কোক স্টুডিও বাংলা সিজন টুয়ের প্রথম গান ‘মুড়ির টিন’। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা হয়েছে গানের মূল অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিলেট ও খুলনার ভাষায় র্যাপ। ১৪ ফেব্রুয়ারি গানটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে। ছয়দিনে গানটির ইউটিউবে ভিউ ৫১ লাখ। বাস, বাসযাত্রী, ড্রাইভার, হেল্পার মিলিয়ে বাসযাত্রার একটা চিত্র উঠে এসেছে এ গানে। পাশাপাশি চমৎকার সংগীতায়োজন, নানা ধরনের মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্ট যুক্ত করায় এটি হয়ে উঠেছে উপভোগ্য। এমন একটি গান তৈরি হওয়ার পেছনে গল্পটা আরো চমৎকার।
কেমন করে তৈরি হলো ‘মুড়ির টিন’, সে কথা জানতে চাইলে গানটির গায়ক ও গীতিকার রিয়াদ হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যাত্রাটা আসলে অনেক আগে শুরু হয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে আমি যখন চট্টগ্রামে ছিলাম, তখন জিইসি মোড় নামে একটা গান বানিয়েছিলাম। আমার গান লেখার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে চট্টগ্রামের দুজন ফোক আর্টিস্ট—শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালি ঘোষ। তাদের গানে যাপিত জীবন ও আঞ্চলিক নানা বিষয় ছিল। আমার তখন মনে হয়েছিল এমন গান হতে পারে। তারপর আমি চট্টগ্রামের ভাষায় গান লিখতে শুরু করি। এমন সব বিষয় নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি, যার সঙ্গে মানুষ নিজেকে যুক্ত করতে পারবে। ২০১৪ সালে আমার প্রথম অ্যালবাম মুক্তি পায়। সেখানে একটা গান ছিল “ডিজিটাল ফোয়া" (ডিজিটাল ছেলে)’’। এরপর আরো একটা গান করি, ‘‘সাতকানিয়া ফটিকছড়ি’’ নামে। সে সূত্র ধরে কোক স্টুডিওতে ডাক পাই।’
কোক স্টুডিওর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মুড়ির টিনের ভাবনা রিয়াদ হাসানের মাথায় আসে। কালুরঘাটের মতো একটি উপশহরে তিনি নিজে ছিলেন এবং সেখানকার বাসযাত্রা দেখেছেন। তাই যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাওয়া, গাদাগাদি, যাত্রীর চেঁচামেচি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গান লেখেন তিনি। এরপর তৈরি হয় গানটি। চট্টগ্রামের ভাষার সঙ্গে আরো দুটো আঞ্চলিক ভাষাকে যুক্ত করা হয়। এ নিয়ে রিয়াদ হাসান বলেন, ‘অর্ণবদা ছিলেন আমাদের সঙ্গে। আমাদের প্রিয় একজন মিউজিশিয়ান। সবকিছু মিলিয়ে তিনি একটা আইডিয়া দিলেন, আরো দুটো আঞ্চলিক ভাষা এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ওই সূত্র ধরে সিলেট ও খুলনার ভাষা এল র্যাপ আকারে।’
গানটি প্রাথমিকভাবে সুর করার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারার বাইরে করার চেষ্টা করেছেন তিনি। আমেরিকান কান্ট্রি মিউজিকের ধাঁচে মিউজিক দেয়া হয়েছে। এ গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন শুভেন্দু দাস শুভ। মুড়ির টিনের সংগীত পরিচালনা ও গানটি তৈরি হওয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘মুড়ির টিন তো প্রচলিত অন্য গানের মতো না। রিয়াদ এটা লিখেছে। এরপর অন্য কোনো ভাষা যোগ করার আইডিয়া দিয়েছিলেন অর্ণবদা। আমরা কিছু সূত্রে পল্লবের খোঁজ পাই। তাকে যুক্ত করা হয় গানটির সঙ্গে। চট্টগ্রামের ভাষায় মূল গানটির সঙ্গে মিল রেখে সিলেটি অংশটা লেখা হয়। সিলেটের কিছু বিশেষ বিষয় এসেছে। আঞ্চলিকতার পাশাপাশি গানে একটা দর্শনের জায়গাও আছে। এরপর যুক্ত হয় খুলনার ভাষা, যেটা করেছেন তৌফিক আহমেদ।’
গানটিতে ভাষার পাশাপাশি বাদ্যকার ও বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবও লক্ষ করার মতো। এ নিয়ে মজার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন শুভেন্দু দাস। বাসে থাবা দিয়ে যাত্রী ডাকা বা ড্রাইভারকে থামতে বলার চল রয়েছে। সেটিকে গানে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। শুভেন্দু বলেন, ‘একটা টিনের ট্রাঙ্কে থাবা দিয়ে শব্দটা তৈরি করলেন মিথুন। আর শুটিংয়ে একটা মুড়ির টিনই আনা হয়েছিল। এছাড়া অন্য যারা বাদ্য বাজালেন তারাও চমৎকার করেছেন। থ্রুম্বুন বাজালেন অপূর্ব, ট্রাম্পেটে কাবিল, হারমোনিকায় মাঈশা। এ রকম আয়োজন কোক স্টুডিওতেই সম্ভব।’
বাদ্যযন্ত্র ও বাদ্যকারদের যুক্ত করা সম্পর্কে রিয়াদ হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশে তো আসলে এখনো এমন প্লাটফর্ম নেই যে মিউজিশিয়ানরা মনের খোরাক মিটিয়ে মিউজিক ডিজাইন করতে পারবে। কোক স্টুডিও সেটা করেছে।’ বিভিন্ন জায়গা থেকে যুক্ত হয়েছেন শিল্পীরা। মুড়ির টিনে হারমোনিকা বাজিয়েছেন মাঈশা মারিয়াম। মুড়ির টিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘শুভেন্দু দার মাধ্যমে আমি গানটিতে যুক্ত হই। মুড়ির টিনে অসাধারণ শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছি। কোক স্টুডিও সবার আইডিয়াকেই গুরুত্ব দেয় এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করার কারণেই গানটা এত ভালো হয়েছে।’
মুড়ির টিন সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে রিয়াদ হাসান ও শুভেন্দু দাস শুভও এ কথার প্রতিধ্বনি করেছেন। শায়ান চৌধুরী অর্ণবের তত্ত্বাবধানে তারা গানটিতে স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন এবং কোক স্টুডিও এ আয়োজন করেছে বলেই মুড়ির টিন তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সফলও হয়েছে।










