দুর্গাবতী ঘোষের জন্ম ১৯০৫ বা ১৯০৬ সালে, কলকাতায়। তার বাবা গিরীন্দ্রশেখর বসু ছিলেন ভারতে মনঃসমীক্ষণের অগ্রদূতদের একজন। গিরীন্দ্রশেখর যখন কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন, তখন জন্ম হয় দুর্গাবতীর। বাংলার বিখ্যাত এ মনোবিজ্ঞানী গিরীন্দ্রশেখর বসুই ভারতে প্রথম ইন্ডিয়ান সাইকোঅ্যানালিটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। দুর্গাবতী ঘোষ স্থানীয় ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে ১৯২১ সালে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি চারুচন্দ্র ঘোষের ছেলে রবীন্দ্রচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
স্বামী রবীন্দ্রচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে ১৯৩২ সালে প্রথমবার ইউরোপ ভ্রমণ করেন দুর্গাবতী ঘোষ। পরে এ ভ্রমণের ইতিবৃত্ত নিয়ে প্রকাশিত হয় তার ভ্রমণকাহিনী ‘পশ্চিমযাত্রিকী’। ১৯৩৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় সাত কিস্তিতে প্রকাশিত হয় রচনাটি, পরের বছর প্রকাশিত হয় বই হিসেবে। প্রথমবার প্রকাশের পরই পশ্চিমযাত্রিকী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যে যুগে নারী আক্ষরিক অর্থেই অন্তঃপুরবাসী ছিল, সে যুগে এক নারী ইউরোপ ভ্রমণ সেরে এসেছেন এবং লিখেছেন ভ্রমণকাহিনী। এ বিষয় প্রথমে সবার নজর কাড়ে। আর দ্বিতীয়ত, দুর্গাবতীর লেখার শৈলী ও মতামত প্রকাশের ধরনও বোদ্ধামহলে আলোচিত হয়। দুর্গাবতীর লেখায় তারা খুঁজে পান বাঙালি নারীর মনন এবং আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শ পাওয়া এক নতুন বৈশিষ্ট্যের সম্মিলন।
দুর্গাবতীর ভ্রমণকাহিনীটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পর লেখক মোহিতলাল মজুমদার ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লেখেন, ‘আমাদের ঘরের একটি মেয়ে বেরিয়ে পড়েছে—সমুদ্র, পর্বত, মরুভূমি এবং আধুনিক সভ্যতার পূজাস্থানে।’ জয়তী গুপ্তের ‘ট্রাভেল কালচার, ট্রাভেল রাইটিং অ্যান্ড বেঙ্গল উইমেন (১৮৭০-১৯৪০)’ বইয়ে ইংরেজিতে উদ্ধৃত বক্তব্যটিকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। বর্তমান রচনায় ব্যবহৃত পরবর্তী উদ্ধৃতিগুলোও উল্লিখিত বই থেকে অনূদিত।
উনিশ ও বিশ শতকের প্রথম দশকগুলোয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভারতীয় নারীর জন্য ভ্রমণ বলতে সাধারণত বোঝাত স্বামীর সঙ্গে কোথাও যাওয়া—স্বামীর চাকরি, লেখাপড়া কিংবা পেশাগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনে। জয়তী গুপ্ত লিখেছেন, ‘কিন্তু দুর্গাবতীর ভ্রমণকাহিনী একেবারে ভিন্ন রকম। এখানে বিদেশ ভ্রমণ একটি উপভোগ্য ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে উঠে এসেছে, যেখানে লেখক নিজেই প্রধান চরিত্র।’ যদিও দুর্গাবতী পুরো লেখায় বারবার উত্তম পুরুষকে বহুবচনে (আমরা) ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও পর্যবেক্ষণ ও রচনাশৈলীর কারণে তার স্বতন্ত্র সত্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত শতকের গোড়ার দিকে যখন ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হচ্ছিল, সাধারণত পুরুষরাই উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত কারণে বিলেতে যেতেন। তবে ‘গৃহবন্দি’ নারীরাও এ রাজনৈতিক-ভৌগোলিক শক্তি নিয়ে কৌতূহলী ছিলেন। ওই সময় বাঙালি নারীর বিদেশ ভ্রমণকে নারীবাদী অবস্থান, সামাজিক প্রথাবিরোধিতা কিংবা অভিযানের স্পৃহা হিসেবে দেখা হতো না। তবে এ ধরনের ভ্রমণ এবং বিশেষ করে ভ্রমণকাহিনী ছিল বিরল ও নতুন। দুর্গাবতীর লেখায় দেখা যায় চেনা অন্তঃপুর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা, জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দূর ইউরোপযাত্রার অভিজ্ঞতা, জীবন নিয়ে অভিনব অনুভবের বহিঃপ্রকাশ।
‘পশ্চিমযাত্রিকী’তে বারবার তিনি চেনা কলকাতা আর বাড়ির প্রতি টানের কথা বলেছেন। তবে এও বলেছেন ‘নতুন স্থান দেখার আনন্দের মধ্যে কিছুটা কষ্ট তো সহ্য করা চলেই।’ দুর্গাবতীর ভ্রমণকাহিনীতে ইউরোপের নারী-পুরুষের আচরণ ও গৃহস্থালি ভূমিকা, পশ্চিমা সমাজে দারিদ্র্যের চিত্র, প্রবাসী বাঙালি ছাত্রদের উপস্থিতি সবই উঠে এসেছে। এমনকি আধুনিক সভ্যতার বার্তাবাহক ইউরোপীয় সভ্যতার সূক্ষ্ম সমালোচনাও পাঠক টের পাবেন। বেশকিছু ক্ষেত্রে দুর্গাবতী ইউরোপকে বর্ণনা করেছেন তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে। পাশাপাশি তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল আধুনিকতার প্রতিনিধিত্বকারী পশ্চিমা দেশের সংস্কৃতির প্রকৃত চিত্র। দুর্গাবতীর লেখায়, ‘একদিন বাসে করে কোথায় যাচ্ছিলাম। পাশে এক ইংরেজ মহিলা তার ছোট ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলেটি খেলা করতে করতে তার গালে একটু কাদা লাগিয়ে ফেলেছিল। শিক্ষিতা জননী তৎক্ষণাৎ নিজের থুথু দিয়ে রুমাল ভিজিয়ে ছেলের গালের কাদা তুলে দিলেন। ...আমাদের দেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মেথর—যারা অনবরত ময়লা পরিষ্কার করছেন—তাদেরও বোধ হয় থুথু দিয়ে ছেলের মুখ মোছানোর ইচ্ছা কোনোদিন হবে না।’
দুর্গাবতীর ভাবনা মৌলিক, উপমাচয়ন অনন্য এবং রচনা রসবোধসম্পন্ন। প্যারিসে একটি নাচের অনুষ্ঠানে দেখা ছিপছিপে নারীদেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘খুব ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির এক গৃহকর্মীর মুখে শুনেছিলাম, প্রথম পক্ষের স্ত্রী স্বামীর পাতে বসে খায়, দ্বিতীয় পক্ষের জন সঙ্গে বসে খায়, আর তৃতীয়জন খায় স্বামীর কাঁধে চড়ে। এই নাচ দেখে মনে হলো—শুধু খাওয়া কেন, এদের মত শরীর সুগঠিত হলে স্বামীর কাঁধে চড়ে পৃথিবীও পরিভ্রমণ করা যায়।’
‘পশ্চিমযাত্রিকী’তে লেখক বলেছেন, এ ভ্রমণ শুধু উপভোগ নয়, তার জন্য একটি শিক্ষাও ছিল। আক্ষরিক অর্থেই পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতেই ইউরোপকে দেখেছেন দুর্গাবতী। কয়েক মাসের এ ইউরোপ যাত্রা তাকে শুধু অচেনা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়নি, বরং নতুন করে আত্মপরিচয়ের মুখোমুখি করেছে। ইউরোপের প্রতিটি কোণে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেছেন একজন বাঙালি নারী হিসেবেই। অনেক জায়গায় তার শাড়ি, সিঁদুর, চুড়ি ইত্যাদি নিয়ে বিদেশীদের কৌতূহল ছিল। এ কৌতূহল ও বিস্ময়ের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন স্বীকৃতিরই এক রূপ।
‘পশ্চিমযাত্রিকী’ অপরাপর ভ্রমণকাহিনীর মতো ভ্রমণবৃত্তান্তমাত্র নয়। এটি তিরিশের দশকের একজন বাঙালি গৃহিণীর দেখা ইউরোপ, তার অনুভব করা আধুনিক সভ্যতার বিবরণ। বাঙালি গার্হস্থ্যবোধ দিয়ে প্রভাবিত এক নারীর ইউরোপ ভ্রমণ, যার কাছে সভ্যতা মানে শুধু বাহ্যিক শৃঙ্খলা নয়, তার ভেতরে থাকা মানবিক বোধটিও। তাই তো তিনি লিখেছেন, ‘ইউরোপ হয়তো চমকজাগানিয়া, কিন্তু আমাদের দেশের অনেক কিছুই অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী।’
মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা








