মারা গেছেন মহীনের ঘোড়াগুলির তাপস দাস। সবার কাছে তিনি বাপীদা নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে বিদায় নিলেন এ পৃথিবী থেকে। ১৯৫৪ সালে জন্ম নেয়া তাপস দাস ছিলেন মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ব্যান্ডের শুরু থেকে যুক্ত থাকার কারণে তাকে ‘মহীনের আদি ঘোড়া’ নামেও ডাকা হয়।
ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তাপস দাস। বহুদিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু অন্য বহু শিল্পীর মতো তার জীবনেও ছিল অর্থাভাব। উপযুক্ত ও দীর্ঘ চিকিৎসায় তাই বাধা এসেছিল বারবার। তবু তিনি লড়ে গেছেন তেজি ঘোড়ার মতো। ক্যানসারের তৃতীয় স্টেজে ছিলেন। এর মধ্যে নানাভাবে তাকে সাহায্য করেছেন বাংলা ব্যান্ডের অন্য শিল্পীরা। তাদের বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরে ‘বাপীদা’ আবার হেঁটেছেন। তবে বেশিদূর সম্ভব হলো না। গতকাল সকালে এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এ শিল্পী। তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন গায়ক রূপম ইসলাম। তাপস দাসের সঙ্গে আলাপচারিতার ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘এ রকম কত বাঙ্ময় মুহূর্তই রয়ে গেল শুধু... সচল হয়েই থেকে গেল গানজীবনের অনন্ত পথ চলা... থেমে গেল বললে ভুল হবে, মারাত্মক ভুল... বাপীদা—সশরীরে তুমি আর নেই—কিন্তু সর্বত্র এভাবেই তুমি থাকবে।’
নারায়ণ চন্দ্র দাস ও জ্যোৎস্না দাসের চতুর্থ পুত্র তাপস দাস। তারপর একসময় বন্ধু ও ভক্তদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাপীদা। অল্প বয়স থেকেই সংগীতের জগতে তার যাত্রা। তিনি তার মা জ্যোৎস্না দাসকে প্রথম গুরু বা শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করতেন। গিটারে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষা নেননি। স্বশিক্ষিত গিটারবাদক তাপস দাস। কলেজ জীবনে গিটারের সঙ্গে তার সখ্যতা তৈরি হয়। এরপর তিনি পরিচিত হন মহীনের ঘোড়াগুলির ঘোড়াদের সঙ্গে। ১৯৭৫ সালে গৌতম চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ চ্যাটার্জি, রঞ্জন ঘোষাল, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়, আব্রাহাম মজুমদার ও তপেশ বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র অংশ হন তাপস দাস। তারপর দীর্ঘ পথচলা।
মহীনের ঘোড়াগুলি শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের শেষ বছর সারা রাত শাস্ত্রীয় সংগীত শুনে বেড়িয়েছিলেন তারা। ঘন কুয়াশায় ময়দানে হাঁটছিলেন ব্যান্ডের সদস্যরা। তখনো অবশ্য ব্যান্ড হয়নি। সেই সকালেই ‘ভেসে আসে কলকাতা/কুয়াশা তুলিতে আঁকা...’ লেখা হয়ে যায় তাপস দাসের মাথায়। সেখান থেকে রঞ্জন ঘোষালের বদলে নেয়া ‘গুলতি ছোঁড়া ঘুরি ওড়া আগস্ট দুপুর কে দেবে ফিরে...’ নিয়ে তৈরি হয়েছিল মহীনের ঘোড়াগুলির প্রথম গান। তারপর দুই দশক ঘোড়ার মতোই দাবড়ে বেড়ানো। মহীনের ঘোড়াগুলির বহু গান এখনো জনপ্রিয় আর তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তাপস দাস।
ক্যানসার তাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে বারবার। কিন্তু গান ছাড়েননি তিনি। মহীনের ঘোড়াগুলির পর ২০১৫ সালে শুরু করেন ‘মহীন এখন ও তার বন্ধুরা’ নামে একটি ব্যান্ড। তিনি মনে করেন মহীনের ঘোড়াগুলি নাম ব্যবহার এখন কেবল ব্যবসার জন্য হতে পারে। তাই ব্যান্ডের প্রতি সম্মান থেকে মহীনের নাম যুক্ত করে নতুন ব্যান্ডের ভিন্ন নাম দিয়েছেন। একই বছর পাঁচটি গানের একটি ইপি অ্যালবাম প্রকাশ করা হয় এ ব্যান্ড থেকে। এর সঙ্গে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’কে ট্রিবিউট করেও একটি অ্যালবাম করেছেন তিনি।
২০১১ সালে একটি দুর্ঘটনায় পা প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে তাপস দাসের। এরপর ক্যানসার। তবু গানের সঙ্গ তো তিনি ছাড়বেন না। কয়েক মাস আগেও স্টেজে উঠেছেন। সংগীত মেলায় গেয়েছিলেন ‘ভালোবাসো’। দর্শক একাত্ম হয়েছিল তার গায়কিতে। রূপম ইসলাম ঠিকই বলেছেন, তাপস দাস মারা গেলেও বাপীদা থাকবেন সর্বত্র।










