প্রতি বছরই অস্কার নিয়ে বিতর্ক থাকে। এ বছরও আছে। তবে ৯৬তম অস্কার নিয়ে সমালোচনা না থাকার সুযোগ ছিল। অর্থাৎ ক্লিন ইমেজ রাখা সম্ভব ছিল এ আসরে। কিন্তু হলো না। বরং গত বছরের তুলনায় এবার সমালোচনা বেশিই হচ্ছে। তবে দর্শক ও বিশ্লেষকরা যুক্তি দিয়ে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। তর্কের প্রথম বিষয়—ওপেনহাইমার ও কিলার্স অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। সাধারণ দর্শকের একটা বড় অংশই খুশি ক্রিস্টোফার নোলানের অস্কার জয়ে। কিন্তু বিপরীতে যখন মার্টিন স্করসেসির ‘কিলার্স অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’ বাদ পড়ে, তখন নোলান ভক্তরাও মিইয়ে যান।

ওপেনহাইমার পুরস্কার জিতবে তা জানা ছিল সবার। কিন্তু এতগুলো বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য করার কথা ভাবেননি। মূলত অস্কারের একটা রাজনীতি আছে। সেখানে অগ্রাধিকার দেয়া হয় মার্কিন ইমেজ রক্ষা করা বা বাড়ানো সিনেমার। কিলার্স অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা কালো দিক দেখায়। আর ক্রিস্টোফার নোলানের ওপেনহাইমার কোনো না কোনোভাবে হয়ে ওঠে একটা প্রপাগান্ডা সিনেমা যা আণবিক বোমা ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে একটা ইমেজ দেয়ার চেষ্টা করে।

ক্রিস্টোফার নোলানের একটা সিনেমা নিয়ে সাধারণত কথা হয় বছরের পর বছর। তার সিনেমা, সিনেমার নিয়মিত দর্শকেরই বুঝতে হলে দেখতে হয় একাধিকবার। এমনকি ব্যাটম্যানেরও নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন তিনি। টেনেট, ইনসেপশনের কথা বলাই বাহুল্য। সেখানে ওপেনহাইমার কেবলই এক সরলরৈখিক সিনেমা, যার টেক্সট বারবার মনে করায় যুদ্ধভিত্তিক আর পাঁচটা মার্কিন সিনেমাকে। ভিএফএক্স ব্যবহার না করে একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়েই তা শুট করেছেন নোলান, কিন্তু তার অন্যান্য সিনেমার ইমেজের ব্যবহার থেকে ওপেনহাইমার এগিয়ে থাকে না। তবে ওপেনহাইমারের ইমেজের তুলনায় মার্কিন ইমেজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই অস্কার পেয়ে যায় সিনেমাটি। অন্যদিকে একাডেমি মানুষকে বিস্মিত করেছে সেরা অভিনেত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে। কেন এমা স্টোন? ‘‌পুওর থিংস’-এ তিনি দারুণ অভিনয় করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। চরিত্রচিত্রণ থেকে শুরু করে চরিত্রকে ধারণ করায় কোনো খুঁত ছিল না। কিন্তু লিলি গ্ল্যাডস্টোনের তুলনায় বেশি কি?

এখানে বিনোদন গণমাধ্যম ভ্যারাইটি একটি বিষয় সামনে আনছে। তা হলো অস্কার ক্যাম্পেইন। অস্কার কমিটি নানাভাবে প্রভাবিত হন। ভোটের বাইরেও থাকে কিছু বিষয়। এর মধ্যে কোন বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া গেল, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভ্যারাইটি বলছে, লিলি যদি সহ-অভিনেত্রী বিভাগে মনোনয়ন নিতেন, তবে তার পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা ছিল। কেননা সাড়ে ৩ ঘণ্টার সিনেমায় তার স্ক্রিন টাইম ছিল ৫৬ মিনিটের মতো। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর ৪৯ ও রবার্ট ডি নিরোর ৪৭ মিনিট। এসব হিসাবে লিলি মূলত পার্শ্ব অভিনেত্রীর মনোনয়নে এগিয়ে থাকতে পারতেন।

এবারের অস্কারে আরো কিছু বিষয় সামনে এসেছে। যেমন স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম এখনো অস্কারে বড় প্রভাব ফেলতে পারেনি। কেবল নেটফ্লিক্সই লাইভ অ্যাকশন শর্টে একটি পুরস্কার জিতেছে। একটা বিষয় অনেকেরই জানা, বড় স্টুডিওর সিনেমাকে অস্কার কমিটি আলাদা মনোযোগ দেয়। ওপেনহাইমারের পেছনে আছে ইউনিভার্সাল পিকচার্স। পরের বছরও ‘ডুন টু’ ও ‘গ্ল্যাডিয়েটর টু’ এগিয়ে থাকবে অস্কারের ইঁদুর দৌড়ে।

আরো একটা প্রশ্ন আসছে দর্শকের মনে—ব্র্যাডলি কুপার কি আদৌ অস্কার পাবেন? এ বছর সাতটি মনোনয়ন এসেছিল কুপার ও তার মায়েস্ত্রোর ঝুলিতে। কিন্তু অস্কার এল না একটাও। এর পেছনের কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা দেখছেন বড় কোনো স্টুডিওর না থাকা। কেননা মায়েস্ত্রো প্রযোজনা করেছে নেটফ্লিক্স। অবশ্য এটা তেমন বড় বিষয়ও নয়। কেননা মার্টিন স্করসেসির মতো নির্মাতাও তার সিনেমা নিয়ে তিনবার অস্কারে ১০টি মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু কোনোবারই একটা অস্কার পাননি। যত নিয়ম আর ব্যাখ্যাই থাক, একাডেমির এসব সিদ্ধান্ত একটা বড় প্রশ্নবোধক হয়েই ঝুলে থাকবে।