ভা'রতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে শিখ গুরু নানকের ভ্রমণ ও ধর্মপ্রচার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গুরু নানক শুধু শিখ ধর্মের প্রবর্তকই নন, বরং একজন মানবতাবাদী ও সত্য অনুসন্ধানী সাধক হিসেবেই খ্যাত। তার পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বিহার, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ সফরের মাধ্যমে নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক জাগরণের সূচনা ঘটায়।

শিখ ধর্মের প্রবর্তক শিখ গুরু নানক প্রথম উদাসীর (আধ্যাত্মিক ভ্রমণ) অংশ হিসেবে পূর্ব ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন। এ যাত্রার পথে তিনি উত্তর প্রদেশের চান্দৌলি থেকে বিহারের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। বিহারে প্রবেশ করে তিনি স্থানীয় সাসারাম পরিদর্শন করেন। গুরু নানকের স্বর্গীয় ও সুমধুর শবদ (গুরু নানক রচিত ও উচ্চারিত ভজন, বাণী বা সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণমূলক আধ্যাত্মিক গান) মানুষের মনকে কুসংস্কার, ভয় ও অসৎ কাজের বন্ধন থেকে মুক্তি দিত। সাসারামে গুরু নানক কয়েকদিন অবস্থান করেন। এ সময়ে ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার, সাধু, মহাজনসহ অনেকেই গুরু নানকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার আশীর্বাদ লাভ করেন।

গুরু নানক লোকজনকে শিক্ষা দেন, ‘কিরাত করো, বঁধ চাকো ও নাম জাপো—অর্থাৎ পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করো, ভাগ করে খাও এবং সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করো। কয়েকদিন পর গুরু নানক সেখান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণে যান।

এরপর গুরু নানক বিহারের বর্তমান গয়া জেলার বিশিষ্ট স্থান বুদ্ধগয়ার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি শহরের প্রান্তে অবস্থান করেন। তার সঙ্গী ও শিষ্য ভাই মর্দানা পবিত্র গান গাইতে শুরু করেন। বুদ্ধগয়ার এক বৌদ্ধ মন্দিরের দেব গির নামে এক মহন্ত গুরু নানকের ‘শবদ’-এর মাধুর্যে আকৃষ্ট হন। বুদ্ধগয়ার ওই মন্দির খুবই বিখ্যাত, যেখানে গৌতম বুদ্ধ ধ্যান ও প্রজ্ঞা লাভ করেছিলেন।

গুরু নানক মহন্ত দেব গিরের মনোবাসনা জানতেন। তাই দুজনের মধ্যে কথোপকথন শুরু হয়। গুরু নানক বললেন, ‘একটি জীবিত শাখায় শক্তি ও নম্রতা উভয়ই থাকে। প্রেম হলো সংযুক্তি, কিন্তু খারাপ কাজের সঙ্গে সংযুক্তি হলো দায়িত্বহীনতা। নশ্বর জিনিসের প্রতি সংযুক্তি অসদাচার। আমাদের চিরন্তন প্রভুকে ভালোবাসা উচিত। সৎ কাজ করাটাকে ভালোবাসা উচিত। এটাই মানুষকে ধার্মিক করে তোলে।’ তখন মহন্ত দেব গির জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি আমাদের ইন্দ্রিয়কে হত্যা করতে না পারি, তাহলে আমরা কী করব?’ উত্তরে গুরু নানক বললেন, ‘ইন্দ্রিয়কে অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে হবে। ভালোবাসার অনুভূতিকে হত্যা করা উচিত নয়। ইন্দ্রিয়কে সত্যিকারের প্রভুর দিকে মনোযোগী করা উচিত। সত্যিকারের প্রভুকে ভালোবাসার একমাত্র পথ হলো তার নাম জপা, তাকে স্মরণ এবং যা কিছু তিনি আমাদের দিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।’ দুজনের সঙ্গে আরো কথা হয়। মহন্ত দেব গির গুরু নানকের প্রতি অসীম ভক্তি পোষণ করেন এবং অনেক দিন তার সান্নিধ্যে থাকেন।

বুদ্ধগয়া থেকে গুরু নানক রাজৌলির দিকে যাত্রা করেন। সেখানে কালান শাহ নামে একটি সুফি সাধু ছিলেন, যিনি কঠোর তপস্যা করতেন। দিন রাত তিনি আগুন জ্বালিয়ে বসে ধ্যান করতেন। কালান শাহ গুরু নানকের বার্তার জাদুকরী প্রভাবের কথা জানতে পারেন এবং গোপনে তা শোনেন। তার প্রবচন ‍শুনে কালান শাহর মনের ওপর গভীর প্রভাব পড়ে। তিনি গুরু নানকের আশীর্বাদ চান।

রাজৌলির পর গুরু নানক নালন্দা ভ্রমণ করেন। এখানে তিনি বৌদ্ধ ও জৈন সন্ন্যাসীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সে সময় শহরটিতে গরম পানির ঝরনা ছিল বেশি। শীতল পানির অভাব ছিল। গুরু নানকের নির্দেশে স্থানীয়রা মাটি খুঁড়লে সেখান থেকে শীতল পানি বের হয়। ঐতিহাসিক এ ঝরনাকে ‘গুরু নানক শীতল কুণ্ড’ বলা হয়।

নালন্দা থেকে গুরু নানক পাটনা (পাটলিপুত্র) যান। পাটনা শিখ ধর্মের ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, গুরু নানকের সফরকালে পাটনায় ৬৪টি দরজা ও ৬৭০টি প্রাসাদ ছিল, যা খাদ ও কাঠের প্রাচীর দিয়ে রক্ষিত। গুরু নানক পশ্চিমের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন এবং ভগৎ জৈতমলের বাড়ি যান। বাড়িটি গঙ্গা নদীতীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত, বর্তমানে এটি আলমগঞ্জ মহল্লা নামে পরিচিত। ভগৎ জৈতমল গুরু নানকের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় প্রায় ৩৫০ বছর বয়সী ছিলেন। তিনি গুরু নানককে জানালেন, তিনি এ জগৎ থেকে মুক্তি চান। গুরু ভগৎ জৈতমলের ধৈর্য পরীক্ষা করতে শুরু করেন। দীর্ঘ আলাপের পর গুরু নানক নিশ্চিত করলেন, নবম জন্মে তিনি জৈতমলের আত্মা মুক্ত করবেন।

এরপর পাটনার রাজা ও রানী গুরু নানকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তারা গুরু নানকের আশীর্বাদে যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। রাজা ও রানী এজন্য গুরু নানককে ধন্যবাদ জানান।

পাটনার পর গুরু নানকের ভ্রমণক্রম ছিল যথাক্রমে বিহারের হাজিপুর, লালগঞ্জ, কাটিহার, মুঙ্গের, ভাগলপুর, সাহিবগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও বৈদ্যনাথ এলাকা।

Capture2

শিখ ধর্মমতে, গুরু তেগ বাহাদুরের ওপর বিশাল এই পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন ধোবানি নামে এক তান্ত্রিক নারী, ধুবড়ি জেলা, আসাম ছবি: অবিনাশ মহাপাত্রর দ্য শিখ হিস্ট্রি অব ইস্ট ইন্ডিয়া

গুরু নানক আসামও ভ্রমণ করেন। তিনি তার তৃতীয় উদাসীতে (তৃতীয় দীর্ঘ ভ্রমণকাল ১৫১৪-১৮ সাল) তখনকার পূর্ব ভারতের আসামে ধুবড়ি ভ্রমণ করেন। এখানে তার সঙ্গে আসামের নব্য বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রবর্তক শ্রীমন্ত শংকর দেবের সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এ সাক্ষাৎ শিখ ধর্ম ও নব্য বৈষ্ণব ধর্মপ্রবাহ দুই মহান আধ্যাত্মিক ধারার মিলন ঘটায়। উভয়েই এক নিরাকার সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভক্তি, সামাজিক সমতা ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি গুরুত্ব দেন।

দুই সাধুই ভক্তিমার্গে (ভক্তি) গভীরভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন এবং সংগীত ও কবিতাকে আধ্যাত্মিক বাণী প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শংকর দেবের বড়গীত (ভক্তিমূলক গান) ও অঙ্কিয়া নাট (একাঙ্ক নাটক) যেমন জনপ্রিয় হয়েছিল, তেমনি গুরু নানক ‘শবদ’ মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার জ্ঞান প্রচার করেছেন। তাদের আলোচনায় সম্ভবত সামাজিক সংস্কার, জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা ও সমাজসেবার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

ধুবড়ি ছাড়াও গুরু নানক আসামে যেসব স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো গৌরীপুর, যোগীঘোপা; গোলপাড়া জেলার রাঙ্গামাট্টি, গোলাঘাট, ধনশ্রী উপত্যকা, কামাখ্যা, গুয়াহাটি, করিমগঞ্জ, নজিরা, মঝুলী, কামরূপ, হাজো, মৎস্যধ্বজ, তিনসুকিয়া ও ডিব্রুগড়। পরবর্তী সময়ে গুরু নানকের অনুসারী ও ভক্তরা এসব স্থানে গুরুর স্মৃতিকে লালন করেন এবং ধর্মশালা প্রতিষ্ঠা করেন।

পশ্চিমবঙ্গে (যা প্রাচীনকালে বঙ্গদেশ বা বঙ্গরাজ্য নামে পরিচিত ছিল) শিখ ধর্ম প্রবেশ করার কারণে পশ্চিম বাংলার ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল।

শিখ ইতিহাসবিদ ও লেখক অবিনাশ মহাপাত্র লিখেছেন, বাংলাদেশে ভ্রমণ ও ধর্মপ্রচার পর্বে চট্টগ্রাম ছিল গুরু নানকের ভ্রমণের শেষ স্থান। সেখান থেকে তিনি ও ভাই মর্দানাকে নিয়ে কলকাতায় যান। প্রথমে যান দমদমে। তিনি কয়েকদিন এখানে অবস্থান করেন। দমদমের স্থানীয় মানুষ তার শবদ শ্রবণ করতে আসেন এবং তার শিষ্য হয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।

গুরু নানক মহারাজের পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণের সম্পূর্ণ পথচিত্র হলো ১. কলকাতা, ২. হুগলি, ৩. নদীয়া, ৪. মুর্শিদাবাদ, ৫. মালদহ, ৬. কেন্দ্রলি (ভগৎ জয়দেবের জন্মস্থান), ৭. বর্ধমান (কাটোয়া), ৮. বিষ্ণুপুর, ৯. মেদিনীপুর (চন্দ্রকোনা) ও ১০. কাঁথি।

গুরু নানকের ভ্রমণপথ ও শিখ ধর্মপ্রচার, পূর্ব ভারতের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক বিন্যাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। বিহারের সাসারাম, পাটনা ও অন্যান্য স্থান থেকে আসাম আর পশ্চিমবঙ্গের দমদম থেকে মেদিনীপুর এসব অঞ্চলে গুরু নানকের উপস্থিতির কারণে নতুন ধর্মচিন্তার প্রভাব পড়ে। তার শিক্ষা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানুষের নৈতিক জাগরণ ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। এ কারণে আজও ভ্রমণস্থানগুলো গুরু নানকের স্মৃতি বহন করে চলেছে; এসব অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত গুরুদুয়ারাগুলো শিখ ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী।

[প্রবন্ধটি শিখ ইতিহাসবিদ অবিনাশ মহাপাত্রর দ্য শিখ হিস্ট্রি অব ইস্ট ইন্ডিয়া শীর্ষক গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ের ভিত্তিতে তৈরি করা; পাশাপাশি ‘গুরুদুয়ারাধুবড়ি সাহিব ডটকম ডট হিস্ট্রি’তে প্রকাশিত গুরু নানক দেবজি’র ভিজিট টু আসাম শিরোনামে লেখা প্রতিবেদন থেকেও তথ্য নেয়া হয়েছে]

নীরব হাসান: লেখক ও গবেষক