ভদ্রলোক শব্দের শব্দগত বা আভিধানিক অর্থ ভালো আচরণসম্পন্ন ব্যক্তি। ভদ্রলোক বলতে আমরা এমন মানুষই চিনি, যারা যেকোনো সংঘাত ও বিতর্ক এড়িয়ে চলেন এবং বিতর্ক আবশ্যক এমন জায়গায়ও নিজের নম্র ও শান্ত আচরণ বজায় রাখেন। তবে বাঙালি ভদ্রলোক টার্মটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি শ্রেণীকে ইঙ্গিত করে গত শতাব্দীতে পরিচিতি লাভ করে। মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় বঙ্গভূমিতে ব্রিটিশ শাসনামলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গোত্রীয় এক নতুন শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে, যারা ‘বাঙালি ভদ্রলোক’ হিসেবে পরিচিতি পান। আভিজাত্য বা জ্ঞানভিত্তিক পরিচয় দিয়ে শুরু হলেও টার্মটি পরবর্তী সময়ে ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার হতে শুরু করে কলকাতাভিত্তিক উচ্চবংশীয়, কিন্তু মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের ইঙ্গিত করে যারা দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র বা সংস্কৃতিসংক্রান্ত সব বিষয়েই প্রচুর বুদ্ধিবৃত্তিক মন্তব্য করলেও উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান রাখতেন না। কথা বেশি কিন্তু কাজ কম করা এ শ্রেণী তাই বুদ্ধিবৃত্তিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না এনেই উপমহাদেশের ইতিহাসে স্থান গ্রহণ করে ফেলেছিলেন।
ইতিহাসবিদ ও রয়াল সোসাইটির সদস্য শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, একচেটিয়াভাবে না হলেও প্রাথমিকভাবে ‘বাঙালি ভদ্রলোক’ বাংলার তিনটি ঐতিহ্যবাহী উচ্চ বর্ণ— ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থের অন্তর্গত। সম্পদ বৃদ্ধি, ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব ও প্রশাসনিক পদলাভের মাধ্যমে পাওয়া উচ্চ মর্যাদা এ ‘নতুন অভিজাততন্ত্রের’ উত্থানের কারণ ছিল। যেহেতু তৎকালীন হিন্দু সমাজের তিনটি উচ্চ বর্ণের বিশালসংখ্যক মানুষের প্রশাসনিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা ছিল, তাই তারা উনিশ শতকের বাংলায় ‘ভদ্রলোক’দের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশজুড়ে ছিলেন। তবে ভদ্রলোক টার্মটি কখনই আবদ্ধ কোনো গ্রুপ ছিল না, বাস্তবে এটি ছিল উন্মুক্ত গোষ্ঠী। অনেক ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ দরিদ্র এবং নিরক্ষর হওয়ায় ভদ্রলোক হিসেবে গণ্য হতো না। কিন্তু উনিশ শতকের শেষদিকে অনেক মধ্যম সারির কৃষক ও ব্যবসায়ী শিক্ষা ও সম্পদগত উন্নতি করার মাধ্যমে ভদ্রলোক শ্রেণীভুক্ত হয়েছেন। পরিবর্তন আসুক বা না আসুক বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উপমহাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে ভদ্রলোকদের পদচারণা ছিল প্রবলভাবেই। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু হলেও এ অঞ্চলের রাজনীতিতে ‘ভদ্রলোক’দের প্রাধান্য ছিল দেশভাগের আগ থেকেই। ১৯৪৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গের অনেক মুখ্যমন্ত্রীই এ সামাজিক গোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছিলেন।
তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছিলেন বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীর সদস্যরা সম্ভবত অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের প্রভাষক ও ট্রিনিটি কলেজের ফেলো জয়া চ্যাটার্জি ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অবনতির জন্য ভদ্রলোক শ্রেণীকে দায়ী করেন। তিনি তার ‘দ্য স্পয়েলস অব পার্টিশন’ বইতে লিখেছেন, ‘সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাজনীতির প্রতি তাদের অনুমিত প্রতিভা নিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাস থাকার পরেও, বাংলার ভদ্রলোক গোত্রীয় নেতারা বিষয়গুলো নিয়ে গভীর ভুল বিচার করেছিলেন কারণ, প্রকৃতপক্ষে, তারা রাজনৈতিক শ্রেণী হিসাবে গভীরভাবে অনভিজ্ঞ ছিলেন। তারা উচ্চ শিক্ষিত এবং পরিশীলিত ছিলেন যা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তারা কখনই বাংলার রাজনীতি বা অর্থনীতির নেতৃস্থানীয় হতে পারেনি।’
জয়া চ্যাটার্জি তার বইতে ভদ্রলোকদের জীবনাচরণ নিয়েও সমালোচনা করেছিলেন এই বলে, ‘ভদ্রলোকেরা জমির আয় দিয়ে জীবনযাপন করত, কিন্তু কখনও কৃষি ব্যবসার আয়োজন করেনি। তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক হিসাবে, তারা উৎপাদন ও ব্যবসার কৌশল খুব কমই বোঝে...... রাজ্যশাসন ও জনগণ থেকে কর আদায় করার ক্ষেত্রে তাদের তেমন কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। ১৯৪৭ সাল নাগাদ বাংলার ভদ্রলোক একটি পশ্চাৎমুখী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল।’ শিক্ষিত হলেও এ ভদ্রলোকদের বড় একটি প্রতিবন্ধকতা ছিল তাদের অতীতে বসবাস, সেকেলে চিন্তাধারায় আটকে থাকা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা। নিজেদের স্বার্থ ও উদ্দেশ্যের প্রতি ভদ্রলোকেরা অতিরিক্ত মনোনিবেশ করার ফলে নিজেদের চারপাশে ঘটে চলা ভারতবর্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপুল পরিবর্তনের প্রতি তাদের অন্ধত্ব তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা।
প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের লেখায়ও বিংশ শতাব্দীর ভদ্রলোক শ্রেণীর পরিচয় উঠে এসেছে কাল্পনিক চরিত্রদের হাত ধরে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস এবং গল্পসহ জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যে ভদ্রলোক শ্রেণীটি প্রায়ই দেখা যায়। জমিদারি নেই, কিন্তু শিক্ষা ও প্রয়াত জমিদারত্বের অহংকার থেকে চালিত মনোভাবের ফলে নাটুকে ও অভিনয়প্রবণ জীবনযাপন করা চরিত্রদের গল্প শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস দেবদাস ও শ্রীকান্ত কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে উঠে এসেছে বারবার। কালীপ্রসন্ন সিংহ তার বিখ্যাত বই ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’তে ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রাধান্য পাওয়ার সময় এ শ্রেণীটির সামাজিক মনোভাব ও ভণ্ডামির সমালোচনা করেছেন ব্যঙ্গাত্মক স্বরে।
‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ কলকাতার ‘অভিজাত ভদ্রলোক’দের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে, কারণ বইতে ছদ্মনামের আড়ালে থাকা মানুষের পরিচয় অস্পষ্ট ছিল না পাঠকদের কাছে। প্রথম খণ্ড প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার ‘ফুলবাবু ভদ্রলোকেরা’ রে রে করে উঠেছিলেন, কারণ নকশার লেখক কাউকে যে ছেড়ে কথা বলেননি। এমনকি নিজেকেও তুলোধুনো করেছিলেন তিনি চরিত্রের আড়ালে। বইটি প্রকাশের পর কালীপ্রসন্ন সিংহ বহু মানুষের শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। নকশার প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘সত্য বটে অনেকে নকশাখানিতে আপনারে আপনি দেখতে পেলেও পেতে পারেন, কিন্তু বাস্তবিক সেটি যে তিনি নন তা বলাই বাহুল্য, তবে কেবল এইমাত্র বলতে পারি যে আমি কারেও লক্ষ্য করি নাই অথচ সকলেরেই লক্ষ্য করিচি। এমনকি স্বয়ংও (আমি নিজেও) নকশার মধ্যে থাকিতে ভুলি নাই।’ প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর পাঠক ও ভদ্রলোক সমাজ যখন কালীপ্রসন্নের ওপর ক্ষেপে উঠলেন, তখন দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘তবে বলতে পারেন ক্যানই বা কলকেতার কতিপয় বাবু হুতোমের লক্ষ্যান্তবর্ত্তী হলেন, কি দোষে বাগাম্বর বাবুরে প্যালানাথকে পদ্মলোচনকে মজলিসে আনা হলো, ক্যানই বা ছুঁচো শীল, প্যাঁচা মল্লিকের নাম কল্লে, কোন দোষে অঞ্জনারঞ্জন বাহদুর ও বর্ধমানের হুজুর আলী আর পাঁচটা রাজা রাজড়া থাকতে আসরে এলেন?’
ভদ্রলোকেরা যে নিজেদের বিষয়ে এ-জাতীয় ব্যঙ্গের জবাবে থেমে ছিলেন এমন নয়। হুতোম প্যাঁচার নকশা প্রকাশের পর অনেকেই কালীপ্রসন্ন সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় ‘আপনার মুখ আপুনি দেখ’ শিরোনামের বই প্রকাশ করে এক চোট প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। প্যারীচাঁদ মিত্রের পুত্র চুনীলাল মিত্রও কালীপ্রসন্ন সিংহের ওপর ক্ষেপেছিলেন। তিনি প্রকাশ করলেন ‘কলিকাতার নুকোচুরি’ নামের একটি ছোট পুস্তিকা, যাতে কালীপ্রসন্ন সিংহকে ভালোই তুলোধুনো করা হয়েছিল। চুনীলাল মিত্র লিখেছিলেন, ‘হুতোম নিজে বজ্জাত হয়ে অন্যের খুঁত ধরছেন। হুতোম জীবনে যা করেছেন সবাই খারাপ কাজ। ভালোর মধ্যে শুধু ওই মহাভারত।’
১৯৯০ ও এ শতাব্দীর শুরুর দশকে চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ড তাদের ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’,”‘আমার মধ্যবিত্ত ভেরু প্রেম’, ‘আমরা বাঙালি জাতি’ এবং আরো অনেক গানের কথায় বাঙালি ভদ্রলোকদের দ্বিচারিতা ও পরস্পরবিরোধী সামাজিক ভূমিকা তুলে ধরেছিল।
তবে কথা বেশি কিন্তু কাজ কম করার কালচারসম্পন্ন এ শ্রেণীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ভূমিকাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক ধরে ফেলেও দেয়া যায় না। ব্রিটিশ শাসনামলে সম্পন্ন হওয়া বঙ্গীয় অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক একটি আন্দোলন ছিল ‘বাংলার নবজাগরণ’, যাকে বাঙালি রেনেসাঁও বলা হয়। এর সময়কাল ছিল আঠারো শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত। এ নবজাগরণে ভদ্রলোক শ্রেণীর সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। বলা যায় রেনেসাঁর আংশিক প্রভাবেই বাঙালি ভদ্রলোক গোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবির্ভাব ঘটে। প্রাথমিকভাবে রেনেসাঁ ছিল বাঙালি হিন্দুদের নেতৃত্বে, যারা ঔপনিবেশিক বাংলায় বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। এ নবজাগরণে সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিশিষ্ট পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। পরবর্তী সময়ে উল্লেখযোগ্য বাঙালি মুসলিম অবদানকারীদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, লেখক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মীর মশাররফ হোসেন, ভাষাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ। শুরুতে নবজাগরণে কেবল বাংলার হিন্দু সমাজের উঁচু স্তরের সামান্য অংশ প্রভাবিত হলেও শেষাবধি মুসলিম সমাজ ও উপমহাদেশের সব প্রান্তে এ নবজাগরণ ছড়িয়ে পড়ে।
বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীর অস্তিত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত ও সীমিত হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের মাঝে অনেকটাই ভিন্নভাবে প্রভাবিত রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সে মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী শিক্ষিত ও কিছুটা রুচিশীল অর্থ সম্পদের অধিকারী হলেও একই সঙ্গে ছিলেন প্রাচীনপন্থী এবং দ্বিচারিতাবিশিষ্ট; তাদের মতো চিন্তাধারার মধ্যবিত্ত শ্রেণী বাংলাদেশের নাগরিক সমাজেও গড়ে উঠতে শুরু করে আশির দশকের পরই। নতুন এ মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ যারা সম্পদের দিক থেকে দরিদ্রও নয় আবার অভিজাতও নয়, শিক্ষিত কিন্তু শিক্ষা নিয়ন্ত্রকও নয়, প্রশাসনে অংশগ্রহণকারী কিন্তু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণকারী নয়; প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সাহিত্য-সংস্কৃতির বিস্তৃত পরিমণ্ডলজুড়ে। সময়ের সঙ্গে এরাও কি স্থান পাবেন বাঙালি ভদ্রলোকের ন্যায় নতুন কোনো ব্যঙ্গাত্মক রূপে নাকি হয়ে উঠবেন আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আমাদের হয়তো পরবর্তী শতাব্দী পর্যন্ত।
ফাহাদ হৃদয়: প্রতিবেদক, বণিক বার্তা









