রাজারাজড়াদের আমলের দিকে তাকাই। ভারতের বহু নেটিভ স্টেটের রাজাদের ঘর সাজাতে ব্যবহার হতো আইভরি—হাতির দাঁত। তবে দাঁত খুলে সাজিয়ে রাখা হতো না। দাঁত থেকে তৈরি হতো নানা শৌখিন জিনিস। আজ আমরা যাকে শোপিস বলি। ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে গেলেও দেখা যাবে সেখানে রাখা আছে হাতির দাঁতে তৈরি দাবার সেট, নৌকার মডেল। কবে কার মাথায় এসেছিল হাতির দাঁত থেকে শৌখিন দ্রব্য তৈরি করা যায়, তা নির্ণয় প্রায় অসম্ভব। আর রাজারাজড়াদের আমলে তারা হাতি পুষতেন, সে হাতির দাঁত প্রয়োজনে কাটা হতো। কিন্তু এরপর দেখা গেল জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বন কেটে বসতের কারণে কমে গেল হাতি। কিন্তু চাহিদা কমেনি এর দাঁতের। সেই থেকে শুরু হলো চোরা শিকার।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার কাকাবাবু সিরিজের জন্য লিখেছিলেন ‘কাকাবাবু ও চোরাশিকারি’। এর সঙ্গে আজকের ‘পোচার’ সিরিজের তেমন কোনো যোগ নেই। কিন্তু চোরাশিকার নিয়ে লেখা কম হয়নি, সংবাদপত্রে প্রতিবেদনও কম আসেনি। কিন্তু এটি কমেনি। এর নানা কারণও আছে। সে কারণগুলোই উঠে এসেছে দক্ষিণ ভারতের সিরিজ পোচারে।
এ গল্প মূলত হাতির চোরাশিকার নিয়ে। কেরালায় ১০ বছর আগেও বেশকিছু হাতি ছিল, কিন্তু তার সংখ্যা কমছিল ক্রমেই। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পুলিশ ও বনবিভাগ। বেড়ে যাওয়া চোরাশিকার নিয়ে তারা নতুন করে শুরু করে তদন্ত। এর জন্য নিযুক্ত হয় অফিসার মালা। নীল ব্যানার্জি লিড করেন কেসটি এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয় কম্পিউটার প্রোগ্রামার অ্যালান।
কানাডীয় নির্মাতা রিচি মেহতা পরিচালনা করেছেন অ্যামাজনের সিরিজ পোচার। প্রশ্ন হচ্ছে এটি ভিন্ন কোন কারণে? প্রথম কারণ ভারতীয় সিরিজে একদিকে থাকে অপরাধ, একদিকে প্রেম, আরেকদিকে কমেডি। অপরাধ নিয়ে করা সিরিজগুলোর বেশির ভাগই দেখা যায় আন্ডারওয়ার্ল্ড ও গডফাদার জনরার গল্প। এর বাইরে দক্ষিণে দু-একটা সিরিজ হয়েছিল মিথকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সমাজে চলমান রিয়েল ক্রাইম, যা চোখের আড়ালে বা যা নিয়ে আলোচনা হয় না এমন সিরিজ কম। সে জায়গাকেই ধরেছে পোচার। এর আগে নেটফ্লিক্সে এসেছিল ‘কালা পানি’। সেখানেও পরিবেশ সুরক্ষার একটা আবেদন ছিল। অ্যামাজনের পোচার সেখানে পরিবেশের পাশাপাশি নিয়ে এল প্রাণীদের বেঁচে থাকা, বাঁচিয়ে রাখার দাবি।
সিরিজটি খুবই ধীর গতির। ক্রাইম থ্রিলার দেখে যারা অভ্যস্ত, তারা খুব একটা উত্তেজনা বোধ করবে না। কেননা এখানে গল্প এগোয় না সহসা। শুরু থেকেই হাতির দাঁতের চোরাচালান ও এর পেছনের মানুষের খোঁজার চেষ্টা দেখা যায়। কিছু দূর গেলে বোঝা যায়, কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধ সংস্থা এখানে নেই, দুর্দান্ত গোলাগুলির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তবু সিরিজ তার টার্গেট অডিয়েন্সকে ধরে রাখতে পারবে কয়েকটি কারণে।
দক্ষিণ ভারতের অফবিট সিনেমা দেখার অভ্যাস যাদের আছে, তাদের ভালো লাগবে এর সিনেমাটোগ্রাফি। কোনো গ্ল্যামার নেই, কিন্তু কেরালার মানুষ, তাদের জীবন, ঘরবাড়ি খুব বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে সিরিজে। এর বাইরে অভিনয়ে সবাই বাস্তবধর্মী। মালা চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিমিষা সাজায়ান। তিনিই বলা চলে মূল চরিত্র। তার বাবা নিজে একজন শিকারি ছিলেন, কিন্তু মালা চায় জঙ্গলের পশুদের বাঁচাতে।
রোশান ম্যাথিউর চরিত্রটির নাম অ্যালান। কম্পিউটার প্রোগ্রামার। চাইলে বড় চাকরি নিতে পারতেন বিদেশে। কিন্তু তিনি মনে করেন, প্রোগ্রামের মাধ্যমে পরিবেশের নানা প্রাণীকে বাঁচানো সম্ভব। মানুষ ও প্রাণীদের মধ্যে একটা সম্পর্কও তৈরি করা যায়। আর নীল ব্যানার্জিও কাজপাগল মানুষ। পোচারদের ধরার জন্য দিনরাত এক করে ফেলছেন। এদিকে তার ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাধি ধরা পড়েছে। কিন্তু সেসব না পাত্তা দিয়ে তিনি কাজ করে চলেছেন।
সিরিজটি দেখায় চোরাশিকারের সঙ্গে জড়িত ভারতের অনেক ক্ষমতাসীন ব্যক্তি। তারা বনবিভাগের ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু নানা কৌশলে তাদের ধরার চেষ্টা করে বনবিভাগ। ধরেও ফেলে। এর সমান্তরালে আসে কিছু মানুষ, যারা বাধ্য হয় সে কাজ করতে। নইলে তাদের সংসার চলবে না। সিরিজের এ পর্যায়ে একটা বিষয় দৃষ্টিকটু। অর্থাভাবে চোরাশিকারের সঙ্গে যুক্ত গরিব লোকদের নানা উপদেশ দেন মালা। অথচ সে ব্যক্তিদের একজন আগেই স্বীকার করেছে, সরকার তাকে বনরক্ষার জন্য যে পারিশ্রমিক দেয় তাতে সংসার চলে না।
বাস্তবে তদন্ত কখনো গ্ল্যামারাস না। ভারতীয় নানা সিরিজে বন্ড স্টাইলে যে তদন্ত দেখানো হয় তা অবাস্তব। পোচার মূলত দেখিয়েছে সত্যিকারের তদন্ত। এর নানা বাধা। এর সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার ভিএফএক্সের কাজ বেশ ভালো ছিল। একাধিক দৃশ্যে হাতি, বানর দেখানো হয়েছে ভিজুয়াল ইফেক্ট দিয়ে। তা বাস্তবসম্মত। এর পাশে ছিল বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার আবেদন। দর্শককে যুক্ত করতে পারে সিরিজটি। এটিই সবচেয়ে বেশি প্রশংসার দাবিদার।










