মানুষের সবচেয়ে প্রিয় হলো নিজের প্রাণ। কখনো তার থেকেও বেশি প্রিয় তার সন্তানের প্রাণ। সন্তানের জন্য সে কত কিছুই না করে। এ নিয়ে আছে বহু গল্প। আছে বহু সত্য ঘটনা। দেবাশীষ মাখিজা এমনই একটি গল্প নিয়ে এসেছেন, যেখানে এক নাচার পিতা তার ছোট শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য জীবনপণ করে। মরণপণও বলা যায়। আর এজন্য তাকে পাড়ি দিতে হয় নানা চড়াই-উতরাই। লড়াই করার শক্তি তার নেই, সে কেবল পালিয়ে বাঁচতে চায়। তবে এর মধ্যে একটা আশা থাকে। কোনো এক শক্তিমানের ছত্রচ্ছায়ায় হয়তো নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। এ নিয়েই সিনেমা নির্মাণ করেছেন দেবাশীষ, যে সিনেমার নাম ‘‌জোরাম’।

জোরাম মূলত এ সিনেমার ছোট শিশুটির নাম। মনোজ বাজপেয়ী অভিনয় করেছেন দাসরু ও বালা চরিত্রে। তার মূলত দুটি চরিত্র, যদিও মানুষ একই। নাম ভাঁড়িয়ে মুম্বাই বাস করে সে। এ সিনেমায় বেশকিছু বিষয় বাস্তবের খুব কাছাকাছি। মানুষের, বিশেষত প্রান্তিক মানুষের জীবনে থাকা নানা চ্যালেঞ্জ ও বঞ্চনা সিনেমার মূল বিষয়। দেবাশীষ একটা পরতের নিচে রেখেছেন সেটা। সিনেমার মূল গল্প থ্রিলার অনুসারী, কিন্তু পরের স্তরে থাকে জীবনের কষাঘাত। সেখানেই আমরা দাসরুকে পাই এবং কেবল দাসরুকে নয়, পাই আদিবাসী জনতাকে।

প্রান্তিক মানুষের জীবন নানা সময়ই এসেছে সিনেমায়। কিন্তু বলিউডের মূলধারার সিনেমায় তার অনেক কিছুই টাইপকাস্ট। দেবাশীষ এ সিনেমায় মানুষের সেই বহুল চর্চিত বঞ্চনার জীবন কাছ থেকে বা দূর থেকে দেখাননি। তিনি দেখিয়েছেন অন্যের মাধ্যমে। প্রথমেই আসা যাক দাসরুর ক্ষেত্রে। তার প্রেম দিয়েই শুরু হয় গল্প। ঝাড়খণ্ডের প্রেমিক-প্রেমিকার দোলনা বিলাসের সঙ্গে দর্শক শুনবেন ‘পিন্ডারে পলাশের বন’ গানের একটি সংস্করণ। এরপর সেখান থেকেই গল্প চলে যায় পুঁজিবাদের হাতে। আমরা দেখি বা দেবাশীষ দেখান, ভূমিপুত্রদের নিজের জমি থেকে সরিয়ে সেখানে কারখানা বানানোর পায়তারা চলছে। আর এতে মদত দিচ্ছে সেই জনতারই প্রতিনিধির ছেলে।

জমি দেয়ার বদলে দাসরু বেছে নেয় বিদ্রোহীর জীবন। মাওবাদীদের সঙ্গে যুক্ত হয় সে। এর মধ্য দিয়ে জোরামের নির্মাতা দেখালেন, কেমন করে একজন সাধারণ মানুষ বেছে নেয় অনিশ্চিত জীবন। কিন্তু কোমল মনের দাসরু পারে না অকারণ হত্যা মেনে নিতে। আমরা দেখি সে প্রেমিকার সঙ্গে ঘর ছাড়ে। শ্রমিকের জীবন বেছে নেয়। সেখানেই স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তার নতুন বাস। নতুন নাম । কিন্তু শত্রু যার পেছনে সে কেমন করে বাঁচবে। মারা পড়ে তার স্ত্রী আর মেয়ে জোরামকে নিয়ে ফেরারি জীবন শুরু করে দাসরু।

এ সিনেমায় সিস্টেমের অনেক বিষয়ও তুলে এনেছেন দেবাশীষ। যেমন আমরা দেখি পুলিশ অফিসার রত্নাকরকে। জিশান আইয়ুব অভিনয় করেছেন এ চরিত্রে। মনোজকে মাওবাদীদের মধ্যে রেখে দেবাশীষ দেখিয়েছেন বিদ্রোহীদের আপাত অনিয়ম ও তাদের ভুল নকশার বিদ্রোহ। যে কারণে একদিন দাসরু দলত্যাগী হয়। অন্যদিকে রত্নাকরের মাধ্যমে দেখিয়েছেন একজন সাধারণ পুলিশ অফিসারের অসহায় অবস্থা। সে বাড়ি ফিরতে পারে না দিনের পর দিন। ওদিকে অপরাধী খুঁজতে গিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলে গিয়ে দেখে পুলিশ স্টেশনের অব্যবস্থাপনা।

সিনেমার মূল গল্প জোরামকে নিয়ে তার বাবার পালিয়ে যাওয়া ও স্থানীয় ক্ষমতাসীনের কাছে আশ্রয় চাওয়া। কিন্তু আদতে সেই ক্ষমতাসীনই মারতে চেয়েছিল দাসরুকে, তা আমরা সিনেমার শেষে জানি রত্নাকরের মাধ্যমে। এটি সিনেমার মূল গল্প। কিন্তু এ সরল গল্পের বাইরে সিনেমায় দেবাশীষ মূলত দেখিয়েছেন সাদা চোখে দেখা যায় না এমন কিছু বিষয়। যেমন ’বিদেশী’ যেভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে মুম্বাইয়ের রাজনীতিবিদের ওপর ছড়ি চালাতে পারেন। মাওবাদীদের অবস্থা এবং বিশেষ করে রত্নাকর যখন ঝাড়খণ্ডে আসে, সেখানকার আইনপ্রয়োগকারীদের অবস্থা। তাদের ভঙ্গুর পুলিশ স্টেশন, ইউনিফর্ম ছাড়া স্টেশনে বসে থাকা থেকে শুরু করে বিকৃত আমোদের বয়ান, প্রান্তিক ভারতের ল অ্যান্ড অর্ডারকে দেখায়।

মনোজ বাজপেয়ীর সঙ্গে এর আগে দেবাশীষ করেছিলেন ‘‌ভোঁসলে’। ডার্ক এ সিনেমা মুম্বাইয়ের সেই চিত্র দেখিয়েছিল, যা বলিউড দেখায় না। এবার তিনি জোরামের মাধ্যমে দেখালেন একটা আপাত সরল গল্প, কিন্তু তার কয়েক স্তরে আছে ধাক্কা দেয়ার মতো কিছু উপাদান। আর বলাই বাহুল্য, মনোজ নিজের অন্যতম সেরাটা দিয়ে কাজ করেছেন। তবে দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন বিদেশী চরিত্রে অভিনয় করা মেঘনা মাথুর। শিড়দাঁড়া বেয়ে একটা ভয়ের স্রোত নামান তিনি। আর এ সিনেমায় জিশান আইয়ুব যেন হয়ে উঠলেন প্রতিটি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি, যারা এখনো সত্য খুঁজতে চায়, সত্য বলতে চায়।