ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা সর্বগুণসম্পন্ন না হইলেও ইহাদের অনেকগুলি সদ্গুণ আছে। ইহারা অতিশয় কর্মদক্ষ ও চতুর এবং অনেকে শিক্ষিত। এদেশের পুরুষদের মত স্ত্রীলোকেরাও কখন কর্তব্য কর্মে অবহেলা দেখায় না; কোন কাজ থাকিলে অলসভাবে বসিয়া মিথ্যা সময় নষ্ট করে না। সংসারের কর্ম না থাকিলেও অধিকাংশ ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা কোন না কোন আবশ্যক শিল্পকর্মে ব্যাপৃত থাকে। এখানে পুরুষেরা কেবল অর্থ উপার্জ্জন করে, বাড়ীর সমস্ত ভার স্ত্রীলোকদের হাতে ন্যস্ত থাকে। পুরুষ গৃহের কর্তা বটে, কিন্তু স্ত্রীই যথার্থ সংসারের রাণী। আমাদের দেশের মত এখানে ‘বাহির’ বাড়ী ও ‘ভিভর’ বাড়ী নাই, সুতরাং স্ত্রীলোকদের বাড়ীর চারদিক দেখাশুনা করিতে এবং কোন বন্ধু বা অভ্যাগত লোক আসিলে তাঁহার অত্যর্থনা করিতে হয়। সংসারের সকল কর্ম সুচারুরূপে চালান, সমস্ত চাকর চাকরাণীদের উপর দৃষ্টি রাখা, সমস্ত আয়ব্যয়ের হিসাব রাখা ইত্যাদি অতিগুরুতর কার্যসকল ইংরাজ স্ত্রীলোকের দ্বারা সম্পাদিত হইয়া থাকে। এদেশের গৃহস্থ স্ত্রীলোকেরা প্রায় সকলেই কাপড় ধোয়া হইতে সন্তান পালন করা পর্যন্ত সংসারের সমস্ত কাজ নিজে করে যেহেতু এখানে চাকরাণী রাখা সহজ কথা নয়, আর বাহিরের লোক দিয়া কাজ করাইতে অনেক খরচ পড়ে।

বড়মানুষদের বাড়ীতে অনেক বিলাসী স্ত্রীলোক আছেন, তাঁহারা দাসদাসীদের হাতে সংসার ও সন্তানের ভার দিয়া কেবল গানবাজনা করিয়া, পোষাক করিয়া, কিংবা গল্পের বই পড়িয়া দিন কাটান। কিন্তু এ সম্বন্ধে কেবল ইহাদের দোষ দিব কি, সকল দেশেই ধনী স্ত্রীলোকদের অলস দেখিতে পাওয়া যায়। প্রচুর অর্থ সর্বত্র বিলাসের প্রধান মূল। স্ত্রীলোকেরা সংসারের ভিত্তিস্বরূপ, অতএব সর্বসাধারণ ইংরাজ মহিলারা অলস হইলে ইংরাজ-সংসার কথন চলিত না বা ইংলণ্ডের এত উন্নতি হইত না। আমার মতে ইহারা বরং পুরুষদের যথার্থ অর্ধাঙ্গ। এখানে স্ত্রীলোকে সচরাচর যেরূপ পুরুষের সহায়তা করে ও অনেক সময়ে পুরুষের কাজ করিয়া থাকে, এরূপ আমাদের দেশে প্রায়ই দৃষ্ট হয় না। নারীর উচিত কাজ ব্যতীত ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা দোকান চালায়, কেরাণীগিরি করে, স্কুলে শিক্ষা দেয়, পুস্তক ও সংবাদপত্র লেখে, সভা করিয়া বক্তৃতা দেয় ইত্যাদি অনেক পুরুষের কর্ম অতি সুন্দররূপে নির্বাহ করে। দেশের স্ত্রীলোকেরা জাতির অর্ধ ভাগ; তাহারা কেবল অতি যৎসামান্য কাজ করিয়া কিংবা অলসভাবে থাকিয়া জীবন যাপিলে সমস্ত জাতির অনেক অনিষ্ট হইয়া থাকে। ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা কেবল সংসারকর্মে ব্যাপৃত না থাকিয়া অনেক বিষয়ে পুরুষের সহযোগী হওয়াতে কত বড় বড় কার্য সম্পন্ন হইতেছে এবং দেশের কত শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে।

ভারতবর্ষবাসী ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা, সেখানে সমস্ত জিনিস ও চাকর চাকরাণী অতি অল্প পয়সায় পাওয়া যায় বলিয়া এবং স্বামীদের অতিরিক্ত বেতনের টাকায় অধিক মায়া না থাকায় সাধ্যমত নড়িয়া বসিতে ইচ্ছা করে না। খাওয়া, পোষাক পরা, গল্প করা, গানবাজনা করা ও হাওয়া খাওয়া সেখানে তাহাদের প্রধান কাজ; সুতরাং ভারতবর্ষীয়েরা তাহাদের দৃষ্টান্ত দেখিয়া ইংরাজ স্ত্রীলোকমাত্রকেই ‘বাবু’ মনে করিয়া থাকেন। এক সময়ে আমিও সমস্ত ইংরাজ স্ত্রীজাতিকে অলস বলিয়া ভাবিতাম, কিন্তু এখানে আদ্যোপান্ত সব দেখিয়া আমার সে ভ্রমবিশ্বাস একেবারে দূর হইয়াছে। ইংরাজ পুরুষদের মত ইহাদের পরিশ্রম, সহিষ্ণুতা ও কার্যক্ষমতা দেখিয়া অতিশয় আশ্চর্য হইয়াছি। আর ইংলণ্ডীয় স্ত্রীলোকদের মধ্যে যে সকল সদগুণ লক্ষিত হয়, কেবল বহিরাকারের পরিবর্তে ঐ গুলির অনুকরণ করিলে আমাদের যথার্থ উপকার হইবার সম্ভাবনা।

ইংলণ্ডে স্ত্রীলোকদের শিক্ষার জন্য বিলক্ষণ সুবিধা আছে। কোন নগরে বালিকাদের ভাল ভাল স্কুল ও কলেজের অভাব নাই; লণ্ডনে প্রায় প্রতি পাড়াতেই দুই তিনটা করিয়া ছোট ছোট বালিকা বিদ্যালয় দেখিতে পাওয়া যায়। আজকাল লণ্ডন, অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ত্রীলোকেরা পুরুষদের সমান শিক্ষা পাইয়া থাকে। লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ত্রীলোকেরা পুরুষদের সহিত সমানে এক কলেজে এক অধ্যাপকের নিকট পাঠ করিয়া এক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং সমান উপাধি লাভ করে। এখানকার পরীক্ষা সকল আমাদের দেশের বিএ, এমএ ইত্যাদি পরীক্ষা হইতে অনেক কঠিন হইলেও বহুসংখ্যক ইংরাজ স্ত্রীলোকে পুরুষদের সহিত সমানে আড়াআড়ি করিয়া ঐ সকল কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, এবং কখনও কখনও পুরুষদের উপরে উঠে। লণ্ডনে উপাধিধারী পুরুষের ন্যায় উপাধিধারী স্ত্রীলোকেরও অপ্রতুল নাই; কুমারী স্মিথ বিএ, শ্রীমতী জোন্স এমএ, এরূপ নাম প্রায়ই শুনিতে পাওয়া যায়। আজকাল যে সকল সর্বাপেক্ষা কঠিন পরীক্ষা অতি অল্প পুরুষই দিয়া থাকে, সেগুলিতে পর্যন্তও স্ত্রীলোকেরা অগ্রসর হইতে কুণ্ঠিত হয় না এবং তাহাতে উত্তীর্ণ হইয়া থাকে। ইহাতেই বুঝা যায় যে, স্ত্রীলোকেরা বুদ্ধির প্রখরতায় পুরুষদের অপেক্ষা নিকৃষ্ট নহে; বরং অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও জ্ঞান ও বিদ্যায় পুরুষদের সহিত সমকক্ষতা করা স্ত্রীলোকদের শ্রেষ্ঠতার পরিচয় দেয়। শুনিয়াছি, উত্তর

আমেরিকার স্ত্রীলোকেরা জজ, ব্যারিষ্টার ইত্যাদি হইয়া পুরুষের মত উচ্চাসনে বসিয়া বিচারাদি করে এবং সেখানকার সকল ভদ্র স্ত্রীলোকেরা অতিশয় সুশিক্ষিতা। ইংলণ্ডের স্ত্রীলোকেরা এখন অধ্যাপনা ও চিকিৎসা অপেক্ষা অধিক উন্নত কর্ম করে না; কিন্তু এখানে স্ত্রীশিক্ষার যেরূপ দ্রুত উন্নতি হইতেছে তাহাতে বোধ হয়, ইংরাজ মহিলারা অনতিবিলম্বে আমেরিকার স্ত্রীলোকদিগকে অতিক্রম করিয়া উঠিবে।

এখানে স্ত্রীলোকেরাও ছয় সাত বৎসর হইতে আরম্ভ করিয়া কুড়ি পঁচিশ বৎসর পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পড়িয়া থাকে। অনেকে আবার ইহাতেও সন্তুষ্ট থাকে না, শিক্ষিত ইংরাজ পুরুষদের মত জীবনের শেষ পর্যন্ত বিদ্যাচর্চায় নিমগ্ন থাকে। এখানে অনেক গ্রন্থকর্ত্রী, পণ্ডিতা ও বিজ্ঞানবিদ আছেন। দুই এক বিষয়ে স্ত্রীলোকদের অধিক আধিপত্য দেখিতে পাই। এখন ইংরাজীতে সর্বোৎকৃষ্ট নবন্যাসগুলি স্ত্রীলোকদের লেখনী হইতে প্রসূত হইয়া থাকে।

এদেশে বালিকারা পাঠশালায় কেবল বিদ্যাশিক্ষা করে না; লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেলাই, পশমবোনা ইত্যাদি শিল্পকর্ম, গানবাজনা, ব্যায়াম এবং কখনও কখনও রন্ধনও শিক্ষা করে। ইংরাজ পিতামাতারা যাহাতে তাঁহাদের কন্যারা ঐ সমস্ত বিষয়ে পারদর্শিনী হয়, তাহার যথাসাধ্য যত্ন লন। তাঁহারা পুত্রদের বিদ্যাশিক্ষা সম্বন্ধে যেমন যত্নবান, কন্যাদের শিক্ষাদানেও সেইরূপ ব্যগ্র হন। এখানে শিক্ষয়িত্রীর অভাব নাই, সেইজন্য পিতামাতারা পুত্রদের শিক্ষক নিযুক্ত করিবার সময় কন্যদেরও শিক্ষয়িত্রী রাখিয়া দেন এবং উভয়েরই জন্য প্রায় সমান অর্থ ব্যয় করেন। কেবল ধনী নয়, সামান্য গৃহস্থদের কন্যারাও আঠার উনিশ বৎসর অবধি লেখাপড়া, গানবাজনা ও আবশ্যকীয় শিল্পকর্ম শিখে। যতদিন পর্যন্ত কন্যারা ঐ সকল বিষয়ে সুশিক্ষিতা না হয়, ততদিন পিতামাতারা অকাতরে অর্থ ব্যয় করেন এবং কর্তব্য কর্ম সাধন করিতেছেন ভাবিয়া আনন্দিত হন। ভারতবর্ষের যে প্রকার লোকের কন্যারা বিদ্যা ও শিল্পকর্মে একেবারে অজ্ঞ, এখানে তাহার অপেক্ষা নিম্ন শ্রেণীর লোকের কন্যারা অতি শিক্ষিতা ও চতুরা। এদেশে অতি ছোটলোক ভিন্ন যে সে লোকের স্ত্রী, কন্যারা লিখিতে পড়িতে ও পিয়ানো বাজাইতে পারে; সকলেই সংসারকর্মে ও পোষাক ইত্যাদি প্রস্তুত করায় পটু।

ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা মনের সহিত শরীরেরও বিলক্ষণ যত্ন লয়। প্রায় সকল বালিকা বিদ্যালয়ে ব্যায়াম ও শরীরসঞ্চালক ক্রীড়ার নানা প্রকার সুবিধা দেখিতে পাওয়া যায়। অনেক স্থলে পুরুষদের মত স্ত্রীলোকেরাও জিমনাষ্টিক প্রভৃতি বলসাধ্য ক্রীড়াতে নিপুণ হয়। আর হাঁটিয়া বেড়ান, ঘোড়ায় চড়া, দৌড়াদৌড়ি করা, লনটেনিস খেলা ইত্যাদিতে ইংরাজ মহিলারা পুরুষদের সহিত সমকক্ষতা করিয়া থাকে। এখানে প্রায়ই এমন অনেক স্ত্রীলোক দেখিতে পাই, যাহারা শারীরিক বল ও মনের তেজে অধিকাংশ বাঙ্গালী পুরুষদের অপেক্ষা অনেক শ্রেষ্ঠ। ভদ্র ইংরাজ স্ত্রীরা যত রাস্তায় হাঁটিয়া বেড়ায়, সচরাচর ভারতবর্ষীয় পুরুষেরা তত বেড়াইতে পারেন কি না সন্দেহ। আবার ইউরোপের মধ্যে সকল জাতির স্ত্রীলোকদের অপেক্ষা এই দেশের স্ত্রীরা অধিক বলিষ্ঠ ও কষ্টসহ। কথিত আছে, একজন ইটালীয় ভদ্রস্ত্রী সমস্ত বৎসরে যত না চলিয়া বেড়ায়, একজন ইংরাজ মহিলা একদিনে তাহার অপেক্ষা অধিক হাঁটিয়া থাকে। এইরূপ সবল ও ক্লেশসহ মাতাদের যে সুস্থকায় ও বলবান সন্তান হইবে আর তাহারা পরে সাহসী, তেজীয়ান ও কর্মঠ ইংরাজ পুরুষে পরিণত হইবে তাহার আর আশ্চর্য নাই।

ee

ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা অতিশয় চঞ্চল এবং বাল্যকাল হইতে চতুর হইতে শিখে। ইহারা আমাদের দেশের স্ত্রীলোকদের ন্যায় নয় দশ বৎসরে বিবাহিতা হইয়া সংসারে প্রবেশ করে না এবং বার তের বৎসরে একেবারে গৃহিণী হইয়া পড়ে না বটে, কিন্তু শিশুকাল হইতে নানা প্রকার লোকের সহিত কথা কহিয়া ও মিশিয়া অল্প বয়সেই অনেক বিষয়ে চতুরতা লাভ করে। ইউরোপের অন্য কোন দেশের মহিলারা ইহাদের মত চঞ্চল ও মুখরা নয়। ফ্রান্স, জর্মণী, ইটালি প্রভৃতি দেশে গিয়া একজন তের চৌদ্দ বৎসরের বালিকার সহিত কথা কহিলে, সে সরল ও নম্রভাবে কথার উত্তর দিবে, কিন্তু ঐ বয়সের একটী ইংরাজ বালিকা নাকে চোকে কথা কহিয়া কথাতে লোককে হারাইয়া দিতে পারে। আবার কোন সাধারণ স্থানে বেড়াতে গেলে পুরুষের অপেক্ষা স্ত্রীলোকের গলার স্বরই অধিক শুনিতে পাই; আর একটী বালিকাকেও স্থিরভাবে বসিয়া থাকিতে দেখি না, বিনা কারণেও সর্বদা ইহাদের হাত, পা ও মাথা নড়ে। প্রাপ্তবয়স্কা যুবতীরাও অনেক সময়ে প্রকাশ্য স্থানে জঘন্য আচরণ করিয়া থাকে।

ইংরাজ মহিলারা বিনয়বতী ও আতিথেয়ী নয়। কোন ব্যক্তির সহিত কথা কহিবার সময় ইহারা শিষ্টাচার পূর্বক আলাপ করিতে জানে না এবং কোন অভ্যাগত ব্যক্তি বাড়ীতে আসিলে ভারতমহিলাদের মত ইহারা নিজের আহার ত্যাগ বা অগ্রাহ্য করিয়া অভ্যাগত ব্যক্তিকে ভোজন করাইতে অগ্রসর হয় না। শুনিয়াছি অনেক স্থানে কোন নিমন্ত্রিত ব্যক্তি বাড়ীতে আসিলে ইহারা প্রথমে নিজেদের জন্য ভাল জিনিসগুলি রাখে আর অবশিষ্টগুলি তাহাকে খাইতে দেয়। এইরূপ কথা অত্যুক্তি হইতে পারে বটে, কিন্তু আমাদের দেশে এরূপ দৃষ্টান্ত কেহই দেখিতে পাইবে না এবং এরূপ কথাও কখনও শুনা যায় না। অনেক কঠিন গুণ না থাকিলেও ভারতমহিলারা স্ত্রীস্বভাবসুলভ লজ্জা, বিনয়, দয়া, মায়া স্নেহ, মমতা ইত্যাদি কোমল গুণে অলঙ্কৃতা; এ সকল সদগুণে আমরা কোন জাতির নিকট হারি মানি না। হিন্দুরমণীদের বিলক্ষণ তেজ ও সাহস ছিল, এখনও আছে, কিন্তু কেবল স্বাধীনতা ও শিক্ষার অভাবে আমরা উহার পরিচয় দিতে পারি না। পুরুষদের তাচ্ছিল্য ও সামাজিক কুসংস্কারই হিন্দুস্ত্রীদের হীনাবস্থাও সকল অমঙ্গলের কারণ। তেজ, সাহস ইত্যাদি কঠিন গুণ থাকিলেই যে কোমল গুণ হারাইতে হয়, এরূপ বিবেচনা করা নিতান্ত ভ্রম। কেবল ইংরাজ মহিলাদের মধ্যেই ইহার উদাহরণ দেখিতে পাইতেছি।

ইংরাজ মহিলাদের বিনয়াদি গুণের আধিক্য না থাকাতে ইহারা সময়ে সময়ে স্বাধীনতার অপব্যবহার করিয়া থাকে। ইহাদের স্বামীখোঁজার বিষয় শুনিলে অনেকে আশ্চর্য হইবেন। বিবাহের বয়স প্রাপ্ত হইলেই ইংরাজ যুবতীরা স্বামী অন্বেষণে একেবারে পাগল হইয়া বেড়ায়। এ সম্বন্ধে ইহাদের সম্পূর্ণ দোষও দেওয়া যায় না। ইংলণ্ডে পুরুষ অপেক্ষা স্ত্রী লোকের সংখ্যা অধিক, আর শিক্ষিতা ও রূপবতী স্ত্রীদেরও অভাব নাই। সুতরাং অন্যান্য বিষয়ের মত যুবতীদের মধ্যে ভয়ানক আড়াআড়ি হইয়া থাকে। উপযুক্ত বয়স হইলেই কিসে পুরুষের মন তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইবে, কি উপায়ে অন্য সকলকে ফেলিয়া তাহাকে পছন্দ করিবে তাহাই সাধিবার জন্য প্রত্যেক ইংরাজ যুবতী লালায়িত হইয়া বেড়ায়। এ সময়ে ইহারা রাস্তা, বাগান, নাট্যশালা প্রভৃতি অধিক পুরুষের সমাগমস্থানে যায় আর নিজেদের রূপ ও গুণ দেখাইবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে। এই বয়সে ইহারা অধিক চঞ্চল ও বাক্যপটু হয় এবং পিতামাতার মতানুসারে বাড়ীতে থাকিতে ভাল বাসে না, আর গুরুজনের সঙ্গ ছাড়িয়া সর্বত্র নিজেরাই গমনাগমন করে। অবশ্য ইহাদের মনে কোন দূষ্য ভাব না থাকিতে পারে, মনের মত বর জোটানই একমাত্র উদ্দেশ্য হইতে পারে। ইংরাজ মহিলারা জেলেদের মত বড় বড় স্থানে জাল পাতিয়া রাখে; মাছের মত পুরুষেরা একবার জালে আসিয়া পড়িলে আর নিস্তার নাই। যৌবন ও সৌন্দর্যে বঞ্চিত হইবার আগে একটা বর ধরিতে পারিলে ইহাদের আহ্লাদের আর শেষ থাকে না।

ভারতবর্ষীয় পুরুষেরা স্ত্রীলোকদের স্বাধীনতা দিতে ভয় পান, কারণ স্ত্রীরা বহুকাল অবধি পরাধীনা থাকাতে তাহাদের মন এত দুর্বল ও তেজোহীন হইয়া পড়িয়াছে যে, তাহারা স্বাধীন হইলে নিজেদের শাসন করিতে পারেন না। অবশ্য ইহা অনেকটা সত্য; কেহ অনেক বৎসর অধীন অবস্থায় থাকিয়া সহসা স্বাধীন হইলে কখনই স্বাধীনতার ঠিক ব্যবহার করিতে অথবা স্বাধীনতা বজায় রাখিতে পারে না। কিন্তু এক সময়ে না এক সময়ে সকলকেই শিখিতে হয়, শিশু একেবারে চলিতে শিখে না, তাহাকে অনেকবার দেখাইয়া দিতে ও ধরিতে হয় এবং সে অনেকবার পড়িয়া যায়। আমাদের দেশের স্ত্রীদের বর্তমান অবস্থা ঐরূপ। তাহারা এত দুর্বল ও হীনাবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে যে পুরুষেরা তাহাদের আদর করিয়া ধরিয়া না তুলিলে, তাহাদের অবস্থার কখনই উন্নতি হইবে না। এবং অল্প অল্প করিয়া তাহাদিগকে স্বাধীনতার পথে প্রবর্তিত না করিলে তাহারা কখনই নিজেদের শাসন করিতে শিখিবে না বা স্বাধীন হইয়া বেড়াইতে পারিবে না। আবার দুই একজন অল্প শিক্ষিতা স্ত্রী স্বাধীনতা পাইয়া তাহার ব্যবহার না জানাতে বিপথগামিনী হইয়াছে বলিয়া দেশীয় লোকদের মনে আরো ভয় জন্মিয়াছে। কিন্তু দুই একজনের এ রকম মন্দ দৃষ্টান্তে সমস্ত স্ত্রীজাতির প্রতি সন্দেহ করা জ্ঞানী পুরুষের কাজ নয়। কোন নুতন উদ্যমে একেবারে বা সম্পূর্ণরূপে সফল হওয়া যায় না, কতক বিফলতা ঘটিবেই ঘটিবে। ভয়ের পরিবর্তে স্ত্রীলোকদের ভালরূপ শিক্ষা দিয়া স্বাধীনতা দিলে তাহারা স্পষ্ট দেখিতে পাইবে যে, হিন্দুমহিলারা কোন অংশে ইংরাজ মহিলাদের হইতে হীন নয়।

এদেশের স্ত্রীলোকেরা বরাবরই স্বাধীন জীবনে নিজের মান রাখিয়া কিরূপে চলিতে হয় তাহা উত্তমরূপে জানে। ইহারা সকল সময়েই প্রকাশ্য স্থানে ও প্রকাশ্যভাবে পুরুষদের সহিত কথা কহে, খেলা করে ও গল্প করে, এবং বাল্যকাল হইতেই জগতের নানাবিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করে, সেজন্য পাগলের মত হইয়া পুরুষকে স্বর্গীয় দেবতা ভাবিয়া সর্বদা প্রণয় ও সুখস্বপ্নের চিন্তা করে না। ইহারা লেখা পড়া শিখে, নানা দেশে ভ্রমণ করে এবং পিতা ও ভ্রাতাদের নিকট থাকিয়া, সর্বদা তাঁহাদিগকে বন্ধুদের সহিত রাজনীতি, শাসন প্রভৃতি গূঢ় বিষয়ে কথোপকথন করিতে শুনে, সেজন্য ইহাদের গভীর চিন্তা ও ভালমন্দ বিবেচনা করিবার শক্তি জন্মে। আর ইহারা সাংসারিক কাজ, পুস্তকপাঠ ইত্যাদিতে অধিকাংশ সময় কাটায়; অলসতা ইহাদের মনে কুটিল ভাব জন্মাইয়া সর্বনাশ করে না। অতএব এই সকল কারণে ইংরাজ মহিলারা যে সহজে অসৎপথাভিলাষিণী হয় না, তাহা সকলেরই বোধগম্য হইবে। ভারতীয় স্ত্রীরা সতীত্বের জন্য বিশ্ববিখ্যাত; এবং আমরা হিন্দুমহিলারা যেমন সতীত্বের জন্য প্রাণ দিতে ও স্বামীর অনুরাগে সমস্ত সংসার ত্যজিতে কিঞ্চিন্মাত্রও কুণ্ঠিত হই না, এরূপ এদেশে শুনা যায় না বটে তথাপি ইংরাজ মহিলারা স্ত্রীলোকের প্রধান ধর্ম সতীত্ব বজায় রাখিতে প্রাণপণে চেষ্টা করে।

স্ত্রীলোকদের মধ্যে এখানে অনেক রমণীরত্ন আছে। মিস মেরী কার্পেন্টার, মিস ফ্লরেন্স নাইটিঙ্গেল, লেডি বেকার প্রভৃতি অনেক উচ্চশিক্ষিতা ইংরাজ মহিলার নাম বোধ হয় অনেকেই শুনিয়াছেন। মিস মেরী কার্পেন্টার চিরজীবন অবিবাহিতা থাকিয়াও নিজের জ্ঞান ও বিদ্যাবলে দেশের কত উন্নতি করিয়াছেন। তাঁহার যত্নেই এদেশের কারাগৃহ ইত্যাদি অনেক স্থানের অবস্থা উন্নত ও পরিবর্তিত হইয়াছিল এবং অনেক স্ত্রীসভাও তাঁহার সাহায্যে স্থাপিত হইয়াছিল। ইংলণ্ডাগত যুবকদের হিত সাধনের জন্য মিস মেরী কার্পেন্টার কর্তৃক এক সভা স্থাপিত হইয়াছিল, উহা এখনও চলিতেছে এবং উহা হইতে অনেক উপকার দর্শিয়াছে। ভারতবর্ষের স্ত্রীশিক্ষার জন্য তিনি যে যথেষ্ট চেষ্টা পাইয়াছিলেন তাহা কাহারও অবিদিত নাই। মিস ফ্লরেন্স নাইটিঙ্গেল ক্রিমিয়া যুদ্ধের সময় নির্ভয়ে সৈন্যশিবিরে থাকিয়া আহত সৈন্যদের পরিচর্যা করিয়া যে কত সাহসিকতা ও স্ত্রীসুলভগুণের পরিচয় দিয়াছিলেন, তাহার বিষয় শুনিয়া এমন কোন লোক নাই, যিনি আশ্চর্য ও স্তম্ভিত না হন।

এই সকল বিখ্যাত স্ত্রীলোক বিবাহিত হইয়া অন্যের দ্বারা চালিত না হইলেও আত্মসাহায্যে ও আত্মবলে পৃথিবীর কত উপকার করিয়াছেন, তাহা ভাবিলে কেমন আহ্লাদ হয়। কিন্তু আমাদের দেশে অবিবাহিতারা দূরে থাকুক, বিবাহিতারা পর্যন্ত দেশের মঙ্গল সাধনে অগ্রসর হন না। ইংরাজ স্ত্রীলোকেরা, বিবাহ না হইলে বা বিধবা হইলে, জীবনকে নিরর্থক না ভাবিয়া যতদূর সাধ্য মানুষের জীবনের কর্তব্য কর্ম সাধিতে চেষ্টা করে। অন্যের সাহায্যে অনেকে অনেক কাজ করিতে পারে, কিন্তু যাঁহারা নিজে নিজের সহায় হইয়া নিজ বিবেকশক্তির দ্বারা পৃথিবীর উপকার করিতে পারেন ও অগ্রসর হন, তাঁহাদের জীবন যে কত বহুমূল্য তাহা আমরা ভাবিতে পারি না।

বিবাহিতা স্ত্রীলোকদের মধ্যেও যথার্থ পতিব্রতা ও পতির সহায় স্ত্রী এই জাতিতে অনেক দেখিতে পাই। স্ত্রীস্বাধীনতা থাকিলেও বিশ্বাসী ও স্বামীর অনুবর্তিনী স্ত্রীদের অভাব নাই। লেডি বেকার এই সকল পতিব্রতা স্ত্রীদের মধ্যে একজন প্রধান। যে সকল মরুভূমিতে যাইতে পুরুষেরা পর্যন্ত সাহস করে না, তিনি স্ত্রীলোক হইয়াও স্বামীর সহিত নির্ভয় চিত্তে তথায় বাস করিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন। তিনিও স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার সেই ভয়ঙ্কর মানুষের অগম্য মরুভূমিতে নুতন নুতন হ্রদ ও নদীর আবিষ্কারের জন্য ঘুরিয়া বেড়াইতেন, এবং সেই আত্মীয়পরিজনহীন স্থানে তিনিই স্বামীর একমাত্র সহায় হইয়াছিলেন। তিনি সাহসাদি পুরুষোচিত গুণের সহিত স্ত্রীলোকের উপযুক্ত সমস্ত সদগুণে অলঙ্কৃত ছিলেন। লেডি ব্র্যাসি আর একটি গুণসম্পন্ন রমণীরত্ন। ইনি ক্রমাগত প্রায় দেড় বৎসর স্বামীর সহিত সমুদ্রে বেড়াইয়া বেড়াইয়া নানা প্রকার কষ্ট সহ্য করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। এই মহোদয়া স্ত্রী নিজের ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রভৃতি বিষয় সম্বন্ধে অনেক পুস্তক লিখিয়া নিজের কীৰ্ত্তি অক্ষয় করিয়া রাখিতেছেন। ইহার জীবনচরিত পড়িলে হৃদয় আনন্দিত হয় এবং মন প্রশস্ত ও সৎকর্ম্মে উৎসাহিত হয়।