বগুড়া শহরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত মধুবন সিনেপ্লেক্স। আধুনিক ও সুসজ্জিত সিনেপ্লেক্স হিসেবে এটি চালু হয় ২০২১ সালে। আধুনিকায়নের মাত্র চার বছরের মাথায় গত শুক্রবার ‘একেবারে বন্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছে প্রেক্ষাগৃহটি।
মধুবনের মালিক রোকনুজ্জামান ইউনূস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভালো সিনেমার অভাবে মধুবন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। লোকসান দিতে দিতে আর সম্ভব হচ্ছে না। সরকার বিদেশী সিনেমা চালাতে দেয় না, আবার দেশীয় সিনেমাও নেই। দেশের সিনেমা না থাকলে অন্তত বিদেশী সিনেমা চালানোর অনুমতি দেয়া উচিত। অন্যথায় হলগুলো বন্ধ হতে থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দর্শক আমার হল দেখতে আসবে না, সিনেমা দেখতে আসবে। সুন্দর পরিবেশ তৈরি করেছি, কিন্তু ভালো সিনেমা ছাড়া দর্শক হলে আসবে কেন? ধারাবাহিকভাবে ভালো সিনেমা মুক্তি পেলে মানুষ হলে আসবে। একটি দুর্বল সিনেমাও টিকে যেতে পারে, যদি তার আগে পরে ভালো সিনেমা আসে। কিন্তু এখন সিনেমা মুক্তির সে ধারাবাহিকতাই নেই।’
মধুবন নতুন করে আবার চালু করার সম্ভাবনা নিয়ে রোকনুজ্জামান বলেন, ‘বন্ধ করে রেখেছি। সরকার যদি ডাকে, আলোচনায় বসে সমাধান খোঁজে, দেশে ভালো সিনেমা আসে বা বিদেশী সিনেমা আমদানির সুযোগ করে দেয়, যৌথ প্রযোজনার বিষয়ে আশ্বাস দেয়, তাহলে হয়তো আবার হলে সিনেমা প্রদর্শন শুরু করতে পারব। যদি আমাদের কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফেলা না হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সিনেমা ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এখনকার নীতিমালা অনুযায়ী উপমহাদেশের ভাষায় নির্মিত সিনেমা আমদানি করা যাবে না। এটিকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। আমরা যেন যেকোনো দেশ থেকে সিনেমা আমদানি করতে পারি। এনে সেন্সর বোর্ডে জমা দেব। বোর্ড দেখবে সেটা বাংলাদেশে চলার মতো কিনা।’
লায়নস সিনেমাসও বন্ধের পথে: আধুনিক প্রযুক্তি ও চার স্ক্রিন নিয়ে ২০২২ সালে কেরানীগঞ্জে যাত্রা শুরু করে লায়নস সিনেমাস। রাজধানীর অদূরে অবস্থিত অন্যতম আধুনিক এ প্রেক্ষাগৃহও এখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মির্জা আবদুল খালেক আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রচুর ব্যাংক ঋণ রয়েছে। কয়েক মাস ধরে কিস্তি শোধ করতে পারছি না। ফলে আমি ঋণখেলাপি হয়ে গেছি। ঈদে দুই-একটা সিনেমা মুক্তি পেলেও সেগুলো দিয়ে তো সারা বছর চালানো যায় না। তাই হল বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না। প্রতি মাসে আমার হলে আনুমানিক ১৫ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে হচ্ছে আলাদা। এসব মিলিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সিনেমার প্রতি ভালোবাসা থাকলেও এ বাস্তবতায় আর এগোনো যাচ্ছে না। ইচ্ছা ছিল, কোনোভাবে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমার প্রতিষ্ঠানটা ১০০ বছর পূর্ণ করত। সেটা আর সম্ভব হলো না।’
দর্শক না আসার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দর্শক সিনেমা হলে আসে সিনেমা দেখতে। অথচ এখন যে সিনেমাগুলো মুক্তি পাচ্ছে, সেগুলো সিনেমা নয়, বরং ফাজলামি। একজন শাকিব খান দিয়ে কি পুরো ইন্ডাস্ট্রি টিকবে? শাকিব খান সুপারস্টার, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একজন দিয়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রি চলবে না। ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নের জন্য কোথায় কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে কেউই ভাবছে না। সরকারেরও কোনো মাথাব্যথা নেই।’
তিনি হতাশার সুরে বলেন, ‘এ সেক্টর (সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি) নিয়ে কারো কোনো আগ্রহ নেই। ৫ আগস্টের পর আমরা হল মালিকরা একাধিকবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি, কোনো জবাব পাইনি। মনে হয়েছে, এ সেক্টর থাকুক বা না থাকুক, কারো কিছু যায় আসে না।’
তবে সমাধানের পথও তিনি দেখান। তার দাবি, ‘আপৎকালীন সময়ের জন্য হলেও বিদেশী সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতি দিতে হবে। হলে সিনেমা না এলে প্রেক্ষাগৃহ বাঁচবে না। এখন যদি ১০-১৫টা হল একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ঈদকে কেন্দ্র করে যে বড় বাজেটের সিনেমা তৈরি হয়, সেগুলো কোথায় চলবে?’
ভেঙে মার্কেট করার সিদ্ধান্ত মণিহারের: বাংলাদেশের বৃহত্তম সিনেমা হল মণিহার। এটি ভেঙে সেখানে মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা করছে মালিকপক্ষ। দীর্ঘদিন ধরেই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছিল তারা। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আর কোনো বিকল্প না দেখে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে মালিকরা।
জানা গেছে, এ মাস পর্যন্ত চিন্তাভাবনা করার পর পরই হলটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মালিকপক্ষ এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রেক্ষাগৃহসংশ্লিষ্টদের দাবি, বিদেশী সিনেমা আমদানি করা সম্ভব না হলে এ ধরনের হল টিকিয়ে রাখা যাবে না। কারণ সারা বছর শুধু দুই ঈদ দিয়ে সিনেমা হল পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। নিয়মিত আয় না থাকায় স্টাফদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ নানা খরচ জোগানো মালিকদের জন্য বড় সংকটে দাঁড়িয়েছে।
নির্মাতাদের উদ্বেগ: প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে অনেক নির্মাতাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্মাতা দীপংকর দীপন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ঈদনির্ভর সিনেমা বানানো আত্মঘাতী চর্চা। সারা বছর সিনেমা মুক্তি না দিলে হল বাঁচবে না। আমরা বহুবার বলেছি, তবুও ঈদনির্ভর সিনেমা বানানো হচ্ছে। যারা ঈদনির্ভর সিনেমা বানাচ্ছে তারা কি ভেবেছে, ঈদের বাইরে হলগুলো কীভাবে চলবে? এ মুহূর্তে হলে সিনেমা দেয়া সবচেয়ে জরুরি। যেহেতু আমরা পর্যাপ্ত সিনেমা বানাতে পারছি না, ভারতীয় সিনেমা আনার অনুমতি দেয়া দরকার। তবে এটাও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এর আগেও ভারতীয় সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, কয়েকটা ছাড়া বাকিগুলো সফল হয়নি। তবুও এটা শেষ চেষ্টা হিসেবে নেয়া উচিত। এর পরও যদি কাজ না হয়, তবে হল বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’
সিনেমার জন্য অশনিসংকেত: একসময় সিনেমা হল ছিল মানুষের প্রধান বিনোদন কেন্দ্র। এখন একের পর এক আধুনিক প্রেক্ষাগৃহও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হল মালিক, নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট সবার মতে, এটা বাংলা সিনেমার জন্য বড় অশনিসংকেত। তারা মনে করেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলো হারিয়ে যাবে।










