সুরের ভুবনে এক অনন্য নাম: ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা’ ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে এ গান আজও নদীমাতৃক বাংলাদেশের সুর হয়ে বয়ে চলে। কিন্তু সে কণ্ঠস্বর আজ চিরতরে স্তব্ধ। গত শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। বাংলাদেশের লোকসংগীত, বিশেষ করে লালনসংগীতের সঙ্গে তার নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে।

লালনের গানেই জীবনের পথচলা: স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ার দোলপূর্ণিমার এক মহাসমাবেশে প্রথমবারের মতো লালনের গান পরিবেশন করেছিলেন ফরিদা পারভীন। গানটি ছিল ‘সত্য বল সুপথে চল।’ সেই মুহূর্তে শ্রোতার আবেগ আর উচ্ছ্বাস তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, এ পথেই তার জীবনযাত্রা। শুরুতে অনীহা থাকলেও বাবার উৎসাহে মকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনের গান শেখা শুরু করেন তিনি। পরে খোদা বক্স সাঁই, করিম সাঁই, ব্রজেন দাসসহ গুরুপরম্পরার সাধকদের কাছ থেকে তালিম নেন। তার কণ্ঠে লালনের গান হয়ে ওঠে শুধু সংগীত নয়, বরং এক গভীর জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বমঞ্চে লালনের সুর: শুধু বাংলাদেশেই নয়, ফরিদা পারভীন লালনের গান পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে তার কণ্ঠে বেজেছে লালনের দর্শন। ২০০১ সালে ‘ফরিদা পারভীন প্রজেক্ট কমিটি’র উদ্যোগে তিনি জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লালনের গান পরিচয় করিয়ে দেন। পরে গড়ে তোলেন ‘ফরিদা পারভীন ট্রাস্ট’, যার লক্ষ্য ছিল লালনের গান সংরক্ষণ, স্বরলিপি তৈরি ও বাদ্যযন্ত্রের আর্কাইভ গড়ে তোলা।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা: ফরিদা পারভীনের জন্ম নাটোরের সিংড়ায়। বাবার বদলির চাকরির কারণে শৈশব কেটেছে মাগুরা ও কুষ্টিয়ায়। মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সে গান শেখা শুরু করেন তিনি। প্রথম ওস্তাদ ছিলেন কমল চক্রবর্তী। মা তাকে কোলে নিয়ে গান গাইতেন, সেই সুরের অনুরণন সারা জীবন তার ভেতর বেজেছে। যদিও জন্ম নাটোরে, বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায় বলেই অনেকে তাকে কুষ্টিয়ার মেয়ে মনে করতেন।

ব্যক্তিজীবন: ব্যক্তিজীবনে ফরিদা পারভীন একসময়ের জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার আবু জাফরের স্ত্রী ছিলেন। তাদের সংসারে এক মেয়ে ও তিন ছেলে। আবু জাফরের লেখা ও সুর করা বহু গান তার কণ্ঠে অমর হয়ে আছে, যেমন ‘এই পদ্মা এই মেঘনা,’ ‘তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম,’ ‘নিন্দার কাঁটা।’ যদিও দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ ঘটে, তবু গানই ছিল তার চিরসঙ্গী। ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

শেষ সময়ের লড়াই: দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ফরিদা পারভীন। সপ্তাহে দুদিন তাকে ডায়ালাইসিস করাতে হতো। ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর অবস্থার অবনতি হয়। গত বুধবার থেকে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও শনিবার রাতে তিনি মারা যান।

শেষ শ্রদ্ধা ও চিরবিদায়: গতকাল হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ প্রথমে নেয়া হয় তেজকুনীপাড়ার বাসায়। সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে মরদেহ কুষ্টিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাদ মাগরিব চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাকে।

সংগীতাঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি: ফরিদা পারভীনের প্রস্থান শুধু সংগীতাঙ্গনের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন গানের মাধ্যমে লালনের দর্শন ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার এক অনন্য সাধক। তার কণ্ঠ, তার সুর, তার অবদান—সবকিছুই প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে।

সৈয়দ আব্দুল হাদী

ফরিদা আমাদের বাংলা গানের, বিশেষ করে লালনগীতির একজন অত্যন্ত গুণী শিল্পী ছিলেন। তার বিশেষ অবদান লালনসংগীতকে আমাদের দেশে এবং দেশের বাইরে পরিচিত ও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। প্রত্যেক গুণী শিল্পীর প্রয়াণই একটি ক্ষতি, কিন্তু তার প্রয়াণে বিশেষভাবে লালনসংগীতের জগতে এক বড় শূন্যতা তৈরি হলো। ব্যক্তিগতভাবে ফরিদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই স্নেহময় ছিল। তিনি আমাকে বড় ভাইয়ের মতো দেখতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। তার মৃত্যুতে আমার মনে হয়েছে একজন প্রিয় ছোট বোনকে হারালাম।

সাবিনা ইয়াসমিন

ফরিদা পারভীনের চলে যাওয়ার খবর আমাকে এতই শোকাহত করেছে যে সত্যিই কিছু বলার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এমন একজন শিল্পীর জন্ম পৃথিবীতে খুব কমই হয়। আমি ভীষণ মর্মাহত। ফরিদা পারভীন সেই শিল্পী, যিনি লালনসংগীতকে শুধু আমাদের দেশে নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। তার এ অবদান সত্যিই অমূল্য। পৃথিবীর যেখানেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আছে, তাদের মনে তার গান অনন্য ছাপ রেখে গেছে। আমাদের দেশের লালনের গানকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচিত করানো কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি একটি বিশাল অবদান।

আলিফ আলাউদ্দিন

আসলে কী বলব। ফরিদা পারভীন বাংলা লোকসংগীত, বিশেষ করে লালনের গান বছরের পর বছর ধরে গভীর নিষ্ঠা আর মমতায় ধারণ করেছেন, পরিবেশন করেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তিনি লালনের দর্শন ও গানকে সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন। তার কণ্ঠের দরদ, অভিব্যক্তির শক্তি এবং আন্তরিকতা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। সত্যিকার অর্থেই সংগীতজগতে, বিশেষ করে লোকসংগীতের অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য গভীর বেদনার, তবে তার গানে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তার আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি।

মৌসুমী আক্তার সালমা

আমাদের সংস্কৃতির এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। আমরা একজন অভিভাবক ও লালন সাধককে হারালাম। আমার সঙ্গে তার মাতৃতুল্য সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, তার সঙ্গে একই মঞ্চে ও টিভিতে গান গাওয়ার। ছোটবেলায় ফরিদা ম্যামের কণ্ঠে লালন শাহর গান শুনেই লালনসংগীতের প্রতি আমার ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল। এমন একজন অভিভাবককে হারানো সত্যিই অপূরণীয় ক্ষতি। যদি তিনি আরো কিছু সময় আমাদের মাঝে থাকতেন, তবে তার কাছ থেকে আরো অনেক কিছু শেখার সুযোগ ছিল।

সোমনুর মনির কোনাল

ফরিদা পারভীনের অসুস্থতার কথা কয়েক মাস ধরে শুনতে পাচ্ছিলাম। অসুস্থতার সময় আমি ও আমার পরিবার যতটুকু সম্ভব খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করেছি। তিনি শেকড়, মাটি আর মানুষের গান করতেন। তার গানের যেমন চমৎকার ফিলোসফি ছিল, তেমনি তার জীবনের সুন্দর কিছু দর্শনও ছিল। চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে তাকে জানার সুযোগ হয়েছিল। তিনি আসলেই একজন মাটির মানুষ ছিলেন। লোকগান কিংবা লালন যা-ই করতেন, একনিষ্ঠভাবে করতেন। আমাদের জন্য তার চলে যাওয়া একটা বড় দুঃসংবাদ এবং সংগীতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

সাইফ শুভ

ফরিদা পারভীনের চলে যাওয়া বাংলা সংগীতাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ২০০৫ সালে তার সঙ্গে একই মঞ্চে আমার প্রথম গান করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার আশীর্বাদের স্মৃতি আজও আমার কাছে উজ্জ্বল ও নতুন মনে হয়। তিনি ছিলেন শুদ্ধ লালন দর্শন ও গানকে জীবন্ত করে তোলার এক অনন্য সাধক এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। তার কণ্ঠে ছিল গভীরতা, সরলতা ও সত্যের স্পর্শ, যা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এবং সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান অপরিসীম।