হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রে এ শতকের শুরুর দশকটা ছিল কমেডি সিনেমার। আশি বা নব্বইয়ের দশকেও ছিল, তবে এরপর নতুন করে এসেছিল। এর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় একটি সিনেমার নাম ‘হেরা ফেরি’। অক্ষয় কুমার, সুনীল শেঠি ও পরেশ রাওয়াল অভিনীত সিনেমাটির পরিচালক প্রিয়দর্শন। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটি একইভাবে জনপ্রিয়। সিনেমার পরিচালক হিসেবে প্রিয়দর্শনকে সবাই জানলেও এর পেছনে আছেন আরেকজন। তিনি মালয়ালম সিনেমার নামজাদা পরিচালক সিদ্দিক। ১৯৮৯ সালে তার গল্প ও পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছিল মালয়ালম সিনেমা ‘রামজি রাও স্পিকিং’। সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি হেরা ফেরি। সিনেমার নির্মাতা সিদ্দিক ইসমাইল মারা গেলেন এ মাসের শুরুতে। তবে রামজি রাওয়ের নির্মাতা হিসেবে কেবল সিদ্দিকের নাম নিলে ভুল হবে। তার সঙ্গে ছিলেন আরেকজন। তিনি লাল।
সিদ্দিক ইসমাইলের মতো নির্মাতাদের পরিচিতি তুলনামূলক কম। সিদ্দিককে রামজি রাও স্পিকিংয়ের জন্য বেশি মানুষ চিনবেন না। তবে নিশ্চিত তাকে চিনবেন ‘বডিগার্ড’ সিনেমার পরিচালক হিসেবে। সালমান খান অভিনীত এ সিনেমা মুক্তি পায় ২০১১ সালে। রেকর্ড ব্যবসা করা সিনেমাটি ছিল মালয়ালম বডিগার্ডের রিমেক। পরিচালক ছিলেন সিদ্দিক। তিনি দক্ষিণে বেশকিছু কমেডি, রোমান্টিক কমেডি ও অ্যাকশন কমেডির নির্মাতা। মালয়ালম বা দক্ষিণে তিনি যথেষ্টই পরিচিত। কিন্তু নির্মাতা হিসেবে তিনি যতটা পরিচিত, ততটা পরিচয় পাননি তার সহযোগী লাল।
প্রভাস অভিনীত ‘সাহো’তে তিনি ইব্রাহিম। অথবা ধানুষ অভিনীত কারনান সিনেমায় যমরাজ চরিত্রে অভিনয় করা শক্তপোক্ত দাড়িওয়ালা লোকটাকে অনেকেরই চেনার কথা। অভিনেতা হিসেবে দক্ষিণে তিনি অনেকই পরিচিত। ডাকনাম লাল। আসল নাম এমপি মাইকেল। কোচিতে জন্ম এ অভিনেতার নাম ‘হেরা ফেরি’র লেখক হিসেবে স্পষ্টই দেয়া আছে সিনেমার পরিচিতিতে। মূলত সিদ্দিকের সঙ্গে মিলে তিনিই লিখেছিলেন রামজি রাও স্পিকিং। দুজনের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল প্রায় একই সময়। সিদ্দিক ইসমাইল তার ক্যারিয়ার শুরু করেন নির্মাতা ফাজিলের (ফাহাদ ফাসিলের বাবা) সহকারী হিসেবে। এ সময় লালের সঙ্গে তার পরিচয়। জমে যায় দুজনের রসায়ন। সিদ্দিক ও লাল জুটি হিসেবে বেশকিছু সিনেমায় কাজ করেছেন। টানা পাঁচ বছর, পাঁচটি ব্লকবাস্টার উপহার দিয়েছিলেন তারা। কমেডিকে উপস্থাপন করেছিলেন নতুন করে। সিদ্দিক-লাল জুটিকে তুলনা করা যায় বলিউডের সেলিম-জাভেদের সঙ্গে।
সিদ্দিক ও লাল তাদের ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৮৬ সালে। দুজনেই ছিলেন নির্মাতা ফাজিলের সহকারী। এ সময়ই আড্ডার মধ্য দিয়ে সিনেমা নিয়ে তাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার শুরু। তারা নিজেদের মতো করে সিনেমা নির্মাণের চিন্তা করেন। ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ে ১৯৮৯ সালে। সে বছরই মুক্তি পায় তাদের প্রথম সিনেমা ‘রামজি রাও স্পিকিং’। এরপর টানা পাঁচ বছরে পাঁচটি সিনেমা করেন তারা। গল্প সিদ্দিক-লাল। নির্মাতা হিসেবে নাম বেশির ভাগ সময় সিদ্দিকেরই থাকত। তাদের পরবর্তী সিনেমাগুলো ছিল: ইন হরিহর নগর (১৯৯০), গডফাদার (১৯৯১), ভিয়েতনাম কলোনি (১৯৯২) ও কাবুলিওয়ালা (১৯৯৩)। সে সময়ের মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রি বর্তমান দক্ষিণ ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রির মতো এত জমকালো ছিল না। শত কোটি রুপির ব্যবসাও হতো না। কিন্তু সময়ের হিসেবে এ পাঁচ সিনেমার প্রতিটিই ছিল হিট। একটি উদাহরণ দিলেই সেটা বোঝা যাবে। রামজি রাও স্পিকিংয়ের সুতো ধরেই এত বছর পর আবার হেরা ফেরির সিকুয়াল নির্মাণের কথা চলছে।
সিদ্দিক-লালের সিনেমার কিছু বিশেষত্ব ছিল। খুব সাবলীলভাবে কমেডিকে তারা উপস্থাপন করেছিলেন দৈনন্দিন বাস্তবতার পাশে। লালের সঙ্গে মিলে সিদ্দিক দেখিয়েছিলেন, সিনেমায় খুব বেশি কিছু আনতে হয় না। বিশেষত কমেডির ক্ষেত্রে গল্পের চরিত্র অনুসারে লেখকরা ঠিক লেখাটা আনতে পারলে তা মজাদার হয়ে ওঠে। আজকের দিনে এসে হেরা ফেরি আরেকবার দেখলেও এ কথাই মনে হবে। তাদের সিনেমায় কমিক টাইমিংও নতুন ধারায় এসেছিল। এর চেয়ে বড় কথা, তারা কেরালার সংস্কৃতি ও চলতি অবস্থার বিষয়গুলোও সিনেমায় রেখেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল বেকারত্ব। আশির দশকের শেষে বিষয়টি প্রকট হয়েছিল। তারা কমেডিতেও বিষয়টি এনেছিলেন, যা মানুষের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। দর্শকদের চাহিদা বুঝতে পেরেছিল এ জুটি। এছাড়া চিত্রনাট্যে গতি থাকত, দর্শক মিস করতে চাইত না ও চাইলেও পারত না।










