করুণ বেহালার মতো আমি বেজে চলেছি আজীবন অপরের সুরে

আমার কি নিজস্ব বলে কিছু নেই? আমার বুকের গভীরে

যে বেদনা তার কতটুকু ধার করা, কতটুকু খাদ মেশা?

কতটুকু নিখাদ কষ্ট থেকে উৎসারিত আজো জানা হলো না?

 

আমি মানুষের ভালোবাসার মূল্য দিতে গিয়ে অনেক

অমূল্য সময় অকাতরে নষ্ট করেছি,

কত মানুষের অবহেলাকে অনিন্দ্য প্রেম বলে

আমি বুকে টেনে নিয়েছি

ভুল জায়গায় এসে ভুল মানুষের কাছে ভুল পাঠ নিয়েছি

অনেক আনন্দময় মুহূর্ত আমি হত্যা করেছি বেদনার শানিত ছুরিতে

ভালোবাসা পেতে গিয়ে আমিও দীর্ঘশ্বাস দিয়েছি,

ফুল নিতে গিয়ে নিয়েছি গাঢ় গভীর বেদনা।

 

এমন বেসুরো সুরে যে বাঁধতে হবে আমার জীবন, বুঝতে পারিনি।

 

 ভুল করে বেঁচে আছি

 

আজকাল বেঁচে থাকটাই বড় অপরাধ বলে মনে হয়

তবু আমি বেঁচে আছি

তুমি ভালো থেকো প্রেম, ভালো থেকো নারী

ভুল করে বেঁচে আছি।

 

কতটুকু দুঃখ পেলে মানুষেরা শুদ্ধ হয়?

কতটুকু কষ্ট তাকে পুড়ে পুড়ে খাঁটি করে

আজো জানা হলো না।

আগুনের ভেতরে আমি অঙ্গার হয়ে আছি

স্বপ্নের ভেতরে আমি দুঃস্বপ্ন করে লুকোচুরি

ভুল করে বেঁচে আছি।

 

বেঁচে আছি কি মরে গেছি, মাঝে মধ্যে তাও

ফারাক করতে পারি না। যদি না বাঁচি কি এসে যায়?

যদি বেঁচে থাকি, তাতে কার কতটুকু ক্ষতি?

মৃত্যু আমাকে নেবে না, স্বপ্ন আমাকে নেবে না

দুঃখ আমাকে নেবে না, প্রেম আমাকে

ক্ষমা করবে না জানি।

 

এমন মৃত্যুমলিন জীবন আমি চাইনি কখনো।

 

আমার কোনো ইচ্ছে নেই, কোনো স্বপ্ন নেই

আজীবন দুঃস্বপ্নের চারা রুয়ে যাই

নিষ্পত্র, নিষ্ফল বৃক্ষে কেবলই জল ঢালি।

বেঁচে আছি সীমাহীন অক্ষমতা আর ক্ষমাহীনতায়

পৃথিবীতে এমন কোনো শাস্তি নেই

যা আমি ভোগ করিনি।

 

এতদিন ভালোবাসাহীন ভালোবাসায় আমিও আচ্ছন্ন ছিলাম

আজ কোথাও কেউ নেই, কিচ্ছু নেই

কেবলই আমার অপেক্ষা করা।

 

এক আকাশের নিচে আমরা বসবাস করছি অথচ

কতটা ফারাক

আমরা এক ভাষায় কথা বলি,

গায়ের বর্ণ ও চেহারায় কোনো ফারাক নেই

একই মাটি ও জলহাওয়ায় বেড়ে উঠেছি

অথচ শৈশব থেকে আমাদের শেখানো হয়

ওরা ও আমরা আলাদা

একই বাতাস থেকে আমরা অক্সিজেন নিচ্ছি

আমাদের নিঃশ্বাসে এত বিষ ছড়ানো কেন?

সব নদী সমুদ্রে মেশে সব পাখি নীড়ে ফেরে

কিন্তু মানুষ বরাবরই বিভাজনের পথ খোঁজে

পাখিগুলো কি অনায়াসে সীমান্ত পার হয়

আকাশের কোনো সীমানা নেই

তাহলে মানুষ কেন সীমান্তে পাহারা বসায়?

শীতে আসা সাইবেরিয়ার অতিথি পাখিকেও

আর অচেনা মনে হয় না

মানুষই মানুষের থেকে ভিন্ন হতে চায়

মানুষ তার পোশাক ও রীতিতে নিজেকে

আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে চায়

আমরা কেন পাহাড়ের ঝরনার মতো বাইতে পারি না?

৩.

এতটা গভীর করে কেউ ভালোবাসেনি

এতটা মধুর করে কেউ বলেনি, ঘৃণা করি

তোমার ঘৃণাই আমাকে বাঁচার প্রেরণা দিয়েছে

আর ভালোবাসা আত্মহত্যায় দিয়েছে প্রেরণা

 

কোথাও কেউ নেই, কেবলই নিঃসঙ্গতা বুকে বয়ে বেড়াই

মনে হয় তার ভালোবাসা না পেলে আমি মরে যাই

আজীবন দুহাতে দুঃখ সরাই, কষ্ট সরাই

নিজের জন্য শোকাশ্রু ছাড়া আমি কিছুই জমা রাখিনি

আমার বেদনার সমান কোনো সাগর নেই পৃথিবীতে

 

আমি নিয়ত দুঃস্বপ্নের দিকে হাত বাড়ানো এক মানুষ

দিব্য চোখে আমি আমার সমূহ পতন দেখতে পাচ্ছি

তোমরা কী করে আমাকে ফেরাবে?

হে মানব তোমাদের প্রতি আমার ঋণের পাল্লা

অনেক বেশি ভারী হয়ে গেছে

আরো বেশি ঋণ নেয়ার সামর্থ্য নেই, এক অসমর্থ মানুষ আমি

আমার অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই

বর্তমান দুলছে বেতস লতার মতো

তোমাদের কাছে অশেষ ঋণ জমা হয়েছে

এই যে মানবজন্ম, তার পুরোটাই তো আমার ঋণ

এই যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, তাও তোমাদের দান

এই যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি, তাও তোমার করুণা

আমি তোমাদের করুণা ও দয়ায় বেঁচে আছি

পৃথিবীতে মমতা নামে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না কখনো।