পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের (১৫২৬) পরই মোগল ও আফগানদের মধ্যে কঠিন সময় শুরু হয়। আফগানরা ছিল উত্তর ভারত থেকে বিতাড়িত, তাই তারা পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোয় বিশেষ করে বাংলায় চলে আসে। তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হয়েছিল বাংলা। সে সময়ে বাংলায় বাবরের সমসাময়িক নসরত শাহর অধীনে ছিল বেশকিছু অঞ্চল। তার সহযোগিতায় বাংলায় এসে মোগলবিরোধী ঘাঁটি গড়েছিল আফগানরা। সে সময় নসরত শাহ বাংলায় মোগলবিরোধী জোট শক্ত করতে পেরেছিলেন। কারণ আফগানদের অনেক দল ছিল, যারা বিতাড়িত হয়ে বাংলায় হাজির হয়েছিল। আফগানদের সহায়তায় একটি কনফেডারেসি গঠন হয়েছিল। তাদের প্রথম কাজ ছিল বিহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সীমান্ত শিবির স্থাপন করা। এ পরিস্থিতিতে মোগল রাজপুত্র হুমায়ুন জৈনপুরের দিকে অগ্রসর হন। খুব স্বল্প সময়েই তিনি আফগানপ্রধান মারুখ খান ও নাসির খান লোহানিকে জৈনপুর থেকে বিতাড়িত করেন। গঙ্গা থেকে গোগড়া পর্যন্ত সমগ্র উত্তর উপকূল এভাবে বাবরের হাতে চলে আসে। এ পরিস্থিতিতে নসরত শাহ মোগলদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকবেন বলেই জানিয়েছিলেন। বাবর চেয়েছিলেন এ সুযোগে তিনি রাজমহল দখল করবেন। তবে রাজদূতকে বন্দি ও নানা ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা সন্দেহে বাবর নসরত শাহকে বিশ্বাস করেননি। এদিকে আফগান নেতা বাহরান খান লোহানির মনেও সন্দেহ জাগে নসরত শাহকে ঘিরে। তাই মোগল ও আফগান উভয় নিজেদের মতো এগিয়ে যেতে থাকে। বাবরকে প্রতিহত করতে আফগান নেতারা নসরত শাহ ব্যতীতই পরিকল্পনা করছিলেন। তবে বাহরান খান লোহানির আকস্মিক মৃত্যু তাদের মোগলদের বিপক্ষে দুর্বল করে তুলেছিল। আফগানদের হারাতে বাবর দক্ষিণ বিহারের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এর মাঝেই অসংগঠিত আফগান বাহিনীকে পুনরুজ্জীবিত করতে মাহমুদ খানের আগমন হয়। এভাবে লোহানি-পরবর্তী আফগান কনফেডারেসির নতুন যাত্রা।
তবে এর মাঝেই মাহমুদের সঙ্গে নসরত শাহর বেশকিছু দ্বন্দ্ব হয়েছিল। এতে আফগান কনফেডারেসি হুমকির মুখে পড়লেন। মাহমুদ বিশাল সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বাবরের বিপক্ষে আফগানদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নসরত শাহ, শের খান সুর, বিবন খান, বায়েজিদ খান ও একজন হিন্দু জমিদার বসন্ত রায়। ১৫২৯ সালের শুরুতে মোগলদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। মাহমুদ ও শের খান গঙ্গার দুই তীর, চুনা ও বেনারসের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। আফগানদের ঐক্যের খবরে বাবর অগ্রসর হয়েছেন এমন খবরে ভয়ে মাহমুদ পালিয়ে যান। মোগল সেনারা গঙ্গা পার হয়ে বক্সার পর্যন্ত বিজয় অর্জন করে। বাবরের এ বিজয় আফগান কনফেডারেসিতে দিশেহারা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।
অন্যদিকে আফগান কনফেডারেসির সহযোগী শের খান সুর মোগল জায়গিরে যোগ দেন। কারণ আফগান স্বার্থের ঊর্ধ্বে তিনি ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে ভেবেছিলেন। বাহরান খান লোহানি ছিলেন আফগান প্রতিরোধের স্বীকৃত নেতা। কিন্তু তার মৃত্যু হয় এবং তার নাবালক পুত্র জালাল খান লোহানি তখনো নেতৃত্ব দেয়ার অবস্থায় ছিলেন না। তাই নসরত শাহর ওপরই মোগলবিরোধী আফগান ফেডারেশনকে পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব পড়েছিল। যেহেতু একদিকে তিনি মোগলবিরোধী ফেডারেশন নিয়ে কাজ করছিলেন, অন্যদিকে আবার তিনি মোগলদের সঙ্গে কূটনৈতিক মৈত্রীতেও আবদ্ধ হয়েছিলেন। আফগানরা মোগলদের প্রতিরোধে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। তবু আফগান ফেডারেশনে ঐক্য ছিল না। দলের মাঝে নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা নিয়ে হাতাহাতি লড়াই লেগেই থাকত এবং এটি আফগান শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবশ্য এ পরিস্থিতি দীর্ঘকাল ধরে চলছিল, লোদি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই।
মুহাম্মদ শাহ, জালাল খান লোহানি, নসরত শাহ ও শের খান সুর নিজেদের মধ্যে একজন দক্ষ নেতা নির্বাচন করতে পারেননি। মোগলদের প্রতিরোধ লড়াই বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলনেতা। তবে তা নির্ধারণে ছিল আফগান ফেডারেশনের ব্যর্থতা। এ পরিস্থিতি বিহারে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। আফগানদের মাঝে চলছিল অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং ছিল আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব। বাংলার সুলতান নসরত শাহ আফগান ফেডারেশনের অংশ ছিলেন, পাশাপাশি বাবরের বশ্যতার ভান ধরেছিলেন। তখন থেকেই কখনো তারা মোগলদের বিরোধিতা করছে জোটবদ্ধ হয়ে, কখনো তারা নিজেরাই নিজেদের সঙ্গে লড়ছেন, ষড়যন্ত্রও চলেছে। আফগান নেতারা আবার নিজেদের মধ্যে দলে ভাগ হতে থাকেন। এভাবেই নিজেদের মাঝে লড়াইয়ের ফলে আফগান শিবিরে ঐক্য ভেঙে যায়। শের খান বেনারস দখল করলেও বাবরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। জালাল খান লোহানি বক্সারের কাছে এসে আত্মসমপর্ণ করেন। অন্য আফগান নেতারাও ধীরে ধীরে নত হতে থাকেন। বাবর সরাসরি বাংলার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।
বাকি ছিলেন নসরত শাহ, যিনি তার সব মিত্রদের দ্বারা পরিত্যক্ত হতে থাকেন। যেহেতু তিনি মোগলদের সামনে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়েছিলেন, তাই তাকে হয় মোগলদের কাছে নিজের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে হতো অথবা আত্মরক্ষায় পালাতে হতো। সোনে নদীর তীরে তিন দিনব্যাপী গোগড়ার যুদ্ধ (১৫২৯) হয়েছিল। যেখানে মাহমুদ লোদিকে বাবর আফগান সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হতে বাধা দেন। আফগান দল অনেক চেষ্টার পরও বাবরের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার জন্য জয়ী হতে পারেনি। তবে সেনাপতি বসন্ত রায় বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। শেষে তিনি ময়দানেই প্রাণ হারান। এটা ছিল বাবরের অন্যতম জয়।
১৫৩০ সালে বাবরের মৃত্যু ছিল নসরাত শাহর জন্য অনেক বড় সুযোগ। নসরত শাহ ও মুহাম্মদ লোদি অল্প চেষ্টায় শের খান সুর ও জালাল খান লোহানিকে মোগলবিরোধী দলে যোগদান করাতে সফল হন।
১৫৩১ সালে আবার মোগলদের প্রতি নতুন উদ্যমে আফগান আগ্রাসন শুরু হয়। মুহাম্মদ লোদির সহযোগিতায় শের খানের নেতৃত্বে তারা মোগলদের কাছ থেকে জৈনপুর দখল করে নেয়। তবে চৌসার যুদ্ধে লোদির অযোগ্যতা এবং শের খানের বিশ্বাসঘাতকতায় আফগান দল সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে আফগান শক্তি। তবে মোগল বিজয়ের পেছনে দায়ী করা হয় আফগান নেতা শের খান সুরের বিশ্বাসঘাতকতাকে। বাবরের পর পুত্র হুমায়ুন আফগানদের প্রতি তার লড়াই জারি রাখেন। আফগান নেতা নসরত শাহ জীবনের শেষ সময়েও মোগলদের সঙ্গে লড়তে পরিকল্পনা করেছিলেন। মোগলদের সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রু বাহাদুর শাহর সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে দূত পৌঁছনোর আগেই নসরত শাহ মৃত্যুবরণ করেন। নসরতের উত্তরাধিকারী ছিল গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ। যার মাঝে রাষ্ট্র পরিচালনা ও মোগল প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো কোনো গুণাবলি ছিল না। ফলে তার অদক্ষতার কারণেই গুজরাটের বাহাদুর শাহর সঙ্গে নসরতের পরিকল্পানাটি যে বাস্তবায়ন প্রয়োজন ছিল তা অনুমান করতে পারেনি। অহংকার, ভুল সিদ্ধান্ত ও অপরিকল্পনাই ছিল আফগান ফেডারেশনে তার আবদান। তবে এ সময়ে বিহার নিয়ে মোগলরা ছিল দোটানায়। আফগান নেতা লোহানি, ইস্তরানি ও ফার্মুলিসদের সঙ্গে বিহারে চলছিল দীর্ঘ লড়াই। তবে আফগানদের এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষকে কাজে লাগিয়ে বিহারের কিছু অংশ দখল করে নেয় মোগলরা। পরবর্তী সময়ে বাবর বা হুমায়ুন কেউই বিহারের বাইরে তৎকালীন বাংলা অঞ্চলের তেমন কোনো অংশ মোগল অধীনে আনতে পারেননি। আফগান সীমানা ছিল বিহারপূর্ব এলাকা পর্যন্ত। হুমায়ুনকে ভারত থেকে বিতাড়িত করার পর শের শাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। দিল্লি থেকে বাংলাকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো শের শাহ ও তার পুত্র ইসলাম শাহর (১৫৩৯-৫৩) সময় পর্যন্ত। আকবরের বাংলা বিজয় ১৫৭৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা কখনই দিল্লির অধীনতার বাইরে ছিল না। দিল্লিতে আফগানদের মধ্যে মতবিরোধ, নিজেদের মাঝের নানা বিবাদ তাদের একেবারেই দুর্বল করে দিয়েছিল। মোগল আফগান লড়াইয়ের শেষ পরিণতি পানিপথের যুদ্ধ (১৫৫৬) দিয়ে হয়েছিল। যার পরিণতি মোগলদের পক্ষেই ছিল। ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর বাংলার রাজনীতিতে নানাভাবে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে।
ঝাঁসিতে বাংলার অভিজাতদের আগমন ঘটে। মুহাম্মদ গাজীর পুত্র খিরজ খান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর খান উপাধি ধারণ করেন, বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা দেন এবং বাংলার সিংহাসন দখল করেন। হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর আকবর ১৫৫৬ সালে মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। বাহাদুর শাহকে সঙ্গে নিয়ে আগের শত্রুদের মোকাবেলা করা শুরু করেন। মোহাম্মদ আদিল শাহকে হত্যা করা হয় আকবরকে হত্যার পরিকল্পনার দায়ে। বাহাদুর শাহকে পুরস্কৃত করতে ১৫৬০ পর্যন্ত বিহারের কিছু অংশ শাসনের অনুমতি দেন। মোগলরা অগ্রসর হতে থাকে। আগ্রা থেকে জৈনপুর পর্যন্ত মোগল বাহিনী এগিয়ে যায়। গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহর উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় ও তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ। তারা নিজেদের স্বার্থেই মোগলদের অধীনতা মেনে চলেন। তার পরই কররানিদের হাতে চলে আসে বাংলার রাজদণ্ড। এটি মূলত আফগানদের একটি উপজাতি শাখা। তাজ কররানির পূর্ব পর্যন্ত কররানি বংশ নিয়ে তেমন কিছুই জানা যায়নি। বাংলার রাজদণ্ড দখলে কররানি ভাইদের জন্য ছিল অন্যতম সুযোগ। এ সময় আবার গৌড় ও দক্ষিণ বিহার মোগলদের অধীনে ছিল না। বিহারে আফগানপ্রধানদের মধ্যে অন্তঃসংঘর্ষের ফলে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। এ সুযোগে তাজ কররানি দক্ষিণ বিহারের কিছু জেলা দখল করে নেন। নিজ পরিবারের ভিত্তি মজবুত করেন। তাজ কররানির মৃত্যুতে সোলাইমান কররানি বাংলার শূন্য সিংহাসনে পা রাখেন এবং তিনি ১৫৭২ পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর শাসন করেন। বাংলার রাজধানী গৌড় ও তান্ডায় স্থানান্তর করেন। সোলাইমান রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি বৈদেশিক নীতিতেও সফল ছিলেন। তবে তিনি তার কিছুদিন পরই মোগলদের কাজে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি মোগল রাজদরবারের ও আকবরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন। আকবরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে খুতবা পাঠ করলেন। এর কিছুকাল পরেই মোগল বাহিনীর বিপরীতে সোলাইমান কররানি ওড়িশা দখলের চেষ্টা করে। এতে যুক্ত হন দাউদ খান কররানি। আকবর ওড়িশা দখল করে রাজধানী স্থাপন করে। সোলাইমান কররানির নির্মিত জগন্নাথ মন্দির ধ্বংস করেন। ১৫৭২ সালে সোলাইমান কররানি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তার এক পুত্র বায়েজিদ কররানি সিংহাসনে বসেন। মাত্র চারদিন তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। তাকে হত্যা করে সোলাইমান কররানির আরেক পুত্র দাউদ কররানি। মাখজাম-ই-আফগানাতে এসেছে ১৬ দিনের মতো বায়েজিদ ক্ষমতায় ছিলেন। বেশকিছু জায়গায় আবার এক বছরও এসেছে। দাউদ ক্ষমতায় এসেই একটি দল গঠন করেন, তিনি নিজেকে সম্রাট আকবরের ছেয়ে বেশি শক্তিশালী মনে করতেন। সম্রাটের আনুগত্য অস্বীকার করেন এবং নিজের নামে মুদ্রার প্রচলন করেন। তাই মোগল সম্রাট আকবরও এর শেষ দেখে নিতে অগ্রসর হতে থাকেন। তুকারয়ের যুদ্ধই ছিল দাউদ খান কররানির জন্য প্রথম পরাজয়।
কররানিদের দমনই ছিল বাংলা থেকে আফগানদের একেবারে বিদায় এবং মোগলদের বাংলা বিজয়।
ফারিহা আজমিন: লেখক





