একটি বংশ। গল্পটি যখন বলা হচ্ছে বংশের চার পুরুষ তখন জীবিত। জীবিত প্রথম পুরুষ ও চতুর্থ পুরুষ এমন একটি অবস্থানে উপনীত যে উভয়কে শিশু বলা চলে। বংশটি শাখ-প্রশাখা ছড়িয়ে পরিণত হয়েছে একটি বৃহৎ পরিবারে। সে পরিবারের কর্মী পুরুষটির নাম আনন্দমোহন মজুমদার। অবসরপ্রাপ্ত শিল্পপতি আনন্দমোহনের চার সন্তান নিয়ে বংশটি শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়েছে। বংশটি মূলত তৃতীয় প্রজন্মে এসে ছড়িয়ে পড়েছে নানা স্থানে। আনন্দমোহনের চার সন্তানের তিনটি বিভিন্ন স্থানে থাকে। প্রথমটি বড় চাকুরে, দ্বিতীয়টি দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে, তৃতীয়টিও চাকুরে কিন্তু রগচটা। চতুর্থটি অনেকটাই আদর্শবাদী ও রোমান্টিক। আনন্দমোহনের হঠাৎ অসুস্থতায় তার সন্তানেরা একত্র হয়। একত্র হয় মূলত বহু মত। আর একুশ শতকের বদলে যাওয়া জীবন ও মত নিয়েই সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেছিলেন ‘‌শাখা-প্রশাখা’।

চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় বহুল চর্চিত। এ শতকে এসে তাকে নিয়ে চর্চা আরো বেড়েছে। তবে সে চর্চার কেন্দ্রে থাকে তার পথের পাঁচালী। এরপর আসে অপুর সংসার ও অপরাজিত। পথের পাঁচালী ভারতীয় সিনেমার বাঁক বদলের প্রথম কাণ্ডারি, সন্দেহ নেই। তবে অন্য দুটো সিনেমা বর্তমানে আলোচিত এর কিছু ‘‌অ্যাস্থেটিকস’ নিয়ে। পাশাপাশি এমন এক প্রেম অপুর সংসারে সত্যজিৎ এনেছিলেন, যা আজ অনেকটা রূপকথার মতো। কিন্তু সিনেমার মূলের দিকে খুব একটা যাওয়া হয় না। অবশ্য না গেলেও ফেলুদা থেকে শুরু করে দেবী, চারুলতা, অশনি সংকেত নিয়েও আলোচনা হয়; কিন্তু আড়ালে পড়ে যায় নব্বইয়ের আশপাশে নির্মিত তার সিনেমাগুলো, যাতে আছে স্পষ্ট কিছু বক্তব্য। এমনই সিনেমা ‌শাখা-প্রশাখা।

সিনেমার নামটি সত্যজিৎ রায় নিশ্চিত একটি বংশের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃতিকে বুঝিয়েছেন। একুশ শতকের মূল কয়েকটি সম্ভাবনাকেও তিনি দেখিয়েছিলেন সিনেমায়। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল দ্রুতগতির জীবন ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা। সিনেমায় আমরা দেখি আনন্দমোহনের (অজিত ব্যানার্জি) তিন পুত্র বাবার অসুস্থতার খবর শুনে বাড়ি এলে ডাক্তারের কাছে জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রবোধ (হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়) জানতে চাইছে কতদিনে একটা জবাব পাওয়া যাবে। কেননা তার অফিসের একটা ব্যাপার আছে। ১৯৯০ সালের আশপাশে এমন জীবন তৈরি হয়নি, কিন্তু চিত্রটি আমরা এ শতকে অহরহ দেখতে পাই। বিশ শতকের শেষে ‘‌ভিশনারি সত্যজিৎ’ সেটি দেখেছিলেন।

সিনেমাটিতে সত্যজিৎ দেখিয়েছিলেন আরো কিছু বাস্তবতা। যেমন এ সিনেমায় আনন্দমোহন একজন সৎ ও কর্মঠ কর্মী। ওরিয়েন্ট মাইকা ওয়ার্কসের জেনারেল ম্যানেজার কাম পার্টনার আনন্দমোহন সম্পর্কে জানতে এলে প্রতিবেদককে (প্রদীপ মুখার্জি) প্রবোধ জানায়, তার বাবার কাজকে মূল্য দিয়েছিল সাহেবরা। তাই দ্রুতই উন্নতি করেছিলেন তিনি। সে উন্নতির প্রসাদ তিনি ছড়িয়েছিলেন নিজের অঞ্চলে। প্রবোধের ভাষায়, ‘‌এখানকার স্কুল তার তৈরি, হাসপাতাল তার তৈরি, চিলড্রেনস পার্ক তার তৈরি এবং লেবার ওয়েলফেয়ার যা কিছু হয়েছে সব তার জন্য। শ্রমিকরা এখনো তাকে দেবতার মতো ভক্তি করে।’ প্রবোধ নিজেই জানাচ্ছেন, তার বাবার ছিল অমিত প্রতিভা আর পরিশ্রম করার ক্ষমতা। কিন্তু সে গুণ তার পুত্রদের ওপর বর্তায়নি। সিনেমার একপর্যায়ে সত্যজিৎ দেখান, প্রবোধ নিজে একজন অসৎ কর্মকর্তা। খাবার টেবিলে সে কথা জানায় ছোট ভাই প্রবীর মজুমদার (দীপংকর দে)। সেখানে প্রবীরই জানায়, ‘‌দু নম্বরী ছাড়া আজকাল কেউ মাথা উঁচু করে চলতে পারে না।’

বিশ শতকের শেষ দশকে প্রবেশ করার আগেই সত্যজিৎ বুঝেছিলেন, পরবর্তী শতকে মানুষের নীতি (ভ্যালুজ) বদলে যাবে। এ সিনেমায় সে বিষয়ই এসেছে। সে কারণেই আনন্দমোহন একদিন তার নাতি দীপায়নের (ডিঙ্গো ডাকনামে সোহম চক্রবর্তী) মুখে শোনেন যে সেও দু নম্বরী জানে। আনন্দমোহনের পুরো জীবনের দর্শনই যেন সে সময় ভেঙে পড়ে। কিন্তু তিনি জানতে পারেন না তারই তৃতীয় পুত্র প্রতাপ (রঞ্জিত মল্লিক) চাকরি ছেড়ে দিয়েছে খুব কাছের মানুষের দুর্নীতির প্রতিবাদে। আনন্দমোহন কেবল জানেন, তার সবচেয়ে মেধাবী পুত্র প্রশান্ত (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) তার জায়গাটি নিতে পারত, কিন্তু নিয়তি তা দেয়নি।

গল্প, দর্শন ও ভবিষ্যতের ভাবনা ছাড়াও ‘‌শাখা-প্রশাখা’র মধ্য দিয়ে সত্যজিৎ রায় দর্শকের সামনে এনেছিলেন বাখ, বেটোভেনের সংগীত এমনকি গ্রেগোরিয়ান চ্যান্ট। এ সিনেমায় প্রশান্ত গভীর রাতে বাখ শোনে। পাশাপাশি সিনেমায় এসেছে সত্যজিৎ রায়ের বেশকিছু সিগনেচার ইস্যু। আনন্দমোহনের পিতা অভয়চরণ মজুমদার (প্রমোদ গাঙ্গুলী) থেকে দীপায়ন মজুমদার পর্যন্ত চার পুরুষের চিত্র আগেও তিনি রেখেছেন ‘‌জয় বাবা ফেলুনাথ’ সিনেমার ঘোষাল পরিবারের মধ্যে। কোনো না কোনোভাবে এটি তার নিজের বংশের (উপেন্দ্রকিশোর থেকে যার শুরু) রেফারেন্স।

‘‌শাখা-প্রশাখা’য় প্রতিটি দৃশ্য ও চরিত্রের কোনো না কোনো দর্শন আছে যা সত্যজিৎ এনেছেন ১৯০ মিনিটের এ সিনেমায়। সহজ দৃষ্টিতে চার পুরুষ ও তাদের নিয়ে তৈরি শাখা-প্রশাখার এ গল্প তাই হয়ে ওঠে মানুষের জীবনযাপন, জীবনদর্শন ও আসন্ন জীবনের কতগুলো সম্ভাবনার একটি দর্শন।