বাসে উঠেই হুড়মুড়িয়ে মহিলা সিটে বসে পড়ল মঞ্জুয়ারা। মহিলা সিট কম, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশি। তেড়েফুঁড়ে না বসলে অন্য কেউ সুযোগটা নেবে। এত দূরের পথ দাঁড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া এই পুরুষভর্তি বাসে দাঁড়ানো ভীষণ বিব্রতকর। গায়ের ওপর লোকগুলো একেবারে নুয়ে পড়বে, না পারলে আসা-যাওয়ার পথে গা ঘেঁষে যাবে। এক মুহূর্তের জন্য শরীর স্পর্শ করবে।

আজ খুব গরম পড়েছে। বৈশাখের ঝাঁ ঝাঁ রোদ যেন শহর পুড়িয়ে খাঁক করে দেবে। বাসের জানালা দিয়ে মঞ্জুয়ারা বাইরের খাণ্ডবদাহন দেখে। রোদের তেজে ভাজা হয়ে যাচ্ছে রাস্তার সব যানবাহন। সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ভেতরের নিরুপায় যাত্রীরা। কেউ এক চুল নড়ছে না, মিনিট বিশেক ধরে জ্যামে আটকে আছে। মঞ্জুয়ারার আশপাশের মানুষগুলোর কপাল, চিবুক বেয়ে দরদরিয়ে ঘাম নামছে। ঘাম মুছতে মুছতে ভারী হয়ে গেছে রুমাল। বাসজুড়ে ঘাম ও পুরুষ শরীরের বিকট গন্ধ। মঞ্জুয়ারার নাক আপনাআপনি কুঁচকে আসে।

মঞ্জুয়ারা নিজেও ঘামছে। কিন্তু আপাদমস্তক কালো বোরকায় ঢেকে রাখার কারণে তার যন্ত্রণা বাইরে থেকে কেউ টের পাবে না। মাঝে মাঝে তার কপাল চটচটে হয়ে যাচ্ছে। কপাল বেয়ে নেমে আসা ঘামের প্রবাহ দুই ভ্রুরুর বাঁধ উপচে আর্দ্র করে দিচ্ছে চোখের পাতা। নোনতা ঘাম দুই চোখে ঢুকে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। এর চেয়ে বেশি জ্বলছে তার বুকের খাঁচা। শরীরে পেঁচানো কাপড়ের পরত ভেদ করে এক ফোঁটা বাতাস ঢুকছে না ভেতরে। খুব হাঁসফাঁস লাগে মঞ্জুয়ারার। আজ যেন বাড়িতে কারো বিয়ে। বিশ-ত্রিশ জনের বরযাত্রী এসেছে। সাহায্য করার কেউ নেই। রান্নাবান্না সব তাকে একাই করতে হবে। চুলার পাশে আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার আর আরেক হাতে বাসি রুমাল নিয়ে মঞ্জুয়ারা সেই অদৃশ্য আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করে। বাসভর্তি মানুষ হা-হুতাশ করে আর আড়চোখে মঞ্জুয়ারার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মনোযোগ অন্যদিকে চালনা করতে চায়।

কন্ডাক্টর ভাড়া তুলতে শুরু করেছে। এই নিথর-নিষ্ঠুর গরমে, এই আটকে থাকা অনিশ্চিত যানজটের মধ্যে কন্ডাক্টরের কাজ দেখে যাত্রীদের মাথা গরম হয়ে যায়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে তার বিবেক-বুদ্ধি নিয়ে। বাকিরা মারমুখী হয়ে ওঠে। বাসের যাত্রীদের একযোগে প্রতিবাদ দেখে ভাড়া তোলায় ক্ষান্ত দেয় চ্যাংড়া কন্ডাক্টর। গেটে ঝুলে থাকা হেলপারের পাশে দাঁড়িয়ে টাকা গুনতে থাকে।

কন্ডাক্টরের এ আত্মসমর্পণ বাসের মানুষের মনে কোনো চাঞ্চল্য জাগায় না। তারা কখনো বিড়বিড় করে, কখনো উচ্চ স্বরে ড্রাইভার, কন্ডাক্টর ও বাসমালিকদের পিণ্ডি চটকাতে থাকে। কয়েকজন যাত্রী ঘুমিয়ে ছিল। তারা এই কথোপকথনে জেগে ওঠে। যেখানকার বাস সেখানে দেখে তারা গলা চড়িয়ে ড্রাইভারকে গালমন্দ করে। মঞ্জুয়ারার দুই সিট পেছনের এক বুড়োমতো মানুষ মুখের থুতু ছিটাতে ছিটাতে বলে, ‘ওই হালার পো হালা ডিরাইবার, এই রাস্তায় তোরে গাড়ি ঢুকাইতে কে কইছে? জানোস না রবিবার এই রাস্তায় কুত্তাপাগল জাম থাকে?’

বুড়োর সম্বোধন শুনেও না শোনার ভান করে ড্রাইভার। চুপ করে বসে তার মাথার ওপর ঘুরতে থাকা মিনি ফ্যানের পাখার ঘটাং ঘটাং শব্দ শোনে। কিন্তু বুড়ো ক্ষান্ত হওয়ার পাত্র নয়। দুই হাত পা ছুড়ে সে ড্রাইভারকে গালাগাল দিতে থাকে, ‘মান্দার পো, রাস্তাঘাট না চিন্যাই গাড়ি চালাইতে বাইরাইছস? তোরে চাকরি দিছে কোন হালায়?’ ড্রাইভার আর চুপ করে থাকতে পারে না। উল্টো ঘুরে বলে, ‘এত প্যাচাল পাড়েন কিল্লিগা? বইতে হইলে বয়েন। নাইলে বাইর হয়া যান গা।’ ড্রাইভারের জবাব শুনে বুড়ো কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে যায়। তারপর গলা চড়িয়ে বলে, ‘হালার পো হালা মুখ সামলায়া কতা কইবি? মাগনা উঠি নাই গাড়িতে। আমগো পয়সা ছাড়া ভাত জুটত না প্যাটে। বাড়িত বয়া মায়ের ওলান চুষতি হুকনা হুকনা।’

ড্রাইভারের মধ্যে এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। সে হেলপারকে ডেকে বলে, ‘ওই জুম্মইন্যা, এই রোহিঙ্গার ঘরের রোহিঙ্গারে বাস থাইকা নামা।’ জুম্মন কিছুক্ষণ ইতস্তত করে। কথার কথা ভেবে ওস্তাদের দিকে তাকায় ভালো করে বোঝার জন্য। বছর বাইশের ড্রাইভারের তরুণ রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে। সে চিৎকার করে বলে, ‘নাটকির পোলা কতা কানে যায় না? এই চুতমারানি বুড়ারে বাস থাইকা নামা। এক্ষণ নামা। কুইক কুইক।’ ড্রাইভারের মারমুখী আচরণ দেখে বুড়ো ভড়কে যায়। সে কন্ডাক্টরকে উদ্দেশ করে বলে, ‘ওই কন্টাক্টর, ভাড়া দিয়া উটছি না? আমারে নামতে কয় কোন সাহসে?’ কন্ডাক্টর বুড়োর দিকে শীতল দৃষ্টি দিয়ে বলে, ‘আপনের মুখের ভাষা ভালা না। নামতে কইছে নাইমা যান। ওই জুম্মন গেট ফাঁকা কর।’ বুড়ো এবারে বাসের ভেতর বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয়। সে আশপাশের যাত্রীদের কাছে ড্রাইভার-কন্ডাক্টরের বেয়াদবির বিচার দেয়। বলে, ‘ভাই দেখছেন দেখছেন কেমন কইরা কথা কয়। যাত্রীগো এরা মানুষ বইলা বিবেচনা করে না। আপনেরা কিছু কন না এই হারামজাদাগো।’

কয়েকজন যাত্রী বুড়োর সপক্ষে গর্জে ওঠে। বাকিরা চুপচাপ ঝামেলা এড়িয়ে বসে থাকে। কন্ডাক্টর এগিয়ে এসে পনেরোটা টাকা গুনে বুড়োর দিকে ছুড়ে মারে। দরজা দেখিয়ে বলে, ‘ওই রোহিঙ্গার পুত, এক্ষণ নাম।’ বাসের নিষ্ক্রিয় যাত্রীরা, যারা এতক্ষণ গরমে নিস্তেজ হয়ে বসে ছিল, তারা এবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। একজন উঠে দাঁড়িয়ে খারাপ ব্যবহারের কৈফিয়ত চায়। তার দেখাদেখি আরো কয়েকজন উঠে দাঁড়ায়। ড্রাইভার ও কন্ডাক্টরের সঙ্গে তর্কে জড়ায়। হতভম্ব বুড়োর মনে এতক্ষণে সাহস ফিরে পায়। টাকের পেছনের সাদা চুল চুলকাতে চুলকাতে সে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে, ‘হাত থাকতে মুখে কি? দ্যান না দুইটা ধইরা। মাইর না খাইলে ঠিক হইব না চোদানির পোলারা।’

দেখা গেল গালিগালাজে অনেকের উৎসাহ থাকলেও কেউ শারীরিক সংঘর্ষে যেতে রাজি নয়। বুড়ো আরো কয়েকবার সংগ্রামী আহ্বান জানানোরও পরও যাত্রীরা গাঁট হয়ে বসে থাকে। এই সুযোগে ড্রাইভার মওকা পেয়ে যায়। সে বাসের ভেতর এতক্ষণ ঘুরতে থাকা ফ্যানগুলো বন্ধ করে দেয়। একদম পেছনের ফ্যানটা নষ্ট ছিল। তাই পেছনের যাত্রীরা বাদে বাকি সবাই হাঁ হাঁ করে ওঠে। সারা বাসে শোরগোল ওঠে, ‘ওই ব্যাটা ফ্যান বন্ধ করছ ক্যান? ওই চালু কর।’

ড্রাইভার বুড়োকে দেখিয়ে বলল, ‘এই হালার পো হালারে নাইমা যাওন লাগত, নাইলে ফ্যান চলত না।’

যাত্রীদের মধ্যে ফিসফাস আরম্ভ হয়ে গেল। কয়েকজন বলল, ‘ঠিকই তো। সব দুষ এই ব্যাডার। হুদাহুদি গাইলপারা শুরু করছে। এই যে চাচা, আপনে নাইম্যা যান।’

যাত্রীদের পল্টি নেয়া দেখে বুড়ো হতভম্ব হয়ে যায়। কিছুক্ষণ কাঁদো কাঁদো মুখে আমতা আমতা করার পর তার চোখ পড়ে মঞ্জুয়ারার ওপর। যাত্রীদের দেখিয়ে সে বলে, ‘ভাইয়েরা, আপনারা এগো কথায় নাচতাছেন? এই হালারা দিল্লির মতো এইহানেও বাসে আমাগো মা-বইনরে রেপ করে।’

বুড়োর কথা শুনে মঞ্জুয়ারার বুক ছ্যাঁত করে ওঠে। সে এতক্ষণ বাসের এসব ঝগড়া থেকে দূরে ছিল। নেহাত কান বন্ধ করার উপায় নেই বলে দুই পক্ষের কথা চালাচালি শুনে গেছে। এখন তাকে এসবের মধ্যে জড়ানো কেন?

সে কিছু বলার আগেই এক পশলা বৃষ্টি নেমে আসার মতো একটা ঘটনা ঘটে। আশপাশের থেমে থাকা বাস, সিএনজি, কার ও মোটরসাইকেলগুলো একে একে খটাখট স্টার্ট নিতে থাকে। জ্যাম ছেড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখে বাসের মানুষদের শিথিল স্নায়ু টান টান হয়ে ওঠে। যেন ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে, এমন ভঙ্গিমায় আনন্দে গদ গদ হয়ে যায়। আনন্দের সংক্রমণ ঘটে ড্রাইভারের মধ্যেও, সে বাসের সব ফ্যান ছেড়ে দেয়। হেলপার জুম্মন বাসের বডি চাপড়ে ওস্তাদকে উৎসাহ দেয়। কন্ডাক্টর ভাড়া আদায়ের প্রস্তুতি হিসেবে বাসের ভেতরে হাঁটাহাঁটি শুরু করে। সুযোগ বুঝে বদমেজাজী বুড়ো যাত্রীটিও টুপ করে নিজের সিটে বসে পড়ে।

বাস গুলিস্তান ছেড়ে যাওয়ার আগেই লাফিয়ে ভেতরে ঢোকে একজন মানুষ। হেলপারের ‘সিট নাই, সিট নাই’ আপত্তি না শুনে সে যাত্রীদের আগাগোড়া মেপে নেয়। তারপর নাটকীয় গলায় বলে, ‘এই বাসে পুলিশ, র্যাব, ডিবি, বিডিআর, সেনাবাহিনীর লোকজন কে কে আছেন?’

মঞ্জুয়ারা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। লোকটার কথা শুনে নড়েচড়ে বসে। সে এদের খুঁজছে কেন?

লোকটা মাঝবয়সী পেটানো শরীরের। মুখে পেল্লায় গোঁফ। যত্নের সাথে কলপ করা চুল। পরনে লাল চেক শার্ট, কালো ফুল প্যান্ট, পায়ে বেল্টের স্যান্ডেল। লোকটার কপালে চকচক করছে ঘাম।

লোকটা এবার গলার স্বর বাড়িয়ে বলে, ‘কী? কেউ নাই পুলিশ-মিলিটারি?’

কন্ডাক্টর ভাড়া তোলা বাদ দিয়ে থমকে যায়। এমনকি মাথা গরম ড্রাইভার যে বুড়োকে কীভাবে বাস থেকে নামানো যায়, সে ফন্দি আঁটছিল সেও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।

লোকটা বলে, ‘পুলিশ, র্যাব, ডিবি, বিডিআর, সেনাবাহিনীর কেউ যদি থাকেন, তাইলে আমার স্যালুট।’

যাত্রীদের উৎসাহে ভাটা পড়ে। ড্রাইভার পিচিক করে থুতু ফেলে অন্য ড্রাইভারদের গুষ্টি উদ্ধার করতে লাগে। যাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজ নিজ কাজে। এই ব্যাডার কতা হুইনা কাম নাই। 

লোকটা মোটেই ভড়কাল না। চোয়ালে দৃঢ়তা ফুটিয়ে বলল, ‘খালি স্যালুট দিতাছি না। আমার একটা কথাও আছে। আমি পুলিশ-মিলিটারিগো চ্যালেঞ্জ করি। তাগো শক্তিরে চ্যালেঞ্জ করি।’

বাসভর্তি মানুষ এবার থমকে গেল। ঝড়ের আগে যেমন হয়, তেমন গুমোট হয়ে গেল বাসের পরিবেশ। যাত্রীদের মনোযোগ পেয়ে লোকটা দৃঢ় গলায় বলল, ‘তাগো অনেক শক্তিশালী। ঠিক না বেঠিক?’

যাত্রীরা বলল, ‘ঠিক।’

‘তাইলে তাগো অনেক ক্ষমতা। ঠিক না বেঠিক?’

যাত্রীরা তীব্র গলায় বলল, ‘ঠিক।’  

‘পুলিশ চাইলে আমগোরে জেলে দিতে পারেন। ঠিক না বেঠিক?’

যাত্রীদের চিৎকার এবারে গগণবিদারী হয়ে উঠল, ‘ঠিক।’

লোকটা জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘ঠিক না।’

যাত্রীরা একে-অন্যের মুখ চাওয়া-চাউয়ি করতে লাগল। ড্রাইভার-কন্ডাক্টর স্ট্যাচুর মতো জমে গেল। সবাই কান খাড়া করে অপেক্ষা করতে লাগল, লোকটা এরপর কী বলে। 

‘আপনাগো চ্যালেঞ্জ কইরা কইতাছি যে বাংলাদেশে আপনাগো চাইতে বড় শক্তি আছে।’

এবার আর কেউ কোনো কথা বলল না। চাতক পাখির মতো হাঁ করে লোকটার কথা শুনতে লাগল। মঞ্জুয়ারার ভয় হচ্ছিল বাস না আবার অ্যাক্সিডেন্ট করে।

লোকটা কিছুক্ষণ সময় নিল। তারপর মুচকি হাসি হেসে ঝুলি থেকে বের করল একগাদা ট্যাবলেট। যাত্রীদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিয়ে বলল, ‘এই হচ্ছে শ্রীপুরের ট্যাবলেট। সবুজটা সকালে আর লালটা রাইতে ঠাণ্ডা পানি দিয়া খাইবেন। সকল ব্যথা-ব্যাদনা-গেস্টিক-টাইফয়েড-জণ্ডিস-পলিপ-মূত্ররোগ সাইরা যাবে। বাংলাদেশে এর চাইতে বড় কোনো শক্তি নাই।’

হাতেগোনা কয়েকজন যাত্রী হেসে উঠল। বাকিদের অনেকে বিড় বিড় করতে লাগল, ‘হ্যাঁ, শ্রীপুরের ট্যাবলেটের নাম শুনছি বটে, কিন্তু এই জিনিস কী এহনো পাওয়া যায়?’

লোকটা এক তাড়া হ্যান্ডবিল বিলাতে বিলাতে বলল, ‘আগের দিন আর নাই। শ্রীপুরের ট্যাবলেট এখন বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত। জাতিসংঘ, সার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবাই এই ট্যাবলেট নিয়া রিসার্চ করতাছে।’

যাত্রীদের মনোযোগ পেয়ে লোকটা উৎসাহিত হয়ে বলতে লাগল, ‘শ্রীপুরের ট্যাবলেট আছে দুইটা, লাল আর সবুজ। লালডা হইলো গিয়া নিশাত আর সবুজডা সুরঞ্জন। যেমন নাম, তেমন কাম। এক পাতা ট্যাবলেট মাত্র একশ ট্যাকা একশ ট্যাকা একশো ট্যাকা।’

কয়েকজন যাত্রী দ্বিধা নিয়ে কেনার পর বাকিরা হামলে পড়ে কিনতে শুরু করল। লোকটা ট্যাবলেট বিক্রি করতে করতে মঞ্জুয়ারার সামনে যাওয়া মাত্র সেই বুড়ো যাত্রী তাকে কানে কানে কথা বলার ইশারা করল। বুড়োর কথা শুনে নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে গেল লোকটা। যেন অমরত্বের ওষুধ বেচছে এমন ভঙ্গি করে বলল, ‘পুরুষের সকল সমস্যার সমাধান নিশাত ট্যাবলেট। ট্যারা-বেঁকা, লম্বা-খাটো, নরম-নিস্তেজ, ঘন-পাতলা সব সারায়া ফেলব।’

ভরা হাটে হাঁড়ি ভেঙে যাওয়ায় বুড়ো একটু লজ্জা পায়। কিন্তু দুই পাতা নিশাত কিনতে ভুল করে না। মুহূর্তেই বাসে নিশাত ট্যাবলেটের কাটতি বেড়ে যায়। এমনকি ড্রাইভার-কন্ডাক্টরও এক পাতা করে কেনে।

বাস চলতে থাকে ধুঁকে ধুঁকে। পোস্তগোলা মোড়ে মঞ্জুয়ারার সহযাত্রী নেমে গেলে সিট খালি হয়। লোকটার বিক্রিবাট্টা ততক্ষণে শেষ। সে মঞ্জুয়ারাকে জানালার দিকে বসার ইঙ্গিত করে খালি সিটে টুপ করে বসে পড়ে।

জেলখানা পার হওয়ার পর বাস শাঁ শাঁ করে ছুটতে থাকে। মঞ্জুয়ারার অনেকক্ষণ গা গুলাচ্ছিল, সে জানালা খুলে হড় হড় করে বমি করে দেয়। বমি করে তার মনে পড়ে পানির বোতল আনা হয়নি। মুহূর্তেই মুখটা আরো বিস্বাদ হয়ে যায়। লোকটা কিন্তু মঞ্জুয়ারাকে খেয়াল করেছে। সে ঝোলা থেকে পানির বোতল বের করে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘একটা ট্যাবলেট খাইয়া দেখবেন নাকি?’ মঞ্জুয়ারা কুলি করে এক ঢোক পানি খেয়ে বলে, ‘পুরুষ মাইনষের ট্যাবলেট আমি খাইয়া কি করুম?’ লোকটা হাসে। পেল্লায় গোঁফের আড়াল থেকে ঝিকিয়ে ওঠে তার সাদা দাঁত। ‘আপনে খাইবেন সবুজটা। ওইটা মাইয়া-পুরুষ সবাই খাইতে পারে।’

মঞ্জুয়ারা হাত পাতে। বলে, ‘আমি কিন্তু পয়সা দিবার পারুম না।’ লোকটা একটা সবুজ ট্যাবলেট আলগোছে বের করে মঞ্জুয়ারার হাতে রাখে। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘পয়সা আমি চাইছি নাকি?’