১৮৮৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের গল্প দ্য ম্যান হু উড বি কিং। কিপলিং শুনিয়েছিলেন হিন্দুকুশ পর্বতমালার দক্ষিণ ঢালে অবস্থিত আফগানিস্তানের একটি এলাকা কাফিরিস্তানকে নিয়ে আশ্চর্য এক গল্প। এ পার্বত্যাঞ্চলে মূর্তি পূজারিদের দেখে মুসলিমরা একদা কাফিরিস্তান নামকরণ করেছিলেন, মানে যেখানে অবিশ্বাসী বা কাফিরদের বাস। গল্পে কিপলিংয়ের বর্ণনায় আমার দুজন ইংরেজ অভিযাত্রীর কাফিরিস্তান অভিযানের গল্প শুনি। ড্যানিয়েল ড্রাভোট ও পিশে কারনেহান দুর্গম পর্বত পেরিয়ে কাফিরিস্তানে পৌঁছেন। তাদের রাইফেল দিয়ে তারা কাফিরিস্তানের বাসিন্দাদের মানে কাফিরদের বিস্মিত করে দেন। আর কাফিরদের মূর্তি পূজা নিয়ে ড্রাভোটের আপত্তি না থাকায় তারা সেই দুই ব্রিটিশ অভিযাত্রীকে সাদরে গ্রহণ করে এবং ড্রাভোটকে আলেকজান্ডারের অবতাররূপে মেনে নেয়। কিন্তু ঝামেলা হলো যখন ড্রাভোট আনুষ্ঠানিক রাজা হওয়ার ইচ্ছা থেকে এক কাফির মেয়েকে বিয়ে করতে যায়। বিয়ের সময় সেই মেয়ে বুঝতে পারে, ড্রাভোট মোটেই কোনো অবতার নয়, বরং রক্তমাংসের মানুষ। তারপর কাফিররা ড্রাভোটকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে কিপলিং তার এ বিখ্যাত গল্প লেখার পর কাফির সম্প্রদায় কিংবা কাফিরিস্তান দুনিয়ার বুকে আর খুব বেশি দিন টিকে থাকেনি। কিপলিংয়ের গল্প প্রকাশিত হওয়ার সাত বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৮৯৫ সালে শেষ কাফিরকেও বলপ্রয়োগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করেন আফগান আমির আবদুর রহমান খান; এই আবদুর রহমান খান ইতিহাসে ‘আয়রন আমির’ নামে পরিচিত হয়ে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় এলাকার নামও— কাফিরিস্তান বা অবিশ্বাসীদের ভূমি থেকে হয় নূরিস্তান বা ‘নূরের ভূমি’। আপাতত কাফিরদের গল্প থেকে বিদায় নিই। পরে আবার ফিরে আসা যাবে। এবার আমরা আফগানিস্তানের সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করব। আমাদের লক্ষ্য চিত্রাল আর সোয়াত উপত্যকা।

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনওয়া প্রদেশের একটি জেলা চিত্রাল। একসময় এ চিত্রাল ও সোয়াত উপত্যকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল কাফিরদের নিকটাত্মীয় কালাশ সম্প্রদায়। ধর্ম, ঐতিহ্য, ইতিহাস, ভাষা নিয়ে কালাশরা দুনিয়ার বিরল এক সাংস্কৃতিক ধারা বহন করে চলেছে। কালাশদের পূর্বপুরুষ কারা, সেটা এক রহস্য, আবার তারা কীভাবে এ পার্বত্য এলকায় এল, তাও এক বিস্ময়। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো হিন্দুকুশের পর্বতে তাদের দুই হাজার বছর ধরে টিকে থাকার ইতিহাস। বর্তমানে এরা পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়। পাণ্ডুর গাত্রবর্ণ আর নীল চোখ কালাশদের অনন্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য। এ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের উৎস খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা কালাশদের মিল খুঁজে পান গ্রিকদের সঙ্গে। কালাশরা নিজেদের আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনীর বংশধর বলে দাবি করে। উল্লেখ্য, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। কালাশদের দাবির স্বপক্ষে বিজ্ঞানের কিছু প্রমাণও মিলেছে।

কয়েক বছর আগে দ্য জার্নাল সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছিল জেনেটিক অ্যাটলাস অব হিউম্যান মিক্সিং শিরোনামে একটি গবেষণাকর্ম। গবেষক দলটির নেতৃত্বে ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিমন মেয়ারস, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গ্যারেট হেলেনথাল ও জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট ফর ইভোলিউশনারি অ্যানথ্রোপোলজির ড্যানিয়েল ফালুশ। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জিনোম সংগ্রহ করে তারা গবেষণা চালিয়েছেন। তাদের ফলাফলে কালাশ সম্প্রদায়ও স্থান করে নিয়েছে। দুনিয়ায় বিভিন্ন কালপর্বে জিনের যে মিলন ঘটেছে, সেখানে দেখা যায়, কালাশদের শরীরে আছে ইউরোপীয় ডিএনএ। কালাশদের শরীরে এ ইউরোপীয় ডিএনএর প্রবেশ ঘটেছিল ৯৯০ থেকে ২১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়ে। আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। আর মূর্তি উপাসক কালাশদের দেবতা, পূজা পদ্ধতি, পুরাণে প্রাচীন গ্রিসের ছায়া পাওয়া যায় ভালোভাবেই। প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো হচ্ছে, রাতের বেলা অগ্নিকুণ্ডকে ঘিরে নাচ, মদ ও অলিম্পিকের অনুকরণে বিভিন্ন খেলাধুলা।&dquote;&dquote;

কালাশদের গ্রামে গেলে প্রথমেই কোনো পর্যটকের চোখে যা আটকে যাবে, সেটা তাদের আন্তরিক আতিথেয়তা। দ্বিতীয়টি তাদের পোশাক। কালাশ শব্দের অর্থ কালো। অনেকে ভাবতে পারেন, কালাশরা কালো পোশাক পরে বলে এমন নামকরণ কিনা। পাকিস্তানের অন্য এলাকার চেয়ে কালাশ মেয়েরা বরং রঙিন ও বর্ণাঢ্য পোশাক পরে। কালাশ পুরুষরা ছাগলের পশমের টিউনিক বাদ দিয়ে এখন পাকিস্তানের জনপ্রিয় পোশাক সালোয়ার-কামিজ পরে। তবে কালাশ নারীরা তাদের পোশাকের বৈচিত্র্য ও রঙ এখনো ধরে রেখেছে। কড়ি, ভারী এমব্রয়ডারি করা লম্বা পোশাকে বিভিন্ন রঙের সম্মিলনে ট্যাপেস্ট্রি দেখা যায়। মেয়ের মাথা ও কাঁধে দেয়া যায় উলের তৈরি রঙিন ঝালর।

কালাশরা পেগান। তাদের দেবলোকে আছে স্রষ্টা দেজাও বা জাসটাক; বিয়ে, পরিবারের দেবীসহ আরো অনেক দেব-দেবী। বহুকাল ধরে নিজেদের ভিন্ন ধরনের জীবনধারা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে প্রতিবেশীদের চাপে ধীরে ধীরে তারা পার্বত্যাঞ্চলের গভীর থেকে গভীরতর অংশে চলে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তৃতিতে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকরা এ প্রাচীন ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের সম্প্রদায়টির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। পাকিস্তান সরকারও কালাশদের নিরাপত্তা ও ঐতিহ্য নিয়ে সচেতন হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতে বসবাসরত স্কটিশ ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ড্যালির্যাম্পল সপরিবারে গিয়েছিলেন কালাশদের গাঁয়ে। বনের মধ্য থেকে গ্রামের দিকে এগোতে এগোতে হঠাৎই দেখলেন, ‘বন থেকে বেরিয়ে একটা পরিষ্কার জায়গার দিকে এগোতে এগোতে আমাদের বুক ধড়ফড় করছিল এবং উচ্চতার কারণে ফুসফুস স্ফীত হয়ে যাচ্ছিল। আমরা চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া পর্বতশৃঙ্গের ছাদে এক ফসল উৎসবের মাঝে নিজেদের আবিষ্কার করলাম। উৎসবের এক পাশে বসে গ্রামের বৃদ্ধরা ঘরে তৈরি এক ধরনের মদ পান করছিল। তাদের পাশেই একদল ঢোলবাদক দারুণ উৎসাহে ছন্দময় সুরে ঢোল বাজাচ্ছিল। নক্ষত্রের তলে চাঁদের আলোয় গোসল করে সেখানে নাচতে জমায়েত হয়েছে ২০০-৩০০ মানুষ। জমায়েতের মাঝখানে কয়েকজন কিশোরী একে অন্যের কাঁধ স্পর্শ করে নাচছে। তাদের কেউই পর্দায় আবৃত নয়। তাদের পরনে এমব্রয়ডারি করা কালো পোশাক, প্রান্তে কড়িযুক্ত। গলায় হার, চুল শক্ত বিনুনি দিয়ে বাঁধা। এবার লাজুক ছেলেরা মেয়েদের হাত ধরে নাচতে শুরু করল। প্রকাশ্যে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে এই সামান্য ঘনিষ্ঠতাই এ অঞ্চলে অকল্পনীয়।’ কালাশদের ইতিহাস সম্পর্কে ড্যালির্যাম্পল জানালেন, ‘এই ফ্যাকাসে বর্ণ আর নীল চোখের কালাশরা একসময় সোয়াত ও চিত্রাল উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিল আর আজো তারা সংরক্ষণ করে রেখেছে তাদের এই নাচ, ধর্ম ও কসমোলজি। তাদের নিকটাত্মীয়রা (কাফির) রাজত্ব করত সীমান্তের ওপারে আফগানিস্তানে।’&dquote;&dquote;

এ লেখার শুরুর দিকে বলা হয়েছিল আফগানিস্তানের কাফির সম্প্রদায়ের কথা। আফগান আমির আবদুর রহমান খানের হাতে যখন কাফিরিস্তান নূরিস্তানে পরিণত হচ্ছিল, ড্যালির্যাম্পল জানাচ্ছেন, ঠিক তখন পাকিস্তানের এই উত্তর সীমান্তে ওয়াহাবি মোল্লারা তাদের অনুসারীদের অবিশ্বাসী কাফিরদের ওপর হামলা করতে উসকে দিয়েছিল, কাফিরদের জমি, কন্যা ও স্ত্রীদের কেড়ে নেয়া হয়। এদের ধাওয়া খেয়ে তারা আরো ভেতরের দিকে সেঁধিয়ে গিয়েছিল। আজকের দিনে কালাশদের পাওয়া যাবে মাত্র তিনটি দুর্গম উপত্যকায়। এ উপত্যকাগুলোর কোনোটার সঙ্গেই চিত্রাল শহরের পাকা সড়কের সংযোগ নেই।

ভৌগোলিকভাবে এ বিচ্ছিন্নতা হয়তো কালাশদের জন্য শাপে বর হয়েছে। এতে তাদের সংস্কৃতি রক্ষা পেয়েছে। নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে এরা বিয়ে করতে পারে না। এটা অবশ্য দুনিয়ার যেকোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরই বৈশিষ্ট্য। কালাশরা তাদের গাথা, পুরাণ, বিশ্বাসকে সংরক্ষণ করে রেখেছে আজ অবধি, আর এসবই তাদের ধর্মবিশ্বাসের অংশ, যা এ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ধর্ম।

সোয়াত উপত্যকা ২০০৭ সালে তালেবানরা দখল করে নিয়েছিল। তবে এখন তাদের হটিয়ে দিয়ে পাকিস্তান সরকার পুনরায় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সোয়াত থেকে চিত্রালের পথে অসংখ্য পুলিশ ও সেনা চেকপোস্ট। পর্যটকদের কাগজপত্র একটু পর পরই পরীক্ষা করা হয়। কাছেই সীমান্তের ওপারে তালেবানদের আস্তানা আছে। তাই সীমান্তে পাকিস্তানের রেঞ্জার্সরা সতর্ক অবস্থানে।

সোয়াত নদী ধরে চিত্রালের দিকে এগোতে এগোতে দুনিয়ার অন্যতম মূল্যবান একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলকে দেখা যাবে। ড্যালির্যাম্পলের বিবরণী শোনা যাক, ‘আমরা বিস্ময়কর একং পার্বত্য ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম দুনিয়ার সবেচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ। পাহাড়ের মাথায় দেখা যাচ্ছিল দুর্গ, যেগুলো সেই ম্যাসিডোনিয়া বা আলেকজান্ডারের আক্রমণের পর থেকে খালি পড়ে আছে; আরো আছে অসাধারণ সব গান্ধারী বৌদ্ধ মঠ, হেলেনীয় ধাঁচের মঠ; ভগ্নদশায় থাকা হিন্দু শাহী দুর্গ ও উপত্যকার নিচের দিকে সূক্ষ্ম কাজ করা কাঠের তৈরি মোগল মসজিদ।’

ড্যালির্যাম্পল রামবার নামের কালাশদের একটি গ্রামে গিয়েছেন। সেখানে তিনি কালাশদের প্রধান পুরোহিত বা কাজী ফকর আজমের সঙ্গে কথা বলেন তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে। কালাশদের কোনো লিখিত শাস্ত্র, ইতিহাস নেই। তাদের সবই শ্রুতি। কয়েক সহস্রাব্দ ধরে শ্রুতির মাধ্যমেই রক্ষিত হয়ে আসছে তাদের গান, কিংবদন্তি, গল্প, কবিতা, রীতি-প্রথা। ফকরের বাবা ছিলেন কালাশদের এক বিখ্যাত ধর্মীয় পুরুষ। তিনি তাদের সব রহস্য, কিংবদন্তি জানতেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কালাশরা যেন তাদের এক চলমান গ্রন্থাগারকে হারায়। বাবার তুলনায় ফকরের জানাশোনা অনেক কম।

কাজী ফকর ড্যালির্যাম্পলকে বলেন, তাদের উপত্যকায় একসময় অদৃশ্য রক্ষাকর্তা দেব-দেবী, দানব, ফেরেশতা, আত্মা ও জিন দিয়ে পূর্ণ ছিল। তার কাজ ছিল শুধু ভালোদের সন্তুষ্ট রাখা, বিশেষত যারা গ্রামের মানুষ ও পশুদের দেখভাল করেন এবং রোগ সৃষ্টিকারী শক্তিদের অর্ঘ্য ও উৎসবের সময় ছাগল উৎসর্গ করে সন্তুষ্ট রাখতেন। আত্মারা স্বপ্নে মানুষকে দেখা দেয়। আবার অনেক খারাপ আত্মা গ্রামের সুন্দরী মেয়েদের ওপর ভর করে। এ কারণে চেহারা সুন্দর, এমন সব কালাশ শিশুর মুখমণ্ডল অপরিষ্কার রাখা হয়, যাতে ক্ষতিকর কোনো আত্মা তাদের প্রতি আকর্ষিত না হয়। ফকর জানান, তিনি মাঝে মধ্যে আত্মাদের দেখতে পান, সদ্য মৃতরাও অনেক সময় সাঁঝবেলায় অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো তাকে ঘিরে ধরে। এমনটা বেশি হয় যখন তিনি তুষার ঢাকা পর্বত তিরিচ মীরের ঢালে যান। এই তিরিচ মীর হচ্ছে চিত্রালের মাউন্ট অলিম্পাস। কালাশদের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর তাদের আত্মার গন্তব্য এই তিরিচ মীর, এখানেই তাদের আত্মা সমবেত হয়।

কালাশদের মধ্যে সর্বপ্রাণবাদ বা প্রকৃতি পূজার চর্চা স্পষ্ট; তারা ছাগল, ঘোড়া, জুনিপার গুল্ম ও হোলি গোত্রের চিরসবুজ বৃক্ষকে সম্মান করে। একই সঙ্গে পর্বত, নদী ও পূর্বপুরুষদের প্রতিও তাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।

কালাশদের বার্ষিক উৎসব দুটি। একটি পূর্বপুরুষদের স্মরণ উপলক্ষ, যা অনুষ্ঠিত হয় শীতকালে। অন্যটি আঙ্গুর তোলার উৎসব। আরো কিছু উৎসব আছে কালাশদের, তার মাঝে একটি হলো জোশি উৎসব। এটি অনুষ্ঠিত হয় মে মাসের শেষ দিকে। দুধ এ উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এ উৎসবের জন্য ১০ দিন আগে বিশেষ পদ্ধতিতে দুধ সংরক্ষণ করা হয়। কালাশরা এ দুধ তাদের বাড়িঘর ও শিশুদের পবিত্র করতে ব্যবহার করে। সদ্যোজাতদের এ দুধ পান করানো হয় এবং বাড়িঘর ও অন্যান্য জিনিসের ওপর ছিটানো হয়।

ড্যালির্যাম্পলকে কাজী ফকর তাদের নদী ও সূর্য দেবতার কথা বলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলেন, সব দেবতাই একজন পরম স্রষ্টার প্রকাশ আর এই পরম স্রষ্টাকে তারা বলেন ‘খুদা’।

উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের মতো কালাশ সমাজেও ওঝারা আছে, যারা মানুষকে রোগমুক্ত করে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়।

কালাশদের আছে মহাকাব্যিক গীতি, যেগুলোয় তাদের মহান যোদ্ধাদের বীরত্বগাথা শোনা যায়। আরো আছে তাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিতত্ত্ব পুরাণ, যেখানে বলা হয় ভূভাগের ভারসাম্য রক্ষা করতেই ঈশ্বর পর্বত সৃষ্টি করেছেন।

তবে কালাশদের পুরাণে একটি বিষয় সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই আর তা হলো, তাদের জাতির উৎস কোথায়, কীভাবে। একপক্ষ বলে আর্যরা যখন মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল, তাদেরই একটি অংশ এই কালাশরা। বিশেষত ঘোড়ার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা এ ধারণাকে শক্তি জুগিয়েছে। কিন্তু আর্যতত্ত্বই এখন ইতিহাস ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুতর প্রশ্নের মুখে। এমনকি আর্য আক্রমণের পক্ষের তাত্ত্বিকরা এখন আর্য অভিবাসন তত্ত্বে নেমে এসেছেন।

সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিভিন্ন লক্ষণ বিবেচনায় অনেকে তাদের আলেকজান্ডারের বাহিনীর উত্তরসূরি বলেই মনে করেন। হতে পারে, তারা এ অঞ্চলে বসবাসকারী গ্রিকদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি অংশ কিংবা সরাসরি আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনীর উত্তরসূরি। কালাশদের নিজেদের দাবিও এরকম।

রুশ বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, এ কালাশরা হলো একটি হারিয়ে যাওয়া স্লাভ গোষ্ঠী। দক্ষিণ দিকে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একসময় তারা পার্বত্যাঞ্চলের গোলকধাঁধায় আটকে যায়। সব মিলিয়ে কালাশদের উৎস নিয়ে নিশ্চিত করে বলার কোনো উপায় নেই। পর্যাপ্ত গবেষণার ঘাটতিও রয়েছে। তবে বছর দুয়েক আগে এক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে কালাশদের পূর্বপুরুষরা সাইবেরিয়া থেকে এসেছে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। ক্যামব্রিজে ব্রিটিশ, ইতালীয় ও পাকিস্তানি গবেষকরা মিলে এ গবেষণা করেন। এর ফল প্রকাশ করা হয় আমেরিকান জার্নাল অব হিউম্যান জেনেটিকসে। এতে তিনটি উপত্যকায় বসবাসরত ২৩ জন কালাশের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এ গবেষণায় দেখা গেছে, কালাশদের ডিএনএর সঙ্গে প্রাচীন শিকারি-যাযাবর ও ইউরোপীয় কৃষিজীবীদের ডিএনএর মিল আছে। সাইবেরিয়ার প্যালিওলিথিক আমলের শিকারি-যাযাবরদের সঙ্গে তাদের অনেক মিল। সম্ভবত কালাশরা ইউরেশিয়া উত্তরাঞ্চলের কোনো প্রাচীন গোষ্ঠী।

কালাশদের উৎস যেমন অনিশ্চিত, তেমনি তাদের ভবিষ্যৎও। ড্যালির্যাম্পল তার অভিজ্ঞতা থেকে তা-ই জানাচ্ছেন। ভ্রমণের শেষ দিনে ড্যালির্যাম্পল আলাপ করেন গ্রামের হেডম্যান সাইফ উল্লাহর সঙ্গে। সাইফের বয়স এখন প্রায় ৬০ বছর। সাইফ কিছু আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বাল্যকালে তাদের গ্রামে ২০ ঘর কালাশ দেখেছেন আর সামান্য কিছু পরিবার ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পরও এখন কালাশ পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬৫। কিন্তু আধুনিক সমাজের হাতছানি কালাশ তরুণদের গ্রাম ছেড়ে চিত্রাল শহরে নিয়ে যাচ্ছে আর সেখান থেকে সমতলের শহরে। বাকিটা শোনা যাক সাইফ উল্লাহর জবানিতে, ‘তারা (কালাশ তরুণরা) জিন্স আর টি-শার্ট পরে ফিরে আসে, তাদের আচরণ হয়ে যায় পাঞ্জাবিদের মতো। আল কায়েদা ও আইএসের ভয়ও আছে। আমাদের ভয়, তারা হয়তো একদিন আমাদের এখানে আক্রমণ করে আমাদের ধর্মান্তরিত করবে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশি ভয় পাই আধুনিক দুনিয়ার হাতছানিকে। নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষা করার লড়াই আমাদের প্রতিদিন লড়তে হয়। আরো ৫০ বছর পর কি এখানে কোনো কালাশের দেখা পাওয়া যাবে? উত্তরটা সত্যিই আমি জানি না।’

ড্যালির্যাম্পলের বেশ আগে ২০১৪ সালে কালাশদের এ গ্রামগুলো সফর করেছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথের ইসলামী ইতিহাসের অধ্যাপক ব্রলাম গেলান উইলিয়াম। তিনি তার সফরকালে দেখেছিলেন, আশপাশের লোকজনের বিভিন্ন আক্রমণের প্রতিকার চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন এক কালাশ নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। কাফিরদের মতো কালাশরা হারিয়ে না যাক।