ঈদ এলে বলিউডেও উৎসবের হাওয়া লাগে। শাহরুখ খান, সালমান খান, আমির খানদের জমানায় এমন হবে, তা তো বলাই বাহুল্য। ঈদকে ঘিরে তাই আলাদা করে সাজে বলিউড। তারকাদের ঘরে আসে ঈদের সওগাত। নতুন করে তারা ঈদের জন্য নিজেদের সিনেমা ও অন্যান্য কাজের পরিকল্পনা করেন। কেবল মুসলিম তারকারাই নন, ঈদ পালন করেন অন্যরাও। বলিউডে ঈদ মোটামুটি সবার উৎসব হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ঈদকে ঘিরে মুক্তি পায় বেশকিছু সিনেমা। যেহেতু এটি একটি উৎসবের সময়, তাই উৎসবকে ঘিরে সিনেমা মুক্তির মাধ্যমে ব্যবসায়িক সফলতা চান প্রযোজক-পরিচালকরাও। গত তিন দশকে ঈদে মুক্তি পাওয়া বলিউডের সিনেমা ভালো ব্যবসা করেছে। তবে সবসময় এমন ছিল না।
ভারতীয়
সিনেমার ইতিহাস ১০০ বছরের বেশি। সে ইতিহাসে ভাস্বর
হয়ে আছে বহু নাম ও ছদ্মনাম। ইউসুফ
খান হয়েছিলেন দিলীপ কুমার, মুমতাজ জাহান হয়েছিলেন মধুবালা। একই ঘটনা মীনা কুমারী, নার্গিস, জনি ওয়াকারের ক্ষেত্রে। অবশ্য স্বনামে বহাল ছিলেন মহম্মদ রফি, কে আসিফ, নাসির
খানরা। নামের এ সাতকাহন করার
কারণ বলিউডে সবসময়ই জনপ্রিয়তার তালিকায় মুসলিমরা থাকলেও ঈদ বা অন্যান্য
উৎসবে বড় করে সিনেমা
মুক্তির মতো বিষয় খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। ঈদে সিনেমা মুক্তি পেত না এমন নয়,
কিন্তু নব্বইয়ের দশকে যে ধারাটা চালু
হয় তা ছিল না।
সে সময় সিনেমা মুক্তি দেয়া হতো, কিন্তু আলাদা উৎসবের আমেজ সেভাবে থাকত না।
ঈদে সিনেমা মুক্তির বিষয়টি আলাদা করে চিহ্নিত করা হয় নব্বইয়ের দশকে। শুরুটা হয়েছিল অনীল কাপুর-মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত ‘বেটা’ সিনেমার মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন ইন্দ্র কুমার। আশির দশকের ‘মাতৃ আজ্ঞাই শিরোধার্য’ ধারার ‘ভালো ছেলে’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অনীল কাপুর। সিনেমায় অনীল-মাধুরী জুটিও দর্শক পছন্দ করেছিল। তাদের ‘ধক ধক করনে লাগা’ অনেক ক্ষেত্রে এ সময়ের আইটেম সংকে পেছনে ফেলে দেয়। পারিবারিক আবহ, ষড়যন্ত্র, প্রেম মিলিয়ে ফ্যামিলি ড্রামা হওয়ার কারণে সিনেমাটি দর্শক সাদরে গ্রহণ করেছিল। সময়ের হিসাবে ব্লকবাস্টার হওয়া ‘বেটা’ ১৯৯২ সালে বক্স অফিসে আয় করেছিল ১০ কোটি রুপি। নব্বইয়ের দশকে এটিই প্রথম বলিউড সিনেমা, যা ঈদে মুক্তি পায়।
ঈদে
মুক্তি পাওয়া দ্বিতীয় সিনেমা ছিল আনাড়ি। এটি ডি রানা নাইডু
প্রযোজনা করেছিলেন। পরিচালনায় ছিলেন মুরলী মোহন রাও। এ সিনেমার মধ্য
দিয়ে দক্ষিণের অভিনেতা ভেঙ্কটেশের বলিউডে অভিষেক হয়েছিল। তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন কারিশমা কাপুর। সিনেমাটি ৩ কোটি রুপি
আয় করেছিল বক্স অফিসে। এরপর ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায় ‘জুড়ওয়া’।
ডেভিড ধাওয়ান পরিচালিত ও সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা
প্রযোজিত সিনেমাটি সে সময় রীতিমতো
‘হালচাল’ তৈরি
করেছিল দর্শকদের মধ্যে। সালমান খানের বিপরীতে এ সিনেমায় অভিনয়
করেন কারিশমা কাপুর ও রম্ভা। দ্বৈত
চরিত্রে সালমান খানের অভিনয় দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। কমেডি সিনেমার কমিক সেন্স বাড়াতে এতে ছিলেন কাদের খান, দালিপ তাহিল, শক্তি কাপুর, অনুপম খের ও শতীশ শাহ।
১৯৯৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তি
পাওয়া সিনেমাটি বক্স অফিসে আয় করেছিল ১৩
কোটি রুপি। সে সময়ের হিট
ও কমেডিকে যদিও ‘কাল্ট ক্ল্যাসিক’ হিসেবে
কেউ তালিকায় রাখে না। তবে নির্মাণের ২০ বছর পর
(২০১৭ সাল) এর সিকুয়াল হলো
ডেভিড ধাওয়ানেরই হাতে।
ঈদে মুক্তি পাওয়া নব্বইয়ের দশকের সিনেমার তালিকায় সাকল্যে এ তিন সিনেমাই থাকছে। এর মধ্য দিয়ে কয়েকটি বিষয় বোঝা যায়। ঈদে সিনেমা মুক্তির বিষয়টি তখনো বলিউডের চর্চায় আসেনি। তারা বিষয়টিকে দর্শকের কাছে সেভাবে পৌঁছাতেও পারেননি। কেননা ‘জুড়ওয়া’ ভালো আয় করলেও তার পরের তিন বছর ঈদ উপলক্ষে কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। অন্তত তারকারা আছেন এমন কোনো বড় সিনেমা মুক্তি পায়নি। অর্থাৎ ঈদে সিনেমা মুক্তি দেয়ার বিষয়টি তখনো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি বদলায় পরের দশকে।
করণ
জোহর পরিচালিত সিনেমা ‘কাভি খুশি
কাভি গম’
মুক্তি পায় ২০০১ সালে। সে বছর ঈদুল
ফিতর অনুষ্ঠিত হয় ১৭ ডিসেম্বর
এবং সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ১৪ ডিসেম্বর। কাভি
খুশি কাভি গম নিয়ে আলাদা
কিছু বলার দরকার হয় না। হিন্দি
সিনেমা সম্পর্কে যারা অল্পও জানেন তারাও এ সিনেমা সম্পর্কে
অবগত। শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন, হৃতিক রোশন, কাজল, কারিনা কাপুর ও জয়া বচ্চন
অভিনীত সিনেমাটি এখনো জনপ্রিয়। করণ জোহর এর কাজ শুরু
করেছিলেন ১৯৯৮ সালে। তবে নির্মাণে লেগে যায় অনেকটা সময়। ভরসা করে ঈদে মুক্তি দিলেন আর বাজিমাত। সিনেমাটি
আয় করেছিল ৫৫ কোটি রুপি।
করণ জোহরের প্রযোজিত ‘কাল হো না হো’ ২০০৩ সালের সিনেমা। অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান। সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ঈদে ও আয় করেছিল ৩৮ কোটি রুপি। ২০০৪ সালের ঈদে মুক্তি পায় শাহরুখ খান অভিনীত যশ চোপড়ার বীর-যারা। সিনেমাটি বক্স অফিসে মোট আয় করেছিল ৯০ কোটি রুপির বেশি। কিন্তু প্রযোজকরা তখনো প্রজাতন্ত্র দিবস, দীপাবলিতেই সিনেমা মুক্তির কথা ভাবতেন। এর মধ্যে ২০০৬ সালে ফারহান আখতারের ‘ডন’ এসেছিল ঈদে। শাহরুখ খানের এ নতুন অবতার দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। বক্স অফিসে সিনেমার আয় ছিল ৭০ কোটি রুপি। প্রিয়দর্শনের ‘ভুল ভুলাইয়া’ মুক্তি পেয়েছিল ২০০৭ সালের ঈদে। সিনেমাটি আয় করেছিল ৪৯ কোটি রুপি।
এ
বছর ঈদে মুক্তি পাচ্ছে সালমান খান অভিনীত ‘কিসি কা
ভাই...কিসি কি জান’। বলিউডে ঈদের
সিনেমা মানেই এখন সালমান খান। কিন্তু ১৯৯৭ সালের পর ২০০৯ পর্যন্ত
ঈদে তার কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। সময়টা অবশ্য সালমানের ক্যারিয়ারের জন্যও খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু ওই বছরই তার
ক্যারিয়ার ইউ টার্ন নেয়।
প্রভুদেবা পরিচালিত ‘ওয়ান্টেড’ দিয়ে ফিরেছিলেন তিনি। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার রিমেক ও দক্ষিণ ভারতের
স্বাদ দেয়া সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ঈদে। সালমান খানের ‘আমি একাই একশ’
ধাঁচের অভিনয়, অ্যাকশন ও প্লট টুইস্ট
এবং প্রকাশ রাজের অভিনয়ের কারণে দর্শক পছন্দ করেছিল সিনেমাটি। ওয়ান্টেড আয় করেছিল ৯৯
কোটি রুপি। এর পর থেকেই
যেন সালমান ঠিক করলেন ঈদে মুক্তি দেবেন তার সিনেমা। পরেরবার দুই হাজার হলে মুক্তি পায় অভিনব কাশ্যপ পরিচালিত ‘দাবাং’। সিনেমাটি আয়
করেছিল ১৫০ কোটি রুপির বেশি। ২০১০ সালের সর্বাধিক আয় করা সিনেমাও
দাবাং।
এরপর যেন ঈদের বাজার সালমান খানই দখল করলেন। ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ১১ বছরে তার আটটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ঈদে। ২০১১ সালে মুক্তি পায় বডিগার্ড। সিদ্দিক ইসমাইলের এ সিনেমাও ১৫০ কোটি রুপির কাছাকাছি আয় করেছিল। ২০১২ সালে যশরাজের ব্যানারে কবীর খানের ‘এক থা টাইগার’ আয় করে ৩০০ কোটি রুপি। ২০১৪ সালে ‘কিক’ সমালোচিত হলেও আয় করেছিল ৪০০ কোটি রুপি। ২০১৫ সালের ‘বজরঙ্গী ভাইজান’ ও ২০১৬ সালে সুলতান ৯০০ কোটির বেশি এবং ২০১৯ সালে ভারত প্রথম দিনে ৪২ কোটি রুপি আয় করে মোট আয় করেছিল ৩৫০ কোটি রুপি। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ঈদে মুক্তি পেয়েছিল শাহরুখ খান অভিনীত ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’। সিনেমাটি মোট আয় করেছিল প্রায় ১০০ কোটি রুপি।
এ তো গেল ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পাওয়া সিনেমার কথা। সেখানে দেখা যাচ্ছে এ শতকের প্রথম দশকে শাহরুখ খান (২০০১-০৬) ও পরের দশকে সালমান খান (২০০৯-২০১৯) ঈদে সিনেমা মুক্তিকে জনপ্রিয় করেছিলেন। তারা ব্যবসাসফল সিনেমা উপহারও দিয়েছেন। আয় ও মুনাফা থেকে সরে এবার আসা যাক সিনেমায় ঈদ প্রসঙ্গে। ঈদের প্রসঙ্গ এসেছে বলিউডের বেশকিছু সিনেমায়। এক্ষেত্রে অবশ্য সালমান খান এগিয়ে থাকবেন। ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘তুমকো না ভুল পায়েঙ্গে’ সিনেমায় ‘মুবারক ঈদ মুবারক’ গান আজও জনপ্রিয়। সনু নিগম, স্নেহা পন্ত ও অরবিন্দ সিং কণ্ঠ দিয়েছিলেন এ গানে। ঈদের আমেজ ও উৎসবের ভাব রয়েছে গানটিতে। এছাড়া অক্ষয় কুমারের ‘তিস মার খা’ সিনেমায়ও ‘ওয়াল্লা রে’ গানটির দৃশ্যায়নে ঈদ উৎসবকে নির্দেশ করে।
এছাড়া
ঈদের বিষয়টি এসেছিল অগ্নিপথ সিনেমায়। সিনেমার খলনায়ক লালার (ঋষি কাপুর) বাড়িতে ঈদের দাওয়াত ছিল এবং সেখানেও একটি গান আছে। ঈদের দৃশ্যায়ন আছে বজরঙ্গী ভাইজানেও। ঈদকে কেন্দ্র করে এসেছে ‘আজ কি
পার্টি’ গানটি।
কিন্তু ঈদের এসব উপস্থাপনায় বলিউড তার মিডিওকোর জায়গা থেকে বের হতে পারেনি। যেমন মুবারক ঈদ মুবারক গানে
সালমান ও তার কো-ড্যান্সারদের গলায় তাবিজ, মাথায় টুপি। ওয়াল্লা রে গানেও সালমান
ও অক্ষয়ের মাথায় টুপি, কিন্তু তা খুবই বৈসাদৃশ্যভাবে
পরা। অগ্নিপথে লালার চোখে সুরমা, মাথায় জিন্নাহ টুপি। চারপাশে লাল-সবুজ কাগজে চাঁদ-তারা। আজ কি পার্টির
ধাঁচটা আর যা-ই
হোক ঈদের সঙ্গে মেলে না। তবে ঈদের চাঁদ দেখা, আনন্দ ভাগ করে নেয়া ও উৎসবের পুরো
আমেজটা আছে ‘সাওয়ারিয়া’র একটি গানে।
সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমাটি ২০০৭ সালে মুক্তি পায়। ‘ইয়ু শাবনমী’ গানের
দৃশ্যায়নে ঈদের আমেজটা দারুণভাবে এসেছে। চাঁদের জন্য অপেক্ষা আর চাঁদ দেখার
আনন্দ এ গানে স্পষ্ট।
বলিউডে ঈদের সময় তারকারা কেমন করে ঈদ পালন করেন তা নিয়ে বহু পত্রিকায় ফিচার হয়। সেখানে শাহরুখ, সালমান ও আমিরই মুখ্য। তবে আমিরের সিনেমা ঈদে মুক্তি পায় না। তিনি বড়দিনই পছন্দ করেন। ঈদে সিনেমা মুক্তি মূলত শাহরুখ ও সালমান খানের অবদান। অন্যদিকে বলিউডে এখন ঈদের আমেজ তুলনামূলক কমে যাচ্ছে। এর কারণ একদিকে রাজনৈতিক, অন্যদিকে বলিউডের মুনাফা কমে যাওয়া ইত্যাদি। তবে পাঠান যেভাবে ফিরেছে, আশা করা যায় বলিউডে ঈদের সিনেমাও ফিরবে।










