উচ্চাঙ্গ সংগীতের দ্বিতীয় শাখা বলা হয় খেয়ালকে। মোগল আমলের শেষ ভাগে খেয়ালের গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। এর পর থেকে ক্ল্যাসিক্যাল সংগীত হিসেবে ধ্রুপদের সঙ্গেই খেয়ালের নাম উচ্চারিত হয়। সপ্তদশ শতকে মোহাম্মদ শাহের শাসনামলে মোগল দরবারের প্রধান সংগীতজ্ঞ নেয়ামত খান খেয়ালের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি সদারঙ্গ নামে পরিচিত ছিলেন। জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় অনেকে সদারঙ্গকে খেয়ালের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করেন। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারের ওস্তাদ সামিও খেয়ালের চর্চায় বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। ওস্তাদ সামি একই সঙ্গে কাওয়ালির পরম্পরারও উত্তরাধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন আমীর খুসরোর শিষ্য মিয়া সামাত বিন ইব্রাহিমের সংগীত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। আমীর খুসরো কাওয়ালির জনক, একই সঙ্গে তাকে খেয়ালের উদ্ভাবক হিসেবেও মর্যাদা দেয়া হয়। এখানে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হলো আমীর খুসরো ও সদারঙ্গের সময়কালের পার্থক্য অন্তত ৫০০ বছর।

‘খেয়াল এটি উচ্চাঙ্গ সংগীতের দ্বিতীয় শাখা; প্রথম শাখা ধ্রুপদের চেয়ে এটি লঘু এবং এতে কল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন অলংকার প্রয়োগ ও তান বিস্তার দ্বারা সৌন্দর্য রচনার সুযোগ আছে। খেয়াল ধ্রুপদের মতো কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলে আবদ্ধ নয়।’

খেয়ালকে বলা হয় ইলম-উল-ইলহাম (কণ্ঠের জ্ঞান) আর কাওয়ালিকে বলা হয় ইলম-উল-কালাম (শব্দের জ্ঞান)। মোগল আমলের শিল্পচর্চাগুলোর মধ্যে সংগীতের ইতিহাস বেশ ভালোভাবে লিপিবদ্ধ আছে। খেয়াল উচ্চমার্গীয় সংগীত ঘরানা হিসেবে অভিজাত দরবারে কিংবা সমাজেই ছিল এর চর্চা। খেয়ালের উদ্ভবকাল নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন এর উদ্ভব ভারতবর্ষের প্রাক-ইসলামী যুগে। তবে অনেকে এ ধারণা নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। খেয়াল শব্দটি এসেছে আরবি ভাষা থেকে। খেয়ালের ওপর ধ্রুপদের প্রভাবও সামান্য। তাই তারা মনে করেন খেয়ালের উদ্ভব প্রাক-ইসলামী আমলে হতে পারে না।

বিশ শতকের আগে খেয়াল সূত্রবদ্ধ করা হয়নি। মৌখিক রীতি ও পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই এ ধারা অব্যাহত থেকেছে। তাই খেয়ালের ইতিহাস নিয়ে নানা মতের প্রাধান্য দেখা যায়। তবে খেয়ালের ইতিহাস মূলত তিনটি চরিত্র ঘিরে আবর্তিত—আমীর খুসরো, সদারঙ্গ ও হুসাইন শাহ শারকি।

গবেষক ক্যাথরিন স্কোফিল্ড মনে করেন, খেয়াল প্রথম চর্চা করতেন কাওয়াল বাচ্চো কা ঘরানার সদস্যরা। এটি কাওয়ালির সবচেয়ে পুরনো ঘরানা এবং এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আমীর খুসরো। এ ঘরানার সদস্যরা সুফি দরগা ও দরবারে খেয়াল গাইতেন। স্কোফিল্ডের দাবি সদারঙ্গ নিজেই খেয়াল শিখেছিলেন একজন কাওয়ালের কাছ থেকে। সদারঙ্গ যেহেতু রাজদরবারের গায়ক ছিলেন এবং অভিজাতদের সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল, তাই খেয়ালকে তিনি আলোচনায় আনতে পেরেছিলেন। আর এ কারণেই তিনি খেয়ালের উদ্ভাবক হিসেবে কৃতিত্ব পান। স্কোফিল্ড দেখিয়েছেন, মোগল শাসনামলের শেষ ভাগে অনেক কাওয়ালই ছিলেন শীর্ষস্থানীয় খেয়াল গায়ক। খেয়াল নিয়ে স্কোফিল্ডের গবেষণা কয়েকটি বিষয় হাজির করে। খেয়ালের উদ্ভবের কোনো নির্দিষ্ট লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় না; যা পাওয়া যায় তা সুফি আধ্যাত্মিক সংগীত ও মোগল দরবারের পৃষ্ঠপোষকতা খেয়ালকে বিকশিত করেছিল। ষোলো শতক থেকে খেয়ালের চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়, কিন্তু হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রভাবশালী ঘরানা হিসেবে আবির্ভূত হয় আঠারো শতকে এবং এখনো সে প্রভাব অব্যাহত আছে। সংগীতের বৈশিষ্ট্যের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাওয়ালির সঙ্গে খেয়ালের কিছু সাদৃশ্য আছে। তাই আমীর খুসরোর প্রতিষ্ঠিত কাওয়াল বাচ্চো কা ঘরানাকেই খেয়ালের উদ্ভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক-ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের বাড়বাড়ন্ত খেয়ালকে তার ইসলামী সংযোগ বা কাওয়ালির সঙ্গে সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেয়। গবেষণা দেখায় কাওয়ালি ও খেয়ালের বিকাশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

 

সংক্ষেপিত ভাষান্তর: অমিত রহমান