কিছু সিনেমা গল্পের জন্য দেখা যায়। কিছু সিনেমা থাকে যার সংগীত অসাধারণ। বাণিজ্যিক সিনেমা দেখার অন্যতম কারণ স্টার পাওয়ার। কিন্তু এর বাইরেও কিছু সিনেমা থাকে, দেখে শান্তি পাওয়া যায় বলে দেখা যায়। পুরোটা সময় পর্দায় দারুণ সব দৃশ্য দেখা যায়। কখনো তা শিল্প নির্দেশক বানিয়ে দেন, কখনো শুট করা হয় সত্যিকার লোকেশনে। তা যা-ই হোক না কেন, দৃশ্যে কবিতা তৈরি করে এসব সিনেমা। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া মার্টিন ম্যাকডনার ‘দ্য ব্যানশিস অব ইনিশেরিন’ এ ধারার সিনেমা।
কবিতা বলতে খানিকটা গম্ভীর মনে হলেও মার্টিনের সিনেমাটিতে আছে সূক্ষ্ম হাস্যরস। তবে তা কেবল রসিক ও সিনেমার নিয়মিত দর্শকদের চোখে পড়বে।
সিনেমাটি নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, আয়ারল্যান্ডের ইনিশেরিন দ্বীপটি বাস্তব বিশ্বের কোনো মানচিত্রে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভৌেগালিকভাবে এর অস্তিত্ব রয়েছে। তা থাকুক বা না থাকুক, এ দ্বীপে কিছু মানুষ আছে আর ম্যাকডনা তাদের নিয়ে তৈরি করেছেন একটি গল্প। সিনেমার শুরুতেই আমরা কিছু সুন্দর দৃশ্যের অভিজ্ঞতা পাই। দ্বীপটিকেই হয়তো পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন পরিচালক। সেখানে সবুজের মধ্যে সমুদ্র আর পাথরের দেখা পাওয়া যায়। প্রকৃতির শব্দ দিয়েই সিনেমা শুরু হয়। পর পরই এর প্রধান দুই চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়—প্যাড্রেইক ও কোম। সিনেমার পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যকার দূরত্ব, কথোপকথন ও মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে গল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন মার্টিন।
সিনেমায় কোম ও প্যাড্রেইক দুই বন্ধু। অসমবয়সী দুই ব্যক্তির জীবন ও মতাদর্শের পার্থক্যই সিনেমাকে সামনে নিয়ে যায়। ১৯২৩ সালে কাল্পনিক দ্বীপেও পৌঁছে যাচ্ছিল আইরিশ গৃহযুদ্ধের গুঞ্জন। বিষয়টি প্রকাশে কুশলতার সাহায্য নিয়েছেন নির্মাতা। সিনেমায় আইরিশ সংকটের পরিস্থিতিটি সমুদ্রের ঢেউ ও বাতাসের শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর বাইরে সিনেমায় কথোপকথনের একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। চরিত্রগুলোর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তাদের মনের ভাব, দ্বীপের পরিস্থিতির খোঁজ দিয়েছেন নির্মাতা। সেখানে কখনো দেখা যায় তাদের মধ্যে চলছে বাদানুবাদ, কখনো গভীর কোনো দর্শন। কথোপকথনের মধ্য থেকে সারবত্তা বের করে নিতে হলে অবশ্য আইরিশ ইতিহাস, বিশ্বসাহিত্য ও ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে জানাশোনা থাকা জরুরি।
এরপর স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন আসবে—সিনেমার মূল গল্পটা আসলে কী? সেক্ষেত্রে স্মরণ করিয়ে দেয়া বাহুল্য হবে না যে শুরুতেই বলা হয়েছে, এতে নিরেট একটা গল্প নেই। আবার না থাকলেও আছে। সহজ করে বললে দ্বীপের মানুষ ও তাদের জীবনযাপনই এ সিনেমার গল্প। যেখানে বেলা দুটোর সময় একটি শুঁড়িখানায় দুজন অসমবয়সী মানুষ বসে মদ্যপান করতে করতে নানা কথা বলে। এর বাইরে পাওয়া যায় আরো কিছু মানুষকে। যেমন প্যাড্রেইকের বোন শিভন। প্যাড্রেইকের সংসারে সে-ই মোটামুটি কর্ত্রী। এছাড়া আছে ডমিনিক, পশুপাল চরানো যার কাজ। অকারণ কথা বলে সময় কাটায় সে। আর তার বাবা এক পুলিশ, যার দিন কাটে মদ্যপানের মধ্য দিয়ে।
সিনেমার ফটোগ্রাফি অসাধারণ। দ্বীপ, সমুদ্র, দ্বীপের মানুষের ঘরবাড়ি, গির্জার দৃশ্যায়ন যেভাবে করা হয়েছে, তা দর্শককে আটকে রাখে। এর বাইরে বেশকিছু দৃশ্য আছে, যা ছবি তুলে রাখার মতো। যেমন একটি দৃশ্যে কোম ঘরে বসে থাকে আর জানালা দিয়ে প্যাড্রেইক তাকায়। এছাড়া কোম ও প্যাড্রেইকের সমুদ্রের তীরে বসে পান করার দৃশ্যটিও চোখে ধরে রাখার মতো। সিনেমাটোগ্রাফিও ততোধিক সুন্দর। একতলা বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যখন পেড্রেইক দুধের জার নিয়ে যায় কিংবা বাতাসে শিভনের স্কার্ফ উড়তে থাকে, সে দৃশ্যগুলো দর্শককে মোহিত করবে। এর বাইরে একটা প্রশ্ন আসবে, কোমের সমস্যা কী? উত্তরে বলা যায়, দ্বীপের অন্যান্য বাসিন্দার তুলনায় কোম একটু বেশি বাস্তব।
অভিনয়ে কলিন ফ্যারেল ও ব্রেন্ডন গ্লিসেন রীতিমতো একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন। তাদের বন্ধুত্ব ও দ্বিমত এ সিনেমার দর্শনীয় অংশ। এর বাইরে ডমিনিক চরিত্রে ব্যারি কিয়োগানও দারুণ অভিনয় করেছেন। যদিও তার চরিত্রের বিস্তার বেশি ছিল না। কেরি কনডনের অভিনয়ও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে খোদ ইনিশেরিন। ওই দ্বীপের সবুজ আর সমুদ্রের সুরে একাকিত্ব আছে। সিনেমার বহু সংলাপের মধ্যে সে নৈঃশব্দ্যের বার্তা দেয়।










