বাংলাদেশ সময় গতকাল সকালে গুয়াদালহারায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার রক্ষণভাগের একটি বড় ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১-০ গোলে জয় পায় মেক্সিকো। ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়া মেক্সিকোর জন্য এটি বড় সাফল্য।
ম্যাচের শুরুটা ছিল বেশ নিষ্প্রাণ। দুই দলই উল্লেখযোগ্য গোলের সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। প্রথমার্ধ শেষে খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়ার সময় দর্শকদের দুয়োধ্বনিও শোনা যায়। তবে ম্যাচের শেষ দিকে এসে বদলে যায় পরিস্থিতি।
ম্যাচের ৫০তম মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন লুইস রোমো। দক্ষিণ কোরিয়ার গোলরক্ষক কিম কিউং-গু এবং ডিফেন্ডার লি গি-হিউক নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে বল হাতছাড়া করেন। বক্সের ভেতরে পাওয়া সেই বল সহজেই জালে পাঠান রোমো।
ম্যাচের ৮৭তম মিনিটে প্রায় সমতায় ফিরেই গিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। চো গুয়ে-সুংয়ের কাছ থেকে আসা কাছাকাছি দূরত্বের হেড দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক রাউল রাঙ্গেল। এরপর ফিরতি বলে ইয়াং হিউন-জুন শট নিলে আরো চমৎকার এক সেভ করেন তিনি। ডান হাত বাড়িয়ে বলকে গোললাইন পার হতে দেননি রাঙ্গেল।
দুই ম্যাচে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘এ’-এর শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে মেক্সিকো। তাদের চেয়ে তিন পয়েন্ট পিছিয়ে আছে দক্ষিণ কোরিয়া। চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকা—দুই দলেরই সংগ্রহ ১ পয়েন্ট করে। বৃহস্পতিবার রাতে আটলান্টায় দুই দলের ম্যাচটি ড্র হয়েছিল ১-১ গোলে।
মেক্সিকো তাদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া পিছিয়ে পড়েও চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ গোলে হারায়। এবার দ্বিতীয় ম্যাচে হারল এশিয়ান জায়ান্টরা।
মেক্সিকো সিটিতে বৃহস্পতিবার সকালে গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রের মুখোমুখি হবে মেক্সিকো। একই দিনে মন্টেরে শহরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলবে দক্ষিণ কোরিয়া। গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় দল হিসেবে কোন দল উঠবে নকআউটে, তা সেদিনই নির্ধারিত হবে।
৯ জনের কাতারকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিল কানাডা: স্ট্রাইকার জনাথন ডেভিডের হ্যাটট্রিকে বিশ্বকাপের মূল পর্বে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয় তুলে নিয়েছে কানাডা। বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোর রাতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৯ জনের কাতারকে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করে সহ-আয়োজক দেশটি নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনাও অনেকটা উজ্জ্বল করেছে।
তবে বড় জয়ের আনন্দের মাঝেও কানাডা শিবিরে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিডফিল্ডার ইসমাইল কোনের গুরুতর চোট। দুই ম্যাচ শেষে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘বি’-এর শীর্ষে উঠে এসেছে কানাডা। সমান ৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। অন্যদিকে ১ পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে কাতার। আগামী বুধবার রাতে ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে কানাডা। একই দিন একই সময়ে সিয়াটলে বসনিয়ার মুখোমুখি হবে কাতার।
লাল-সাদা পোশাকের দর্শকদের উচ্ছ্বসিত সমর্থনে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে স্বাগতিকরা। ম্যাচের ১৬তম মিনিটে কানাডাকে এগিয়ে দেন কাইল লারিন। এর আগে জনাথন ডেভিডের শট ঠেকিয়ে দেয় গোলরক্ষক মাহমুদ আবুনাদা। কিন্তু ফিরতি বলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে জালে বল পাঠান সাইল। ১৩ মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ডেভিড। একটি ক্রসে দুর্দান্ত ভলিতে গোল করে কানাডাকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। এরপর ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় কাতারের বিপক্ষে। তাজন বুকানানের ওপর এল আমিনের ফাউলের ঘটনায় প্রথমে পেনাল্টি দেয়া হলেও ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায় ফাউলটি বক্সের বাইরে হয়েছিল। ফলে সিদ্ধান্ত ফ্রি-কিকে পরিবর্তন করা হয় এবং হোমাম আহমেদের হলুদ কার্ড উন্নীত হয় লাল কার্ডে। তাতে ১০ জনের দলে পরিণত হয় কাতার।
বিরতির ঠিক আগে লারিনের হেডার ঠেকালেও ফিরতি বলে কাছ থেকে নেয়া শটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন ডেভিড। ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া কাতারের সামনে তখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ার্ধে আরো বড় ধাক্কা খায় কাতার। আসিম মাদিবোর একটি ট্যাকলের পর ইসমাইল কোনে আহত হয়ে স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়েন। ওই ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে মাদিবোকেও লাল কার্ড দেখানো হয়। ফলে ৯ জনের দলে পরিণত হয় কাতার।
কোনের বদলি হিসেবে নামা নাথান সালিবা ফ্রি-কিক থেকে কানাডার চতুর্থ গোল করেন এবং উদযাপনের সময় কোনের জার্সি তুলে ধরে তাকে উৎসর্গ করেন গোলটি। এরপর কাতারের দুর্দশা আরো বাড়ে, যখন মিডফিল্ডার মোহাম্মদ মান্নাই আত্মঘাতী গোল করেন। যোগ করা সময়ে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে কানাডার ৬-০ গোলের জয় নিশ্চিত করেন ডেভিড।
শেষ ২০ মিনিটের ঝড়ে বসনিয়ার জালে সুইজারল্যান্ডের চার গোল: একের পর এক আক্রমণ, বলের দখল আর অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেও দীর্ঘ সময় গোলের দেখা পাচ্ছিল না সুইজারল্যান্ড। তবে কোচ মুরাত ইয়াকিনের তিনটি পরিবর্তনই বদলে দেয় ম্যাচের চিত্র। বৃহস্পতিবার রাতে ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচে শেষ ২০ মিনিটে চার গোল করে বসনিয়াকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়েছে সুইসরা। জোড়া গোল করে ম্যাচের নায়ক হয়েছেন বদলি খেলোয়াড় জোহান মানজাম্বি।
কাতারের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ড্র করতে হয়েছিল সুইজারল্যান্ডকে। তাই শুরু থেকেই তারা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। মাঝমাঠে গ্রানিত জাকার নেতৃত্বে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি সুইসদের হাতে।
বাম প্রান্ত দিয়ে ড্যান এনডোয়ে বারবার বসনিয়ার রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করেন। তাকে থামাতে কখনো কখনো দুই-তিনজন খেলোয়াড়কে একসঙ্গে নামতে হয়। তবু সুইজারল্যান্ড গোল পাচ্ছিল না। কারণ বসনিয়ার সংগঠিত রক্ষণভাগ ছিল দুর্ভেদ্য। বল পেলে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠছিল তারা, আবার বল হারালে দ্রুত নিজেদের অর্ধে নেমে এসে প্রতিরোধ গড়ে তুলছিল।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র দেখা যায়। সুইসরা আক্রমণ চালিয়ে গেলেও গোলের পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। ম্যাচের ৭০ মিনিটে ইয়াকিন একসঙ্গে জোহান মানজাম্বি, রুবেন ভারগাস ও জিব্রিল সোকে মাঠে নামান। তাতেই বদলে যায় ম্যাচের গতি। মাঠে নামার মাত্র ৪ মিনিট পরই গোল করেন মানজাম্বি। সুইজারল্যান্ডের আক্রমণ থেকে পাওয়া বল জোরালো সাইড ভলিতে জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি।
এর কিছুক্ষণ পরই বড় ধাক্কা খায় বসনিয়া। নিশ্চিত গোলের সুযোগের সামনে থাকা ব্রিল এমবোলোকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন তারিক মুহারেমোভিচ। ফ্রি-কিক থেকে গোল না হলেও ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া বসনিয়া এরপর আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি।
৮৩তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আরেক বদলি খেলোয়াড় রুবেন ভারগাস। ডান দিক থেকে এমবোলোর পাস পেয়ে প্রথম ছোঁয়াতেই বল জালে পাঠান তিনি। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে সুইজারল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন মানজাম্বি।
সংযুক্তি সময়ের তৃতীয় মিনিটে এরমিন মাহমিচ একটি গোল শোধ করে বসনিয়ার আশা কিছুটা জাগান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি পায় সুইজারল্যান্ড। সেখান থেকে গোল করে ৪-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন অধিনায়ক গ্রানিট জাকা।
এ জয়ে প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে টুর্নামেন্টে শক্ত অবস্থান গড়ে নিল সুইজারল্যান্ড। আর কোচ ইয়াকিনের কৌশলী পরিবর্তনই হয়ে থাকল ম্যাচের সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
২ ম্যাচ শেষে কানাডা ও সুইজারল্যান্ড উভয়ের সংগ্রহ সমান ৪ পয়েন্ট। বসনিয়া ও কাতারের ঝুলিতে ১ পয়েন্ট করে।













