বলিউডে বা ভারতে এখন কী ধরনের সিনেমা হচ্ছে? এক কথায় উত্তর—অ্যাকশন সিনেমা। উত্তর-দক্ষিণ সবদিকে একই ধারা। পূর্বে (পশ্চিমবঙ্গ) অবশ্য তা নেই। মূলত দক্ষিণ ভারতে অনেকদিন ধরে অ্যাকশন ঘরানার সিনেমা হচ্ছে আর ইদানীং বলিউডও সে পথ ধরেই চলছে। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ শাহরুখ খানের ‘পাঠান’ ও ‘জওয়ান’। এর মধ্যে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘অ্যানিমেল’ আবার নিয়ে এসেছে ভায়োলেন্স। তিনটি সিনেমাই এ বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী। মারদাঙ্গা সিনেমার এ বাজারেই ‘ডাঙ্কি’ মুক্তি দিলেন শাহরুখ-হিরানী। রাজকুমার হিরানীর এ সিনেমা পুরনো ধারার বলিউডকে অনুসরণ করে রেখেছে প্রেম, বন্ধুত্ব, পরিবার, ভারত ও দেশপ্রেমের গল্প।
সিনেমা হিসেবে ‘ডাঙ্কি’র প্রচুর খামতি আছে। প্রথম খামতিটা হলো এর গল্প বলার ধরনে। রাজকুমার হিরানী কখনই সূক্ষ্মভাবে গল্প বলেন না। তার বক্তব্যের ধরন স্পষ্ট। তার প্রতিটি সিনেমাই কমিক। সোজা কথায় কমেডি। আর সে কমেডি তিনি করেন মোটাভাবে। মুন্নাভাই থেকে পিকে, সব সিনেমায়ই তার কমেডি স্থূল। ডাঙ্কিতেও সে একই বিষয় আছে। সিনেমায় বাগু যখন তার দাদির নামে শপথ করে, তার পর পরই দাদি মারা যায়। এখানে হিরানী কোনো দুঃখবোধ রাখেন না বা দর্শকের মধ্যে জাগান না। দাদির শব নিয়ে যাওয়ার সময়ও তিনি চরিত্রগুলো দিয়ে কমেডি করান। অনেকেই এ ধারা পছন্দ করেন না, কিন্তু যদি এ ধারা পছন্দ হয়ও ডাঙ্কির এ কমেডিতে হাসি আসে না।
ঠিক একইভাবে গিতু গুলাটি চরিত্রে দর্শককে হাসাতে পারেননি বোমান ইরানী। তিনি যেন এলেন চরিত্রটিতে অভিনয় করলেন, কিন্তু কেন কী করলেন, তা যেন বোঝা যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টিই চিত্রনাট্যে এ চরিত্রকে লেখার ধরনের কারণে। চরিত্রটিকে ঠিকমতো গড়ে তোলা হয়নি। স্ক্রিন টাইমও কম। অথচ এ বোমান ইরানীকে নিয়েই রাজু তৈরি করেছিলেন ডক্টর আস্থানা (মুন্নাভাই এমবিবিএস), লাখবির সিং (লাগে রহো মুন্নাভাই) ও ভাইরাসের (থ্রি ইডিয়টস) মতো চরিত্র। গিতু গুলাটি মনে রাখার মতো চরিত্র হয়ে ওঠেনি।
কাজ করেনি শাহরুখ-তাপসীর রসায়ন। হার্ডি মানুর প্রেমে পড়ছেন, তার জন্য এটা সেটা করছে, মানু একসময় লন্ডনে থেকে যেতে বলছে হার্ডিকে কেবল তারই জন্য। কিন্তু কেন যেন মনেই হচ্ছে না তাদের মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক আছে। বাগু, হার্ডি, মানু, সুখী ও বালির মধ্যে একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়। বন্ধুত্বের গল্প বলতেও হিরানী সেরা। প্রতিটি সিনেমায়ই বন্ধুত্ব রেখেছেন তিনি। কিন্তু এ সিনেমায় বন্ধুত্বও যেন সমযোজী বন্ধনের মতো। আয়নিক নয়।
সিনেমার সাফল্য এখন হিসাব করা হয় আয়ের নিরিখে। প্রথম দিন ‘জওয়ান’ আয় করেছিল ৭৫ কোটি রুপি, পাঠান ৫৫ কোটি। সেখানে ডাঙ্কির আয় মাত্র ৩০ কোটি রুপি। কিন্তু আইএমডিবিতে সিনেমার রেটিং ৭ থেকে বেড়ে ৮ হয়ে গেছে। কেননা দর্শক পছন্দ করছেন সিনেমাটিকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কী আছে ডাঙ্কিতে যার কারণে দর্শকের এত ভালো লাগল?
হিরানীর মতো সিনেমা ডাঙ্কি ‘হয়নি’ বলার পরও দর্শক ডাঙ্কির প্রশংসা করছে। কেননা শাহরুখ খানকে তারা দেখতে চেয়েছেন হিরানীর সিনেমায়। সত্যিকার অর্থে যে গল্পটা হিরানী বলেছেন, তা অনেকেরই মন ছুঁয়ে গেছে। যদিও ‘বীর-জারা’র নির্মাণ, অভিনয় বা শিল্পগুণের ধারেকাছেও নেই ডাঙ্কি, কিন্তু মানুর জন্য হার্ডির অপেক্ষা করার গল্পটা দর্শক পছন্দ করেছে। কেননা এই ২০২৩ সালে এসে জীবনভর কেউ অপেক্ষা করে না কারো জন্য।
সিনেমার মূল গল্প ‘ডাঙ্কি ফ্লাইট’ নিয়ে। পাঞ্জাবে নব্বইয়ের দশকে এটি জনপ্রিয় ছিল। যারা বৈধ পথে ইংল্যান্ড যেতে পারত না, তারা অবৈধভাবে যেত। এজন্য তাদের পাড়ি দিতে হতো সমুদ্র ও মরুপথ। কেউ গুলি খেয়ে মরত আর কেউ ডুবে। এরপর লন্ডন পৌঁছে আরেক মানবেতর জীবন। ডাঙ্কি যাত্রার সে দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার উপস্থাপন ছিল দুলকার সালমান অভিনীত ২০১৭ সালের ‘কমরেড ইন আমেরিকা’য়। হিরানী কেবল ছুঁয়ে গেছেন বিষয়টি। একবার মরুভূমিতে ধরা পড়া, কনটেইনারে যাত্রার দৃশ্য আর পানিতে ডুবে থাকা দিয়ে ১০ মিনিটে শেষ করেছেন হিরানী। আইইএলটিএস ব্যবসার চিত্র দেখাতে দেখাতেও দেখাননি। নিয়ে এসেছেন ‘ব্রিটিশদের ভারতে থাকতে তো ভিসার দরকার হয়নি’ বায়বীয় আবেগ।
কিন্তু দর্শক সেটাই পছন্দ করেছেন। গানের উপস্থাপন সুন্দর না হলেও লিরিক পছন্দ করেছেন দর্শক। শাহরুখের কিছু ক্ষেত্রে অতি অভিনয়ও তারা এড়িয়ে গেছেন দেশপ্রেমের বুলিতে। অথচ সিনেমায় মনে রাখার মতো তেমন সংলাপও নেই। তবে আবেগ আছে, কমেডি আছে। ছোট শহরের গল্প আবার ফেরালেন হিরানী। প্রেম-অপেক্ষার কথাও বললেন। তাই শাহরুখ-পান্নুর রসায়ন কাজ না করা বা তাদের বৃদ্ধ বয়সের মেকআপে ত্রুটি থাকলেও তা দর্শক ধরেন না। তদুপরি হিরানীর সিনেমা। আছেন শাহরুখ খান। আর সিনেমায় আছে সাবেকিয়ানা। তাই প্রচুর অ্যাকশন সিনেমার যুগে দর্শকের মুখে নতুন স্বাদ এনে দিল ডাঙ্কি। হেরেও জিতলেন হিরানী।










