সালে জন ফ্রেয়ার সুরাটে প্রায় ৭০০ শ্রমিককে দেয়াল নির্মাণরত অবস্থায় দেখেছেন। ১৭১৭ সালে ফররুখশিয়ারের সময় আগে থেকে বিদ্যমান দেয়াল আরো সংস্কার ও মজবুত করা হয়।

১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরই মোগল আধিপত্য সংকুচিত হতে থাকে। সুরাটের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। যদিও দীর্ঘদিন ধরেই মারাঠা আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল সুরাট। এ সময়ে সেখানকার বাড়িঘর বিধ্বস্ত করা হয়। লুটপাট করা হয় অস্থাবর সম্পত্তি। ডাচ ও ইংরেজ বণিকেরা কোনোভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারলেও বেকায়দায় পড়ে মোগল প্রশাসন। সুরাট যেন আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে দিল্লির কাছ থেকে। প্রশাসকেরা হয়ে উঠতে থাকে আরো বেশি শক্তিহীন। নওয়াব তেগ বেগ খান (১৭৩৩-১৭৪৬)-এর সময় সুরাট মোটামুটি স্বাধীন অবস্থা লাভ করে। মোগলদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তখন কেবল কাগজে-কলমে। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় মোগল অভিজাতদের মধ্যেই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। রাজনৈতিক টানাপড়েনের সুযোগ লুফে নিতে পারে মারাঠা ও বিদেশী বেনিয়া শক্তিগুলো। ১৭৫৮ সালে নবাব সফদার খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে অস্থিরতা আরো ঘনীভূত হয়। ১৯৫৯ সালের নভেম্বরে ফরমানের মাধ্যমে সুরাটের ভবিষ্যৎ থেকে এক রকম সরে যায় মোগল শক্তি। তার স্থানে এগিয়ে আসে মারাঠা, ডাচ ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৮০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবেই সুরাটের প্রশাসনিক দায়িত্ব তুলে নেয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সুরাট হাতছাড়া হওয়ার মধ্য দিয়ে মোগলরা কেবল তাদের অর্থনৈতিক শক্তির বড় একটা উৎস হারায়নি। সংকটপূর্ণ করে তুলেছে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বও। বাংলা ও সুরাটকে হস্তগত করার মাধ্যমে ইংরেজরা ২০০ বছরের জন্য নিজেদের আসন অনেকটাই নিশ্চিত করেছে; অন্যদিকে মোগলের আধিপত্যে পড়েছে সমাপ্তির ডঙ্কা।

 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক