ডক্টর ফস্টাস: টমাস মান

এটা সেই জাতের এক মহান উপন্যাস, যা মার্কিনিরা লেখার প্রাণপণ চেষ্টা করে আসছে এ অজুহাতে যে Finnegan’s Wake-এর অবস্থান ক্ষয়ে যেতে বাধ্য বা তার চেয়েও খারাপ, সেটা এমনকি একদিন পড়াও হয়ে যেতে পারে। তবে এমনতর কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের ভাগ্য এখনো প্রসন্ন হয়নি। অবশ্য আমাদের জাতীয় প্রতিভার চিহ্ন হচ্ছে ছোটগল্প কিংবা উপন্যাসিকা। আমাদের কাজকর্মের যে দানবীয় চেহারা, তারই নাটকীয় রূপ দেন মান, দেখান কীভাবে স্পিরোচেট জীবাণুর মতো, নািসবাদের মতো একটা অসুখ আমাদের রাজনীতির শরীরে প্রবেশ করে, ঠিক যেমনভাবে মানের জিনিয়াস নায়কের ক্ষেত্রে সিফিলিস দুষ্ট ক্ষতরূপে তার প্রতিভা এবং খোদ তার নিজেরও ধ্বংসের কারণ হয়। দারুণ রূপক, অসাধারণ উপন্যাস।

 

গুড অ্যাজ গোল্ড: জোসেফ হেলার

আমার ধারণা, মার্কিন নির্বুদ্ধিতার ব্যাপারে চোখ-কান খোলা একজন দারুণ ব্যঙ্গপ্রবণ ঔপন্যাসিক বলেই শ্রদ্ধেয় কথাসাহিত্যিকদের তালিকায় তার নাম কখনো অন্তর্ভুক্ত হয় না (সিলেবাসে ঢোকার আগেই ভাষায় ঢুকে গেছে Catch-22)। এ বইয়ে তিনি ক্রমে হয়ে ওঠা এক রাজনীতির দুর্বৃত্তের চরিত্র উন্মোচনে মারাত্মক মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। চরিত্রটি কি হেনরি কিসিঞ্জার হতে পারেন?

 

কসমিকমিকস: ইতালো কালভিনো&dquote;&dquote;

দুঃখিত, তবে আমাকে বলতেই হচ্ছে যে ইউরোপের সেরা সাহিত্য ফসলগুলো জীবদ্দশাতেই আমাদের হারিয়ে দিয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের ইংরেজি বিভাগগুলো এটা জানবে একেবারে সবার শেষে: দুর্ভাগ্য হলো, সেরা কিছু সাহিত্যের পৃথিবীতে আমাদের পাঠকদের কখনই সহজ প্রবেশাধিকার ঘটবে না। কালভিনো আমাদের একটি আদিম অণু উপহার দেন, যার মধ্যে ভরা থাকে নেপলসের একটি পরিবারের নৈশভোজকেন্দ্রিক কলহ-বিবাদ— আমরা শুধু তাদের কণ্ঠ শুনি। একপর্যায়ে সেই অণুটি বিস্ফোরিত হয় এবং তার চারপাশজুড়ে আমাদের এ মহাবিশ্বের দ্রুত সূত্রপাত ঘটে। পুরোদস্তুর আতশবাজির খেলা শুরু হয়, যখন আমরা প্রধান চরিত্র কিউকে বিভিন্ন কাল পর্বে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে দেখি: ডাইনোসর থেকে শামুক হয়ে এবং একেবারে ‘রেললাইনের পার্শ্ববর্তী গর্তবাসী কীট পর্যন্ত, যাকে দেখবে বলে একদল ডাচ তরুণী জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে দেয়।’ আর সে অনুধাবন করে, ‘যে চোখগুলো আমাদের দেখবে বলে অবশেষে উন্মোচিত হয়, সেগুলো আসলে আমাদের নয়, অন্য কারো।’ কিন্তু কিউ একে বিজয় ভাবে। বলে, ‘ওই সব কয়টি চোখই আমার।’ দৃষ্ট হওয়াও তো অর্ধেকটা দেখা।

 

দ্য গোল্ডেন স্পার: ডন পাওয়েল&dquote;&dquote;

পাঠকরা এখন পাওয়েলের দুর্দান্ত কঠিন সব উপন্যাসের খবর পাচ্ছে। আর এ সাম্প্রতিকটিতে (১৯৬২) তিনি ম্যানহাটনের সোনালি যুগের পুনর্নির্মাণ করেন, যেখানে গ্রাম থেকে এক তরুণ তথাকথিত বিখ্যাত একজন মানুষকে খুঁজতে আসেন, যে তার মাকে সন্তানসম্ভবা করেছিল একদা। এটাই সম্ভবত সেই খাঁটি নিউইয়র্ক নভেলের গ্রিনিচ ভিলেজ সংস্করণও বলতে পারেন আপনি— বন্য রকম মজাদার, তবে বুনো শ্লেষমিশ্রিত মজা।

 

ক্রিয়েশন: গোর ভিডাল

ম্যারি ম্যাকার্থি, আরেক সত্যিকারের বুদ্ধিমতী, একদা মন্তব্য করেছিলেন, আপনি যদি ওয়ার অ্যান্ড পিস থেকে কিছুই না পান, অন্তত টলস্তয়ের বিখ্যাত স্ট্রবেরি জ্যামের রেসিপিটুকু তো মিলবে সেখানে। আমি মাঝেমধ্যে এমন উপন্যাস লিখি, যেগুলো আমাদের যা জানা দরকার অথচ জানি না, সেসব বিষয়ে আলোকপাত করবে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে যদি কোনো ব্যক্তি ৭৫ বছর অবধি বেঁচে থাকেন, তাহলে তার সোক্রাতেস, বুদ্ধ, কনফুসিয়াস, জরথুস্ত্র, লাওৎ সে, মহাবীর, দেমোক্রিতাস প্রমুখকে চেনার কথা। আমি এ রকম একটি চরিত্র উদ্ভাবন করি এবং স্বীকৃতভাবেই এ আপাত অসম্ভব কথোপকথনগুলো ঘটতে দিই, যা আমরা আজ প্রতিটি ধর্ম ও রাজনীতির গোড়ায় ঘটতে দেখি। এখানে আমার উদ্দেশ্য একেবারেই স্বার্থহীন: এ ধরনের বই একজন লেখে তখনই, যখন আমাদের অন্য পৃথিবী সম্পর্কে জ্ঞানলাভে নিরুৎসাহিত করা হয়; যা ব্যাখ্যা করে কেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বৌদ্ধদের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেয়ার বিষয়টি আমাদের এতটা হতবাক করে দিয়েছিল। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রচারমাধ্যম এটা নিশ্চিত করেছে যেন আমরা অন্য সংস্কৃতি ও ধর্ম বিষয়ে একেবারে কিছুই না এবং নিজেদের সম্পর্কে খুবই অল্প জানি। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার, আমাদের স্কুলগুলোয় কৌতূহলের বোতামটিকে সযত্নে বন্ধ করে রাখা হয়।

 

অনুসৃতি: আলম খোরশেদ

উৎস: The Salon.com Reader’s Guide to Contemporary Authors