ভীষণ গরম পড়েছে আজ। কয়েক দিন ধরে গরমের মাত্রা বাড়ছে। আজকের তাপমাত্রাটা চরমে পৌঁছেছে। অসহ্য গরমে অস্থির লাগছে। ফ্যানের বাতাসও গায়ে লাগছে না। অন্যান্য দিনে অফিসে থাকায় গরমটা এত অনুভব করেনি রাশেদ। কারণ অফিসে এয়ারকন্ডিশনার রয়েছে।
আজ ছুটির দিন বলে বাইরে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। বাসায় একা রয়েছে রাশেদ। সুরভি মেয়ে রুমকিকে নিয়ে উত্তরায় ওর খালার বাসায় বেড়াতে গেছে গতকাল। আমেরিকা থেকে খালার বড় মেয়ে নুজহাত পাঁচ বছর পর দেশে এসেছে। নুজহাত সুরভিরই সমবয়সী, একসঙ্গে কলেজ-ভার্সিটিতে পড়েছে। বান্ধবীর মতো।
আজ ছুটির দিন। বাইরে কোথাও যাওয়ার প্ল্যান নেই রাশেদের। এ ভয়াবহ গরমে কোথাও গিয়েও শান্তি নেই। নাশতাটাস্তা খেয়ে সোফায় বসে দৈনিক পত্রিকায় চোখ বুলোচ্ছিল রাশেদ। হঠাৎ বাইরে থেকে ঠাণ্ডা বাতাসের ছোঁয়া লাগে গায়ে। অবাক হয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়।
আকাশে মেঘ জমেছে। এ সকালেই চারপাশ সন্ধ্যার মতো কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে।
ঝড়-বৃষ্টি হলে অসহ্য গরমের প্রকোপটা কমবে ভেবে স্বস্তিবোধ করল রাশেদ। কতক্ষণে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়, তার অপেক্ষা করতে থাকে সে। হঠাৎ বাসার কল বেলটা বেজে ওঠে।
কল বেলটা পরপর কয়েকবার বাজতেই সচকিত হয় সে। এ সময়ে আবার কে এল? সাধারণত আজ তো কারো আসার কথা নয় বাসায়। কাজের বুয়াকে আগেই বলে দেয়া হয়েছে তিনদিন আসতে হবে না, এ কয়দিন তার ছুটি। কৌতূহলী হয়ে অনেকটা বিরক্তি নিয়ে দরজাটা খুলে দাঁড়ায় রাশেদ।
সামনেই একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। চারতলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। দেখেই বোঝা যায়। সারা মুখে ঘাড়ে গলায় ঘামের বিন্দু চিক চিক করছে। বয়স ২৪-২৫ হবে। গায়ের রঙ খুব ফর্সা ছিল আগে, রোদে পুড়ে কিছুটা কমেছে। দেখতে চমৎকের। নাক কিছুটা চাপা হলেও চোখ দুটো বেশ বড় বড়, পটলচেরা চোখ বলা যায়। পরিচর্যাহীন হলেও মেয়েটির রূপ যে কাউকে আকৃষ্ট করবে সহজেই। মেদহীন সুঠাম শরীর। দেহের বাঁকে বাঁকে যৌবন উপচে পড়ছে। মাথাভর্তি চুলগুলো খোঁপায় বাঁধলেও তাতে তেমন যত্নের প্রকাশ নেই। কোমরের নিচে দুই প্যাঁচ দিয়ে শাড়ি পরেছে। আর এক টুকরো কাপড় ওড়নার মতো গলায় ঝুলছে। উজ্জ্বল প্রিন্টের ব্লাউজ তার সুডোল বুক দুটিকে আড়াল করলেও এর উদ্ধতভাব ঠিকই ফুটে উঠছে।
মেয়েটির কাঁধে একটি ঝুলি আর হাতে দুটি ছোট আকারের কাঠের বাক্স।
এই সকালে ঘরের দরজা খুলে সামনে দাঁড়ানো অপরিচিত মেয়েটির দিকে নজর বুলিয়ে বিরক্ত হলেও রাশেদের মনে অন্য রকম দোলা লাগে। দেখেই বোঝা যায়, মেয়েটি বেদে সম্প্রদায়ের। সাধারণত গ্রামীণ জনপদে আগে তাদের বিচরণ সীমাবদ্ধ থাকলেও আজকাল মেট্রোপলিটন আধুনিক রাজধানী ঢাকা শহরেও বেদে কন্যাদের দেখা যায়। শহরের ব্যস্ত এলাকায় দলবেঁধে ওরা ঘুরে বেড়ায়। কাঁধে ঝোলা আর সঙ্গে ছোট কাঠের বাক্স নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বেদেনিদের হাতে অনেক সময় ছোট বড় মাঝারি বিভিন্ন সাইজের জ্যান্ত সাপ থাকে। কাঠের বাক্সেই থাকে সাধারণত জ্যান্ত সাপগুলো। সাপের নানা ধরনের খেলা দেখিয়ে বাতব্যথার বনাজি ওষুধ, মালিশ, বুনো লতাপাতা, গাছের শিকড়বাকড়, পশুপাখির হাড়, মাছের কাঁটা, দাঁত, ধনেশ পাখির তেল প্রভৃতি দিয়ে ভেষজ ওষুধ তৈরি করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করে। টোটকা চিকিৎসা করে যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে সংসার চালায়। বেদে ছেলেরা সাধারণত অলস স্বভাবের হয়ে থাকে। তারা ঘরে শুয়ে বসে সময় কাটায়। মেয়েদের কঠোর পরিশ্রম করে সংসারের সবার ভাত-কাপড় সংস্থান করতে হয়। শহরের বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় বেদেনিদের দল দেখা যায়। আজকাল শহরে ব্যস্ত মানুষের সাপ খেলা দেখার সময় নেই, আর বেদেনির টোটকা ওষুধে তেমন আস্থা নেই কারো আগের মতো। ফলে আয়-উপার্জন অনেক কমে গেছে বেদে কন্যাদের। যে কারণে শহরের রাস্তায়, পথে-ঘাটে বিভিন্ন মানুষের সামনে জ্যান্ত সাপ ধরে ভয় দেখিয়ে অনেকটা জোর করে টাকাপয়সা আদায় করে ওরা। পারতপক্ষে বেদেনির দল দেখলে সবাই তাদের এড়িয়ে চলতে চায়। আজ তার নিজ ফ্ল্যাটের সামনে তেমনি একজন বেদেকন্যা একাকী দাঁড়িয়ে। বৈশ সুন্দরী।
প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায় রাশেদ মেয়েটির দিকে।
মেয়েটি তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে মুখে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে বলে, ‘আমি বাইদ্যা মাইয়া। আইছিলাম পেটের ধান্ধায়, আমার কাছে সুন্দর চুড়ি, কানের গয়না, নাকফুল আছে। বেগম সাবেরে ডাকেন, পছন্দ হইলে নিব, না নিলে নাই।’
বাসায় তার বউ আছে ভেবে মেয়েটি তাকে ডাকতে বলে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে উঁকি দেয়,
‘বেগম সাহেব, বাসায় নাই, আমি আছি শুধু একা, তোমার সুন্দর চুড়ি, কানের দুল, নাকফুল কেনার মতো কাস্টমার এই বিল্ডিংয়ে পাইবা না, শুধু শুধু চারতলা সিঁড়ি বাইয়া উঠছ, কোনো লাভ হইল না, তুমি যাইতে পারো এইবার’ বলে দরজা বন্ধ করতে উদ্যত হয় রাশেদ। মেয়েটির সঙ্গে বেশি কথা বলে শেষে আবার কোন ঝামেলায় জড়ায়, তার চেয়ে আগেভাগে ওকে বিদায় করা ভালো।
‘আপনার বাসার দুয়ারে আইলাম, এমনি এমনি বিদায় কইরা দিবেন আমারে, আপনার দিলে কি একটু দয়ামায়া জাগে না, অনেক দূর পথ রৈদের মধ্যে হাইট্যা আইছি, এই গরমে সিঁড়ি বাইয়া চারতলায় উঠছি, বুকটা শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেছে। ঘরে ফ্রিজে ঠাণ্ডা পানি থাকলে একটু খাওয়ান, দিল থেইকা দোয়া করমু।’
মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গিতে জাদু আছে, রাশেদ খেয়াল করে। মেয়েটির কথায় যথার্থতা রয়েছে, অনুভব করে সে। এই কাঠফাটা রোদে অনেক দূর পথ হেঁটে এসে আবার বিল্ডিংয়ের চারতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে। মেয়েটির জন্য হঠাৎ কেন জানি মায়া জাগে তার মনে। রাস্তাঘাটে এ ধরনের মেয়েদের দেখলে যেখানে সে অন্য সময় তাদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে, এখন তেমন একটি মেয়ের জন্য মনটা সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছে, নিজের এ পরিবর্তনে অবাক হয় সে।
‘আস্থা, ঠিক আছে। দাঁড়াও তুমি, আমি পানি আনছি’ বলে ঘরে ঢুকে রাশেদ ফ্রিজ খুলে পানির বোতল বের করে। গ্লাসে পানি ভরে নিয়ে এসে মেয়েটির হাতে দেয়।
পানির গ্লাস নিতে গিয়ে রাশেদের হাতের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যায় তার। ঢক ঢক করে পানি খেয়ে গ্লাসটি ফিরিয়ে দিতে দিতে মেয়েটি সরাসরি তাকায় রাশেদের চোখের দিকে। মেয়েটির চোখের দৃষ্টিতে অনেক কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ছে। পাশাপাশি ওই চোখের দৃষ্টিতে কেমন যেন সম্মোহনী ভাব লক্ষ করে সে। আচ্ছা, বেদেকন্যাটি কি তাকে জাদুটোনা করছে নাকি?
‘আপনে অনেক ভালা মানুষ, আজকাল অপরিচিত কাউরে এইভাবে কেউ ঘরের ফ্রিজ থিকা ঠাণ্ডা পানি আইন্যা খাওয়ায় না, আল্লায় আপনের অনেক ভালা করব’— বেদেকন্যার কথাগুলো বেশ লাগে রাশেদের। মেয়েটি ক্রমেই তাকে কেমন যেন আকৃষ্ট করছে, অনুভব করে সে।
‘আমার কাছে বাতব্যথার ভালা ওষুধ আছে, লাগলে নিতে পারেন। মুরব্বি, বুড়া মানুষ যদি কেউ থাকে, তার লাইগা বাতব্যথার মালিশ নিতে পারেন। এত দূর চারতলা বাইয়া যদি আপনের কাছে কিছু বেচাবিক্রি করতে না পারি, তাইলে কেমনে চলব, খালি হাতে ফিরা গেলে খাওন-দাওন জুটব কেমনে, আমার কাছ থিকা কিছু একটা কিনেন গো সাব, কিছু বেচতে না পারলে না খাইয়া থাকতে হইব।’
বেদেনির কথা শুনে নিজের পিঠের ব্যথার কথা মনে পড়ে রাশেদের। সে ভাবে, তাকে পিঠের ব্যথার কথাটা বলবে কিনা। এটা জানতে পারলে বেদেকন্যা তার টোটকা ওষুধ, মালিশ বিক্রির জন্য আরো তত্পর হবে, হয়তো চেপে ধরবে আর বলবে, ‘আমার মালিশ আর ওষুধে সব ব্যথা-বেদনা নিমিষেই দূর হইয়া যাইবে। রাশেদ আবার ভাবে, বেদেকন্যার টোটকা ওষুধ আর মালিশে হয়তো তার পিঠের ব্যথা সেরেও যেতে পারে, কোন ওষুধে কী গুণ তা কি আগে থেকে বলা যায়?
যদিও এসব টোটকা চিকিৎসা, ঝাড়ফুঁকে একদম বিশ্বাস বা আস্থা নেই তার। দ্রুত নানা দিক চিন্তাভাবনা করে একসময় সে বলে, ‘আমার পিঠে কয়দিন ধরে ব্যথা, কোনো ওষুধপত্র খাই নাই, এখনো সারছে না। কী করি ভাবতেছি।’
রাশেদের কথা শুনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বেদেকন্যার চোখ-মুখ। যাক, তাহলে একজন কাস্টমার পাওয়া গেল।
‘সাব, আপনের পিঠের ব্যথা নিমিষেই দূর কইরা দিমু, আমার কাছে দুইডা মালিশ আছে। ধনেশ পাখির তেল দিয়া বানানো। এমুনভাবে মালিশ কইরা দিমু। দেখবেন, বিষ ব্যথা সব কই চইল্ল্যা যাইব।’
মেয়েটির কথা শুনে চমকে ওঠে রাশেদ। হঠাৎ বুঝতে পারে না কী বলছে সে। প্রশ্ন করে, ‘মানে?’
‘মানে আবার কী? আমি আপনের পিডে এমুনভাবে মালিশ কইরা দিমু আমার ওষুধ দিয়া, শিঙা লাগামু। বিষাক্ত রক্ত বাইর কইরা নিমু। এরপর দেখবেন আপনের পিডে আর কোনো বিষ ব্যথা নাই, কতজনরে এই ওষুধ দিলাম। এ ওষুধের গুণের কথা সবাই কয়। বুঝলেন গো সাব, দামও খুব বেশি না। কিন্তু উপকার অনেক বেশি।’
বাসায় একাকী রয়েছে সে। এখন যদি মেয়েটিকে শরীর মালিশ করতে ঘরে ঢুকতে দেয়, তাহলে যদি কোনো অঘটন ঘটায় সে। বলা তো যায় না, তার মনে আবার কী রয়েছে? মেয়েটিকে ঘরে ঢোকানোর পর যদি কেউ এসে পড়ে। বাসায় এক বেদেকন্যার সঙ্গে তাকে দেখতে পেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেতে পারে, সুরভির কানে যদি যায় কথাটা কী যে হবে— ইত্যকার চিন্তাভাবনা তাড়িয়ে নেয় রাশেদকে। মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোলচালে কেমন অস্থির হয়ে ওঠে সে।
‘ও সাব, কী ভাবতাছেন? ঘরের ভেতরে চলেন, আমি আপনের পিডে ধনেশ পাখির তেল মালিশ কইরা দিই, ডরাইয়েন না, আমি কোনো খারাপ মতলব লইয়া আপনের বাসার সামনে আসি নাই, চুরি-ডাকাতির ধান্ধা করি না আমি’— খুবই সহজ-সরল আন্তরিক ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে বেদেকন্যা।
তার কথায় আর নিজেকে আগের মতো ধরে রাখতে পারে না রাশেদ। দ্বিধা, সংকোচ, সংশয় সন্দেহ সবকিছু কাটিয়ে দরজা থেকে সরে ঘরে ঢুকে মেয়েটিকে আহ্বান জানায়, ‘আসো, ঘরের ভেতর আসো।’
মেয়েটি ঘরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দেয় রাশেদ। সে অনুভব করে, তার ভেতরে ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা চাড়া দিয়ে উঠছে। অনেকটা কাঁপা হাতে দরজা বন্ধ করে সে। কাজটা ভালো করল নাকি মন্দ করল, ভাবতে থাকে সে।
বেদেকন্যা ততক্ষণে ড্রইং রুমের কার্পেটে তার কাপড়ের ঝোলা আর হাতের ছোট্ট কাঠের বাক্স দুটি রেখে হাত-পা ছড়িয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বসেছে। বাইরে গরমে এতক্ষণে হাঁসফাঁস করছিল। এখন ফ্যানের নিচে অনেকটা আরাম বোধ করছে। একটি ফ্ল্যাটে অচেনা একজন পুরুষের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে বসে আছে, বাসায় আর কেউ নেই। এখন যদি সেই পুরুষটি তার ওপর চড়াও হয়, জোর খাটায়, অন্য কিছু করার চেষ্টা করে, তাহলে কী হবে? এ বিষয়ে বেদেকন্যার কোনো চিন্তাভাবনা নেই। অনেকটা নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে সে বসে আছে কার্পেটের ওপর।
‘ও আচ্ছা, তোমার নামটা যেন কী? থাকো কোথায়?’ কাঁপা গলায় উত্তেজনা চেপে জানতে চায় রাশেদ।
‘আমার নাম বিজলি, থাকি হেই নন্দীপাড়ার বস্তি।’
‘সঙ্গে আর কে থাকে?’
‘আর কে থাকব? সোয়ামি আছে, পোলা আছে একটা?’
‘তোমার স্বামী কী করে?’
‘কিছু করে না, বইয়া বইয়া শুধু খায় একটা আকাইম্মা ভাদাইমা পুরুষ। আমি দুনিয়া ঘুইরা যদি আয়-রোজগার করতে পারি, তা দিয়া সংসার চালাইতে হয়। আমি যদি রোজগার করতে না পারি, তাইলে খাওন-দাওন বন্ধ হইয়া যায়, এইডা একটা জীবন হইল, আপনে কন?’ অনেকটা আক্ষেপ আর ক্ষোভ ঝরে পড়ে বিজলির কণ্ঠে। রাশেদ বুঝতে পারে, স্বামী নিয়ে চরম অসন্তোষ তার মনে।
নানা কথা বলতে বলতে এর মধ্যে অনেকটা সহজ হয়ে উঠেছে রাশেদ। কিছুক্ষণ আগের উত্তেজনা ভাবটা কিছু কমেছে। হাত-পা না কাঁপলেও বুকের ভেতর এক ধরনের ধুঁপকপুকানি চলছে, অনুভব করে সে।
মেয়েটিকে তো ঘরে ঢুকিয়েছে, এখন আবার কেউ এসে না পড়লেই হয়। বাইরে অনেক অন্ধকার করেছে, সন্ধ্যার মতো অবস্থা চারদিকে। তুমুল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হতে বেশি বাকি নেই। এ সময়ে কেউ আসবে না, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তার পরও আশঙ্কার শেষ নেই। এখন যত তাড়াতাড়ি মেয়েটিকে বিদায় করতে পারলেই রক্ষা, হাঁফ ছেড়ে বাঁচা যাবে।
রাশেদ চুপচাপ দ্রুত অনেক কিছু ভাবছে। বেদেকন্যা বিজলি এটা ঠিকই অনুভব করে। ‘ও সাব কী সব চিন্তা করতাছেন, আপনের পিঠ মালিশ করাইবেন না কইলেন, জলদি করেন। বাইরে অনেক ঝড়-তুফান শুরু হইতাছে। এখান থিকা আমার আবার হাইট্টা নন্দীপাড়া যাইতে অইব। বেশি ঝড়-বৃষ্টি হইলে এ ঢাকা শহরে তো রাস্তাঘাটই গাঙের লাহান অইয়া যায়, নৌকা চালানের অবস্থা হয়, সে রকম হইলে আমি ঘরে ফিরা যামু কেমনে?’ উত্কণ্ঠা ঝরে পড়ে বিজলির কণ্ঠে।
বিজলি আমাকে কী করতে হইব এখন? যা করার তাড়াতাড়ি করবে। তাড়া দেয় রাশেদ।
ততক্ষণে নিজের কাপড়ের ঝোলা থেকে একটি বোতল আর কয়েকটা ওষুধের কৌটা বের করে রাশেদের পিঠ মালিশের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে বিজলি।
‘তা কোথায় শুইবেন? এখানে না, অন্য ঘরের বিছানায় চলেন—’
মেয়েটির কথায় কেমন যেন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। অনেকটা সম্মোহিত করে ফেলেছে যেন মেয়েটি তাকে, অনুভব করে রাশেদ। চাইলেও সেই মোহাচ্ছন্ন ভাবটা এড়াতে পারছে না সে। অনেকটা বাধ্য পুতুলের মতো নিজের বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায় রাশেদ। তার পিছু পিছু বিজলিও কৌতূহলী ভাব নিয়ে এগোয়।
বিজলির কথামতো পরনের টি-শার্ট খুলে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে রাশেদ।
এবার বিজলি রাশেদের পিঠে হাত রাখে। ধীরে ধীরে তার আঙুল মৃদু চাপ দিতে শুরু করে। পিঠের ওপর থেকে নিচের দিকে তার হাতের আঙুল অদ্ভুত এক মোলায়েম ভঙ্গিতে ওঠানামা করছে। বিভিন্ন ধরনের বনাজি ওষুধ আর ধনেশ পাখির তেল মাখিয়ে রাশেদের পিঠে চমৎকেরভাবে ম্যাসাজ করছে বেদেকন্যা বিজলি। বেশ আরাম বোধ করছে রাশেদ এ মুহূর্তে। এক ধরনের স্বর্গীয় অনুভূতি তার সবকিছু ভুলিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ বাইরে খুব কাছেই কোথাও ভয়ঙ্কর শব্দে বাজ পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে যায়। আলো নিভে গিয়ে সারা ঘরে ঘন গাঢ় অন্ধকার গ্রাস করলেও বিজলির হাত থেমে থাকে না। সে আগের মতো রাশেদের পিঠে ম্যাসাজ করতে থাকে। এতক্ষণ রাশেদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে থেকে তার পিঠে ধীরে ধীরে মালিশের কাজ সারলেও এখন তার হাত দুটি আরো বেশি সচল এবং দ্রুত হয়ে উঠেছে। ক্রমেই বিজলি তার শরীরের একদম কাছে চলে এসেছে। ম্যাসাজ করার সময় মুখে বিড় বিড় করে কী সব মন্ত্র উচ্চারণ করছে সে। তার নরম শরীরের স্পর্শ পাচ্ছে রাশেদ। একপর্যায়ে বিজলি রাশেদের পিঠে চড়ে বসে।
এখন উবু হয়ে বসে ম্যাসাজ করছে সে। রাশেদ তার সুডোল নরম স্তন দুটির চাপ অনুভব করছে সে এখন। বিজলির চেহারা দেখতে না পেলেও তার গরম নিঃশ্বাস অনুভব করছে ঠিকই। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে বিজলির। বাইরে উত্তাল ঝড়-বাতাসে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার ঘরে বিছানায় উপুড় হয়ে শোয়া রাশেদের বুকের মধ্যে তখন তীব্র ঝড় শুরু হয়ে গেছে। সেই ঝড়ে তার ভেতরের সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে যেন সে হারিয়ে ফেলছে কোনো অজানা জগতে। যেখান থেকে ফেরার কোনো তাগিদ অনুভব করছে না সে। ক্রমেই সে যেন তলিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ রাশেদ পিঠ থেকে বিজলিকে সরিয়ে বিছানায় উঠে বসে। তারপর তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে চেপে ধরে। নিজের পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক অবস্থান সব ভুলে যায় নিমিষেই। বদলে গিয়ে অন্য এক মানুষে পরিণত হয় সে। যেন ক্রমেই বদ্ধ এক উন্মাদ হয়ে উঠছে। সেই উন্মাদনা রাশেদকে অন্য এক মানুষে রূপান্তর করছে।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিজলি কিছুটা অবাক হলেও সে বাধা দিতে চায়, ‘আহা, কী করতাছেন সাব, এসব কী করতাছেন আপনে?
রাশেদ তখন আরো বেশি ক্ষেপে উঠেছে।
রাশেদের উন্মাদনা দেখে বিজলি শুধু হাসে। বিড় বিড় করে বলে, ‘আহারে পুরুষ মানুষ, মাইয়া মানুষ কাছে পাইলে নিজেরে আর ঠিক রাখতে পারে না, সবাই এক পদের। সাব, আপনেও শেষ পর্যন্ত...। আমি ভাবছিলাম আপনে এ রকম কিছু করবেন না।’
এর মধ্যে ধীরে এবং ধীরে বাইরে ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ কমে আসে। হঠাৎ ঘরের বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে ওঠে। আলো জ্বলে উঠতেই রাশেদ ও বিজলি নিজেকে আবিষ্কার করে আদিম যুগের মানব-মানবীর মতো। দুজনের কারো গায়েই কোনো কাপড় নেই। ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর নিয়ে পরস্পরের দিকে তাকায়। দুজনেরই ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস বইছে। এতক্ষণ দুজনই দারুণ এক যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। একজন আরেকজনকে জয়ের ভীষণ এক যুদ্ধে মেতেছিল। সেই যুদ্ধ থামলেও তার রেশ কাটেনি।
হঠাৎ বিজলির কাচ ভাঙা খিলখিল হাসি শুনে সংবিত ফিরে পায় যেন সে।
ঠাট্টা মেশানো সুরে বিজলির কথা শুনে হঠাৎ তার সুরভির কথা মনে পড়ে যায়।
আচ্ছা, এখন সুরভি কী করছে, যদি সে জানতে পারে, একলা বাসায় তার অনুপস্থিতিতে প্রিয় স্বামী কি কাণ্ড করছে। তাহলে কী হবে?
নিজের ওপর চরম ঘৃণা জাগে তার মনে।
ততক্ষণে বিজলি ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার নিজের কাপড়চোপড়, শাড়ি-ব্লাউজ কুড়িয়ে নিয়ে পাশের বাথরুমে ঢুকেছে।
বিছানায় একপাশে ঝিম মেরে বসে আছে রাশেদ।
নিজের সব কাপড়চোপড় পরে মাথার চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে রাশেদের সামনে এসে দাঁড়ায় বিজলি।
রাশেদ তার মানিব্যাগ থেকে কয়েকটা বড় নোট বের করে বিজলির হাতে দেয়। কত টাকা দিচ্ছে, সেদিকে খেয়াল করে না সে।
একসঙ্গে বেশ কয়েকটা হাজার টাকার নোট পেয়ে খুশিতে বিজলির মনটা নেচে ওঠে। এই সাহেব খুশি হয়ে এতগুলো টাকা দেবে তাকে, ভাবতেই পারেনি। রাশেদের দিকে কৃতজ্ঞভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসে বিজলি।
‘সাব, আপনে খুব ভালা মানুষ। শিক্ষিত, ভদ্রলোক কিন্তু আইজকা এইডা কী করলেন? আপনেরে তো তেমন মানুষ ভাবি নাই আমি। আমি তো আপনের পিঠে ব্যথা-বেদনার মালিশ দিতেছিলাম। এরপর এইডা কী হইয়া গেল।
বিজলি ড্রইং রুমে গিয়ে নিজের কাপড়ের ঝোলাটা ঠিকঠাক করে। কাঠের বাক্স দুটো খুলে ভেতরের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা পরখ করতে গিয়ে আঁতকে ওঠে। আর্তনাদ করে বলতে থাকে, ‘সর্বনাশ হইয়া গেছে গো সাব, অনেক বড় সর্বনাশ হইয়া গেছে। এইডা কী হইলো গো এখন কী হইব?’
বিজলির অস্থিরতা দেখে অবাক হয়ে রাশেদ জানতে চায়, ‘কী হইছে?’
‘এই কাঠের বাক্সে তিনটা সাপ আছিল, এখন দেখি মাত্র একটা আছে। বাকি দুইডা নাই, বাক্স থিকা কেমনে জানি বাইর হইয়া গেছে। সাপ দুইডা এই বাসার মধ্যেই লুকাইছে কোন চিপাচাপায় কে জানে। এখন কই খুঁইজ্জ্যা পামু কন তো সাব?’ বলেই বিজলি এঘর-ওঘরে উঁকি-ঝুঁকি মারে। রান্নাঘরে ছুটে যায়। কিচেন কেবিনেটগুলোর দরজার পাল্লা খুলে ভেতরে দেখে। নাহ, কোথাও সাপ দুটিকে খুঁজে পায় না সে।
রাশেদও অস্থিরভাবে খুঁজতে থাকে। বিভিন্ন রুমে গিয়ে সোফা, বিছানাপত্র উল্টেপাল্টে, ওয়্যারড্রোব, আলমারির ভেতরের ড্রয়ার খুলে দেখে, কোথাও বিজলির সঙ্গে আনা কাঠের বাক্স থেকে বেরিয়ে যাওয়া সাপগুলোর দেখা পায় না ওরা।
বিজলি অনেকটা হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত রাশেদকে আশ্বস্ত করতে বলে, ‘ভয় পাইয়েন না সাব, আমার এ সাপগুলোর কোনো বিষ নাই। কামড়াইব না, কামড়াইলেও কিছু হইব না।’
বিজলিকে বাসার মধ্যে আর বেশিক্ষণ রাখা ঠিক হবে না। বাইরে আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে ঝকঝকে রোদ উঠে গেছে। ছুটির দিন আজ। হঠাৎ বাইরে থেকে কেউ এসে উঠতে পারে। কেউ এসে পড়লে এবং একলা বাসায় সঙ্গে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো টগবগে যৌবনা এক বেদেকন্যাকে দেখলে মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। সবার মুখে বদনাম ছড়াবে, দুশ্চরিত্রের মানুষ হিসেবে জানবে সবাই তাকে।
বিজলি বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রাশেদ আবার ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাপ দুটির সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এঘর-ওঘরের ফার্নিচার, কাপড়চোপড়, বিছানাপত্র, আলমারি, রান্নাঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র, কিচেন কেবিনেট, হাঁড়ি-পাতিল, ফ্রিজ, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন সবকিছু খুলে উল্টেপাল্টে দেখে।
তার কৃত অপরাধের সাজা বুঝি এভাবেই নির্ধারণ করেছে নিয়তি।





