বাংলায় ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হয়েছিল বিশেষ একটি শ্রেণী। এরা ভদ্রলোক নামে পরিচিত। মূলত ইংরেজি ও প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত, ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি চাকরিজীবী শ্রেণীটিই ভদ্রলোক নামে পরিচিত হয়। এরা ব্যুরোক্রেসি ও প্রশাসনেও ছিলেন। নানা কারণে তাদের নিয়ে সরকারের তৈরি হয়েছিল সমস্যা। তাদের দিয়ে কাজ করানো যেত না। একটা সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগত অনেক। এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন এডউইন মন্টেগুও। ১৯১৭ সালের ১ ডিসেম্বর তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘আশা করেছিলাম আমাদের আমলাতন্ত্র বিষয়টা বুঝতে পারবেম, কিন্তু সত্যতা হলো আমরা ভূমিকম্পের মতো একটা অবস্থার ওপর বসে আছি।’ মূলত ভারতের আইসিএসদের দিয়ে কাজ করাতে না পারার ক্ষোভ থেকে তিনি এ কথা লিখেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে দেখা যায় তিনি কর্মকর্তদের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন ও সংস্কার বিষয়ের জরুরি পরিস্থিতি বোঝাতে পারেননি। বঙ্গভঙ্গের পর বাংলায় যে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হয়েছিল পরে তা সাংবিধানিক সংস্কার ও অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই খেয়াল করেছিল। এছাড়া বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল সে সময় সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। ১৯১৩-২০ সাল পর্যন্ত অস্থিতিশীল অবস্থা ছিল। এরপর গান্ধী এসে শান্তির ডাক দেন। তিনি এসব অশান্ত মানুষকে অহিংসার পথ দেখানোর চেষ্টা করেন এবং হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মতোই ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯২১ সালে বাংলার অবস্থা ১৯১৩ সালের মতো ছিল না। নতুন সংবিধানের কারণে সেখানে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়। সে উদ্দেশ্যেই বেশকিছু রাজনৈতিক দল কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থিতাবস্থা আনা। সেই সঙ্গে তাদের আশা ছিল নিজেদের তারা নিয়ে যাবেন ক্ষমতার কাছাকাছি। আবার কাউন্সিলের বাইরে একটা গোষ্ঠী ছিল যারা এ কাজ বন্ধ করার চেষ্টায় ছিল।

এ সময় থেকে স্বরাজের দাবি আরো জোরেশোরে উঠতে শুরু করে। নতুন সংবিধান অনুসারে স্থানীয়দের হাতে সে রকমই বেশি ক্ষমতা দেয়ার একটা বিষয় ছিল। মূলত মর্লে-মিন্টো প্রস্তাব বা সংস্কার থেকে সরে এসে নতুন করে মন্টেগুর তৈরি সংবিধানের মধ্য দিয়ে ভিন্নভাবে কাজ করার চেষ্টা হয়েছিল। সেখানে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল নানা শ্রেণীর মানুষ। ১৯২১-২৩ সালে বেশ ভালো কাজ হয়েছিল, যা কিনা পূর্বরর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী চরমপন্থার বিপরীতে একটা স্থিতাবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছিল। এরপর অন্য এক পরিস্থিতি থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন, যা ১৯২৩ সালে দ্বিতীয় মন্টেগু-চেমসফোর্ড কাউন্সিল তৈরিতে বাধ্য করে।

১৯২১ সালের জানুয়ারিতে তেজ বাহাদুর সাপ্রু লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি পুরো বিষয়টি কেমন যাবে তা নির্ভর করবে সরকার ও লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ও কাউন্সিল অব স্টেটের সম্পর্কের ওপর।’ এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন, ‘আর অন্যান্য প্রদেশে বিষয়টি কাজ করবে সেখানকার মন্ত্রীরা কেমন কাজ করেন বা তাদের কাজ করতে দেয়া হয়।’ এখান থেকেই সরকার ও ভদ্রলোকদের মধ্যকার বোঝাপড়া বা সম্পর্কের গুরুত্বটা বোঝা যায়। সাপ্রু জানতেন সরকার ও জাতীয়তাবাদী ভদ্রলোকদের মধ্যে বোঝাপড়া ভালো হলেই কেবল এ নতুন সংবিধান কাজ করবে।

সাপ্রু আরো বলেছিলেন, নতুন ধারা ও সংস্কার হয়েছে তা যদি ভদ্রলোক শ্রেণীর জন্য সুবিধাজনক হয়, তবেই এটি কাজ করবে। মূলত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে হওয়ার নানা মত, চরমপন্থা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের ফলে সে সময়টা ছিল উত্তাল। এতে যুক্ত হয়েছিলেন ভদ্রলোক শ্রেণীটিও। তাদের নিয়েই তৈরি হয়েছিল সেকালের রাজনৈতিক দলগুলো।

নতুন সংবিধান কেমন কাজ করবে তা নির্ভর করেছিল গভর্নরের পক্ষ থেকে মন্ত্রী বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে। কেননা তারাই সরকার ও লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মধ্যে সেতু হিসেবে ছিলেন। ফলে গভর্নরের সিদ্ধান্তই ঠিক করবে এ সম্পর্ক ও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। লর্ড রোনাল্ডশে এ সময় ছিলেন গভর্নর। আগের বছরই তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন বাংলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই। রোনাল্ডশের চেষ্টা ছিল নতুন সংবিধানকে ঠিকমতো কাজে লাগানোর। তিনি এর গুরুত্বও অনুভব করেছিলেন। তবে তিনি বলেছিলেন যারা বিষয়টির সঙ্গে একমত না তারা আলাদা হয়ে থাকতে পারেন।

রোনাল্ডশে তার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জিকে। সুরেন্দ্রনাথকে তিনি নিজের ‘পুরনো সমালোচক’ বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া সেকেন্ড মিনিস্টারাল পোস্ট দেয়া হয় সুরেন্দ্রনাথের নমিনি প্রভাস চন্দ্র মিত্রকে। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল লিবারেল লীগের সেক্রেটারি। ১৯২০ সালে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় স্যার আবদুর রহিমকে। তাকে যুক্ত করার মাধ্যমে ধর্মের ক্ষেত্রে একটা সাম্যাবস্থা রাখা হয়, কেননা একজন মুসলিম অন্তত প্রয়োজন ছিল পুরো ব্যবস্থার মধ্যে। এছাড়া যুক্ত হন নওয়াবালী চৌধুরী।

এদের মধ্যে চৌধুরীর কাজকর্ম বা তার অর্জনগুলো ছিল সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। তাকে সিস্টেমের সঙ্গে একত্ব করার মাধ্যমেও একটা সম্প্রদায়কে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। বিশেষত বাংলার মুসলমানদের কাছে সরকারকে প্রাসঙ্গিক করা ও সরকারের পারপাজ সার্ভ করার জন্য এর প্রয়োজন ছিল। সরকার চেয়েছিল আবদুর রহিম ও চৌধুরীর মাধ্যমে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে সরকারের নীতি প্রবেশ করানো।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ভালো কাজ করেছিলেন। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। একটা দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়েছিলেন ব্যানার্জি। সরকারের পক্ষ থেকে এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি এ সময় প্রাসঙ্গিক ছিলেন। নিজেকে তিনি একজন সত্যিকার বাঙালি ভদ্রলোক প্রমাণ করেছিলেন।

কিন্তু এর মধ্যে কমিশনে যুক্ত হয়েছিলেন আরো কিছু মানুষ। তারা ছিলেন তুলনামূলক তরুণ। ফলে কাউন্সিলে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। তার মধ্যে বিশের দশকে শুরু হয় নতুন আন্দোলন। সেখানে এ মন্ত্রীরা যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারেননি। সরকারের ধারণা ছিল তারা যেহেতু এক একটা অংশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা চাইলেই সে মানুষের নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল খেলাফত, অসহযোগ প্রভৃতি চলমান আন্দোলনের মধ্যে সরকারের মন্ত্রীরা খুব বেশি কিছু করতে পারলেন না। আরো বড় বিষয় হলো কেবল বাংলার ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ সরকারকে এ সমস্যায় পড়তে হয়েছে। অন্য কোনো অঞ্চলে এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। কেননা আন্দোলনগুলোর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বাঙালি ভদ্রলোকরা।

১৯২১ সালের জানুয়ারিতেই রোনাল্ডশে একটা মিটিং করেন। সেখানে আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাজেট। সে সময় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এজে খের জানান, সরকারের কাছে বাজেটের ক্ষেত্রে ২ কোটি রুপির ঘাটতি আছে। প্রাদেশিক অর্থনীতি সে সময় আরো বেশি দুরবস্থার মধ্যে আছে। অর্থনৈতিক এ দুরবস্থা শাসনের জন্য সংকট তৈরি করবে। এক্ষেত্রে খেয়াল করার মতো বিষয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। যুদ্ধে ব্রিটেন সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল আর ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ভারতেও এসেছিল তার আঁচ। যুদ্ধের আগেও বাংলার অর্থনীতি নিয়ে সরকার ততটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। যুদ্ধের পরে যেভাবে কাজ করা প্রয়োজন ছিল সরকার তা-ও করতে পারেনি।

পরবর্তী সময়ে মর্লে মিন্টো লেজিসলেচার আসে। এর অবস্থাও অনেকটাই মন্টেগু-চেমসফোর্ড কমিশনের মতোই হয়েছিল। সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে কোম্পানির শাসন ছেড়ে ব্রিটিশরাজের শাসন এসেছিল। সেখানে ক্ষমতার আসনে ছিল ব্রিটিশ আমলারা, কিন্তু তাদের সহযোগী ছিল বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণী। মজার ব্যাপার এ দুই শ্রেণীই মূলত পরস্পরের মতো আচরণ করত। বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণী আচরণ শিখেছিল ব্রিটিশদের কাছ থেকেই। তাদের ছাঁচেই নিজেদের তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সংস্কার ক্ষেত্রে এসে দেখা গেল কোনোকিছুই তারা সরকারি নীতি অনুসারে সাজিয়ে নিতে পারছেন না। সরকারের এ ব্যর্থতার কারণ ছিল দুই শ্রেণীর ভদ্রলোক। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ব্রিটিশ আমলা ভদ্রলোক ও বাঙালি ভদ্রলোক। সব মিলিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনাই সুষ্ঠুভাবে কাজ করেনি। ব্যর্থ হয়েছিল সব ধরনের সংস্কার।

মাহমুদুর রহমান: লেখক ও প্রাবন্ধিক