অনুবাদ: মাহমুদ আলম সৈকত

‘তারপর...এখানকার হালচাল কেমন বলো।’

‘এখানে? কী বলব এখানকার কথা?’

আনোয়ারের জন্য প্রশ্নটা আসলে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। হয়তো সচেতনভাবে নয়, হয়তো অবচেতনেই সে ঠিক করে রেখেছিল যে, যা হয় হোক। এদিককার বিষয়আশয় নিয়ে ও অনুসন্ধিত্সু হলেও তেমন মাথা ঘামায় না। বরং এসব ব্যাপারে কথা উঠলেই সে ত্বরিত গতিতে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নেয়।

জাভেদ আবারো প্রশ্নটা করল। ‘এদিকে কী কী ঘটেছে?’

‘এদিকে?’ আনোয়ারের অবাক কণ্ঠে উত্তর, তারপর সে ভাবনায় ডুবে গেল। শেষে বলল, ‘বন্ধু, এখানে আসলে কিছুই ঘটেনি।’

‘কিছুই না?’

‘সত্যি বলছি! কিছুই ঘটেনি। তুই ওদিকে যা দেখেছিস, তার তুলনায় তেমন কিছুই এদিকে ঘটেনি।’

‘ঠিক বলছিস? আমরা তো ওখানে বসে বসে ভাবছিলাম যে, এখানেও কিছু না কিছু ঘটেছে।’

‘হ্যাঁ বন্ধু, সত্যি বলছি, কিছুই ঘটেনি।’ আনোয়ারের কণ্ঠে লজ্জা আর বিষাদের মিশেল।

‘কিন্তু ওদিকে তো একটা যুদ্ধই হয়ে গেল, তাই না?’

‘হুম, যুদ্ধটা হয়েছে।’ আনোয়ারের কণ্ঠটা দমে এসেছে।

কথোপকথনটা থমকে দাঁড়িয়েছে। আনোয়ারের নৈর্ব্যক্তিক উত্তরে আলাপচারিতার উৎসাহে ভাটা পড়েছে। জাভেদের জিজ্ঞাসাটা মামুলি ধরনের ছিল। কেননা সেই জিজ্ঞাসায় তেমন ব্যাগ্রতা ছিল না।

ফের মুখ খুলল আনোয়ার। ‘আসলে হয়েছে কি, এসব বাইরের কোনো শক্তির প্রভাবে ঘটেনি। যা ঘটেছে তা সবই উসকানির ফলে। আর উসকানি বাইরের কেউ দেয়নি, আমাদের আমাদেরই।’

জাভেদ গলা মেলাল, ‘ঠিক বলেছিস। বাইরের চাপে কিছু ঘটেনি। যা ঘটেছে সব নিজেদের মামলায়।’

আনোয়ারের কণ্ঠ এবার কিছুটা ঝাঁঝালো, ‘না, ব্যাপারটা অতটাও সহজ না। ওদিকে যা ঘটেছে, তার বেশির ভাগটাই বাইরের চাপে। বরং এদিকে যা যা ঘটেছে তা পরিষ্কারভাবেই নিজেদের তৈরি। যুদ্ধের পর যা সব ঘটল আর কি।’

‘তাই নাকি?’

‘আলবৎ’

‘কিন্তু ঠিক কী ঘটেছে বল তো?’

‘এই তো হরতাল, ধর্মঘট, মিছিল, প্রতিরোধ, ছাত্র আন্দোলন, ধরপাকড়...’

ওদের সামনের টেবিলে রাখা একটা ঝকঝকে ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাতে শুরু করল জাভেদ। সকাল থেকেই ওটা টেবিলে পড়েছিল, ওটা নেড়েচেড়ে দেখার মতো সময় যে সে পায়নি কিংবা ওটা দেখার আগ্রহও ছিল, ব্যাপারটা তেমন নয়। কিন্তু এখন, কী এক দুর্মর টানে ম্যাগাজিনটা তাকে টানল। ভেতরের পৃষ্ঠার ছবিগুলো বেশ মনে ধরল জাভেদের।

‘গৃহযুদ্ধের মতো একটা ব্যাপার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও হামলে পড়ল। ব্যারিকেড দেয়া হলো, চত্বরে স্টেনগান দাঁড় করিয়ে রাতভর গোলাগুলি চলল...’

‘এইটা ভালো।’ হাসিমাখা অভিব্যক্তি জাভেদের।

‘কী?’

‘না মানে এই কার্টুনটার কথা বলছি...’, বলেই আনোয়ারের দিকে ম্যাগাজিনটা এগিয়ে দিল।

অনেকটা অনাগ্রহ থেকেই কার্টুনটার দিকে তাকাল সে, তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘হুম, ভালোই।’ তারপর আবার সব চুপচাপ।&dquote;&dquote;

জাভেদ প্রস্তাব দিল, ‘চল বেরোই।’

‘ঠিক বলেছিস।’

‘ঘরে বসে থাকলে সারা রাত এইসব হাবিজাবিই চলতে থাকবে একের পর এক। আর কেউ যদি আড্ডা মারতে আসেও তাহলে দেখা যাবে সে-ও এই একই বিষয় নিয়ে খচখচ করবে। বন্দিদশার এ এক নতুন রকম।’ বলেই সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ভেতরের কামরার দিকে গলা উঁচিয়ে জানাল, ‘আনোয়ারের সঙ্গে বাইরে যাচ্ছি।’ বলেই পা বাড়াল জাভেদ।

‘দোস্ত, সিন্ধের দাঙ্গা বিষয়ে কিছু শুনেছিস?’ যেন আনোয়ারের হঠাৎই মনে পড়ল বিষয়টা এবং সে সম্পর্কে জাভেদকে জানানোটাও জরুরি বলে মনে হলো।

‘রেডিওর বুলেটিন শুনে তুই আসলে কিছুই জানতে পারবি না। ভয়াবহ ব্যাপার ঘটে গেছে বুঝলি। প্রচুর মানুষ মারা গেছে, ঘর ছাড়তে হয়েছে তার চেয়ে বেশি মানুষকে। লিয়াকত মার্কেটের কথা মনে আছে না? কত বড় মার্কেট ছিল, কিন্তু ওখানকার একজনও বেঁচে পালাতে...’

‘আচ্ছা বন্ধু, এই পেটের ওপর আর রানের ওপর চারকোনা কাগজ লাগানো কেন?’ চলতি পথে থেমে গেছে জাভেদ।

আনোয়ারকেও মাঝপথে কথা থামাতে হলো। জাভেদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি অনুসরণ করে সে দেখল, একটা সিনেমার পোস্টার, পোস্টারে অর্ধনগ্ন এক নর্তকী। নর্তকীর পেট আর রানের উন্মুক্ত অংশ চৌকো কাগজে সাঁটা। আনোয়ারের প্রতিদিনকার চলতি পথ এটা আর হররোজ ওটা চোখে পড়লেও ওর কখনো আগ্রহ জন্মায়নি।

‘ধুর। বাদ দে তো।’

হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছে আনোয়ার। জিজ্ঞেস করল, ‘আইসক্রিম খাবি?’

‘খেতে পারি।’

আইসক্রিম খেতে খেতে জাভেদের নজরে পড়ল এক যুবতী। হাল ফ্যাশনের, চওড়া ঘেরের জামা, চোখে ঢাউস গোল রোদচশমা। দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইস্তক মেয়েটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করল জাভেদ।

‘আনোয়ার বন্ধু, বেল-বটম যুগ তাহলে শেষ হয়ে গেছে আমি না থাকা অবস্থায়!’

‘শুধু বেল-বটমই না, চোঙ্গা প্যান্টের যুগও শেষ।’&dquote;&dquote;

‘হুম চোঙ্গা প্যান্ট-চোঙ্গা শার্ট...আচ্ছা বন্ধু তুই কিন্তু এখনো বললি না যে, এখানে কী ঘটেছে।’

‘তুই নিজেই দেখতে পাচ্ছিস কী ঘটেছে’, আইসক্রিমে কামড় বসাতে বসাতে আনোয়ারের উত্তর। ‘এখানে বেল-বটমের যুগ গিয়ে ঢোলাঢালার যুগ এসেছে।’

‘এইটা কিন্তু মামুলি কোনো ঘটনা না।’

‘না না, একদমই না। এইটা অনেক বড় ব্যাপার।’ আনোয়ারের কণ্ঠে একরাশ শ্লেষ। হাঁটা থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তো, এই অত্যন্ত বৃহৎ ঘটনায় তোর কী মতামত?’

‘দোস্ত, দেখ ওই মেয়ের পোশাক-আশাক নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নাই। সুতরাং এইটা নিয়ে বাদাবাদিও চাই না।’ বলার পর আইসক্রিমের কাঠিটা রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে যোগ করল, ‘আমরা কি এগোব?’

‘হ্যাঁ, চল।’

হাঁটতে লাগল ওরা।

আনোয়ারের অভিব্যক্তি থেকে গম্ভীর ভাবটা দ্রুত উবে গেল। কিন্তু জাভেদের এইসব মামুলি ছোট ছোট বিষয়ে জানার অপার আগ্রহ দেখে নিজেকে আটকাতে পারল না। জিজ্ঞেসই করে বসল, ‘তা এখন তো তুই এখানে, তোর প্রতিক্রিয়া শুনি?’

‘প্রতিক্রিয়া? আমার প্রতিক্রিয়া? মানে কী?’

‘মানে হচ্ছে, দীর্ঘসময় বন্দি অবস্থায় থাকার পর এই যে আবার ফিরে আসলি এখানে, কেমন লাগছে তোর?’

‘কী বলব, সত্যিই অদ্ভুত...’

‘কী হলো?’

‘ওই যে ছেলেটাকে দেখ...গোলাপি পায়জামা পরা, আর আমার যদি ভুল না হয় তাহলে পায়জামার কাপড়টা সিল্কের।’

‘তো?’

‘তো মানে এইখানে কোনো সমস্যা চোখে পড়ছে না তোর? আসলেই!’ বলেই একটু সময় চুপ জাভেদ, ফের বলল, ‘আজকালকার ছেলেপিলেরা কি এমন চটকদার রঙই পছন্দ করে? ওই তো অনেককেই দেখছি রঙদার সিল্কের পায়জামা-কোর্তা পরেছে।’

‘হুম আজকাল খুব পরছে ছেলেপিলেরা। আচ্ছা শোন, কড়াই-গোস্ত নাকি?’

‘কড়াই-গোস্ত?’

‘হ্যাঁ, রাতের খাবারের সময় তো হয়েই গেছে, বাসায় গিয়ে খাওয়ার কী দরকার? চল বাইরেই খেয়ে নিয়ে একটা লম্বা হাঁটা দিই।’

 

চরম ভিড়ভাট্টা তখন। রাস্তার দু’পাশেই মোটরগাড়িগুলো পার্ক করে রাখা। খাবারের দোকানগুলোর টেবিল-চেয়ার দোকান উজিয়ে ফুটপাতে চলে এসেছে, যার একটাও ফাঁকা পড়ে নেই। একটা বেশ ঢাউস আকারের খাসির ছবির নিচেই আস্ত খাসির রান ঝলসানো হচ্ছে। গনগনে চুলায় কাঠকয়লা পুড়ে যাওয়ার শব্দ।

‘দোস্ত, এখানে খুব ভিড়।’

‘চিন্তা নেই... কোনো চিন্তা নেই! এক্ষুনি খালি টেবিল পেয়ে যাব, দাঁড়া।’ বন্ধুকে আশ্বস্ত করেই আনোয়ার ইতিউতি চোখ বোলাতে লাগল। পেয়েও গেল, একেবারে রাস্তার ধার ঘেঁষে ফুটপাতে একটা খালি টেবিল দেখা যাচ্ছে। কাছেই একটা গাড়ি রাখা, দেখা গেল গাড়ির বনেতটা ছেলেছোকড়ারা বেশ টেবিল বানিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। দেখতে দেখতে জাভেদ বলল, ‘আচ্ছা, এটাও নিশ্চয় আমি যাওয়ার পরপর শুরু হয়েছে?’

‘কোনটা?’

‘কড়াই-গোস্তের ব্যবসা।’

‘বটেই, শহরে নতুন আমদানি।’

জাভেদ আরেকবার মনোনিবেশ করল পরিবেশটায়। মোটরগাড়ি, টেবিল, চেয়ার, খাবারদাবার, মানুষজন...‘আচ্ছা এ জায়গাটা তো বেশ নিরিবিলিই ছিল একসময়, তাই না?’ একটু থেমে যোগ করল, ‘আর অদ্ভুত ব্যাপারটা কী বুঝলি, সবাই শুধু টিকিয়া আর কড়াই-গোস্তই খাচ্ছে। টিকিয়া কাবাবের দোকান তো খুব একটা চোখে পড়ল না, আছে নাকি?’

আনোয়ার ঠিকঠাক শুনছিল না। তার মনোযোগ অন্যদিকে, তন্দুরের প্রতি। আনমনেই জবাব দিল, ‘অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আমাদের খাবারটা দিচ্ছে না কেন...’

জাভেদ এবারে বেশ সময় নিয়ে জায়গাটা চাখতে লাগল। জোয়ান-বুড়ো, ছেলে-মেয়ে, সুন্দরী তরুণী, কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক, পেট মোটা উকিল— সবাই গোগ্রাসে গিলছে। কাছের একটা টেবিলে পেটানো শরীরের এক যুবক ঘামতে ঘামতে সনির্বদ্ধ দৃষ্টিসমেত হামলে পড়ছে খাবারের ওপর। কাছের আরেকটা টেবিলে স্যুট-টাই পরা ভদ্রলোক, সঙ্গে দারুণ এক আবেদনময়ী, দুজনের মাঝখানে একটা খালি কড়াই। উদ্ভিন্ন যৌবনার প্লেটে মুরগির আস্ত একটা মাংসল ঠ্যাং, খুঁটে খুঁটে মাংস খাচ্ছে, কব্জির নিপুণ মোচড়ে ঠ্যাংটাকে দুই ভাগ করে বেশ আয়েশ করে হাড়টা চুষতে শুরু করেছে। যেদিকেই তাকাচ্ছে, টেবিলে টেবিলে কুতকুতে লোভী চোখ, বিশাল হা, হা-এর ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে মাংস। চিবানো আর চোষার শব্দে ডুবে আছে জায়গাটা। প্রতিটি টেবিলে প্রতিটি মুখাবয়বের একটিই চিত্র চোখে পড়ছে—  খাবারের ভারে ঝুলে পড়া চোয়াল। জাভেদের মনে হলো, চোয়ালের ঝুলে পড়াটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তার অবাক দশা একসময় আতঙ্কে পর্যবসিত হলো।

‘বন্ধু আনোয়ার, লোকজন আজকাল খুব খাচ্ছে তাই না?

 &dquote;&dquote;

আনোয়ারের কানে ঢুকলই না কথাটা। ওদের টেবিলে কড়াই-গোস্ত এসে পৌঁছেছে। ‘নে নে শুরু কর।’

খাবারের প্রথম গ্রাসটা মুখে দিতে দিতেই জাভেদের ভাবনায় এল, ‘আমার হা-ও ওদের মতোই বড়?’

‘কি রে খাচ্ছিস না কেন?’

‘না না, খাচ্ছি তো।’

‘উহু, খাচ্ছিস না। দেখ ভাই এইখানে অতি ভদ্রতা দেখানোর কিছু নাই। এইটা হলো কড়াই-গোস্ত, আর এইটা খেতে হয় ঠিক গুহামানবের মতো করে।’

আনোয়ারকে খুশি করার জন্য গোস্তে বেশ বড় বড় কয়েকটা কামড় বসাল জাভেদ। কিন্তু শেষে হাল ছেড়ে দিল। খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, খালেদের কী খবর? ওর সঙ্গে এখনো দেখাই হলো না।’

‘খালেদ?’ আরেকটা বিরাট হা-এর দ্বারপ্রান্তে এসে থেমে গেল আনোয়ারের হাত। ‘তুই কিছু জানিস না?’

‘না তো! কী ব্যাপার?’

আনোয়ার ঢোক গিলে নরম গলায় জবাব দিল, ‘খালেদ আর আমাদের মাঝে নাই, মারা গেছে।’

‘কী! খালেদও?’ তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেল জাভেদ। ‘হুম, গত দুই বছরে কতজনকে হারালাম আমরা!’

‘হ্যাঁ, গত দুই বছরে মানুষজন ঝটপট মরে গেছে।’

‘আর সবাই-ই মারা গেছে তাদের নিজ নিজ বিছানায়।’ জাভেদের কণ্ঠটা যেন ভেসে এল বহুদূর থেকে।

‘মানে? কী বলতে চাইছিস?’

‘ওদিকের লোকজন কত রকম ভাবে মরেছে। আমরা তো জানিও না কত রকমভাবে ওদের মৃত্যু ঘটেছে। অথচ স্বাভাবিকভাবে তো মানুষদের বিছানাতেই মরার কথা।’ একটু থেমে ফের বলল, ‘সেই জন্যই রশিদের মৃত্যুটা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক লেগেছে।’

‘রশিদ? রশিদ মারা গেছে? ও না রাজশাহী থাকত?’

‘থাকত কিন্তু শেষের দিকে রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছিল। আমার কাছেই উঠেছিল, অল্প কয়েকদিন ছিল...তারপর মারা গেল...বিছানাতেই মরে পড়েছিল।’

আনোয়ারের মুখাবয়বে বিষাদের ছায়া স্পষ্ট। ‘রশিদটাও মরে গেল!’

‘হুম। ওকে আমরা যতদূর সম্ভব নিয়মমাফিক দাফন-কাফন করিয়েছি। সম্ভবত রশিদের মৃত্যুর ঘটনাটি ওই দেশে সর্বশেষ স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর ঘটনা।’ তারপর নীরবতায় ডুবে গেল জাভেদ।

তারপর আর খাবারে মন বসল না কারোই। টুকটাক নেড়ে রেখে দিল। জাভেদ আবারো রেস্তোরাঁর ভেতর লোকজনের দিকে মন দিল। টেবিলের প্রায় সব মুখই বদলে গেছে। নতুন নতুন গ্রাহক এসেছে। টাটকা গরমাগরম কড়াই-গোস্ত টেবিলে টেবিলে। সেই ঝুলে পড়া চোয়াল, গোগ্রাসে গিলতে থাকা হা, কুতকুতে চোখ। আনোয়ারের দিকে ফিরে বলল, ‘তুই জানতে চেয়েছিলি না, আমার প্রতিক্রিয়া কী?’

‘হ্যাঁ’

‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যে সবকিছু বেশ বদলে গেছে। অস্বীকার করব না, সব দেখেশুনে ধাক্কামতো খেয়েছিলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি যে, কিছুই বদলায়নি। ফলে আবারো কেমন জট পাকানো লাগছে সবকিছু।’

‘তা এই দুই রকমের উপলব্ধির মধ্যে যোগাযোগটা কী রকম?’ যেন বেশ আমোদ পেয়েছে এমন কণ্ঠে জানতে চাইল আনোয়ার।

‘কোনো যোগাযোগই নাই। যা-ই হোক, কিছু মনে করিস না...বাদ দে।’ ঝটপট বিষয়ান্তরে গেল জাভেদ, ‘এখানকার অবস্থা বল।’

‘এখানকার বলার মতো কোনো অবস্থা নাই।’ আনোয়ার ঠিক করল এখন থেকে বাকিটা পথ আর কোনো কথার ফাঁদে সে পা দেবে না, কোনো গল্পগাছা খুলে বসার মতো ইচ্ছা নেই।

‘গতকাল কার সাথে যেন কথা বলছিলি?’

‘বলছিলাম নাকি? মনে পড়ছে না রে।’

‘ওই যে কে যেন গুলি খেল?’

‘ও...মির্জা’র কথা বলছিস...’

‘মির্জাও গুলি খেয়ে মরল? কে গুলি করল?’

‘একটা প্রতিবাদ সভায় গিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে। ভিড়ের মধ্যে।’

‘এইসব প্রতিবাদ সমাবেশের এই এক ফ্যাকরা। হাজার হাজার জড়ো হয়। তারপর কী হলো?’

‘রাস্তা পার হচ্ছিল...চার কদম গিয়েছে কি যায়নি, একটা গুলি এসে লাগল। ওখানেই মারা গেছে।’

‘কিন্তু গুলিটা চালাল কে, কেন?’

‘কেউ একজন...মানে...এই আর কি।’

‘আজব, আজব তো! তারপর?’

‘এইটুকুই’

‘তুই বলতে চাচ্ছিস এরপর আর কিছু নাই?’

‘না। নাই। এরপর আর কী ঘটতে পারে?’

‘একটা মানুষ গুলি খেয়ে মরে গেল, তুই বলছিস এরপর আর কিছু বলার মতো নাই, মানে ব্যাপারটা অদ্ভুত না?’

‘হয়তো তুই ঠিক বলছিস। এইভাবে আগে ভাবিনি।’

‘এইভাবে আগে ভাবিসনি!’ আনোয়ারের দিকে যুগপত্ভাবে ভয় আর বিস্ময় মেশানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জাভেদ।

‘হ্যাঁ বন্ধু।’ আনোয়ারের চোখে লজ্জার গাঢ় প্রলেপ, ধন্ধে পড়ে গেছে।

‘জাভেদ!

‘বল’

‘দেখ... ওদিকে নিশ্চয় তুই এ রকম বহু বহু ঘটনা দেখেছিস নিজের চোখে...তাই না?’ যেন শেষবারের মতো নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে চাইছে আনোয়ার।

জাভেদ ইতস্তত করল, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু আমরা অন্তত জানতাম যে কী ঘটছে... কেন ঘটছে।’

[ ইন্তিজার হুসেন— পাকিস্তানের অনন্য উর্দু সাহিত্যিক। অবিভক্ত ভারতের উত্তর প্রদেশের শহর দিবাইতে ১৯২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এ কথাশিল্পী। ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময় চলে যান পাকিস্তানে, থিতু হন লাহোরে। দেশভাগের রক্তঝরা ইতিহাস আর দুঃখ-যন্ত্রণা তাই তার রচনায় বারবার ফিরে এসেছে। তার গল্প-কবিতা-উপন্যাসে ঘরহারাদের কষ্ট, মৃত্যু, কঠিন বাস্তবতা পড়তে পড়তে পাঠক যখন বাকরুদ্ধ হয়, তখনই ইন্তিজার খুলে বসেন রূপকথার ডালি। সেই ডালি সেজে ওঠে রামায়ণ-মহাভারত-উপনিষদ-জাতককথা আর এক সহস্র এক রজনীর হাত ধরে, নতুন রূপে। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের জন্য ২০১৪ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সাহিত্য খেতাবে ভূষিত হন। ২০১৩ সালে ম্যানবুকার প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পান। উর্দু সাহিত্যের এ সফল কথাকারের জীবনাবসান ঘটে ২০১৬ সালে। অনূদিত ‘বন্দি’ গল্পটি তার ‘আছির’ গল্পের ভাষান্তর। গল্পটি নেয়া হয়েছে গল্প সংকলন কাছুয়ে থেকে। এটি ১৯৯৫ সালে লাহোরের সঙ্গ-এ-মিল প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশিত হয়। গল্পটি উর্দু থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন রাকসান্দা জলিল।]