অনুবাদ করতে গিয়ে কেউ এর নাম রেখেছেন ‘সাড়ে তিন হাত জমি’, কেউ বা রেখেছেন ‘কতটুকু জমি প্রয়োজন’—তবে যে নামই বলি না কেন, লেভ তলস্তয়ের Mnogo li cheloveku zemli nuzhno? নামের এ গল্প আমাদের বেশির ভাগ পাঠকের কাছে এসেছে সংক্ষিপ্তাকারে এবং অবশ্যই হিতোপদেশমূলক কাহিনী হিসেবে। গড়পড়তা পাঠক হিসেবে আমরা এবং আমাদের অভিভাবকরা গল্প-উপন্যাসে যে রকম নৈতিক বার্তা খুঁজে থাকি, আমাদের সন্তানদের যেমন নৈতিক-আদর্শিক পোশাক পরাতে চাই, সেসবই এ গল্পে রয়েছে বেশ লাগসইভাবে। যদিও গভীরভাবে দেখতে গেলে এটি কেবল একটি হিতোপদেশমূলক গল্প নয়, এটি একজন মানুষের জীবন পরিভ্রমণের গল্প, একজন লেখকের গভীরতর অভিজ্ঞানের গল্প, একটি সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্রান্তিকাল মানুষের মননে যে পরিবর্তন নিয়ে আসে তার গল্প। সংক্ষিপ্তাকারে পড়ার কারণে আমরা যেমনটি ভেবে থাকি যে, এ গল্পের কৃষক পাহোম একজন নিতান্তই লোভী মানুষ, বিষয়টি আসলে এত সরল উপসংহারের নয়। কেননা তলস্তয় তার এ নাতিদীর্ঘ গল্পটিতে (কেউ কেউ এটিকে উপন্যাসিকা হিসেবেও প্রকাশ করে থাকেন) চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের যে পাহোমের সামনে দাঁড় করান, তাকে তিনি নিজেও সরাসরি লোভী বলতে দ্বিধাবোধ করেছেন। যদিও এটি ঠিক যে, তিনি দেখিয়েছেন কী করে একজন মানুষ লোভের সিংহদ্বারে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু তার নিজের কাছে বোধকরি এটি শয়তানের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া এক কৃষকের গল্প—সেই কৃষকের, যে কিনা তার স্ত্রী ও স্ত্রীর বড় বোনের কথোপকথন শুনতে শুনতে ভেবেছিল, ‘আমার যদি যথেষ্ট জমি থাকত, তাহলে আমি শয়তানকেও পাত্তা দিতাম না।’ আর তার ওই চিন্তাটুকু বুঝতে পেরে শয়তানও নড়েচড়ে বসেছিল। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, পাহোম এ গল্পে একজন ভিকটিমও বটে—ভিকটিম সে শয়তানের, শয়তানরূপী সমাজের, সামাজিক মূল্যবোধের ও মানুষের প্রচল চিন্তাচেতনার।

তলস্তয় এ গল্প লিখেছিলেন ১৮৮৬ সালে—যখন তার বয়স ষাটের কাছাকাছি। বলা চলে, জীবনের পানপাত্রের পুরোটাই তিনি তত দিনে স্পর্শ করে ফেলেছেন। অভিজাত ও সামন্তবাদী চিন্তাচেতনার উত্তরাধিকার ছিলেন তিনি, একই সামাজিক-অর্থনৈতিক স্তরে ছিলেন তার স্ত্রী সোফিয়াও। কিন্তু তিনি যখন এ গল্প লিখছেন, তখন অনেক পরিবর্তন এসেছে তার চিন্তাচেতনা ও জীবনযাপনে—যার অভিঘাত পড়েছে তাদের সামাজিক ও দাম্পত্য জীবনেও; কিংবা অন্যভাবে বলতে গেলে, তাদের দাম্পত্য জীবনের অভিঘাতও তাকে ক্রমে ঠেলে দিয়েছে এই এক জীবনযাপনের দিকে। বিয়ের আগে তার যে জীবনযাপন, তা ছিল রুশ সমাজের আরো ১০ জন অভিজাত, ভূস্বামীর জীবনচিত্রেরই মতো। ‘সাড়ে তিন হাত জমি’র পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আছে রুশ সমাজের সেই সময়কাল, যা সৃষ্টি হয়েছিল ১৮৬১ সালের কৃষি সংস্কারের অভিঘাতে। রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের রাজত্বকালের এ বৈপ্লবিক কৃষি সংস্কার সেখানকার সাধারণ কৃষককে মুক্ত করে ভূমিদাসত্ব থেকে। এ গল্পের পাহোম সেই সংস্কারেরই ফসল, যে মুক্ত কৃষক বটে, অথচ কোনো জমিজমা নেই! যদিও ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই তলস্তয় তার মা-বাবাকে হারিয়েছিলেন, তার পরও তিনি মানুষ হয়েছিলেন অভিজাত শ্রেণীর মূল্যবোধের ছায়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া এবং সেনাবাহিনীর কর্মকর্তার চাকরি শেষ করে ইউরোপ ঘুরে তিনি ফিরে আসেন ইয়াস্নয়া পোলিয়ানায় তার জমিদারিতে। আর শিক্ষকতা শুরু করেন নিজেরই গড়ে তোলা স্কুলে। যেখানে শিক্ষা দেয়া হতো কৃষকের ছেলেমেয়েদের। ১৮৬২ সালে অর্থাৎ কৃষি সংস্কারের বছরখানেকের মধ্যে ৩৪ বছর বয়সে তার প্রথমে প্রেম ও পরে খুব দ্রুতই বিয়ে হয় সোফিয়ার সঙ্গে। তলস্তয় মনে করতেন, বেপরোয়া আবেগ ও বিশুদ্ধতার মধ্যে যে টানাপড়েন রয়েছে, বিয়ে তার অবসান ঘটায় যৌনক্ষুধাকে ভালোবাসায় রূপান্তরের ভেতর দিয়ে; মানুষ যে প্রচণ্ড কামতৃষার জন্য লজ্জাবোধ করে, বিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পথকে মসৃণ করে থাকে। কিন্তু বিয়ের রাতেই সোফিয়া জানতে পারেন, তলস্তয় তার সঙ্গে যা করছেন, মানে যে যৌনক্রিয়া করছেন, তা অনেক কৃষাণী ও বেশ্যার সঙ্গেও করেছেন। আর এ জানা তাদের দুজনের জীবনকেই নরককুণ্ডে পরিণত করে। পরে সারা জীবন বিশ্বস্ত থেকেও সেই নরককুণ্ড থেকে তলস্তয় আর বেরোতে পারেননি।

মস্কো শহরের দরিদ্রদের কদর্য জীবনের সঙ্গে তলস্তয়ের প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে ১৮৮২ সালে, একটি জরিপের কাজ করতে গিয়ে। মানুষের জীবন যে কত কষ্টকর, অসহায়, নির্দয় ও বীভৎস হতে পারে, তা তিনি উপলব্ধি করেন নিবিড়ভাবে। এভাবে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পাননি তিনি, আর তাই সে সময় রচনা করেন ‘আমাদের কী করতে হবে’ নামের একটি ছোট পুস্তিকা, যাতে কী করে এ দরিদ্রদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটতে পারে তার রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি। ১৮৮৩ সাল থেকে তার জীবনযাপনে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তিনি এ উপলব্ধিতে পৌঁছান যে সম্পত্তিই হচ্ছে সব রকমের সমস্যার মূল; আর তাই সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আর সংসারের দেখাশোনা করবেন না, জমিজমা আর লেখালেখি থেকে যে টাকা-পয়সা আসছে, সেসবের হিসাব-নিকাশের সঙ্গেও যুক্ত থাকবেন না। এ সময়ই তিনি চাষীদের মতো জামাকাপড় পরতে শুরু করেন, অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে তাদের সঙ্গে, বাড়ির কাজ থেকে চাকর-বাকরদের বাদ দিয়ে দেন তিনি, কাঠ কাটা, জল টানা আর জুতা বানানোর মতো কাজকর্ম থেকে ঘরদোরের নানা কাজ নিজেই করতে শুরু করেন। যা কিছু বাহুল্য মনে হতে থাকে, তা-ই বাদ দিতে শুরু করেন তিনি জীবন থেকে। শিকার করা বাদ দেন ১৮৮৪ সালে আর ১৮৮৬ সালে তিনি লেখেন এ বিখ্যাত গল্প—‘কতটুকু জমি প্রয়োজন’।

গল্পের যে শুরুটা আমরা দেখি, দুই বোনের যে কথোপকথন শুনি আর পাহোমের মনে তারই সূত্রে যে ভাবনা জেগে উঠতে দেখি, তাতে কিন্তু মনে হয় না, তাদের মধ্যে কোনো লোভ আছে। দরিদ্রতা, ভূমিহীনতা কিংবা গ্রামে পড়ে থাকা নিয়ে তার স্ত্রীর কোনো আক্ষেপ দেখি না, বরং বড় বোনের সঙ্গে কথা বলার সময় বেশ সরল ও আন্তরিক বিশ্বাস থেকেই তাকে বলতে শোনা যায়, আমাদের কাজটা ছোট। কিন্তু কারো কাছে আমাদের মাথাটা নোয়াতে হয় না। তোমরা শহরে আছো, সেখানে কিন্তু নানা নষ্টামি আছে। পাহোমকেও তেমনটাই ভাবতে দেখি আমরা, যদিও খানিকটা আক্ষেপও জাগতে দেখা যায়, পর্যাপ্ত জমিজমা নেই বলে, কিন্তু সেই সঙ্গে একটু গর্বের ছায়াও ফুটে উঠতে দেখা যায়, ছোটবেলা থেকে চাষার কাজ করলেও তাদের মধ্যে অন্তত কোনো বদখেয়াল নেই। তলস্তয়ের মুনশিয়ানা এখানেই যে শয়তানের ঘাড়ে দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে এই পাহোমকে এমন এক ব্যক্তিতে পরিণত করেন, যে জমিজমা বা সম্পদ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে চায় না। গল্প শুরু হলে এবং রুশ সমাজের ওই ইতিহাসগত পরিপ্রেক্ষিতটুকু জানা থাকলে অবশ্য আমাদের এটি বুঝতে তেমন কষ্ট হয় না যে, পাহোম সেই প্রজন্মের কৃষক, যারা কেবলই মুক্ত হয়েছে ভূমিদাসত্ব থেকে, খানিকটা জমিও কিনেছে কষ্ট করে এবং অন্বেষণ করছে আরো খানিকটা স্থিতিশীলতার। এটি খুব গভীরভাবে লক্ষ করার ব্যাপার, তলস্তয় কোনো লোভী, অভিজাত ব্যক্তির আরো নির্লজ্জ লোভী ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার গল্প শোনান না আমাদের; তিনি আমাদের শোনান সহায়-সম্বলহীন একজন মানুষের ক্রমে লোভী হয়ে ওঠার আখ্যান। আমরা দেখি, পাহোম যে পাড়াগাঁয় থাকে, তার কাছেই এক ধনী নারী থাকেন, যিনি আবার খুব দয়ালু! তিনি জমিজমা বিক্রি করে দেবেন বলে পাহোমদের পাড়া-প্রতিবেশীরা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কষ্ট করে হলেও যার যার মতো করে খানিকটা জমি কিনতে থাকে। পাহোমকেও দেখি বেশ কষ্ট করেই জমি কিনতে। তাদের স্বামী-স্ত্রীর কাছে ছিল মাত্র ১০০ রুবল। সংসারের একমাত্র ঘোড়াটা বিক্রি করে দিল তারা। ছেলেকে পাঠাল মজুর খাটতে, অগ্রিম টাকা নিয়ে। ৪০ একর জায়গা কিনল তারা, দাম শোধ করতে পারল মাত্র অর্ধেকটার। চুক্তি হলো, বাকি টাকা শোধ করে দেবে আগামী দুই বছরের মধ্যেই। কী আশ্চর্য, সত্যিই সে পরিশ্রম করে একসময় শোধ করে দিল বাকি টাকাগুলো।

এমন একটি কঠোর পরিশ্রমী সংসারের কর্তা পাহোম তাহলে অমন পরিণতির দিকে এগিয়ে গেল কী করে? তাকে এগোতে হলো, কেননা মুক্ত কৃষক হওয়ার মধ্য দিয়ে সে প্রবেশ করল একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আর বাজারের চাহিদা অস্থির করে তুলল তাকে। তলস্তয়ের মূল বার্তাটি আসলে লুকিয়ে রয়েছে এখানেই—মুক্ত হওয়ার পরও একজন ভূমিদাস আসলে মুক্ত থাকতে পারে না, সে নতুন এক দাসে পরিণত হয়—প্রতিযোগিতামূলক বাজারের দাসে। এ প্রক্রিয়ায় পুরনো সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটি আর থাকে না। যেমন আমরা দেখি পাহোমের ক্ষেত্রেও—দেখি তার শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে যাচ্ছে নিজের সম্প্রদায়ের ওপর থেকে, কেননা সে সহসাই উপলব্ধি করছে, তার প্রতিবেশীরাই তার প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় নতুন আরেকটি জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপনের ও নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার ঝুঁকি নিতেও দেখা যায় পাহোমকে। মুক্তবাজারের নিয়তি শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায় বস্কিরদের সর্দারের সামনে। দিন হিসেবে জমি কেনার এ নতুন আয়োজনে নামার আগে পাহোমকে আমরা একটি স্বপ্ন দেখতে দেখি। সর্দারকে হাসতে দেখার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের শুরু, আর শেষ নিজের মরদেহ দেখার ভেতর দিয়ে। আর সত্যিই পরদিন তার জমি চিহ্নিত করার পর মৃত্যু ঘটে। আপাতদৃষ্টিতে এই মৃত্যু হয়তো অতি লোভের, কিন্তু এর বার্তা আরো সুদূরপ্রসারী—অতি লোভের কোনো ব্যাপার স্যাপার নেই এখানে, আসল কথা হলো, সম্পদ কখনই তোমাকে স্বস্তিতে থাকতে দেবে না, সুখে তো আরো না—তা সে সামান্য হোক আর হোক অনেক অনেক একর।

 

ইমতিয়ার শামীম: কথাসাহিত্যিক