বিশ্বকাপে গতকাল রাতে পর্তুগালের বড় জয়ের পর শেষ বাঁশি বাজতেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বার্তাটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু দৃঢ়। টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললেন, ‘আমি ফিরে এসেছি।’ খবর এপি।
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের ৫-০ গোলের জয়ে দুটি গোল করে রোনালদো বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। তিনি এখন প্রথম খেলোয়াড়, যিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপ আসরে গোল করার কীর্তি গড়লেন। উদ্বোধনী ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর সমালোচকদেরও জবাব দিলেন তিনি।
৪১ বছর বয়সী এ সুপারস্টারের জন্য সমালোচনা নতুন কিছু নয়। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, গত সপ্তাহে তাকে ঘিরে হওয়া তীব্র নেতিবাচক মন্তব্যগুলো সহজ ছিল না।
পর্তুগিজ ভাষায় রোনালদো বলেন, ‘কিন্তু সবসময়ই এমন হয়। এতে কিছু আসে যায় না। কারণ আমি ২৩ বছর ধরে এই কাজ করছি। যখন সবকিছু ভালো যায়, তখন বলা হয় “ক্রিস্টিয়ানো দুর্দান্ত”; আর যখন খারাপ যায়, তখন বলা হয় “ক্রিস্টিয়ানো অবসরপ্রাপ্ত”, “সে বুড়ো হয়ে গেছে”। সব সময়ই এমন হবে। কিন্তু আজ আমরা, আমি এবং আমার সতীর্থরা, মাঠে ভালো জবাব দিয়েছি। আমরা সেটাই চেয়েছিলাম।’
ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই ইতিহাস গড়েন রোনালদো। জোয়াও ক্যানসেলোর ক্রস থেকে ডান পায়ের শটে বল জালে জড়িয়ে পর্তুগালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। এরপর বেঞ্চের দিকে দৌড়ে গিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে উদ্যাপনে মেতে ওঠেন।
৩৯তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। ব্রুনো ফার্নান্দেসের পাস থেকে বক্সের ভেতর ডান পায়ের শটে পোস্ট ঘেঁষে বল জালে পাঠিয়ে স্কোরলাইন ৩-০ করেন।
খেলোয়াড়ি জীবনে কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ছিলেন উজবেকিস্তানের কোচ ফাবিও কানাভারো। তিনি ২০০৬ বিশ্বকাপে ইতালিকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন। রোনালেদোর পারফর্ম্যান্স প্রসঙ্গে ম্যাচ শেষে ফাবিও বলেন, ‘ডিফেন্ডার হিসেবে আপনাকে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে এবং বক্সের মধ্যে তার কাছাকাছি থাকতে হবে। বক্সে যদি তাকে এক সেন্টিমিটার জায়গাও দেন, তাহলে আপনি শেষ।’
দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কারও জেতেন রোনালদো। তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এমন স্বীকৃতি অবশ্য নতুন কিছু নয়।
চলতি সপ্তাহে বেঞ্চে বসানোর দাবির মুখেও রোনালদোর পেশাদারত্ব ও মানসিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ।
মার্তিনেজ বলেন, ‘সে একজন মানুষ। তার আবেগ থাকবে, অনুভূতি থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেটা বিস্ময়কর, সেটা হলো তার প্রতিক্রিয়া। সে যা-ই অনুভব করুক না কেন, তার উত্তর হলো আবার অনুশীলন মাঠে ফিরে যাওয়া, কঠোর পরিশ্রম করা এবং নিজের কাছ থেকে আরো বেশি দাবি করা। এই পেশাদারত্বই তাকে এত দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষ পর্যায়ে টিকিয়ে রেখেছে।’
বাংলাদেশ সময় গতকাল দিবাগত রাতের দুটি গোলের ফলে রোনালদো এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী গোলদাতা। তার ওপরে আছেন কেবল ক্যামেরুনের ফরোয়ার্ড রজার মিলা, যিনি ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ৪২ বছর বয়সে গোল করেছিলেন।
এ বছর রোনালদো এবং আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি ইতিহাসের একমাত্র দুই ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপ খেলছেন। রোনালদোর বিশ্বকাপ গোলযাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। এরপর তিনি ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—সব আসরেই গোল করেছেন।
বিশ্বকাপ খেলার সংখ্যায় তিনি মেসির সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে থাকলেও প্রতিটি বিশ্বকাপে অন্তত একটি করে গোল করার রেকর্ডে তিনি একাই অনন্য। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ২০১০ বিশ্বকাপে মেসি কোনো গোল করতে পারেননি।
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে রোনালদো বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ১০-এ উন্নীত করেছেন। অন্যদিকে, আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং সোমবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আরও দুটি গোল করে মেসি বিশ্বকাপে মোট ১৮ গোল নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে রয়েছেন।
রোনালদোর এই দুই গোল আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার রেকর্ড গোলসংখ্যা ১৪৫-এ উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তার ১০ গোল পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিওর ৯ গোলকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে তিনি এখন বিশ্বকাপে পর্তুগালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
মঙ্গলবারের ম্যাচটি ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর ২৩০তম ম্যাচ, যা ইতিহাসে সর্বাধিক।
এটাই সম্ভবত রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ। তিনি ২০১৬ সালে পর্তুগালকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতিয়েছেন এবং ক্লাব পর্যায়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের কৃতিত্বও অর্জন করেছেন।














