আমার স্বীয় কোনো যানবাহন নাই। শহর ঢাকার যেই এলাকায় এক্ষণে বসতি, সেইখান হইতে কর্মস্থানে যাইতে কয়েক দফায় বাহন বদলাইতে হয়। সেই হেতু বাসে বসিয়া কিতাব পড়িবার পুরনো অভ্যাস ত্যাগ করিতে হইয়াছে। কিন্তু খ্রিস্টীয় একুশ শতকের অষ্টাদশ সনে এমন কয়েকখানি পুস্তক হস্তগত হইয়াছে, যেইগুলি পাঠ না করিয়া থাকিতে পারিতেছি না। সেই দিন এমনই একটি দিন ছিল। পাঠে পাঠে ঘোর লাগিয়া গিয়াছিল। তারই মধ্যে কোন কালে যে গন্তব্যের কাছে আসিয়া গিয়াছি, আঁচ করিতে পারি নাই। তড়িঘড়ি করিয়া বাস হইতে নামিয়া রিকশা নিতে যাইব। রিকশার স্থলে মাঝবয়সী একজন প্রচারপত্র বিলি করিতেছেন। একে একে সমস্ত রিকশাচালককে দিলেন। অথচ আমাকে পাশ কাটাইয়া চলিয়া গেলেন। অগত্যা আমি যেই রিকশাখানিতে চড়িয়া বসিয়াছি, সেই চালকের কাছ হইতে প্রচারপত্রটি হস্তে নিলাম। শ্রমিক সপ্তাহ উদযাপন করিতেছে কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ— সিপিবি। অতএব শ্রমিকদের মাঝে অধিকার-বিষয়ক প্রচারপত্র বিতরণ কর্তব্য বলিয়া মানিয়া নিয়াছে তাহারা। বহুকাল হইতেই বাম রাজনৈতিক সংগঠনগুলি এই কাজ করিয়া আসিতেছে। নরম বাম সিপিবি অদ্য এইসব নিয়াই বর্তমান। গরম বাম যাহারা, তাহারা কিন্তু আজিও মাঠঘাট গরম করিবার জন্য লাগিয়াই আছে। তাহাদের কথা মনে পড়িতেই মনে পড়িল সদ্য পঠিত আফসান চৌধুরী রচিত এক পুস্তকের কথা। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার নামে একাত্তর-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বহারা, চরমপন্থার যেই রাজনীতি, যেই হঠকারিতা, যেই আত্মঘাত— সেই লইয়া কাহিনী ফাঁদিয়াছেন আফসান।
বিশ শতকের সূচনা হইতে পঞ্চাশ সন পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বাস্তবিক ধারায় ছিল। তারপর তাহাতে মিশে কল্পনা, বিমূর্ত, রোমাঞ্চ— নানাবিধ উপাদান-উপকরণ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশকে সেই ঝাপটা লাগিয়াছিল পৃথিবীব্যাপী। লাতিন আমেরিকায় চে গুয়েভারার প্রাণদান সেই অগ্নিতে ঘৃতাহুতি হিসেবে কাজ করিয়াছিল। দলে দলে তরুণেরা লাল পতাকার মিছিলে শামিল হইয়া যায়। ‘বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস’, ‘লাঙল যার জমি তার’, ‘দেশের মুক্তির পর মানুষের মুক্তি’— এইসব তত্ত্ব ও বাণী শহরের মেধাবী নয়তো বিত্তবান তরুণ, গ্রামের কিষাণ-মজুর-ভুখা মানুষদের বেশ টানিতে থাকে। পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশে তা আরো গতি দেয় পশ্চিম বাংলার চারু মজুমদারের নকশাল আন্দোলন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘর পোড়ার দগ্ধ সময়ে আলু পোড়া দেয়ার মতো করিয়া আগাইয়া আসে একটি গোষ্ঠী। একাত্তর-পরবর্তী এই বাংলায় তাহাদের তত্পরতা আরো বৃদ্ধি পাইয়াছিল। সেই সময়ের চরিত্রের সফল চিত্রণই ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’, আফসান চৌধুরীর একমাত্র উপন্যাসখানি।
গ্রামগঞ্জের সামন্ত প্রভু, জোতদার, তালুকদারদের সম্পদ কেড়ে নিয়ে বিপ্লবের সূচনা। তাই কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, ভুখা মানুষ তত্ত্বকথা ততটা না বুঝেই চরমপন্থার রাজনীতিতে শামিল হইয়া যায়। তত্ত্ববাগীশরা মাও জে দংয়ের মতোই গ্রামের পর গ্রাম সাম্যবাদের মশালে আলোকিত করিয়া শহরের পুঁজিবাদ উত্খাত করিবেন, কেন্দ্রের ক্ষমতা কাড়িয়া লইবেন, এই চেতনায় রোমাঞ্চিত করেন শহরের কবি কবি ভাবনার ছেলেগুলিকেও। তাদের জীবন হইয়া যায় পার্টির জীবন। যেইখানে ব্যক্তির কোনো জীবন নাই, পরিবারের কোনো প্রাণ নাই, ঘর নাই, সমষ্টির চিন্তাই শেষ কথা। তাই পার্টির কথায় কেহ ছাড়ে গৃহ, কেহ পরিবার, কেহ ক্ষেতখামার, কেহ বিশ্ববিদ্যালয়, কেহ চাকরি-বাকরি, কেহ ব্যবসা। যত জন বাড়ে, কেহ আর কর্মী থাকিতে চাহেন না, হইতে চান নেতা। তাতে তত্ত্ব বাড়ে, দল ভেঙে ভেঙে টুকরো হইতে থাকে, দলের নামের ডানে প্রথম বন্ধনিতে নিজের নাম নিতে উৎসাহ বাড়ে বৈ কমিতে চাহে না। তাই পুঁজিতন্ত্র, গণতন্ত্র হটানোর পরিবর্তে নিজেরাই দলে-উপদলে দ্বন্দ্বে-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। মরণঘাতী এই আত্মকলহ মানিয়া লইতে পারে না কেহ কেহ। তাহারা হয় গৃহে ফিরিয়া আসে, নয়তো ফিরিবার পথেই মরিয়া পড়িয়া থাকে। নেতৃবৃন্দের কেহ কেহ ক্ষমতাসীনদের সহিত হাত মেলায়, এমপি-মন্ত্রী হওয়ার পথে আরোহণ করে। রাষ্ট্র আর জোতদারদের পাল্টা আঘাতে কেহ কেহ ফেরারি হয়। সময়ের ফেরে কেহ হয় এনজিওবাজ। যার হওয়ার কথা ছিল বুয়েট পাস নামি প্রকৌশলী, সে হয় যন্ত্রমিস্ত্রি। একটা দল লুটের শিক্ষা ধরে রেখে দস্যুবৃত্তিতেই জড়াইয়া থাকে। গ্রামের সেই গরিব-গুবরারা ভুখার দল— যাহারা অভাব মোচনের স্বপ্ন নিয়া গিয়াছিল রক্ত-পতাকার মিছিলে, তাহারা অভিশপ্তের মতো অপাঙেক্তয় হয়ে বাকি জীবন ধুঁকে ধুঁকে কাটায়। হয়তো নিজেরাও জানে না কত্ত বড় বেইমানির ভুক্তভোগী তাহারা। যাহারা বুঝিয়া উঠিতে পারে তত্ত্ব আর বাস্তবতার ফারাক, তাহাদের কাহারো কাহারো মগজ সেই শূন্যতা সইতে পারে না, তাহারা হইয়া ওঠে আধা বা পুরাপুরি উন্মাদ।
বিষয় নির্বাচনের পর বৈজ্ঞানিক নামেন তাহার প্রমাণে। আফসানও যেন উপন্যাসের ছলে নামিয়া ছিলেন উগ্র বা চরমপন্থার বাম রাজনীতির নামে যে বেইমানি বহমান ছিল, তাহারই প্রমাণে। তৃণমূলের চারণ অথচ সার্থক নাগরিক এই গবেষকের প্রতিফলন আছে তাহার কথাসাহিত্যেও। আফসানের বিষয়-ভাষণ-ভূমি সার্থকতা পেয়েছে তাহার ভাষার যে শৈলী, তা কাহিনীর সঙ্গে জুতসই হইবার কারণে। শব্দে-বাক্যে-অনুপ্রাসে ছড়িয়ে ছড়িয়ে আছে সূক্ষ্ম রসবোধ, সুতীক্ষ খোঁচা, মন ভার করা হাহাকার। আর সব শেষে মেলে দেশ-সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতির এক উত্তেজনা ভরা সময়; যার নায়ক-প্রতিনায়ক-খলনায়ক জলিল, গাজী, পাটোয়ারী, সামাদ, রহমান, শফিক, নেওয়াজ— জানা-অজানা আরো কত না নাম। এইসব চরিত্র বাস্তবেই ছিল, কেহ কেহ বর্তমান ভিন্ন ভিন্ন নামে। তাহাদের কিন্তু সকলেই চিনিবেন, জানিবেন। যাহাদের অনেকেই হালে পুঁজিবাদের পূজা দিয়ে যাচ্ছেন, সাম্যবাদের সেই সব স্বপন আর মনেই করিতে চাহেন না।
বাংলায় মার্ক্সবাদের স্বপ্ন আর বাংলা ভাষার মার্ক্সবাদী সাহিত্যের নতুন এক দিগন্ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র শেষটা দিয়ে শুরু হয়েছিল। যার হুবহু হইতেছে:
‘কপিলা আর কথা বলে না। ঘাটের খানিক তফাতে হোসেনের প্রকাণ্ড নৌকাটি নোঙর করা ছিল। একজন মাঝি ঘুমাইয়া ছিল নৌকায়। তাকে ডাকিয়া তুলিলে সে নৌকা তীরে ভিড়াইল। কুবের নীরবে নৌকায় উঠিয়া গেল। সঙ্গে গেল কপিলা।
ছইয়ের মধ্যে গিয়া সে বসিল। কুবেরকে ডাকিয়া বলিল, আমারে নিবা মাঝি লগে? হ, কপিলা চলুক সঙ্গে। একা অতদূরে কুবের পাড়ি দিতে পারবে না।’
মানিকের মার্ক্সবাদের সূচনার বিপরীতে মাওবাদ দিয়া বাংলায় বামধারার সমাপনীই যেন টানিয়া দিয়াছেন আফসান। চলুন ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’ ঠিক শেষ পাতে বসিয়া পাঠ করি:
‘এখন তার নদী ভালো লাগছে। এখন নৌকার দোলা ভালো লাগছে। এখন ঘরে যাবার কথা ভাবতে ভালো লাগছে। এখন সে যাবে, তারপর ফয়সালা হবে। যদি না হয় তাহলেও যাবে। এ বছর যদি না হয়, আগামীতে যদি না হয়, কোনো দিন যদি না হয় তাহলেও যাবে। তার করার কিছুই নেই। সে, তারা, যাবেই।
যাবে, নদীর মতো যাবে।’
দুঃখ একটাই থাকিতে পারে, বাংলা পাঠকের দরবারে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ যে আদর পাইয়াছে, ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’ তাহার সিকি ভাগও পায় নাই। তবে রচনার তিন দশক পর এসে নবসংস্করণের পর আমার মতন এই প্রজন্মের পাঠককুল যদি তালাশ পান, তবে নিশ্চয় আরো আরো ছড়াইয়া পড়িবে ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’। তাহাতে একটি মাত্র উপন্যাস লেখকের তালিকায় নাম থাকলেও আফসান চৌধুরীর কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হইবে না। ‘একাই একশ’ বলিয়া বাংলার প্রবাদ কিন্তু পুরনো।





