জাঁ পল সার্ত্র ১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর সুইডিশ প্রেসকে দেয়া এক বিবৃতিতে তাঁর সাহিত্যে নোবেল প্রত্যাখ্যানের কারণ ব্যাখ্যা করেন, যা পরে দুই দফা অনূদিত হয়ে প্রকাশ প্রায়। ফরাসি পত্রিকা ‘লা মঁদ’-এর পাতায় সার্ত্রের অনুমোদনে প্রথম ফরাসি অনুবাদটি ছাপা হয়। ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন রিচার্ড হাওয়ার্ড, যা ওই বছরের ডিসেম্বরেই ‘নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস’-এ ছাপা হয়। বণিক বার্তার পাঠকদের জন্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন বর্ণালী সাহা
আমি গভীর দুঃখের সঙ্গে বলছি যে, আমার নোবেলপ্রাপ্তি এক ধরনের লজ্জাজনক বিষয়ে পরিণত হয়েছে: আমাকে একটা পুরস্কার দেয়া হলো, আর আমি তা প্রত্যাখ্যান করলাম। পুরো ঘটনাটা ঘটার একটাই কারণ, যথেষ্ট সময় থাকতে আমাকে জানানো হয়নি যে কী হতে যাচ্ছে। অক্টোবরের ১৫ তারিখ ‘ফিগারো লিটারেয়ার’-এর সুইডিশ সংবাদদাতার কলামে আমি যখন পড়লাম যে, সুইডিশ একাডেমির পছন্দ আমার দিকেই ঝুঁকছে— যদিও তখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি— আমার মনে হলো যে, একাডেমি বরাবর একটি চিঠি লিখেই আমি বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে পারব আর এ নিয়ে কোনো বাড়তি আলাপও হবে না। চিঠিটা আমি পরদিনই পাঠাই।
সেই সময়ে আমার জানা ছিল না যে, প্রাপকের মতামত না-নিয়েই নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে। আমি ভেবে নিয়েছিলাম যে, ঘটনাটি ঘটার আশঙ্কা থাকলেও প্রতিকার করবার মতো যথেষ্ট সময় আছে। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি যে, সুইডিশ একাডেমি একবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়।
একাডেমির কাছে লেখা চিঠিতে আমি ব্যাখ্যা করেছি যে, আমার পুরস্কারটি ফিরিয়ে দেয়ার সঙ্গে সুইডিশ একাডেমি কিংবা খোদ নোবেল পুরস্কারের কোনো সম্পর্ক নেই। চিঠিতে আমি দুই ধরনের কারণের দিকে ইঙ্গিত করেছি: ব্যক্তিগত এবং নৈর্ব্যক্তিক।
ব্যক্তিগত কারণগুলো বলি: এ প্রত্যাখ্যান কোনো খামখেয়ালি পদক্ষেপ নয়; আমি সবসময় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বর্জন করেছি। ১৯৪৫-এ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমাকে ‘লিজিওন অব অনার’ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছিল, আমি তা ফিরিয়ে দিয়েছি, যদিও আমার সহানুভূতি ছিল সরকারের পক্ষে। একইভাবে বেশ কয়েকজন বন্ধুর পরামর্শ সত্ত্বেও আমি কখনো কলেজ দ্য ফ্রান্সে প্রবেশ করার প্রয়াস পাইনি।
আমার এ দৃষ্টিভঙ্গি লেখকবৃত্তির ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। একজন লেখক যিনি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাহিত্য-বিষয়ক ইস্যুতে কোনো অবস্থান নেন, তাঁকে নিজস্ব উপায়েই সক্রিয় হতে হবে, আর উপায়টা হচ্ছে লিখিত শব্দ। যেসব স্বীকৃতি তিনি গ্রহণ করবেন, সেসবই তাঁর পাঠককে একটি চাপের সম্মুখীন করবে, যা আমার কাছে একেবারেই কাঙ্ক্ষিত বলে মনে হয় না। নিজের নাম যদি আমি ‘জাঁ পল সার্ত্র’ লিখে সই করি, আর যদি ‘জাঁ পল সার্ত্র, নোবেলবিজেতা’ লিখে সই করি, দুটো স্বাক্ষর কখনই এক নয়।
যে লেখক এ ধরনের সম্মান গ্রহণ করে থাকেন, তিনি নিজের সঙ্গে সম্মানদাতা সমিতিটিকে বা প্রতিষ্ঠানটিকেও জড়িত করে ফেলেন। ভেনিজুয়েলার বিপ্লবীদের প্রতি আমার সহানুভূতি শুধু আমাকেই দায়বদ্ধ করে; অন্যদিকে যদি নোবেলজয়ী জাঁ পল সার্ত্র ভেনিজুয়েলান আন্দোলনকে সমর্থন করে, সমগ্র ‘নোবেল’ একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই সমর্থনের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে পড়ে।
অতএব একজন লেখকের নিজে একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাওয়াকে ঠেকাতে হবে, যদিওবা তা সবচেয়ে সম্মানজনক অবস্থার মধ্যে ঘটে, আমার ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে।
অবশ্যই এ দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি আমার, এবং পূর্ববর্তী বিজয়ীদের প্রতি কোনো ধরনের সমালোচনার উদ্দেশ্য এতে নেই। বেশ কয়েকজন নোবেলজয়ীর সঙ্গে পরিচয়ের সৌভাগ্য আমার হয়েছে, এবং তাঁদের জন্য আমার রয়েছে যারপরনাই সম্মান ও মুগ্ধতা।
আমার নৈর্ব্যক্তিক কারণগুলো হচ্ছে এই: সংস্কৃতির ময়দানে আজ শুধু একটাই যুদ্ধ সম্ভব, এবং তা হচ্ছে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির— অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতির— শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যুদ্ধ। আমি বলতে চাইছি না যে, তাদের একে অন্যতে অন্তর্লীন হয়ে যেতে হবে; আমি জানি যে, এই দুই সংস্কৃতির মোকাবেলা অপরিহার্যভাবেই সংঘাতের রূপ নেবে; কিন্তু এ মোকাবেলা অবশ্যই ঘটতে হবে মানুষে মানুষে এবং সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ ছাড়াই।
আমি নিজেও এই দুই সংস্কৃতির অসঙ্গতি দ্বারা গভীরভাবে বিচলিত: এই রকম সব অসঙ্গতি দিয়েই আসলে আমি তৈরি। নিঃসন্দেহে আমার সমর্থন যায় সমাজতন্ত্রের দিকে— যেটাকে ইস্টার্ন ব্লক ডাকা হয়ে থাকে, কিন্তু আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা একটা বুর্জোয়া পরিবারে এবং একটা বুর্জোয়া সংস্কৃতিতে। এটা আমাকে তাঁদের সহযোগী হয়ে কাজ করিয়ে নেয়, যাঁরা কিনা এ দুই সংস্কৃতিকে কাছাকাছি নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় রত আছেন। তা সত্ত্বেও আমি অবশ্যই আশা করি যে, ‘যোগ্যতরই জয়ী হবে’। আর যোগ্যতর এখানে সমাজতন্ত্র।
আর এ কারণেই সাংস্কৃতিক কর্তাব্যক্তিদের দ্বারা প্রদত্ত একটা সম্মান আমি গ্রহণ করতে পারি না— পশ্চিমেরটা যেমন পারি না, পুবেরটাও তেমনি পারি না— যদিও এদের অস্তিত্বের প্রতি আমি সহানুভূতিশীল। যদিও আমার সব সমর্থন সমাজতন্ত্রের পক্ষে। আমি একইভাবে লেনিন পুরস্কার গ্রহণে অক্ষম হব, কেউ যদি আমাকে তা দিতে চায়, যদিও তেমনটা ঘটেনি।
আমি জানি যে, নোবেল পুরস্কার আলাদা করে পশ্চিমা জোটের নিজস্ব কোনো সাহিত্য পুরস্কার নয়, কিন্তু এখন নোবেলের মানে এ দাঁড়িয়েছে; আর এমন অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে, যা সুইডিশ একাডেমির সদস্যদের গণ্ডির বাইরে। এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিতে নোবেল পুরস্কার বলতে বস্তুত পশ্চিমের লেখকদের আর পুবের বিদ্রোহীদের জন্য সংরক্ষিত একটি সম্মানকে বোঝায়। যেমন— নেরুদাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়নি, যদিও তিনি দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় কবিদের একজন। ল্যুই আরাগোঁ কখনো সিরিয়াস বিবেচনায় আসেননি, যদিও তিনি অবশ্যই এ পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। দুঃখজনক হলো, পাস্তেরনাককে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে, শোলোকভকে নয়, এবং এর ফলে নোবেল সম্মানপ্রাপ্ত একমাত্র সোভিয়েত সাহিত্যকর্মটি বাইরের দেশে ছাপা হবে আর নিজ দেশে নিষিদ্ধ হয়ে রইবে। বিপরীত দিকেও অনুরূপ পদক্ষেপ নিলে এক ধরনের ভারসাম্য এলেও আসতে পারত। আলজেরিয়ার যুদ্ধের সময় যখন আমরা ‘১২১-এর ঘোষণা’তে সই করেছিলাম, তখন আমাকে নোবেল পুরস্কারটি দিলে আমি কৃতজ্ঞচিত্তে তা গ্রহণ করতাম, কারণ তাতে শুধু আমিই সম্মানিত হতাম না, বরং যে স্বাধীনতার জন্য আমরা যুদ্ধ করছিলাম, সেটাও সম্মানিত হতো। কিন্তু পরিস্থিতি তেমন হয়নি, এবং পুরস্কারটি আমাকে দেয়া হলো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে।
সুইডিশ একাডেমির অভিপ্রায় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বাধীনতার প্রসঙ্গও এসেছে। স্বাধীনতা এমন একটি শব্দ, যার বহু অভিধা হতে পারে। পশ্চিমে এ শব্দ দ্বারা শুধু সাধারণ স্বাধীনতার কথাই বোঝানো হয়ে থাকে: ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, পূর্ণতর স্বাধীনতার ভেতর থাকে পেট পুরে খাওয়ার অধিকার, আর এক জোড়ার বেশি জুতার মালিক হওয়ার অধিকার। পুরস্কারটি গ্রহণ করার চেয়ে প্রত্যাখ্যান করাই আমার কাছে কম বিপজ্জনক মনে হচ্ছে। যদি এটা আমি গ্রহণ করি— তার মানে আমি নিজেকে এমন একটা কিছুর সুযোগ দিচ্ছি, যেটাকে আমি একটা ‘উদ্দেশ্যমূলক পুনর্বাসন’ বলি। ফিগারো লিটারেয়ার পত্রিকার যে প্রবন্ধের কথা শুরুতে বলেছি, সেখানে বলা হয়েছে, ‘সার্ত্রের রাজনৈতিক অতীত, যা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, তা নিয়ে আর কোনো কথা উঠবে না’। আমি জানি, এ প্রবন্ধের বক্তব্যই একাডেমির বক্তব্য নয়, কিন্তু কিছু ডানপন্থী মহলে আমার এ পুরস্কার গ্রহণকে কী চোখে দেখা হবে, তা এ বক্তব্যে পরিষ্কার। আমার এ ‘বিতর্কিত রাজনৈতিক অতীত’কে আমি এখনো যুক্তিযুক্ত মনে করি, যদিও কিছু পুরনো ভুলত্রুটি আমার সহযোদ্ধাদের কাছে স্বীকার করে নিতে আমি প্রস্তুত।
এখানে আমি এটি বোঝাতে চাইছি না যে, নোবেল পুরস্কার একটা বুর্জোয়া পুরস্কার, কিন্তু কিছু গোষ্ঠী নিশ্চিতভাবেই এর এমন একটা বুর্জোয়া অর্থ দাঁড় করাবে, যা আমার ভালোই জানা আছে।
সবশেষে, টাকার প্রশ্নে আসি: বিজয়ীকে দেয়া সম্মানের পাশাপাশি এক সুবিশাল অংকের টাকা যোগ করে একাডেমি ওই ব্যক্তির ওপর একটা ভীষণ ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়। এ সমস্যা আমাকে পীড়িত করেছে। হয় ব্যক্তি পুরস্কারটি গ্রহণ করবেন আর নিজে যেসব সংস্থা বা আন্দোলনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, ওই টাকা দিয়ে সেগুলোয় অবদান রাখবেন (আমার নিজের মনে হয়েছিল লন্ডনভিত্তিক অ্যাপার্টহিড কমিটির কথা), নতুবা কোনো মহত্তর নীতির কারণে পুরস্কারটি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাবে, এবং ফলত এমন কোনো আন্দোলনকে বঞ্চিত করবে, যেখানে প্রবলভাবে আর্থিক সহায়তা দরকার। কিন্তু আমি মনে করি, এটা একটা ভুয়া সমস্যা। স্পষ্টতই আমি এই ২ লাখ ৫০ হাজার ক্রাউন প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ পূর্বে হোক কি পশ্চিমে, প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু ২ লাখ ৫০ হাজার ক্রাউনের বিনিময়ে কাউকে এমন সব নীতি বিসর্জন দিতে বলা যেতে পারে না, যেসব নীতি শুধু ব্যক্তির নিজেরই নয়, তার সহযোদ্ধাদেরও।
এ কারণে পুরস্কার পাওয়া এবং এর প্রত্যাখ্যান, দুটোই আমার জন্য এত কষ্টকর হলো। প্রত্যাখ্যান, যা আমাকে করতেই হচ্ছে।
সুইডেনের মানুষের প্রতি সহমর্মিতার বার্তা দিয়ে এ ঘোষণাটি আমি শেষ করতে চাই।





