‘বেঙ্গল নর্থ ইনফ্যান্ট্রির ৪৬ রেজিমেন্টের হাবিলদার ‘আলম বেগ’-এর খুলি, যাকে তার রেজিমেন্টের আরো অনেক সদস্যের মতো কামানের সামনে বেঁধে গোলায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে তিনি একজন অন্যতম নেতা এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর চরিত্রের মানুষ ছিলেন। ইউরোপীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য যেদিকে দ্রুত ছুটছিল, সেখানে যাওয়ার একটি পথ আলম বেগ দখলে (একটি ছোট বাহিনীর নেতা হিসেবে) নেন। আলম বেগের দল আকস্মিক আক্রমণ করে এবং মেয়ের পাশেই ডা. গ্রাহামকে গুলি করে হত্যা করে। তার পরবর্তী শিকার ছিলেন মিশনারি রেভারেন্ড মি. হান্টার। এ মিশনারিও একই পথে প্রাণ বাঁচাতে নিজের স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে পালাচ্ছিলেন। আলম বেগ মি. হান্টার ও তার পরিবারকে নির্মম নির্যাতন করে রাস্তার পাশে হত্যা করেন।
আলম বেগের বয়স ছিল ৩২ বছর; উচ্চতা ৫ ফুট সাড়ে ৭ ইঞ্চি এবং কোনো বিবেচনাতেই তিনি দেখতে স্থানীয় কোনো মানুষের মতো অসুন্দর ছিলেন না।
খুলিটি ঘরে নিয়ে এসেছিলেন ক্যাপ্টেন (এআর) কস্তেল্লো (সপ্তম ড্রাগন গার্ডের সাবেক ক্যাপ্টেন), আলম বেগের মৃত্যুদণ্ড যখন কার্যকর করা হয়, তখন দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে কস্তেল্লোও ছিলেন।’
উপরের কথাগুলো নোট আকারে এক টুকরো কাগজে লেখা ছিল আর কাগজটি রাখা ছিল একটি মানবখুলির সঙ্গে, যে খুলির বিবরণ আমরা বর্ণনায় দেখতে পাই।
ইংল্যান্ডের কেন্টে অবস্থিত উপকূলীয় শহর ওয়ালমার। ১৯৬৩ সালে এ শহরের দ্য লর্ড ক্লাইড পাবটির নতুন মালিক ভবনের পেছনের দিকে অব্যবহূত কিছু বাক্সের তলায় একটি মানবখুলি খুঁজে পেলেন। খুলিটির চোয়ালের নিচের অংশ ছিল না। যে কয়টি দাঁত অবশিষ্ট ছিল, সেগুলোও নড়বড়ে হয়ে গেছে। খুলিটি হয়তো তেমন কোনো অর্থই বহন করত না, পাবের নতুন মালিক হয়তো খুলিটা ফেলে দিয়ে হাঁপ ছাড়তেন, যদি না খুলির অক্ষিকোটরে সযত্নে রাখা একটি পুরনো কাগজ দেখতে না পেতেন। এবং এ কাগজেই ইংরেজি ভাষায় লেখা ছিল খুলির পরিচয়, যার অনুবাদ বর্তমান লেখার শুরুতেই দেয়া হয়েছে।
ইংল্যান্ডের এক উপকূলীয় শহরে মিলল আলম বেগ নামে সিপাহী বিদ্রোহের এক নেতার খুলি। খুলিটি একদিকে যেমন সিপাহী বিদ্রোহকে প্রতিনিধিত্ব করে, তেমনি একইভাবে তা সেই বিদ্রোহ দমন করে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয়কেও নির্দেশ করে। এককথায় খু
লিটি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশের ক্ষমতার একটি প্রতীক।
আলম বেগের খুলি আবার আরেকটি বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যার নাম সহিংসতা। আলম বেগকে কামানের মাথায় বেঁধে উড়িয়ে দেয়া কিংবা তার খুলিকে যুদ্ধের ট্রফি হিসেবে দেশে নিয়ে আসা ইংরেজদের সহিংসতার উন্মত্ত প্রকাশ। বিপরীতক্রমে নোটে আলম বেগের বিরুদ্ধে নারীদের প্রতি ‘বর্বর আচরণ’ ধর্ষণের ইঙ্গিত বহন করে।
১৯৬৩ সালে খুলিটি খুঁজে পাওয়ার পর স্থানীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন হয়েছিল। সঙ্গে পাবের সেই নতুন মালিক খুলির সাথে গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন একটি ছবিও ছাপা হয়েছিল। সেই মালিক একটা মাসকট হিসেবে খুলিটি তার পাবে সাজিয়ে রেখেছিলেন। মালিক মারা যাওয়ার পর তার আত্মীয়রা খুলিটি মানুষের চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে একটি কাপবোর্ডের আড়ালে লুকিয়ে রাখেন।
আলম বেগ নতুন করে ইতিহাসের পাতায় আবির্ভূত হলেন ২০১৪ সালে। কুইন মেরি, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ইম্পেরিয়াল ইতিহাসের শিক্ষক কিম এ. ওয়াগনার তার অফিসে বসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সহিংসতা নিয়ে লিখছিলেন, এমন সময় তিনি একটি মেইল পান। মেইলটি পাঠিয়েছিলেন এক দম্পতি (ডি ও জন), যারা একটি পুরনো খুলি নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন। বলা বাহুল্য, খুলিটি ছিল আলম বেগের। ইন্টারনেট ঘেঁটে আলম বেগকে নিয়ে কিছু না পেয়ে সেই দম্পতি কিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারণ তারা জেনেছিলেন যে, কিম সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে গবেষণা করেন। মেইল পেয়ে কিমের আগ্রহ জেগে উঠল, ‘কোনো সন্দেহ নেই, আমার আগ্রহ উসকে উঠল, কিন্তু আমি যে কী করব, সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আরো কয়েকবার যোগাযোগের পর আমরা একমত হলাম যে, আমি আরো গবেষণা করার নিমিত্তে খুলিটি তাদের কাছ থেকে নিয়ে আসব। সম্ভব হলে খুঁজে বের করব আলম বেগের ঠিকুজি। পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, খুলির গন্তব্য তাদের স্টোররুম না, আমার অফিসও না, সম্ভব হলে আলম বেগকে খুঁজতে তার দেশেই যেতে হবে, মানে ভারতবর্ষে। তাই নভেম্বরের এক ভেজা দিনে এসেক্সের এক ছোট্ট রেল স্টেশনে ব্যাগের মধ্যে একটা খুলিসমেত নিজেকে আবিষ্কার করলাম। খুলিটা যেনতেন কিছু নয়, বরং আমি যে ইতিহাস নিয়ে লিখি এবং প্রতি বছর আমার ছাত্রদের শেখাই, তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
১৫০ বছরের বেশি পুরনো, হাজার মাইল দূর দেশের একজন বিদ্রোহী সিপাহীর খুলি নিজের জিম্মায় নেয়াটা কিমের কাছে এক গুরুতর দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার মতো মনে হচ্ছিল। এরপর শুরু হলো তার আলম বেগকে খোঁজার অভিযান। কর্মযজ্ঞ শেষ করে সম্প্রতি তিনি আলম বেগকে নিয়ে একটি মোটাসোটা বই লিখেছেন— দ্য স্কাল অব আলম বেগ: দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব আ রেবেল অব ১৮৫৭। আলম বেগকে খুঁজতে যাওয়ার আগে আমারা শুনে নিই, কিমের মনে সেদিন কোন কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল, ‘তাকে (আলম বেগ) যেভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং ট্রফি হিসেবে তার মাথার খুলি সংগ্রহ করা হয়েছে, তা আলম বেগকে দানব হিসেবে দেখানোর প্রতীকী সহিংসতা। এ বইয়ে আমি ব্রিটিশ ভারতের এক নাটকীয় অধ্যায়ে নিহত হওয়া আলম বেগের গল্প বলতে চাই এবং এর মাধ্যমে তাকে কিছুটা মানবিকতা ও মর্যাদা দিতে চাই, যা থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
আলম বেগের খুলির সঙ্গে থাকা নোট থেকেই জানা যায়, তিনি ছিলেন বেঙ্গল নর্থ ইনফ্যান্ট্রির ৪৬ রেজিমেন্টের হাবিলদার। এটা সহজেই জানা যায়, ১৮৫৭ সালের ৯ জুলাই আজকের দিনের পাকিস্তানের শিয়ালকোটে অবস্থিত ক্যান্টনমেন্টে ৪৬ বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট (সংক্ষেপে বিএনআই) বিদ্রোহ করে। সিপাহী বিদ্রোহের এ অংশটি নিয়ে আলোচনা অপেক্ষাকৃত কম দেখা যায়। এ বিদ্রোহসংশ্লিষ্ট কোনো মূল দলিল, প্রতিবেদন, চিঠি, স্মৃতিকথা কোথাও আলম বেগের নাম উল্লেখ নেই। অন্যদিকে সে সময়ের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দলিল কিংবা সেনা নিয়োগের কাগজপত্রও আর টিকে নেই। বেঙ্গল নর্থ ইনফ্যান্ট্রির ৪৬ রেজিমেন্টের তিনজন নন-কমিশনড কর্মকর্তারই নাম পাওয়া যায়। কারণ তারা ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। বলাই বাহুল্য, এ তিনজনের মধ্যে আলম বেগ নেই। ৪৬ বিএনআই তৈরি হয়েছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরে। আলম বেগসহ এ রেজিমেন্টের অন্য সদস্যরা উত্তর প্রদেশেরই অধিবাসী। বেঙ্গল আর্মির জন্য প্রথাগতভাবে এ এলাকা থেকে সেনাসদস্য নিয়োগ করা হতো।
আলম বেগকে খুঁজে না পেয়ে কিম এবার ভিন্ন পথ ধরলেন। তিনি এবার নজর দিলেন কস্তেল্লোর দিকে, যিনি কিনা আলম বেগের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় উপস্থিত ছিলেন। কস্তেল্লোকে খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হয়নি। কিম মোটামুটি কস্তেল্লোর জীবনের একটি নকশা তৈরি করে ফেলতে পারলেন— পুরো নাম আর্থার রবার্ট জর্জ কস্তেল্লো। তার জন্ম ১৮৩২ সালে, আয়ারল্যান্ডের এক ভূস্বামী পরিবারে। এখানে উল্লেখ্য, কস্তেল্লো শিয়ালকোটে বিদ্রোহের মূল লড়াইয়ের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। কস্তেল্লো করাচিতে গিয়েছিলেন ১৮৫৮ সালের জানুয়ারিতে। মানে তখন শিয়ালকোটের লড়াইয়ের অবসান হয়েছে। সে বছর আগস্টে তিনি অবসর নেন এবং দুই মাস পর ভারতবর্ষ ছেড়ে সাউদাম্পটনে পা রাখেন। তথ্যগুলো আলম বেগের খুলির সঙ্গে থাকা নোটের ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করে। কারণ কস্তেল্লোর রেজিমেন্ট শিয়ালকোটে গিয়েছিল বিদ্রোহ হওয়ার অনেক পরে এবং বিদ্রোহী সিপাহীদের কামানে উড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে বিদ্রোহের চরম মুহূর্তে এবং সেটা অবশ্যই ১৮৫৭ সালে। তাই এবার কিমকে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করতে হলো।
কিম এবার অনলাইনে সে সময়কার পত্রিকার খোঁজ করলেন, যেখানে শিয়ালকোটের কথা কিছু পাওয়া যাবে। ভাগ্যদেবী এবার একটু হলেও মুখ তুললেন। ১৮৫৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বরের দ্য মর্নিং পোস্টে একটি আর্টিকেল পাওয়া গেল, যেখানে সে বছর ১০ জুলাই শিয়ালকোটে ৪৬ বিএনআইয়ের তিনজন বিদ্রোহী সেনাকে কামানের মাথায় উড়িয়ে দেয়ার প্রত্যক্ষ বিবরণ ছাপা হয়েছিল। এ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল সপ্তম ড্রাগন গার্ড। এবার রয়াল ড্রাগন গার্ড মিউজিয়ামে কিম তথ্য চেয়ে আবেদন করলেন। তারা একজন কর্মকর্তার ডায়েরির সন্ধান দিলেন, যিনি শিয়ালকোটে কস্তেল্লোর সঙ্গে ছিলেন এবং ডায়েরিতে কয়েক জায়গায় কস্তেল্লোর কথা উল্লেখও করা হয়েছে। ডায়েরির ১০ জুলাই ১৮৫৮ সালের ভুক্তিটি ছোট হলেও বর্তমান কাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ‘তিন সিপাহীর মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করলাম; এক নিমেষে গোলার আঘাতে তাদের শরীর হাজারো টুকরো হয়ে গেল।’ এবার প্রায় সন্দেহাতীতভাবে জানা গেল, কস্তেল্লো ৪৬ বিএনআই বিদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সময় অকুস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এবং ধারণা করাই যেতে পারে, সে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করা সিপাহীদের একজন ছিলেন আলম বেগ। এরপর কিম নিতান্ত কাকতালীয়ভাবে আরেকটি দলিল পেলেন ছবিসহ, যা পুরো বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তোলে। এটিও একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, ১৯১১ সালে সচিত্র দ্য স্পিয়ার পত্রিকায় ‘আ ঘাস্টলি মেমেন্তো— আ প্রোটেস্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি প্রদর্শনী নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল:
আমরা জানতে পেরেছি, ভারতীয় বিদ্রোহের এ ভয়ানক স্মারকটি মাত্র হোয়াইটহলের রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউশনের জাদুঘরে রাখা হয়েছে। এটা বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রির ৪৯ রেজিমেন্টের একজন সিপাহীর খুলি, যাকে আরো ১৮ জনের সঙ্গে ১৮৫৮ সালে গোলায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। আমরা দেখেছি যে, খুলিটি একটি সিগার বাক্সে রূপান্তর করা হয়েছে। ভারতীয় বিদ্রোহ একটি অতীত বিষয়। তার পরও আমরা সেই ভয়ানক সময়ের নিষ্ঠুরতাকে বুঝতে পারি— স্থানীয়দের ক্রূরতা ও তা দমনে নিষ্ঠুর পদ্ধতি। আমাদের প্রতিশোধের একটি স্মারক, যা এখন এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য করা হবে না, সেটা এমন মহান পাবলিক ইনস্টিটিউশনে প্রদর্শনী কি অপমানজনক বিষয় নয়? আমরা আশা করি, পার্লামেন্টে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হবে এবং ওয়ার অফিস বা ইন্ডিয়া অফিস, অর্থাৎ যাদের এখতিয়ার আছে, তারা স্মারকটি দ্রুত সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করার আদেশ দেবেন।
পত্রিকার প্রতিবেদন ও রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউশনের ক্যাটালগে পাওয়া গেল ৪৯ বিএনআই রেজিমেন্টের কথা। এটা ছিল ভুলে ইংরেজি 6 এর উল্টো ছাপা 9। খুলিটি নিঃসন্দেহে ১৮৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে ৪৬ বিএনআই রেজিমেন্টের উড়িয়ে দেয়া ১৮ জন সিপাহীর একজনের এবং স্মরণ করা যেতে পারে, এ বিচারের কথা ড্রাগন গার্ডের ডায়েরিতেও উল্লেখ আছে। প্রদর্শনীর এ খুলিটি কে সংগ্রহ করেছিলেন, সেটা জানা যায়নি, কিন্তু এটা জানা গেল, শিয়ালকোটের আরেকটি ওয়ার ট্রফি দুনিয়ায় আছে।
১৮৫৭ সালের ৯ জুলাই শিয়ালকোটে অবস্থিত ক্যান্টনমেন্টে ৪৬ বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে। সে রাতেই রেজিমেন্টের অন্যদের সঙ্গে আলম বেগ দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করেন। দিল্লি তখন সিপাহীদের দখলে, নামমাত্র মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের শাসক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আরো দক্ষিণে বান্দায় এক স্থানীয় নবাব নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সিপাহীরা জানিয়ে দেন: ‘খুলক্ খোদি কি, মুলক্ বাদশাহ কা, হুক্ম সুবাদার সিপাহী বাহাদুর কা’: ‘দুনিয়া খোদার; এই দেশ সম্রাটের আর শাসন সিপাহীদের।’ এ বিবৃতি বিদ্রোহের পেছনে সিপাহীদের ভাবনাটি প্রকাশ করে দেয়। সিপাহীরা ব্রিটিশদের পক্ষ হয়ে তাদের জন্য ভারত দখল করে দিয়েছিলেন, তারা ছিলেন ব্রিটিশদের ক্ষমতার হাতিয়ার। কিন্তু সিপাহীরা বুঝতে পারছিলেন, তারাই হচ্ছেন কিংমেকার। দিল্লি ও মিরাটের বিদ্রোহী সিপাহীরা বাহাদুর শাহ জাফরকে আনুষ্ঠানিক শাসক হিসেবে ঘোষণা করে একটি বৈধতা খুঁজতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে সিপাহীরা শক্তিশালী শাসকদের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলেন। যেমন কানপুরের নানা সাহেব, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মী বাঈ। ব্রিটিশরা আনুষ্ঠানিক শাসক হিসেবে আগমনের কিছু আগ থেকেই ভারতে কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর সেনাবাহিনী ছিল; এক রাজা অন্য রাজাকে পরাজিত করলে কখনো সেই পরাজিতের সেনাদের হত্যা করতেন না বা তাড়িয়ে দিতেন না। এভাবে সেনারা জীবিকা হিসেবেই বিভিন্ন শাসকের হয়ে লড়াই করত। ইংরেজদের গড়ে তোলা সেনাবাহিনী ছিল সে রকমই। কিম মনে করেন, ‘এক অর্থে শিয়ালকোটের বিদ্রোহ সেভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছিল না। বরং এটাকে বলা যায়, তারা কোম্পানির সঙ্গে তাদের চাকরির চুক্তিকে স্থগিত করেছিল। পরবর্তী লক্ষ্য ছিল স্থানীয় কোনো শাসকের রাজনৈতিক আশ্রয়, যিনি সিপাহীদের নেতৃত্ব ও মর্যাদা দেবেন। কারণ কোনো শাসকের আশ্রয় ছাড়া তারা কেবল একদল বিদ্রোহী সেনা ছাড়া আর কিছুই নন। নবম ও আলম বেগের ৪৬ রেজিমেন্ট শিয়ালকোট ক্যান্টনমেন্টের কোষখানা লুট করে, কোম্পানির সামরিক পোশাক ছুড়ে ফেলে যাত্রা করে। কোষাগারের সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্যান্টনমেন্টে থাকা অস্ত্র, থালাবাটিসহ সবকিছু লুট করেছিল। তবে লুটের অর্থ নিজেরা ভাগ করে নেয়নি, বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল টাকাপয়সা সব নিয়ে বাহাদুর শাহ জাফরের কাছে জমা দেয়া, যেখান থেকে সম্রাট তাদের নিয়োগ করে বেতন দিতে পারবেন। শিয়ালকোট থেকে দিল্লির দূরত্ব ছিল ৩০০ মাইলের বেশি। আলম বেগদের বাহিনীতে ঘোড়া, উট, ক্যারিজসহ শিয়ালকোটের অনেক সাধারণ মানুষও ছিল। এ দীর্ঘ লটবহর ধীরগতিতে দিল্লির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। বিদ্রোহ করার পরে সে রাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে তারা মাত্র ১২ মাইল সফর করেছিল। তিনদিন পর তারা রাভি নদীর তীরে পৌঁছেন, শিয়ালকোট থেকে যে স্থানের দূরত্ব ৫৬ মাইল। কিন্তু তাদের নদী পার হওয়া আটকে গেল। কারণ ব্রিটিশরা সেখানকার নৌকাগুলো ধ্বংস করে দিয়ে পাহারাদার বসিয়েছিল। ত্রিম্মু ঘাটের একটি স্থানে রাভি নদীতে একটি দ্বীপ আছে। আলম বেগরা প্রায় শুষ্ক নদী পাড়ি দিয়ে সেই দ্বীপে অবস্থান নিলেন। এ সময়ের মধ্যে আলম বেগরা পাজামা বা ধুতি পরে সাধারণ মানুষের বেশ ধরেছিলেন। ১২ জুলাই দুপুর নাগাদ সবাই দ্বীপে হাজির হলেন। এমন সময় অগ্রবর্তী স্কাউট এসে খবর দিল, গুরুদাসপুরের দিক থেকে একটি সশস্ত্র বাহিনী এদিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু বাহিনীটি কাদের, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন অশ্বারোহী সেনাকে দেখা গেল। এ বাহিনী ছিল কুখ্যাত নিকোলসনের দুর্ধর্ষ সেনাদল। আলম বেগের ৪৬ বিএনআইয়ে সেনা সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার আর সঙ্গে নবম রেজিমেন্টের আরো ২০০ সেনা। সব মিলিয়ে আলম বেগদের প্রশিক্ষিত সেনাদের একটি বড় সমাবেশ ছিল।
শিয়ালকোটে বিদ্রোহের খবর পেয়েই নিকোলসন প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেন। তার পরিকল্পনা ছিল শিয়ালকোট ও গুরুদাসপুরের মধ্যকার ৪০ মাইল রাস্তাকে নজরদারিতে আনা, যাতে শিয়ালকোটের বিদ্রোহীদের আটক করা যায়। প্রচণ্ড গরমে পথ চলাটা কঠিন ছিল। বেশকিছু ঘোড়া হিট স্ট্রোকে মারা যায়। কিন্তু জুলাইয়ের সেই তীব্র গরমেও ২১ ঘণ্টায় ৪২ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নিকোলসনের বাহিনী শিয়ালকোটের বিদ্রোহীদের আগেই গুরুদাসপুর পৌঁছে যায়। কোনো সন্দেহ নেই, এ যাত্রা ছিল কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু বিদ্রোহীদের শিক্ষা দিতে নিকোলসন ঝুঁকিটি নিয়েছিলেন এবং সময়মতোই তারা রাভি নদীর তীরে পৌঁছতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে নিকোলসনের সঙ্গে থাকা ৫২ রেজিমেন্টের ৬৫০ জনের মধ্যে মাত্র ২২০ জন উপস্থিত ছিল। নয়টি কামান মাঝে রেখে নিকোলসন তার সেনাদের এগোতে নির্দেশ দিলেন। ৫২ রেজিমেন্টের পিছিয়ে পড়া সদস্য ও পাঞ্জাব ইনফ্যান্ট্রিকে রাখা হলো রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে। খোলা মাঠ ধরে ব্রিটিশ সেনারা ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল। আলম বেগ ও তার সাথীদের পক্ষে লড়াই এড়ানোর আর কোনো উপায় ছিল না। অন্যদিকে দিল্লিতে ফেরার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। মাথা ঠাণ্ডা রেখে আলম বেগরা ব্রিটিশ সেনাদের তাদের ২৫০ গজের মধ্যে আসতে দিলেন। ৪৬ রেজিমেন্ট এবার অগ্রভাগে এসে গোলাগুলি শুরু করল। এ গোলাগুলি ২ থেকে ৩ মিনিট চলেছিল। আলম বেগদের কাছে তখন পুরনো মাসকেট, কিন্তু তা দিয়েই তারা ব্রিটিশদের যথেষ্ট ক্ষতি করতে পেরেছিল। এক ব্রিটিশ সেনা সে লড়াইয়ের বিবরণে বলেছিলেন, ‘তারা একটানা গুলি চালিয়েছিল। ৫ মিনিটে আমাদের বাহিনীতে ৪০ জন হতাহত হয়।’ সিপাহীদের প্রথম দফা আক্রমণের পর এবার নিকোলসনদের পাল্টা জবাব দেয়ার পালা। কামান এবং সদ্য পাওয়া এনফিল্ড রাইফেল দিয়ে ব্রিটিশরা আলম বেগদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে। এনফিল্ড রাইফেল তখন সদ্য ৫২ রেজিমেন্টকে দেয়া হয়েছে। সিপাহীরাও পাল্টা গুলি ছোড়া শুরু করে। নিকোলসন এতক্ষণ তার বিশ্বস্ত পশতুন দেহরক্ষীকে নিয়ে একটু পেছনে ছিলেন। এবার তিনি ময়দানে নামলেন। আলম বেগদের বিধ্বংসী লড়াইয়ের পেছনে ব্রিটিশরা একটি কারণ খুঁজে পেয়েছিল। তাদের মতে, সিপাহীরা ভাঙ খেয়ে লড়াইয়ে নেমেছিল, তাই তারা এমন বেপরোয়া হয়ে লড়াই করে। সিপাহীদের মধ্যে ভাঙ, গাঁজা ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও সকলে ভাঙ খেয়ে লড়াইয়ে নেমেছিল, এমনটা ভাবার কোনো যুক্তি নেই। বরং সিপাহীদের সামনে লড়াই ব্যতীত কোনো রাস্তা ছিল না, তাই তারা জান বাজি রেখে লড়বে, এ আর বিস্ময়ের কী!
মোটামুটি আধা ঘণ্টা গোলাগুলির পরে সিপাহীরা পিছু হটা শুরু করল। ৪৬ রেজিমেন্ট প্রায় পুরোপুরি খতম হয়ে গিয়েছিল। তবে তারা যে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিল, তা সে যুদ্ধে অংশ নেয়া অনেক ব্রিটিশ সেনা উল্লেখ করেছে। প্রথম দিনের লড়াই শেষ হতে হতে আলম বেগরা বিধ্বস্ত হয়ে গেল। দ্বীপের মাঝে শুষ্ক স্থানে রাতে আশ্রয় নিল। কেউ কেউ অস্ত্র আর পোশাক ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল। আহত সঙ্গীদের আর আনা সম্ভব হয়নি সিপাহীদের পক্ষে। অনেকে বুকসমান পানি কেটে নদী পার হয়ে ভেসে গিয়েছিল। ত্রিম্মু ঘাটের লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটল ১৬ জুলাই। পুরো দ্বীপ ব্রিটিশরা নিয়ন্ত্রণে নিল। সিপাহীদের মধ্যে যাদের পাওয়া গিয়েছিল, তাদের গুলি করে হত্যা করা হলো। আলম বেগসহ খুব অল্প কয়েকজন রাভি নদী পার হয়ে সে যাত্রায় ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
ত্রিম্মু ঘাটের লড়াইয়ের বছরখানেকের মাথায় আলম বেগকে আটক করা হয়েছিল মাধোপুর থেকে। সেখান থেকে তাকেসহ আটককৃত অন্যদের শিয়ালকোটে ফিরিয়ে নেয়া হয় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার জন্য। আটকের পর পরই তাকে ৪৬ বিএনআইয়ের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একজন ব্রিটিশ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণমতে, ‘একজন বন্দির পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং সে জানিয়েছিল, আঘাতটি সে পেয়েছিল ত্রিম্মু ঘাটের যুদ্ধে।’ অর্থাৎ ১২ মাস আগে নিকোলসনের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে আলম বেগ সেই পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। বন্দিদের মধ্যে সেই ৪৬ বিএনআইয়ের একজন হাবিলদারও ছিলেন, যিনি অপ্রত্যাশিতভাবে মুক্তি পেয়েছিলেন। একজন ব্রিটিশ অফিসার সেই হাবিলদারকে চিহ্নিত করেন বিদ্রোহের সময় তার স্ত্রীকে নিরাপদে পৌঁছে দেয়া একজন সিপাহী হিসেবে। তবে আলম বেগের মুক্তির কোনো সুযোগ ছিল না। একজন অফিসার, তা সে নন-কমিশনড হলেও বিদ্রোহের নেতা হিসেবে বিবেচিত, তাই তার মুক্তির কোনো উপায় নেই। হান্টার ও আরো কয়েকজনকে হত্যা করার অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। তবে কিম তার বইয়ে জানিয়েছেন, আলম বেগের বিরুদ্ধে ডা. গ্রাহাম ও রেভারেন্ড হান্টারকে হত্যা করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। এমনকি হান্টারের কন্যা বা স্ত্রীকে ধর্ষণ করার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, সেটাও সঠিক নয়। তিনি লিখেছেন, ‘শিয়ালকোটে কোনো ক্রুদ্ধ জনতা ছিল না, যারা ইউরোপীয় বেসামরিক নাগরিকদের ধাওয়া করেছিল। বিচ্ছিন্ন স্থানে থাকা সাহেবদের সিপাহীরা হেনস্থা করেছে, এমন খবরও নেই। মেমসাহেবদের ওপর যৌন সন্ত্রাস কিংবা লাশের অঙ্গহানির কোনো ঘটনাও সেখানে ঘটেনি। সিপাহী এবং স্থানীয়রা চাইলে অনেক শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধর্ষণ করতে পারত, কিন্তু সে রকম কিছু তারা করেনি। শিয়ালকোটের বিদ্রোহে নারী ও শিশু হিসেবে শুধু দুজন নিহত হয়েছিল— জেন হান্টার ও তার শিশুকন্যা।
লব্ধ প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও পারিপার্শ্বিক প্রামাণ্য বিবরণ ঘেঁটে কিম জানিয়েছেন, হান্টার ও গ্রাহাম দুজনই দুটি ভিন্ন পথে নিহত হয়েছিল। হান্টারের কন্যাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল, এমন কোনো প্রত্যক্ষ বিবরণ পাওয়া যায় না। কিম মনে করেন হান্টার, তার কন্যা ও নাতনিকে খুন করেছিল নবম বিএলসির অশ্বারোহী দল অথবা চাপরাশি হুরমাত খান। এছাড়া বিদ্রোহের দিন অর্থাৎ ৯ জুলাই ৪৬ বেঙ্গল নর্থ ইনফ্যান্ট্রি কাউকে হত্যা করেনি। অর্থাৎ আলম বেগ নির্দোষ।
আলম বেগকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করার ক্ষেত্রে কিম ওয়াগনার কি একটু বিশেষ জোর দিয়েছেন কিংবা তাড়াহুড়ো করেছেন? তার বইটি পড়তে গেলে সে রকমটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। শিয়ালকোট বিদ্রোহে ধারাবাহিকভাবে কী ঘটেছিল, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই। কিছু ছড়িয়ে থাকা বিবরণী একত্র করে কিম আলম বেগকে নির্দোষ ঘোষণা করছেন। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, আলম বেগকে সমসাময়িক কোনো বিবরণীতে নির্দোষ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়নি। কিম জানাচ্ছেন, ‘৯ জুলাই বিদ্রোহ শুরু হওয়ার সময় আলম বেগ ঠিক কোথায় অবস্থান করছিল, তা আমরা জানি না। এবং সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সে কী ভূমিকা পালন করছিল, তাও আমরা জানি না।’ তাই বলা যায়, এক রকম নিশ্চিত প্রমাণ ব্যতীতই কিম আলম বেগ ও তার রেজিমেন্টকে সব অভিযোগ থেকে মুক্তি দিচ্ছেন। একটি রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করার পর কাউকে হত্যা করেনি, এমন কথা বিশ্বাস করা কঠিন। কিম চাপরাশি হুরমাত খানের ওপর দোষ চাপিয়েছেন হান্টারের সঙ্গে তার শত্রুতার সূত্র ধরে। হুরমত খান হান্টার ও তার কন্যাকে হত্যা করেছিলেন, সেটা হতেই পারে। কিন্তু সেটা নিশ্চিত করে বলার মতো কোনো দলিল কিম খুঁজে পাননি, বরং ঘটনার বিবরণে আমাদের ‘হয়তো’ শব্দটিই ব্যবহার করতে হবে।
ক্যাপ্টেন কস্তেল্লো আলম বেগের মৃত্যুদণ্ডের সাক্ষী হওয়ার ঘটনার তিন মাস পর ভারত ত্যাগ করেন। ভারতের গরম আর কীটের আক্রমণে তিন মাসে মাংস পচে নিরেট খুলি হয়ে যাওয়াটা কঠিন নয়। আলম বেগের খুলিতে যে নোটটি পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায় ডাবলিনের কিলডেয়ার স্ট্রিট ক্লাবের জলছাপ। এ থেকে বোঝা যায়, ভারত থেকে আলম বেগের খুলি নিয়ে কস্তেল্লো আয়ারল্যান্ডেও গিয়েছিলেন। তবে খেয়াল করার বিষয়, নোটটিতে কস্তেল্লোকে তৃতীয় বচনে এবং সপ্তম ড্রাগন গার্ডের ‘সাবেক’ ক্যাপ্টেন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তার মানে ভারত থেকে ফিরে যাওয়ার পর খুব বেশি দিন কস্তেল্লো খুলিটিকে নিজের কাছে রাখেননি। কিমের অনুমানমতে, ১৮৬২ সালে বিয়ে করার পরই হয়তো কস্তেল্লো খুলিটি নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
যুদ্ধে পরাজিতদের খুলি সংগ্রহ, এমনকি খুলির পাহাড় তৈরি করার ইতিহাস বিরল নয়। মধ্যযুগে মধ্য এশিয়ার যোদ্ধাদের মধ্যে এ রীতি প্রচলিত ছিল। ভারতে মোগল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বাবর তার ভারত অভিযানে পরাজিতদের মাথা দিয়ে পাহাড় তৈরি করেছিলেন। ব্রিটিশরা আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের হত্যা করে তাদের খুলি ও শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যুদ্ধের ট্রফি হিসেবে সংগ্রহ করত। কস্তেল্লোও হয়তো বিজয়ের স্মারক, উপনিবেশে তাদের ক্ষমতার বিকারে আলম বেগের খুলিটি সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই। কারণ এ বিষয়ে প্রামাণ্য কোনো দলিল কিম উদ্ধার করতে পারেননি। তাই তিনি লিখেছেন, ‘এটা কোনোদিনই জানা সম্ভব হবে না, ঠিক কোন কারণে কস্তেল্লো আলম বেগের খুলি সংগ্রহ করেছিলেন।... তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, কস্তেল্লো কেবল খেয়ালের বশে খুলিটি সংগ্রহ করেননি। এটা কোনো নতুন ঘটনাও নয়। কস্তেল্লো নিশ্চয়ই তার সহকর্মী আইরিশ জন নিকোলসনের কথা জানতেন। এ নিকোলসন সহিংসতার নিত্যনতুন উপায় উদ্ভাবন করতেন। কস্তেল্লো নিশ্চয়ই এটাও জানতেন যে, নিকোলসন একটি ঘটনায় একজনকে হত্যা করে সেই মানুষের খুলি তার নিজের টেবিলে সাজিয়ে রেখেছিলেন।’
অন্যদিকে এটা জানা যায়, সিপাহী বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ সুভেনির হিসেবে ব্রিটিশ সেনারা সংগ্রহ করত। বিদ্রোহী নেতা তাতিয়া টোপিকে ফাঁসি দেয়ার পর উপস্থিত কর্মকর্তারা তার মরদেহ থেকে চুল কেটে নেয়ার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করেছিলেন।
কস্তেল্লো যখন আলম বেগের খুলি সংগ্রহ করেছিলেন, তখন ইউরোপে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য মানবখুলির চাহিদা ছিল। সে সময় ইউরোপে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপরাধী ও গরিবদের মরদেহের ওপরই এসব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করা হতো। খুলি সংগ্রহ করা অনেকের শখ বা পার্টটাইম কাজ হয়ে গিয়েছিল। তবে কস্তেল্লো আলম বেগের খুলিকে কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করেছিলেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
গল্পের শেষে যেকোনো পাঠকের মনে একটি ভাবনার উদয় হবে আর তা হলো, আলম বেগের খুলির শেষ গন্তব্য কী হবে? কিম এ. ওয়াগনার তার গ্রন্থের শেষে বিষয়টি নিয়ে তার মতামত তুলে ধরতে ভুলে যাননি। তার কথাগুলো এমন—
আলম বেগকে এমনভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, যেন তার ধর্মমতে শেষকৃত্য করা না যায়। আমার মনে হয়, রাভি নদীর একটি দ্বীপে অবস্থিত ব্যাটল অব ত্রিম্মু ঘাটের আজকের দিনের শান্তিপূর্ণ স্থানটি আলম বেগের খুলিকে সমাহিত করার উপযুক্ত স্থান। দ্বীপটি বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের একটি সীমান্ত নির্দেশ করে। শেষমেশ এটা নির্ধারণ করার আমি কেউ না, তবে যা-ই ঘটুক না কেন, আলম বেগের গল্পের শেষ অধ্যায়টি এখনো লেখা বাকি আছে।
That skull had a tongue in it, and could sing once:
how the knave jowls it to the ground, as if it were
Cain’s jaw-bone, that did the first murder!
-Shakespeare, Hamlet, Act 5, Scene 1.
আলম বেগের খুলি কোথায় সমাহিত হবে তা নির্ধারণ করা কিমের সাধ্যে নেই। তবে জন্মস্থানের বিবেচনায় আলম বেগের খুলি দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব বর্তায় ভারত সরকারের ওপর।






