নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর ডোপিং পরীক্ষায় পজিটিভ হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে। ফিফার নিষেধাজ্ঞার পর ম্যারাডোনা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘মে কোর্তারন লাস পিয়েরনাস’। যার অর্থ ‘তারা আমার পা কেটে নিয়েছে’। যে বাক্য তিন দশক পরও লা আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসে অপূর্ণ শোকগাথার মতো ফিরে আসে।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর সেই ডালাসেই আজ রাত ১১টায় মাঠে নামছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। তবে এবার কটন বোল নয়, এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এ দ্বিতীয় ম্যাচের সঙ্গে ১৯৯৪ সালের সেই ডোপকাণ্ডের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের খুব কম খেলোয়াড়ই ম্যারাডোনার সেই ট্র্যাজেডির সময় পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের মাত্র ছয়জন খেলোয়াড়ের জন্ম হয়েছিল সে ঘটনার আগে। তবে সেই বিষাদময় ইতিহাস ভোলেননি ভক্তরা। সে কারণেই গ্যালারির জন্য তারা নতুন এক গান বেঁধেছেন, যার ছত্রে ছত্রে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ডালাসের মাটিতেই ম্যারাডোনার কাছ থেকে ‘কেড়ে নেয়া সে বিশ্বকাপের’ প্রতিশোধ নেবে ‘স্কালোনেত্তা’।
তবে ডালাসের স্মৃতি কিংবা সমর্থকদের আবেগ নয়, নিশ্চিতভাবেই স্কালোনির পরিকল্পনায় এখন শুধুই অস্ট্রিয়া। আর সেই ভাবনার কেন্দ্রে আছে দল নির্বাচন। স্কালোনি তার পুরো কোচিং ক্যারিয়ারে খুব কম সময়ই টানা দুটি ম্যাচে একই একাদশ মাঠে নামিয়েছেন। তার ৯৭ ম্যাচের পথচলায় মাত্র তিনবার তিনি আগের ম্যাচের একাদশ অপরিবর্তিত রেখেছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও তার এ রণকৌশলের ব্যতিক্রম হচ্ছে না। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের একাদশে অন্তত একটি পরিবর্তন নিশ্চিত এবং আরো দুটি পজিশনে পরিবর্তনের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
মেসির হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে অস্ট্রিয়াও জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে এসেছে। ফলে দুই দলের এ লড়াই অনেকটাই গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারণের ম্যাচে পরিণত হয়েছে। তবে স্কালোনি জানেন, অস্ট্রিয়া আলজেরিয়ার মতো প্রতিপক্ষ নয়। সহকারী কোচ পাবলো আইমারও তাই সতর্ক করে দিয়েছেন, রালফ রাংনিকের দল শারীরিকভাবে শক্তিশালী, সংগঠিত এবং প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ। আসলে এ ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণই হচ্ছে দুটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে আর্জেন্টিনার বল দখল, নিয়ন্ত্রিত বিল্ড-আপ এবং ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা; অন্যদিকে রাংনিকের উচ্চগতির প্রেসিং, ট্রানজিশন এবং নিরন্তর দৌড়ের ফুটবল।
স্কালোনির সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা সম্ভবত এখানেই। আলজেরিয়ার বিপক্ষে জয় এলেও কোচিং স্টাফ মাঝমাঠের কিছু জায়গায় অসন্তুষ্ট ছিল। বিশেষ করে বল হারানোর পর রক্ষণে ফেরার গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর অস্ট্রিয়ার মতো দল ঠিক এ জায়গাতেই আঘাত করতে ভালোবাসে। সে কারণেই আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ নিয়ে বরাবরের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন স্কালোনি।
রক্ষণভাগে একটি পরিবর্তন প্রায় নিশ্চিত। গনসালো মন্তিয়েল অনুশীলনে ফিরেছেন, তবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে পাওয়া পেশির অতিরিক্ত চাপের কারণে তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চায় না কোচিং স্টাফ। ফলে ডানপ্রান্তে নাহুয়েল মোলিনার খেলা প্রায় নিশ্চিত। বামপ্রান্তেও একই ধরনের পরিস্থিতি। নিকোলাস তাগলিয়াফিকো পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠলেও তাকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ফাকুন্দো মেদিনাকে আবার শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে।
মাঝমাঠে অবশ্য স্কালোনির ভরসার জায়গায় তেমন পরিবর্তন আসবে না। রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ এবং আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার—বিশ্বকাপজয়ী এ ত্রয়ীই আবারো দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে চতুর্থ মিডফিল্ডার কে? থিয়াগো আলমাদা নাকি নিকোলাস গনসালেস? আলমাদা সৃজনশীলতার প্রতীক। বল পায়ে জায়গা তৈরি করতে পারেন, প্রতিপক্ষের লাইনের মাঝখানে ঢুকে খেলার গতি বদলে দিতে পারেন। অন্যদিকে নিকোলাস গনসালেসের শক্তি তার পরিশ্রম। তিনি আক্রমণের পাশাপাশি রক্ষণেও সমান কার্যকর। অস্ট্রিয়ার ডানপ্রান্তের আক্রমণ বিবেচনায় নিলে গনসালেসের সম্ভাবনা বেশি।
বিশেষ করে অস্ট্রিয়ান মিডফিল্ডার কনরাড লাইমারকে সামলানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বায়ার্ন মিউনিখ তারকা লাইমার একই সঙ্গে প্রেস করেন, বল ছিনিয়ে নেন, আক্রমণে যোগ দেন এবং রক্ষণে ফিরে আসেন। জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচেও তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। স্কালোনির কোচিং স্টাফ মনে করছে, লাইমার এবং স্টেফান পসখের সমন্বয়ই অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র হতে পারে। এ কারণেই স্কালোনি যদি আলামাদাকে রেখে নিকোলাস গনসালেসের মতো পরিশ্রমী খেলোয়াড়কে শুরুর একাদশে আনেন অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আক্রমণে। লাউতারো মার্তিনেজ নাকি হুলিয়ান আলভারেজ? অনুশীলনে দুজনকেই পরীক্ষা করেছেন স্কালোনি। লাউতারো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেও শুরু করেছিলেন, যদিও খুব একটা ভালো করেননি। তবে তার ফিনিশিং এবং বক্সের ভেতরে উপস্থিতি এখনো কোচের আস্থার জায়গা। তবে হুলিয়ান আলভারেজের গুরুত্বও কম নয়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে পাওয়া চোটের কারণে এক মাসের বেশি সময় মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে তাকে ম্যাচের ছন্দে ফিরিয়ে আনতে চাইছে কোচিং স্টাফ। ফলে এ ম্যাচেও দ্বিতীয়ার্ধে আলভারেজকে নামানো হতে পারে।
মেসি তো আছেনই! আর্জেন্টাইন অধিনায়কের জন্য ম্যাচটি রেকর্ডের পাতায় নতুন করে নাম লেখানোর সুযোগ। আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে মেসি এরই মধ্যে জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপে করা সর্বমোট ১৬ গোলের বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একটি গোল করলেই তিনি এককভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে আরোহণ করবেন। তবে গত সপ্তাহে মেসির বাবা হোর্হে মেসির আকস্মিক অসুস্থতার কারণে তিনি কিছুটা পারিবারিক উদ্বেগের মধ্য দিয়ে গেছেন। এ পরিস্থিতিতে নকআউট পর্বের কথা চিন্তা করে স্কালোনি মেসিকে এ ম্যাচে বিশ্রাম দেবেন কিনা, তা নিয়ে ফুটবল মহলে গুঞ্জন থাকলেও ম্যাচের গুরুত্ব এবং অস্ট্রিয়ার মতো কঠিন প্রতিপক্ষের কথা বিবেচনা করে মেসিকে ছাড়া মাঠে নামার ঝুঁকি স্কালোনি নেবেন না বলেই মনে হচ্ছে।
অস্ট্রিয়াকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। জর্ডানের বিপক্ষে রাংনিকের দলের সংগঠন, শারীরিক শক্তি এবং প্রেসিং ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে তারা প্রতিপক্ষের বিল্ড-আপ নষ্ট করতে পছন্দ করে। গোলরক্ষক থেকে শুরু করে ডিফেন্ডার পর্যন্ত সবাইকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এ জায়গাটিই আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
অভিজ্ঞতা, মান এবং সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় এগিয়ে থাকছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরাই। আলবিসেলেস্তেরা বর্তমানে টানা আটটি ম্যাচ জিতেছে। যার মধ্যে সাতটিতেই তারা কোনো গোল হজম করেনি। শেষ চার ম্যাচের তিনটিতেই তারা অন্তত তিনটি করে গোল করেছে। তবে অস্ট্রিয়ার আক্রমণভাগও গত কয়েকটি ম্যাচে বেশ ক্লিনিক্যাল ছিল। আর্জেন্টিনা যেখানে নিখুঁত পাসিং ও শর্ট পাসের মাধ্যমে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করে, সেখানে অস্ট্রিয়া চাইবে ফিজিক্যাল ট্যাকল এবং অনবরত প্রেসিংয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার সেই ছন্দ নষ্ট করে দিতে। তবে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের একটাই প্রত্যাশা—যে শহর একদিন ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ অধ্যায়ের বেদনাময় উপসংহার লিখেছিল, সে ডালাসের মাটিতেই আজ জাদুকরী ছন্দে গর্জে উঠুক লিওনেল মেসির বাঁ পা।














