অস্কারের রাত স্বপ্নের আর স্বপ্নভঙ্গের। তবে এবার স্বপ্ন পূরণ হলো অনেকেরই। মজার ব্যাপার, যারা অস্কার পেয়েছেন কেবল তাদের নয়, তাদের ভক্ত এমনকি সাধারণ দর্শকেরও ইচ্ছাপূরণ হয়েছে গত রাতে। কেননা এবার অস্কারে সেরা পরিচালকের পুরস্কারটি উঠেছে ক্রিস্টোফার নোলানের হাতে। সেরা অভিনেতা কিলিয়ান মারফি। সেরা পার্শ্ব অভিনেতা রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। সব মিলিয়ে সাতটি অস্কার গেছে ওপেনহাইমারের ঘরে। নোলানের এত বছরের সিনেমা সাধনা আর সিনেমাযাত্রার এক মহান স্বীকৃতিই হয়ে থাকল ৯৪তম অস্কার। কিছু প্রশ্ন অবশ্য উঠেছে প্রতিবারের মতোই। তবে সেদিকে যাওয়ার আগে তাকাতে হয় অস্কারের এবারের পুরস্কারের তালিকায়।

৯৬তম অস্কারে কমিটি এবার সেরা সিনেমা নির্বাচন করেছে ওপেনহাইমারকে। একই সঙ্গে সেরা পরিচালকের পুরস্কার ক্রিস্টোফার নোলানের। সেরা অভিনেতা কিলিয়ান মারফি। অর্থাৎ অস্কারের যে প্রধান চারটি পুরস্কার—সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রী—তার তিনটিই পেয়েছে ওপেনহাইমার। এছাড়া সেরা পার্শ্ব অভিনেতা, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি, অরিজিনাল স্কোর ও সম্পাদনার পুরস্কারটিও জিতেছে ওপেনহাইমার। অর্থাৎ একটা সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেই পুরস্কার জিতেছে সিনেমাটি।

তবে চমক দিয়েছেন এমা স্টোন। ‘পুওর থিংস’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারটি জিতে নিয়েছেন তিনি। পুওর থিংস ও এমা স্টোন নিয়ে আলোচনা উঠেছিল সম্প্রতি। এ নিয়ে শুরু থেকে তেমন কোনো জল্পনা-কল্পনা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই জিতে নিলেন অস্কার।

ক্রিস্টোফার নোলান অস্কারের যোগ্য—এ কথা সিনেমা অঙ্গন ও সিনেমাপ্রেমীরা এক বাক্যে স্বীকার করে। সিনেমাটোগ্রাফি, চরিত্রচিত্রণ থেকে শুরু করে সিনেমাকে শৈল্পিক করে তুলতে কোনো কসুর করেন না এ পরিচালক। তার সিনেমা একদিকে বাণিজ্যিক ধারার এবং অন্যদিকে তিনি সিনেমায় সিনেমাটিক জার্নিও রেখেছেন। নোলানের সিনেমার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য তিনি প্রযুক্তি দিয়ে সিনেমার শিল্প নষ্ট করেন না বরং সিনেমাকে সাজিয়ে তোলেন। সে জায়গা থেকে তিনি সিনেমাকে একটি নতুন দিগন্তে নিয়ে গেছেন।

ওপেনহাইমার অস্কার পাওয়ার পেছনে কাজ করেছে বেশকিছু কারণ। প্রথমত নোলানের সিনেমাযাত্রা। দ্বিতীয়ত, গত বছর ওপেনহাইমার তুলেছিল বিস্তর আলোচনা। দর্শক থেকে শুরু করে সাধারণ ও বৃহত্তর মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। সে কারণে সিনেমাটিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

এরপর আসে কিলিয়ান মারফির কথা। তিনি এ সিনেমার জন্য নিজেকে কতটা বদলে ফেলেছেন, তা সিনেমা নিয়ে যারা খোঁজ রাখেন সবারই জানা। নোলানের মতো মারফিও এর দীর্ঘ যাত্রা করেছেন। ওপেনহাইমারের অন্যতম এক্স ফ্যাক্টর তিনি। সেরা অভিনেতার পুরস্কার হাতে অস্কারের মঞ্চে উঠে মারফি বলেন, ‘যে মানুষ পারমাণবিক বোমা বানিয়েছিল, আমরা তাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছি। ভালো না মন্দ সে তর্ক রেখে একটা বিষয় মানতেই হবে, আমরা ওপেনহাইমারের দুনিয়ায় বাস করছি।’

এ বিষয়ে এসেই অস্কারের তর্কটা চলে। ওপেনহাইমারকে অনেকেই প্রপাগাণ্ডা সিনেমা বলছেন। এমন একটি সিনেমার অস্কার পাওয়া নিয়েও তাই বিতর্ক হচ্ছে। আর এ বিতর্কের কারণে মার্টিন স্করসেসির ‘‌কিলার্স অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’-এর মতো মানবতাবাদী সিনেমাকে পাশ কাটিয়ে পুরস্কার দেয়া হলো ওপেনহাইমারকে।

কিন্তু অন্যদিক থেকে বিবেচনা করতেই হয়। ওপেনহাইমার এমন একটা সিনেমা, যা তিনজনকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। মারফির সঙ্গে আছেন রবার্ট ডাউনি জুনিয়রও। ‘‌আয়রনম্যান’সহ তার অন্যান্য লঘু ধারার অভিনয় থেকে নিজেকে বের করে এনেছেন এ অভিনেতা। নোলানও মূলত তার ধারার সিনেমায় থেকেও ওপেনহাইমারে ভেঙেছেন নিজেকে।   

এক্সপেরিয়েন্সেও তিনি যুক্ত করেছেন নতুন মাত্রা। সব মিলিয়ে এবারের অস্কারে অন্য কোনো সিনেমাকে সামনে আনার সুযোগ ছিল না।

যেটুকু ছিল তা একাডেমি দিল এমা স্টোনকে। তাকে তার অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রী নির্বাচন করেছে তারা। এমা তার অস্কার জয়কে দেখছেন সবার জয় হিসেবে। তিনি বলেন, ‘সিনেমার সবচেয়ে ভালো দিক হলো আমরা সবাই একসঙ্গেই আছি। আমি অত্যন্ত আনন্দিত এ পুরস্কার পেয়ে এবং পুরস্কারটি আমি ভাগ করে নিতে চাই সিনেমার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষের সঙ্গে।’

বেশকিছু গণমাধ্যম অস্কারকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলছে, একাডেমির একটি প্যাটার্ন আছে। তারা যে সিনেমাকে পছন্দ করে সেটিকে পারলে সব বিভাগেই পুরস্কার দেয়। এবার তা হয়েছে ওপেনহাইমারের ক্ষেত্রে। এতসবের মধ্যেও অস্কার কমিটি মনে রেখেছে হায়াও মিয়াজাকিকে। ‘‌দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন’ জিতেছে সেরা অ্যানিমেটেড ফিল্মের পুরস্কার। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফিচারে সেরা হয়েছে যুক্তরাজ্যের ‘‌দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’ এবং সেরা গানের জন্য বারবি থেকে পুরস্কার জিতেছেন বিলি আইলিশ ও িফনিয়েস ও’কনেল।

এক নজরে

সেরা সিনেমা

ওপেনহাইমার

সেরা পরিচালক

ক্রিস্টোফার নোলান

সেরা অভিনেতা

কিলিয়ান মারফি

সেরা অভিনেত্রী 

এমা স্টোন

সেরা পার্শ্ব অভিনেতা

রবার্ট ডাউনি জুনিয়র

সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী

ডা ভিনে জয় রÅvনডল্ফ

সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য 

অ্যানাটমি অব ফল 

সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার

দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট

সেরা সিনেমাটোগ্রাফি

ওপেনহাইমার

সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার

দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন