বিশ্বময় কারুশিল্পের ভুবনে বয়নশিল্পের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই এই শিল্পের সূচনা। অঞ্চলভেদে, উপকরণের বৈচিত্র্য ও কৌশলগত জ্ঞানের ধারাবাহিকতায় সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে পৃথিবীব্যাপী বয়ন ঐতিহ্যের ইতিহাস, যা আজো আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ববাংলাই আজকের বাংলাদেশ। এ ভূখণ্ডে হাতেকাটা সুতায় হস্তচালিত তাঁতে তৈরি বস্ত্রের বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জিত হয়েছিল। কৌশলগত নিপুণতা, সূক্ষ্মতা, বয়নদক্ষতা ও নান্দনিক সৌন্দর্য আর গুণগত মানে এই বস্ত্র ছিল অতুলনীয়। এই কাপড়ই অতীতে মসলিন নামে বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।
এই মসলিনেরই একটি ধরন নকশাদার মসলিন বা জামদানি হিসেবে সুপরিচিত। অলঙ্কৃত মসলিনের এই ধারা সময়ের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে তার বহমানতা বজায় রেখেছিল। এই বয়নশিল্পের পরম্পরার চর্চা আজো আমাদের বয়ন ঐতিহ্যের গৌরব জামদানি বয়নশিল্পী সম্প্রদায় অব্যাহত রেখেছেন।
জামদানি বয়নশিল্পে এক বিস্ময়কর বয়নকৌশল যা শ্রুতি ও স্মৃতিনির্ভর। সবাই জানেন বয়নশিল্পে নকশা আবির্ভাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবিষ্কার ও উন্নয়নের ধারায় জালা, জ্যাকার্ড আর ডবির মতো সহযোগী যান্ত্রিক সব কৌশল, বয়নশিল্পীরাও বয়নের সময় এসব কৌশলের সাহায্যে ধীরে ধীরে কাপড়ের জমিনে নকশা ফুটিয়ে তোলেন। অথচ জামদানি বয়নশিল্পীরা নকশা সৃজনে এসব কৌশলের ওপর কখনই নির্ভর করেননি। বরং একবারে সহজ ও আদি গর্ত-তাঁতে (পিট লুমে) কাপড় বোনার সময় বয়নশিল্পীরা নকশা তৈরি করেছেন। এই অসামান্য বয়ননৈপুণ্যের নেপথ্যে রয়েছে বয়নশিল্পীদের প্রজন্মান্তরে অর্জিত নিরন্তর সূক্ষ্মতার অনুশীলন, স্মৃতি ও মেধার বিস্ময়কর ধারণক্ষমতা।
মূলত বাঁশ ও সামান্য কাঠের দণ্ডের সহায়তায় নির্মিত হয় এই তাঁত। এই সামান্য হস্তচালিত যন্ত্রে আমাদের বয়নশিল্পীরা রচনা করে চলেছেন বয়নশিল্পের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ, এক অনন্য বয়নকাব্য। জামদানি তাঁতে প্রচলিত কার্যকর নিয়মে দু’জন অসমবয়সী বয়নশিল্পী সমান্তরালভাবে বসে বোনার কাজ সম্পাদন করেন। এদের মধ্যে একজন হলেন ওস্তাদ কারিগর বা মাস্টার উইভার আর অন্যজন সাগরেদ কারিগর বা সহকারী— অভিজ্ঞ শিক্ষকের সাহচর্যে এই শিষ্যই হবেন আগামী দিনের পরিণত ওস্তাদ। প্রশিক্ষণরত সাগরেদ সেই বাসনায় পরম ধৈর্যে ওস্তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করে তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাপড় বুনে থাকেন।
জামদানি বয়নশিল্পে পৃথক দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশায় দক্ষ কর্মীরা কাজ করে থাকেন উপকরণের সঠিক প্রস্তুতি ও বয়নের প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রেখেই। সবার সম্মিলিত প্রয়াস শেষ হওয়ার পরই বোনার কাজ আরম্ভ করেন বয়নশিল্পী। কাপড় বোনা ও বুনন পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষ হলে বিপণন উদ্যোক্তা বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ব্যবহারকারী ক্রেতার আগ্রহকে তৃপ্ত করেন।
জামদানি বয়নশিল্পের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। একটি অত্যন্ত সাধারণ তাঁদের কৌশলগত কাঠামো এবং অন্যটি কাপড়ের জমিনে নকশার বয়ন পদ্ধতি ও মোটিফের আকৃতিগত নিজস্ব চারিত্রিক ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যের অনুসরণ। বৈচিত্র্যময় বয়নশিল্পে অলঙ্করণের কৌশল মূলত দুটি প্রক্রিয়ায় কার্যকর হয়ে থাকে। একটি টানার দিকে সুতার নিয়মমাফিক বিন্যাসে বয়নের মাধ্যমে মোটিফের দৃশ্যমানতা; আবার ভরনার সুতার গাঁথুনির মাধ্যমেও নকশাগুলো রচিত হয় কাপড়ের জমিনে। জামদানি বয়ন পদ্ধতিতে নকশার গাঁথুনি তৈরি হয় বোনার মাধ্যমে প্রধানত ভরনার সুতার প্রায়োগিক কৌশলকে নির্ভর করে। এই বিষয়টি জামদানি বস্ত্র তৈরির স্বকীয়তার একটি চিহ্নিত বৈশিষ্ট্য।
যদিও কখনো কখনো অন্যান্য বয়নরীতির কারুশিল্পীরা উভয় পদ্ধতিতেও একটি কাপড়ে জমিনে নকশা ফুটিয়ে তোলেন। নকশার আকৃতিগত এবং দৃশ্যগত কিছু বৈশিষ্ট্য ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘদিনের চর্চায় এক পরিবর্তিত স্বতন্ত্র ধারায় উপনীত হয়েছে। আজ সেই বৈশিষ্ট্যগুলোকে ভৌগোলিক বিশেষত্বে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
জামদানির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, জমিনের সুতার ঘনত্ব এবং সূক্ষ্মতার চেয়ে নকশায় ব্যবহূত সুতার সূক্ষ্মতা আনুপাতিকভাবে বেশি ও নকশার সুতার বয়নের ঘনত্বকে গুরুত্ব দেয়া। কাপড়ের মানভেদে নকশার সুতা জমিনের সুতার চেয়ে চার গুণ বেশিও হয়ে থাকে, যে কারণে নকশা তোলার পর শাড়ির জমিনে অলঙ্করণে ব্যবহূত মোটিফগুলোর উপস্থিতি খুবই জোরালো এবং দৃশ্যমানতায় অলঙ্করণে ব্যবহূত সুতার ঘনত্বে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট হয়ে থাকে। কৌশলগত কারণে জমিনের টানার সুতা ও ভরনার প্রতি ধাপে বোনা জমিনের সাধারণ সুতাও সহজে দেখা যায় না। এ কারণে অলঙ্করণে ব্যবহূত নকশাগুলোর উপস্থিতি নকশার আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যকে জোরালোভাবে দৃশ্যমান করে।
প্রায় ১০০ বা ২০০ বছরের পুরনো জামদানি এবং মসলিন মানের জামদানিগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, জমিনের স্বচ্ছতার তুলনায় জামদানির মোটিফের দৃশ্যগত অবস্থান, ভরাট এবং স্পষ্টতা অনেক বেশি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পুরনো মসলিন জামদানি কাপড়ের নিচে যদি প্রসারিতভাবে হাতকে রাখা হয়— তাহলে দেখা যাবে নকশার অংশটুকু ছাড়া বাকি জমিনের অংশে হাতের তালু ও আঙুল প্রায় দৃশ্যমান। বিষয়টির সহজ ব্যাখ্যা হলো, জামদানি বয়নশিল্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মোটিফের কৌশলগত বুননে উপকরণ (সুতা) ব্যবহারের আনুপাতিক তারতম্য। জমিনের স্বচ্ছতার কার্যকারিতা তৈরির কারণে কাপড়ে দৃশ্যমান অলঙ্করণে ব্যবহূত নকশাগুলো বোনার সময় অতিরিক্ত সুতার বয়ন ঘনত্বের কারণে সহজেই ফুটে ওঠে। জামদানি বস্ত্রের নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এটি একটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় যা বয়নশিল্পীরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।
আঠারো ও উনিশ শতকের জামদানি বয়নশিল্পে ব্যবহূত উপকরণ ছিল উচ্চমানসম্পন্ন তুলা থেকে হাতে কাটা মিহি মানের সুতা, সাম্প্রতিক সময়ে জামদানি বয়নের নিয়মিত চর্চায় যা একেবারেই অনুপস্থিত। সময়ের প্রেক্ষাপটে উপকরণের পরিবর্তন এবং বয়নশিল্পী সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় বয়নে নকশার সরলীকরণ ও সময়ের সাথে মজুরি ও ভোক্তার কাঙ্ক্ষিত মূল্যমানের সমন্বয় প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে একবিংশ শতাব্দীর জামদানি কাপড়গুলো পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই এসব অনুমান করা সম্ভব।
জামদানির আদি নকশা অর্থাৎ বিগত দীর্ঘ সময়ের সৃজনে সমৃদ্ধ নান্দনিক অলঙ্করণের মৌলিক ও যৌগিক মোটিফগুলো আমরা পুরনো জামদানি বস্ত্রসম্ভারে লক্ষ করি; এর প্রধান বৈশিষ্ট্য পাড়, আঁচল, বুটি, তেরছি, জাল ও কলকার সমন্বয়ে আনুপাতিক আয়তন, ধরন এবং অবস্থানের সামঞ্জস্য। সাম্প্রতিক সময়ে বোনা জামদানি বস্ত্রগুলোর অলঙ্করণ ও নকশা নির্ধারণের বিষয়ে পরিশীলিত নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রকাশ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
ইদানীং জামদানি শাড়ি তৈরির সময় কয়েকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বয়নশিল্পীরা বিবেচনা করে থাকেন, যা এই প্রকল্পের গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে।
প্রথমত, টানার সুতার কাউন্ট এবং ভরনার সুতার কাউন্ট— সুতা সচরাচর কাঙ্ক্ষিত মানের অনুপাতে ৮৪ থেকে ৬০ কাউন্ট পর্যন্ত ব্যবহূত হয়ে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুব কমসংখ্যক বয়নশিল্পীই ১০০ থেকে ১২০ কাউন্টের সুতায় জামদানি শাড়ি বোনার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। এখানে উল্লেখ প্রয়োজন, অতীতে বোনার সময় দু’দিকেই (টানা এবং ভরনা) হাতে কাটা সূক্ষ্ম সুতা ব্যবহার করা হতো। মিলের সুতা সহজলভ্য হওয়ার পর হাতে কাটা সুতার প্রচলন কমতে থাকে, যা আজ একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতায় খুবই সীমিত সংখ্যক বয়নশিল্পী ভারত থেকে সংগৃহীত অম্বর চরকায় কাটা কিছু সূক্ষ্ম সুতার কাজ করেছেন, যা প্রমাণ করে আজো আমাদের দেশের গৌরব জামদানি বয়নশিল্পীরা সূক্ষ্ম সুতায় জামদানি বস্ত্র তৈরিতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, শাড়ির জমিনে নকশাকে বয়নের মাধ্যমে প্রোথিত করা। সাধারণত জামদানি কাপড়ের চারিত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জমিনের সুতার ঘনত্বের অনুপাতে নকশায় অনেক বেশি সুতা ব্যবহারের কারণে জমাট ও স্ফীতভাব দেখা যায়। সাধারণত ৮৪ কাউন্ট – ১০০ মিলের সুতায় অথবা ৮৪ ৮৪ কাউন্টের সুতায় অথবা সিল্ক সুতি সুতার জামদানি বস্ত্রের জমিন বোনায় ব্যবহূত হয়ে থাকে। জমিনে নকশা বোনার সময় ৮৪ কাউন্ট সুতার ৪ থেকে ৬ গুণ, ৬০ কাউন্ট ৪, ৫, ৬, গুণ, ৫০ কাউন্টের ৪, ৫, ৬ গুণ, শেষতম ২০ কাউন্টের ৪ গুণ বেশি সুতা এক সাথে নিয়ে প্রতিবার নকশা বোনার সময় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
শাড়ির জমিনের সঙ্গে নকশা সুতার পার্থক্যে বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হওয়ার প্রধান কারণ দুটি— সূক্ষ্ম ও সুনিপুণ বয়নে বয়নশিল্পীর দক্ষতার অভাব, আর অনুপাতে শ্রমের প্রাপ্য মজুরির তারতম্য। জামদানি বয়নে প্রয়োজনীয় সময়কালের বিভিন্নতা কেবল নকশার জটিলতার কারণেই ঘটে থাকে না; নকশার পরিকল্পনা অনুযায়ী জামদানি বস্ত্রটি তৈরির প্রয়োজনীয় সময়ের পরিমাণ নকশায় ব্যবহূত সুতা কতটা মোটা বা মিহি তার ওপরও নির্ভর করে।
যেকোনো জামদানি কাপড় তৈরির পর তার মান নির্ভর করে সুতার কাউন্ট, শানার সংখ্যা এবং নকশার সুতা ও জমিনের সুতার আনুপাতিক পার্থক্য কতটুকু তার ওপর। নকশার জটিলতা ও নকশা স্থাপন কাপড়ের জমিনে মোটিফের ঘনত্ব ইত্যাদি বিষয়েও জামদানির মানদণ্ড নির্ণয়ের প্রচলিত নিয়ম। এছাড়াও রয়েছে রঙের সামঞ্জস্য, পাড়, আঁচল ও জমিন অলঙ্করণে নির্ধারিত নকশা ব্যবহারের সামঞ্জস্য ও অভিনবত্ব এবং জটিল জ্যামিতিক বিন্যাস ও মোটিফে মিনার বিস্তৃত ব্যবহার। বর্তমানে মিনার ব্যবহার নেই বললেই চলে। অথচ আদি নকশায় এটি অনেক বেশি বিদ্যমান ছিল।
জামদানি নকশা ধারণাগতভাবে জ্যামিতিক আঙ্গিকে পরিচিত। মূলত চরিত্রগত প্রতিটি বৈশিষ্ট্য ঐতিহ্যগত, সম্প্রদায়গত এবং অঞ্চলগত বয়নশিল্পে বিদ্যমান। বেনারসি শাড়ি ও তার বিন্যাস জামদানি নকশার সাথে একেবারেই মেলে না। জামদানি নকশায় বয়নশিল্পীরা অতীতে কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানত প্রকৃতিনির্ভর অনুপ্রেরণাকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। যেকোনো বিষয়বস্তুর আকার ও আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য শিক্ষায় মনোজগতের সৃজনশীল ভাবনার মধ্য দিয়ে নতুন চেহারায় উপনীত হয়। একটি সুনির্দিষ্ট ফুল, একটি সুনির্দিষ্ট লতা শ্রেষ্ঠ বয়নশিল্পী কোনো না কোনো দিন স্বপ্নের জগৎ থেকে বয়নের মাধ্যমে বাস্তবে দৃশ্যমান করে তোলেন। সময় ও চর্চার ধারাবাহিকতায় সেই লতা, পাতা ও ফুল নাম ধারণ করে। কালের প্রেক্ষাপটে যদি প্রচলনটি থেকে যায়, তখন তা ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। একই বিষয়বস্তু অবলম্বনে জামদানি নকশা, তাঁতিদের নিজস্ব গাণিতিক নিয়মে বয়নকৌশলের কারণে চেহারার বৈচিত্র্যও কখনো কখনো ইয়ারিং বুটি এর একটি উদাহরণ। পোনা পাড়ও বিভিন্ন রকমের রয়েছে, যা জামদানি শাড়ির পাড়ে বহুল ব্যবহূত। শাড়ির আঁচলে কলকার ব্যবহার জামদানি শাড়িতে দীর্ঘদিনের প্রথা ছিল। নান্দনিক সৌন্দর্য রচনায় কলকার উপস্থিতি শাড়িতে নকশার বিন্যাশে এক অপূর্ব মাত্রা তৈরি করত। দুঃখজনক হলেও সত্যি দীর্ঘদিনের চর্চার অমনোযোগিতায় সাম্প্রতিক সময়ের তাঁতিদের বয়নে কলকার নকশার নিপুণতা আর অবশিষ্ট নেই। সরলীকরণের সহজতম চিন্তার মধ্য দিয়ে এক সময়ের জামদানি কলকার দৃশ্যমান ও বয়ন কৌশলগত গাণিতিক জ্ঞানও প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। জামদানি নকশাগুলো অনেক সময় শব্দের মতোই অসংখ্য। বিভিন্ন তাঁতি একক নকশাগুলোকে (অর্থাৎ মোটিফ) একত্র করে অতীতে জামদানি নকশার বাক্য রচনা করে গেছেন। বর্তমানেও এই ধারা প্রচলিত রয়েছে। ওস্তাদ, গ্রাম ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একই নকশার ভিন্ন নামেরও প্রচলন রয়েছে। জামদানি তাঁতিদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কোনো আগ্রহ কখনই ছিল না; এজন্য জামদানি নকশার নামগুলো কে বা কারা, কখন থেকে প্রচলন করেছেন তা গবেষণার জন্য কোনো তথ্যসূত্র পাওয়া যায় না।
এই গ্রন্থে মূলত নকশা বৈচিত্র্যের বৈপরীত্য এবং প্রচলিত ও অপ্রচলিত নকশা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামীর গবেষণায় নিশ্চয়ই আরো অনেক আদি নকশা অন্তর্ভুক্ত হবে। জামদানি নকশার ধরন নির্ভরশীল প্রচলন ও নিপুণ মানসম্পন্ন বয়ন ঐতিহ্যের প্রতি বয়নশিল্পীদের আন্তরিকতার ওপর। যেকোনো ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পে নকশার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের শুদ্ধতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বয়নশিল্পী ও পৃষ্ঠপোষকদের ওপর বর্তায়। উপকরণ, রঙ, প্রায়োগিক কৌশলের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নয়, বরং পরিবর্তন ও চাহিদার উন্নয়ন এই যুক্তিতে তাকে সরলীকরণ করা যায় না।
অতীতে শাড়ি বোনা হতো প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো সুতায়। পরবর্তী সময়ে সহজলভ্যতা ও ব্যবহার প্রক্রিয়া সহজ বলে রাসায়নিক রঙ বয়নশিল্পীদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। বয়নশিল্পীদের অনাগ্রহে সময়ের ধারাবাহিকতায় প্রাকৃতিক রঙে জামদানি বস্ত্র তৈরির চর্চা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তবে এই ধারা আবারো ফিরে এসেছে। প্রাকৃতিক রঙের নবজাগরণের নেপথ্যে রয়েছে ঐতিহ্যের উন্নয়নে আন্তরিক কিছু প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা আর নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা।
অলঙ্করণের বিন্যাস, বয়নের ক্রমানুসারে প্রথমে আঁচল (অতীতে যা বোনা হতো ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত), তারপর জমিনের বিস্তৃত অংশ বোনার পর ভেতরের দিক অর্থাৎ শেষ প্রান্ত বোনা হতো। শেষ মুহূর্তে শাড়ির দৈর্ঘ্য দাঁড়াত ৭ হাত, ৮ হাত, সাড়ে ৯ হাত, সাড়ে ১০ হাত পর্যন্ত; এটা অতীতের জামদানি বস্ত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিটি শাড়িই আসলে ১২ হাত অর্থাৎ ৬ গজ দৈর্ঘ্যের বোনা হয়। ব্লাউজের পিস বলে কোনো কাপড় আদি শাড়িতে যুক্ত ছিল না; এর সংযোজন ঘটেছে গত ৩০ থেকে ৪০ বছরে। বর্তমানে জামদানি বয়নশিল্পীরা বোনার সময় প্রায় সবাই একই রীতি অনুসরণ করে থাকেন। প্রথম বোনা হয় গুড়ি (শুরুর দিক)— আধহাত থেকে এক হাত। তারপর পাড় বসানো হয় অর্থাৎ বোনা আরম্ভ হয় ১০ হাত পর্যন্ত। তারপর বোনা হয় আঁচল— দেড় হাত পরিমাণ। এরপর আঁচলের মাথায় বোনা হয় হাইসা— ৩ থেকে ৪ হাত পরিমাণ; এটা শেষ হলে আড়াই-তিন ইঞ্চির পাট্টা বোনা হয়। এরপর ১ ইঞ্চি ছিলাই বুনে শাড়ি বোনা শেষ করা হয়। গবেষণায় প্রতীয়মান, দীর্ঘদিনের ব্যবধানে শাড়ি বোনার পর্যায়ক্রমে বিপরীতধর্মী পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯ এবং ২০ শতকের প্রথম দিকে জামদানি কাপড়ের নিদর্শনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় সেই সময়কার বয়নশিল্পীরা আঁচল এবং ভেতরের দিক অর্থাৎ দু’দিকেই পাট্টা ও ছিলাই বুনতেন।
যুক্তি হয়তো ছিল যে, একটি শাড়ি সুনির্দিষ্ট আয়তনের পরিকল্পনায় রচিত বয়নসৌন্দর্যের সম্পূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করাই ছিল প্রথাগত মনোভাব। শাড়ির শেষ প্রান্তে শুধুমাত্র আঁচল বোনার পর তাঁত থেকে কেটে নেয়া অংশ পর্যন্ত ধারণাটি সম্পূর্ণ শাড়ির সামগ্রিক সৌন্দর্য হিসেবে বিবেচনা করার চর্চা ছিল না। বয়নশিল্পীরা যেকোনো জামদানি বস্ত্রখণ্ডকে একটা সম্পূর্ণ সৃজনশীল নির্মাণ হিসেবেই বিবেচনা করতেন।
অতীতে একজন বয়নশিল্পী একাধারে ছিলেন নকশাবিদ ও বয়নশিল্পী। রঙ, সুতার ধরন ও প্যাটার্নের ছন্দ রচিত হয়েছে সম্পূর্ণ তার একক সিদ্ধান্তে; যেখানে পৃষ্ঠপোষক, বিক্রেতা কিংবা ভোক্তার প্রভাব ছিল না বললেই চলে। ১০০ থেকে ২০০ বছর আগের জামদানি বস্ত্রবয়নশিল্প সূক্ষ্মতা, নিপুণতা সৌন্দর্য ও নান্দনিকতায় শ্রেষ্ঠতম বয়ন ঐশ্বর্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল আজো যা কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্ম হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। আমাদের মসলিন ও জামদানি বয়নশিল্প কিংবদন্তির গৌরব।
যদিও ইউরোপীয় বণিক, সম্ভ্রান্ত রাজপরিবার, মোগল সম্রাটের পারিষদবর্গ ও পরে নবাব ও রাজা এবং জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা সেই সময়ে বয়নশিল্পের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে কাজ করেছে। সূক্ষ্মতম, জটিল ও কৌশলগত এই বয়নশিল্পের চর্চাকে তারা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সময়োপযোগী পৃষ্ঠপোষকতায়।
নকশার ধরনে পুরনো ও সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে পরিবর্তনের বিষয়টি রচিত হয়ে গেছে প্রধানত মিলের তৈরি মোটা সুতায় নকশা বোনার প্রচলন এবং বয়নশিল্পীদের অবাধ স্বাধীনতা, ভোক্তার নিম্নগামী মূল্যমানের ধারণা এবং সব ধরনের ক্রেতাকে বিক্রয়মূল্যে সন্তুষ্ট করার বিপণন উদ্যোক্তাদের মনোভাব। এর সঙ্গে আরো যুক্ত হয়েছে প্রথা অনুসরণে শিক্ষা ও ঐতিহ্যগত জামদানি নকশার প্রতি ওস্তাদ কারিগরদের শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাসের অভাব। এখানে যদিও আরেকটি প্রধান বিষয়কে নেপথ্যের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। নিম্নগামী মূল্যমানের জামদানি বস্ত্রের চাহিদা— ভোক্তার কাঙ্ক্ষিত অথচ অযৌক্তিক ধারণাপ্রসূত মূল্য নির্ধারণ। যদিও সামঞ্জস্যহীন মূল্যমানের প্রতি আনুগত্য বিপণন উদ্যোক্তাদের বাণিজ্য প্রসারে প্রচলিত মনোভাবের বাস্তবতা। তা সত্ত্বেও বলতেই হয়, দক্ষ জামদানি বয়নশিল্পীরা বিভিন্ন সময়ে উচ্চমানসম্পন্ন শাড়িও তৈরি করছেন। এক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষক ও ভোক্তার অনুপ্রেরণা বয়নশিল্পীকে উচ্চমানসম্পন্ন বস্ত্র তৈরিতে উৎসাহ জুগিয়েছে— এ উদাহরণও রয়েছে। এ বিষয়ে বিপণন উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা প্রশংসার দাবি রাখে।
জামদানি বয়নশিল্পের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে— যা অন্যান্য বস্ত্রের বয়নশিল্পে সচরাচর দেখা যায় না। জামদানি বয়নে নকশার আকৃতি, ধরন, গঠন ও বয়নের সূক্ষ্মতা ও অলঙ্করণে ব্যবহূত নকশার বৈশিষ্ট্যসহ সামগ্রিক রচনাই স্মৃতিনির্ভর গাণিতিক নিয়মকে নির্ভর করে নির্মিত হয়। একটি বেনারসি শাড়িতে নকশার জন্য জ্যাকার্ড কৌশলে পাঞ্চকার্ড হয়ে থাকে ৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ পর্যন্ত। অথচ জামদানির শ্রেষ্ঠতম নিদর্শনগুলো তৈরিতে কারুশিল্পে কোনো কার্ডের সহায়তা প্রয়োজন হয়নি। নকশা তৈরির সম্পূর্ণ কৌশলগত পদ্ধতিই ছিল স্মৃতিনির্ভর। গাণিতিক বয়নকৌশল নকশা স্থাপনের ও আকৃতিগত বৈচিত্র্যকে অংকের নিয়মে স্মৃতিতে রেখে নির্ভুলভাবে ৬ গজ কাপড় বুনে শেষ করা এক কথায় অসাধারণ ও অবিশ্বাস্য। যেকোনো কাপড় বোনার জন্য বয়নশিল্পীদের ওস্তাদের কাছ থেকে দীর্ঘদিনের শিক্ষা প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে ধৈর্য ও গণনার মেধা, মনঃসংযোগ ও পেশার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের গুণাবলি অর্জন করা প্রয়োজন; এই বিশ্বাসের আর কোনো বিকল্প নেই। সময়ের পেক্ষাপটে ওস্তাদ-সাগরেদের প্রশিক্ষণকালীন সম্পর্ক, কাজের প্রতি মনোযোগ, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও ঐতিহ্যগত পেশায় নিয়োজিত থাকার জন্য বংশগত ধারাবাহিকতার প্রতি মনোভাবের পরিবর্তন এসেছে; এজন্যই জটিল নকশা বয়নে বয়নশিল্পীদের দীর্ঘসময়ের অনুশীলন ও ধৈর্যের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বয়নশিল্পীরা বর্তমানে সরল ও তুলনামূলক কম সময়ে বোনা যায় এমন নকশার প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন। বেশ কিছু জামদানি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এই পরিবর্তন সময়ের চলমানতায় গ্রহণযোগ্যও হয়েছে। যার কারণে জামদানির আদি নকশাকে সরলীকরণে রূপান্তর প্রক্রিয়া সাম্প্রতিক সময়ে বয়নশিল্পীদের অতিমাত্রায় প্রলুব্ধ করেছে; বর্তমানে অবশিষ্ট নকশা প্রত্যক্ষ করে। আদি নকশার রূপান্তরকে চিহ্নিত করে এ সময়ে বোনা জামদানি নকশার পার্থকক্যে সহজেই অনুধাবন করা যায়। ধীরে ধীরে সূক্ষ্মতা, নান্দনিক সৌন্দর্য, স্বকীয় আকার আকৃতি সব কিছুরই পরিবর্তন ও নতুনত্বে বিভ্রমে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান সময়ে বয়নশিল্পীরা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তা-প্রতিষ্ঠান ও বয়নশিল্পী সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত ডিজাইনার এবং ব্যক্তি পর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকদের নির্দেশনায় জামদানি বুনে চলেছেন। এতে লক্ষণীয় জামদানি নকশা ও অলঙ্করণের বিন্যাস এবং উপকরণের বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, তার সাথে রঙের ভারসাম্যহীন অবাধ প্রয়োগ— এসব পরিপ্রেক্ষিত সম্মিলিতভাবে জামদানির আদি নকশা ও বর্তমানে প্রচলিত নকশাবিষয়ের ঐতিহ্যগত ধারণা নিয়ে ভোক্তার মনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। সমস্ত পৃথিবীজুড়ে ঐহিত্য ও সংস্কৃতির নিজস্ব পরিচয়ের বয়নশিল্পের উদাহরণগুলো যুগ যুগ ধরে আজ অবধি সময়ের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়ে চলেছে; তবে কিছু কিছু সৃষ্টি আজ বিলীন হয়ে গেছে কারুশিল্পীর পরম্পরাগত পেশার প্রতি অনাগ্রহ, উপার্জনে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ও যথোপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। অর্থনৈতিক অবমূল্যায়নও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক বয়নশিল্পীই স্বকীয় নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হারিয়েছেন। অনেক শিল্পের নতুন রূপান্তরও ঘটেছে। অনেক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বয়নশিল্প নতুনভাবে পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতায় নবজাগরণের পথেও এগিয়ে গেছে। প্রতিটি বয়নশিল্প পরম্পরায় অনুসৃত রীতি ও নীতি চর্চা, নিয়ম আর অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকে তার নিজস্ব চারিত্রিক বিশিষ্টতায় ফুটে ওঠে। জামদানি বয়নশিল্পকৌশল, চারিত্রিক আকার ও আকৃতিগত নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের যোগফল। যদিও কোনো কোনো বয়নশিল্পী বা ডিজাইনার কিংবা বিপণন উদ্যোগী প্রতিষ্ঠান বাংলা অক্ষরমালা, প্রাণী, ব্যবহারিক সামগ্রী এবং মানুষের ছবিকে মোটিফ হিসাবে কল্পনা করে জামদানি বয়নকৌশলে, জামদানি বয়নশিল্পীদের দিয়ে তৈরির পরিকল্পনা করেন। পরবর্তী সময়ে নতুন জামদানির নকশার বয়ন নিদর্শন কোনো প্রদর্শনী কিংবা বিক্রয়কেন্দ্রে জামদানি কাপড় বলে পরিচয় দিতে পারবেন কি? সময়ের প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে জামদানি নকশার সত্যতা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।
আমদানি বয়নশিল্প বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্য, গৌরব আর সমৃদ্ধ বয়নশিল্পের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। এর কিংবদন্তিতুল্য বয়ন ঐতিহ্য বয়নশিল্পীদের যুগান্তরের চর্চার কষ্টার্জিত সম্পদ। অধিক বাণিজ্য, চাহিদা তাত্ক্ষণিক চমকের বিবেচনায় জামদানি নকশার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে যদি প্রত্যেকে পরিবর্তনের ধারায় নিমজ্জিত করেন প্রশ্ন অবশ্যই থেকে যাবে— আগামী ১০০ বছর পর বিভিন্ন রকম বৈচিত্র্যপূর্ণ নকশা, আদি নকশা, সাম্প্রতিক সময়ের প্রচলিত নকশা ও এই শতকের আগামী সময়ের জামদানি বলে চিহ্নিত নকশার পরিবর্তনের দূরত্ব ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কতটা দুঃখজনক হবে। কিংবা তার নিজস্ব বলে কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট থাকবে কিনা সে বিষয়ে আমাদের সংশয় রয়ে যাবে।
বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ নকশা আর জামদানি নকশার এই সংকলনে আদি ও বর্তমান সময়ের বেশ কিছু উদাহরণ মুদ্রিত হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্লেষণধর্মী কিছু উদাহরণও উপস্থাপন করা হয়েছে, অর্থাৎ কীভাবে নকশাকে পরিবর্তন না করে শুধু রঙ বৈচিত্র্য ও অলঙ্করণ বিন্যাসের প্যাটার্নে নতুন ধারণা ও জামদানি নকশার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর ফলে ওই পদ্ধতি একই সাথে বর্তমান সময়ের ভোক্তার আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত করতে সক্ষম এবং বিপণন উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক মূলধনকে নিরাপদভাবে লাভজনক করার নিশ্চয়তা দিতে পারে। সমাজের পক্ষে জামদানি বয়নশিল্পীদের সম্মানজনক আত্মপরিচয়ের গৌরব সম্পর্কে যেমন সচেতন হওয়া প্রয়োজন, আবার ভোক্তা ও ক্রেতাদের জন্য আমদানির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ফ্যাশনের তাত্ক্ষণিক ধারণার সাথে তুলনা না করে, জামদানির মর্যাদা ও আভিজাত্য অনুধাবন করাও আবশ্যক। ঐতিহ্য, পরম্পরা, সংস্কৃতির বিকাশ ও বর্তমান সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতার নিরিখে ভোক্তার মনোভাবের পরিবর্তনের বাস্তবতার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব কিংবা বিরোধ নেই। বস্তুত জামদানি নকশা বয়নশিল্পীদের দীর্ঘ অনুশীলনের ধারাবাহিকতায় এবং পৃষ্ঠপোষকদের সঠিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে অনাগত আগামীতেও বেঁচে থাকবে, এটা আমরা বিশ্বাস করি। বিপণন প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা, নকশাবিদ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অনন্য উৎসগুলোর সামগ্রিক বিশ্বাসকে সম্মিলিতভাবে আরো নিখাদ করা প্রয়োজন; আরো প্রয়োজন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আবহমান ধারার প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধাবোধ। এভাবেই ঐতিহ্যগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের শুদ্ধতম চর্চায় আমাদের শ্রেষ্ঠতম বয়নশিল্পের ভবিষ্যতের ইতিহাসকে আরো বেগবান করা সম্ভব হবে, এবং কিংবদন্তির জামদানি বয়নশিল্পের অনন্য সৌন্দর্যের পুনর্জাগরণ ঘটবে। আর সেটা সম্ভব হলেই কেবল জামদানির আসল ও অকৃত্রিম নকশাগুলো প্রবহমান হয়ে অমলিন সৌন্দর্যে চর্চিত হয়ে বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, জামদানি বয়নশিল্পীদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।






