লিওনেল মেসিকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার ভাষা যেন ফুটবল দুনিয়ার কাছেই ফুরিয়ে এসেছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলের জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে কোচ লিওনেল স্কালোনিও প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়া ভঙ্গিতে বলছিলেন, মেসিকে ব্যাখ্যা করার ভাষা তাঁর জানা নেই। তবে সেদিন ডালাসের স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শক যেন শব্দের চেয়েও শক্তিশালী ভাষায় উত্তর দিয়েছে।
দুটি মুহূর্তে গর্জে উঠেছিল পুরো স্টেডিয়াম।
প্রথমবার, যখন মেসি দারুণ এক প্রথম স্পর্শের শটে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিলেন। সেটি ছিল তাঁর ১৭তম বিশ্বকাপ গোল।
দ্বিতীয়বার, যখন অসাধারণ এক প্রথম স্পর্শ, তারপর পরিচিত গতিতে ছুটে গিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলেন। সেই গোলেই নিশ্চিত হলো আর্জেন্টিনার জয়, আর স্টেডিয়ামজুড়ে সৃষ্টি হলো উৎসবের আবহ।
ডালাস কাউবয়েজ স্টেডিয়াম যেন মুহূর্তেই রূপ নিয়েছিল বুয়েনোস আইরেসের বোম্বোনেরায়। হাজার হাজার সমর্থক শুধু একটি কারণেই সেখানে এসেছিলেন—মহত্ত্বকে কাছ থেকে দেখার জন্য। কিন্তু ‘মহত্ত্ব’ শব্দটিও কি আর যথেষ্ট?
মেসির বর্তমান পারফরম্যান্স তাঁর নিজের মানদণ্ডেও অবিশ্বাস্য।
মাত্র চার বছর আগের কথাই ধরা যাক। ২০২২ বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে প্রশ্ন ছিল—এটাই কি মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ? তিনি কি কখনো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন? সেই সময় বিশ্বকাপ যেন ছিল তার জন্য অপূর্ণতার প্রতীক।
একসময় এই টুর্নামেন্টই মেসিকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে। ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের স্মৃতি তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। পরে তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, অনেক রাত ঘুম ভেঙে সেই পরাজয়ের কথা ভাবতেন।
কিন্তু এখন দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যে স্বপ্নের পেছনে তিনি সারাজীবন ছুটেছেন, এখন যেন সেই স্বপ্নই একে একে তাঁর সামনে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। কৈশোরে যে প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন, আজ তার প্রতিটি প্রত্যাশারও ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন তিনি।
মেসি এখন শুধু বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার নন; তিনি এই টুর্নামেন্টের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও। সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে তৃতীয়বারের মতো গোল্ডেন বল জয়ের, প্রথমবারের মতো গোল্ডেন বুট জয়ের, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়েরও।
যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বিশ্বকাপের মাত্র দুই ম্যাচেই তিনি পাঁচ গোল করে ফেলেছেন। ২০০৬ সালে মিরোস্লাভ ক্লোসে এবং ২০১০ সালে টমাস মুলার যে পাঁচ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন, সেই সংখ্যায় ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছেন মেসি। অথচ সামনে এখনো গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচ বাকি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—ফরাসি কিংবদন্তি জুস্ত ফন্তেইনের এক বিশ্বকাপে ১৩ গোলের রেকর্ড কি হুমকির মুখে?
অসম্ভব বলা যাচ্ছে না। গ্রুপ পর্ব শেষেই যদি তাঁর গোলসংখ্যা আটে পৌঁছে যায়, তাহলে সেই আলোচনা আরো জোরালো হবে।
তবে তিনি সেই রেকর্ড ভাঙুন বা না-ভাঙুন, তাঁর বর্তমান অবস্থানই কয়েক দশক আগে কল্পনারও বাইরে ছিল। ২০০৬ সালে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে বিশ্বকাপে প্রথম গোল করা তরুণ মেসিকে দেখে কেউ ভাবতে পারেনি, দুই দশক পর তিনি এমন উচ্চতায় পৌঁছাবেন।
এমনকি এখন এমন কথাও বলা যায় যে, মেসির বিশ্বকাপ উত্তরাধিকার হয়তো তার বার্সেলোনা অধ্যায়কেও ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।
তিনি বহু অর্থেই সেরা। এই জায়গায় এসে বহু বছরের আরেকটি বিতর্কের কথাও মনে পড়ে—লিওনেল মেসি না ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কে সেরা?
বাস্তবে এই বিতর্ক সবসময়ই কিছুটা অদ্ভুত ছিল। কারণ প্রকৃত অর্থে এখানে খুব বেশি বিতর্কের অবকাশ ছিল না। ইতিহাসের এক বিচিত্র সময়কাল দুই মহাতারকাকে পাশাপাশি হাজির করেছিল বলে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মেসি এখন নিশ্চিত করে দিচ্ছেন যে, তুলনাটা কখনোই সমান ছিল না।
বর্তমান বিশ্বকাপেই সেই পার্থক্য স্পষ্ট।
৩৯তম জন্মদিনের মাত্র কয়েক দিন আগে দাঁড়িয়েও মেসি অবিশ্বাস্য মানের ফুটবল খেলছেন। অন্যদিকে রোনালদোকে এখন তাঁর বয়স—৪১ বছর—অনুযায়ীই দেখাচ্ছে। এটি অবশ্য রোনালদোর সমালোচনা নয়। ৪১ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলে টিকে থাকাটাই অসাধারণ অর্জন।
বরং বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে দেয়, মেসি কতটা ব্যতিক্রম।
রোনালদো যেখানে এখন মৌলিক কাজগুলো করতেও পরিশ্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে মেসি এখনো অনায়াস ভঙ্গিতে এমন সব কাজ করে চলেছেন যা ফুটবল ইতিহাসের খুব কম খেলোয়াড়ই করতে পেরেছেন।
এ কারণেই সবসময় মনে হয়েছে, মেসি ছিলেন আরও বিশুদ্ধ, আরও স্বাভাবিক এবং আরও পরিপূর্ণ ফুটবলার। হয়তো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ প্রতিভাই।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও পেলের বিশ্বকাপ উত্তরাধিকার দীর্ঘদিন ধরেই কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু মেসির বর্তমান যাত্রা সেই উত্তরাধিকারের সঙ্গেও নতুন করে তুলনা দাবি করছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা অতিক্রম করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
অবশ্য এর পেছনে আধুনিক যুগের সুবিধার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। মেসি এমন এক সময়ের খেলোয়াড়, যখন ক্রীড়াবিজ্ঞান, পুষ্টি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে সুবিধা থাকলেই তো সবাই এমন হতে পারে না।
২০১৪ বিশ্বকাপে নানা শারীরিক সমস্যার পর মেসি নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনেন। এই জায়গায় তিনি অনেকটা রোনালদোর পথ অনুসরণ করেছিলেন, যদিও কখনোই রোনালদোর মতো চরম পর্যায়ে যাননি।
অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, ১০ বছর আগে যেমন খেলতেন, এখনো অনেক ক্ষেত্রে তেমনই খেলছেন। হয়তো দৌড়ের সংখ্যা কমেছে, হয়তো পুরো ম্যাচজুড়ে প্রভাব বিস্তারের ধরন বদলেছে। কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্তে তাঁর বিস্ফোরণক্ষমতা এখনো একই রকম শ্বাসরুদ্ধকর।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলটি সেই সত্যেরই প্রমাণ। একই সঙ্গে ম্যাচটি আরেকটি বিষয়ও সামনে এনেছে—এই আর্জেন্টিনা দল এখনো অনেকটাই মেসিনির্ভর।
মেসিকে বাদ দিলে দলটি খুব বেশি উজ্জ্বল নয়। অস্ট্রিয়ার উচ্চচাপের প্রেসিংয়ের বিপক্ষে বেশ কিছু সময় আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে দেখা গেছে। আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ভবিষ্যতে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে। তারা হয়তো মেসির প্রভাবও সীমিত করে দিতে পারবে।
এগুলো অবশ্য এখনো কেবল সম্ভাবনার প্রশ্ন। কারণ আপাতত সব আলোচনা, সব সংশয়, সব বিশ্লেষণকে ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজনই—লিওনেল মেসি।
আর তিনি যতদিন এমন খেলবেন, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়ও সম্ভবত তিনিই হয়ে থাকবেন।
মিগুয়েল ডেলানি: ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের চিফ ফুটবল রাইটার














