যেকোনো ইন্ডাস্ট্রিতে একটা নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট ধারার সিনেমা জনপ্রিয়তা পায়। বলিউডে সত্তরের দশকে জনপ্রিয় হয়েছিল অ্যাংরি ইয়াং ম্যান আর্কিটাইপের সিনেমা। ২০২৪ সালে এসে অমিতাভ বচ্চনকে নানা কারণে ভারতের সেরা অভিনেতা বলা যায়, কিন্তু তার প্রাথমিক জনপ্রিয়তা এসেছিল অ্যাংরি ইয়াং ম্যান চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে। মূলত সেলিম খান-জাভেদ আখতারের চিত্রনাট্যগুলো থেকে তিনি এ ধারার চরিত্র করেছিলেন এবং সে ধারা চলেছিল অনেকদিন। মজার ব্যাপার, এ আর্কিটাইপ ফিরে এসেছে নতুন করে। খেয়াল করে দেখলে বোঝা যাবে কখনো ধানুষ, কখনো থালাপতি বিজয় এমনকি সর্বশেষ প্রশান্ত নীল পরিচালিত কেজিএফের রকির মধ্যেও এ ধাঁচটা আছে। সিনেমার একাধিক দৃশ্যে তার মধ্যে জঞ্জির বা অগ্নিপথের বিজয়কে পাওয়া যায়।
অমিতাভের এ ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’কে অনেকে তুলনা করেন ‘প্রতিনায়ক’ হিসেবে। বিজয় দিনানাথ চৌহান একটি ধূসর চরিত্র। তাকে সাদা বা কালোয় বাঁধা যায় না। একই কথা প্রযোজ্য শাহেনশাহর ক্ষেত্রেও। এ চরিত্রগুলো এমন সব কাজ করে যা আইনত বেঠিক, কিন্তু যেভাবে বা যে কারণে করে তাকে বেঠিক বলতে দর্শকের মন সায় দেয় না। এ ধারারই চরিত্র সম্প্রতি সৃষ্টি করেছেন অ্যাটলি কুমার তার জওয়ানে। কিংবা থেরির জোসেফের মধ্য দিয়ে তিনি এনেছেন একই দর্শন।
সত্তরের দশক ভারতের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। দেশজুড়ে চলছিল বেকারত্ব ও অন্যান্য সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গে এ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়। তাদের চরিত্ররা কখনো প্রতিবাদ করে ওঠে, কিন্তু ‘অ্যাংরি’ হয়ে ওঠে না। মূলত সত্যজিৎ-মৃণালরা সিনেমা দিয়ে সিস্টেমকে প্রশ্ন করেছেন আর বলিউডে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকরা একটা করে চরিত্র তৈরি করেছেন, যা দর্শককে নাড়া দেবে। দর্শক নিজে হয়তো সিস্টেমকে প্রশ্ন করবে না। কিন্তু তারা নিজেদের ওই নায়কের মতো শক্তিশালী মনে করবে। অমিতাভকে সে জায়গা দিয়েছিল বলিউড।
১৯৭১ সালে অমিতাভ অভিনয় করেছিলেন জ্যোতি স্বরূপের ‘পরোয়ানা’য়। আজকে এ সিনেমা নিয়ে তেমন কথা না হলেও তার কুমার সেন চরিত্রটির মরিয়া ভাব প্রথম ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ জন্ম দিয়েছিল। সে শিশুকে বড় করার কৃতিত্ব আজকে পাবেন সেলিম-জাভেদ। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় ‘জঞ্জির’। প্রকাশ মেহরা পরিচালিত এ সিনেমা অমিতাভের ক্যারিয়ার গ্রাফই বদলে দেয়। জঞ্জিরে তিনি প্রথম সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ঠিক সিস্টেম নয়, সিস্টেমের ত্রুটির বিরুদ্ধে।
এরপর এক এক করে এসেছে ‘দিওয়ার’ (১৯৭৫), ফারার (১৯৭৫), কালা পাত্থার (১৯৭৯), শাহেনশাহ (১৯৮৮) ও অগ্নিপথ (১৯৯০)। প্রতিটি সিনেমায় কোনো না কোনোভাবে তিনি সিস্টেম বা প্রচলিত ‘ভালো’র বিপরীতে চলেছেন। প্রতিটি সিনেমায় কমেডি ছিল, রোমান্স ছিল কিন্তু এর ওপরে বড় হয়ে উঠেছিল অমিতাভের চরিত্রের দাপট।
একালে এসে ‘থেরি’র জোসেফ দাঁড়িয়ে যায় ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে। জঞ্জিরের বিজয়কে সেখানে পাওয়া যায়। ২০১৪ সালে ভামসি পাইদিপল্লি নির্মাণ করেছিলেন ‘ইয়েভাদু’। সেখানে চরণ চরিত্রে রাম চরণ ও সত্য চরিত্রে আল্লু অর্জুন অ্যাংরি ইয়াং ম্যান। একজন তার ভালোবাসার জন্য লড়ে যায়, আরেকজন লড়ে ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে। এমন গল্প অবশ্য ভারতে হরহামেশাই দেখা যায়। তবে এর মধ্যে ‘কেজিএফ’ তুলনামূলকভাবে অনেকটা বেশিই অমিতাভ প্রভাবিত।
সিনেমার স্টোরিলাইনের দিকে তাকালে দেখা যায় রকি রীতিমতো ‘রাস্তা থেকে উঠে আসা’ ছেলে। যশ চোপড়া পরিচালিত ‘দিওয়ার’ প্রায় একই রকম। রকির ছোটবেলায় জুতা পালিশ করার দৃশ্য বলিউডের পুরনো দর্শককে দিওয়ারের কথা মনে করিয়ে দেবে। দিওয়ারে ইফতেখারের সামনে দাঁড়িয়ে অমিতাভের বলা ‘আমি আজও ছুঁড়ে দেয়া পয়সা কুড়িয়ে নিই না’র মেজাজ পুরো কেজিএফে স্পষ্ট। আর ‘মেরে পাস মা হ্যাঁয়’ সংলাপটি যে না থেকেও কেজিএফে যত্রতত্র আছে, তা বুঝতে সিনেমাপ্রেমীদের খুব একটা কষ্ট হয় না। ব্যাপারটা একেবারে অস্বীকার করেন না কেজিএফের পরিচালক।
পিটিআইয়ের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত বলেছিলেন, ‘আমার সব সিনেমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা অমিতাভ বচ্চন। এমন অনেক সিনেমা তিনি করেছেন, যেখানে তিনি নায়ক কিন্তু ভিলেনও আসলে তিনিই। তারপর এ ধারার সিনেমা সেভাবে হয়নি।’
আসলেও হয়নি। দক্ষিণের সিংহাম কিংবা রোহিত শেঠির কপ ইউনিভার্স বা বলিউডের অন্যান্য সিনেমা—নায়ক ক্রুদ্ধ হলেও সে নায়কের মতোই থাকে। প্রশান্ত বলেন, ‘অমিতাভ বচ্চন খলনায়কের লুককে নায়কের লুকে পরিণত করেছিলেন।’ মজার ব্যাপার, এই একই কাজ তিনিও করেছেন যশকে দিয়ে। যশ সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং নিজেকে সর্বহারা থেকে একটা ভিন্ন পরিচয় দিয়ে তুলে ধরে। যেমনটা অমিতাভ করেছিলেন দিওয়ার বা কালা পাত্থারে।
কেবল কেজিএফ নয়, উগ্রম ও সালারেও বিষয়টি আছে। আর কেবল প্রশান্ত নীলই না, অ্যাটলি, পাইদিপল্লি, রোহিত শেঠি, সুরেন্দ্র রেড্ডি এমনকি এসএস রাজামৌলি (বিক্রমারকুডু, আরআরআরে রাম চরণের চরিত্র) পর্যন্ত সিনেমায় চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অমিতাভের অ্যাংরি ইয়াং ম্যানের কাছে ফেরত গেছেন। আর প্রশান্ত যেভাবে সিনেমা নির্মাণ করছেন তাতে মনে হচ্ছে এ আর্কিটাইপ তিনি আরো টেনে নিয়ে যাবেন বেশকিছু সিনেমায়।










