বাংলা কবিতায় দুটো বিষয় ঘুরে ফিরে আসে—প্রেম ও দ্রোহ। একালে কিংবা আরো আগে থেকেও প্রেমের সঙ্গে ফাল্গুনের একটা যোগসূত্র রাখা হয়েছে। যদিও এ ফাগুন ইউরোপের ‘স্প্রিং’য়ের আদলে কবির কল্পনায় সাজানো, তবে বাংলায় এটি এসেছে বাংলার মতো করেই। কিন্তু বাংলাদেশের ফাগুন যেমন প্রেমের, তেমনি দ্রোহের। এমন এক ফাল্গুনেই স্লোগান উঠেছিল তরুণ কণ্ঠে। মায়ের ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল তারা। সেখানেই শেষ নয়, প্রাণ দিয়েছিল ভাষার দাবি আদায়ে। সে বিষয়কেই সিনেমায় এনেছিলেন তৌকীর আহমেদ। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার পরিচালনায় ‘ফাগুন হাওয়ায়’ মুক্তি পায় ২০১৯ সালে। ভাষা আন্দোলনের বহু বছর পর তিনি এ সিনেমায় প্রেম ও দ্রোহকে পাশাপাশি রেখেছিলেন।
সিনেমার পটভূমি এক মফস্বল। খুলনাকেই দেখানো হয়েছে সিনেমায়। সেখানে দাদার সঙ্গে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী দীপ্তি। কাছাকাছি সময় খুলনায় বদলি হয়ে আসে বদমেজাজী পুলিশ অফিসার জামশেদ। তিনি উর্দুকে জনতার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু এদিকে খুলনায় নাটক নামাতে চাইছে নাসির ও তার বন্ধুরা। নাসির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই দেখা হয় নাসির ও দীপ্তির এবং তাদের মধ্যে ফাগুনের হাওয়া প্রেম ছড়ায়। কিন্তু ১৯৫২ সালের ফাগুন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। ঢাকার সঙ্গে সে তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল মফস্বলেও। তারই তাপ ও ঝাঁঝ এসে পড়ে জামশেদের মধ্যে। ঢাকার মতোই সেও খুলনায় তার এলাকায় মানুষের মধ্যে উর্দু চাপিয়ে দিতে তোড়জোড় শুরু করে।
তৌকীর আহমেদ এ সিনেমা নির্মাণ করেছেন ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পর। এতদিনে ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মিত হয়েছে মাত্র একটি। আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ থেকে শহীদুল ইসলাম খোকন নির্মাণ করেছিলেন ‘বাঙলা’। ২০০৬ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এর ১২ বছর পর ফাগুন হাওয়ায়। সেদিক থেকে সিনেমাটি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া স্বল্প বাজেটে নির্মিত এ সিনেমা নির্মাণগুণেও সে সময়ের অনেক সিনেমার তুলনায় ভালো।
সাধারণত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় সম্মুখ সমর ও কিছু নির্দিষ্ট বিষয় ঘুরেফিরে আসে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা হয়নি, তবে এ নিয়ে লেখালেখিতেও আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেলের ঘটনার কথা। কিন্তু এর বাইরে দেশের অন্যান্য অংশেও ভাষার দাবি উঠেছিল। সে বিষয়গুলো কম আলোচিত। তৌকীর আহমেদ সেটিই এনেছেন। গল্পটি অবশ্য তৌকীরের নয়। তিনি টিটো রহমানের ‘বউ কথা কও’ ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন সিনেমাটি।
ফাগুন হাওয়ায় সিনেমার সবচেয়ে ভালো দিক পুলিশ অফিসার জামশেদ। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড অভিনেতা যশপাল শর্মা। সে জন্যই হয়তো অন্যান্য বাংলা সিনেমার মতো উর্দুভাষী চরিত্র ভুলভাল উর্দুতে কথা বলে না। মফস্বল শহরের থানার দারোগা যশপাল তথা জামশেদ যেন হয়ে উঠেছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ক্ষমতা ব্যবহারের প্রতিভূ। সে থানায় আসার পরপরই নানাভাবে বাঙালিদের উত্যক্ত করে এবং এ জায়গাগুলোয় তিনি বরাবরের মতোই দারুণ অভিনয় করেছেন।
সিয়াম আহমেদ একজন তরুণ ছাত্র হিসেবে এ সিনেমায় তার লুক ও অভিনয় ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু তিশার বিপরীতে তাকে একটু বেশিই তরুণ মনে হয়েছে কোনো কোনো জায়গায়। দীপ্তি চরিত্রে তিশা ভালো অভিনয় করেছেন, কিন্তু দুজনের রসায়নে একটু ফারাক থেকে গেছে কিছু কারণে। এর বাইরে আবুল হায়াত, শহীদুল আলম সাচ্চু তাদের জায়গায় ঠিকঠাক। তবে এ সিনেমার একটি এক্স ফ্যাক্টর ফজলুর রহমান বাবু। পুলিশ স্টেশনের ঝাড়ুদার চন্দর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এই চন্দর, তার সামাজিক অবস্থান ও চন্দরের সঙ্গে জামশেদের ব্যবহার, সে সময়কার পরিস্থিতির প্রকাশক।
সিনেমায় পঞ্চাশের দশকের একটি মফস্বলের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তৌকীর। নির্মাণের এ দিক বেশ ভালো। দেখে মোটামুটি বিশ্বাস হয় যে ১৯৫২ সালের খুলনা এমনই ছিল। এর একটি কারণ শুটিং স্পট। ২০১৮ সালে খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় সিনেমার শুটিং হয়। পাইকগাছার রাড়ুলী গ্রামে এবং কেবিকে হরিশচন্দ্র কলেজিয়েট ইনস্টিটিউটে ছবিটির মঞ্চের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে।
তৌকীর আহমেদ নির্মিত ফাগুন হাওয়ায় শুরু হয় শীত শেষের একটা আবেশ দিয়ে। তখন বেশ মনোরম একটা পরিবেশ। কিন্তু এরপর এক সময় চৈত্রের হাওয়া ঝাপটা মারে। তখন গুলিও চলে। আর ভাষার দাবিতে সোচ্চার কিছু মানুষ প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে পথে নামে। গল্পের শেষ দিকে নাসির, দীপ্তিসহ আরো অনেকে যখন ভাষার দাবিতে স্লোগান তোলে তখন সিনেমাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাষার দাবিতে একদিন সমগ্র দেশের হৃৎস্পন্দন এক হয়েছিল।










