আমরা নানা সময়ই দুর্ঘটনার খবর পাই। এর কোনোটা প্রাকৃতিক আর কোনোটা মানবসৃষ্ট। শিল্প বিল্পবের পর থেকে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে অনেক বেশি। এতে ক্ষতি হয় প্রকৃতির আর আহত হয় বিপুলসংখ্যক মানুষ। প্রতিদিন খবরের কাগজে এমন নানা ঘটনার খবর আসে। কিন্তু এর পেছনে থাকা মানুষ সম্পর্কে জানা যায় না। অভিযোগ ওঠে, কিন্তু বিচার হয় না। আর মৃতরা চিহ্নিত হয় কেবল সংখ্যা দিয়ে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্যও অদম্য সাহস নিয়ে হাজির হয় আরো কিছু মানুষ। কিন্তু তাদের কথা কেউ মনে রাখে না। এ বিষয়কে চিহ্নিত করেই নির্মিত হয়েছে ভারতীয় সিরিজ ‘দ্য রেলওয়ে মেন’।
১৯৮৪ সালে ভোপালে ঘটেছিল একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ২ ডিসেম্বর রাতে ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেডে গ্যাস লিক করে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মিথাইল আইসোসায়ানেট। এ গ্যাসে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের ফুসফুস। কয়েক মিনিটের মধ্যে হয় মৃত্যু। কারো কারো ক্ষেত্রে সেটা কয়েক ঘণ্টা হতে পারে। কিন্তু ফুসফুসে গ্যাস ঢুকলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। ইউনিয়ন কার্বাইড ফ্যাক্টরিতে অবকাঠামোগত সমস্যা থাকলেও তারা তা প্রকাশ করেনি। দুর্ঘটনা ঘটার পরও তারা কোনো প্রকার ভুল স্বীকার করেনি। এ অবস্থায় ভোপালের লাখের ওপর মানুষ মৃত্যুঝুঁকিতে ছিল। সে সময় ভারতের রেলওয়ের কয়েকজন অফিসার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অমান্য করে তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সেই সত্য ঘটনাই দ্য রেলওয়ে মেন সিরিজের প্লট।
সিরিজের শুরুতেই দেখা যায় কোনো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ভারত ছাড়ছেন। আর ন্যারেটরের কণ্ঠে শোনা যায়, ‘যারা মানুষের জীবন নেয় আমরা তাদের শাস্তি তো দিই না, যারা জীবন বাঁচায় তাদের প্রশংসাও করি না’। চার পর্বের এ সিরিজ শুরু হয় স্থানীয় সাংবাদিক জগমোহন ও ইমাদ রিয়াজকে দিয়ে। ইমাদ কাজ করত ইউনিয়ন কার্বাইডে। সেখানে কোনো একটা সমস্যা আছে তা ইমাদের জানা। এ নিয়েই কাজ করছে জগমোহন। ঘটনা সম্পর্কে ধারণা আছে ইউনিয়ন কার্বাইডের ম্যানেজার কামরুদ্দিনেরও। তিনিও জগমোহনকে সাহায্য করতে চান। কিন্তু এরই মধ্যে সে রাতেই গ্যাস লিক করে। কামরুদ্দিনের চেষ্টায় কারখানা থেকে শ্রমিকরা বেরোতে পারলেও শহরের মানুষকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সে চেষ্টা করেন ভোপাল জংশনের স্টেশনমাস্টার ইফতেখার সিদ্দিকী। তার সঙ্গে এরপর যুক্ত হন ওয়েস্ট সেন্ট্রাল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানজার রতি পাণ্ডে (আর মাধবান)।
চার পর্বের মিনি সিরিজে এ দুর্ঘটনার পাশাপাশি উঠে এসেছে রেলওয়ের একটি চিত্র। আজকের স্মার্টফোন যুগে রেলওয়ের বিষয়টি পুরনো হয়ে গেছে। এ সিরিজে রেলওয়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেলিফোনের ব্যবহার, লোকো ইঞ্জিনের পুরনো বিষয়গুলো তুলে আনা হয়েছে। ইফতেখার যখন লাইন পরিদর্শন করেন বা ব্লক থেকে মেসেজ দেয়ার চেষ্টা করেন সে বিষয়টি দর্শককে বুঝিয়ে দেবে সেই সময়ের আর এ সময়ের পার্থক্য। রেলওয়ে ফুটিয়ে তোলার জন্য ছিল আলাদা সেট ডিজাইন। সে জায়গায় নেটফ্লিক্সের প্রডাকশন বেশ ভালো কাজ করেছে। পাশাপাশি আশির দশকের পোশাক, চুলের ডিজাইন এমনকি মানুষের আচার-আচরণেও সে ছাপ ছিল। সেই সঙ্গে নির্মাতারা নিয়ে এসেছেন শিখবিরোধী দাঙ্গার কথা। রেলের শিখ যাত্রীরা যে সে সময় আক্রমণের শিকার হয়েছিল, সে কথাও ভুলে যাননি নির্মাতারা।
দ্য রেলওয়ে মেন সিরিজে ভোপাল জংশনের স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন কে কে মেনন, ইমাদ রিয়াজ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাবিল খান, রেলযাত্রীদের লুট করা ‘কন ম্যান’-এর চরিত্রে ছিলেন দিব্যেন্দু শর্মা। এ তিনজন যেন পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। সিরিজের মধ্যবর্তী সময়ে আসেন আর মাধবন। তার অভিনয় নিয়ে নতুন করে বলার প্রয়োজন হয় না। জুহি চাওলা ছিলেন রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার রাজেশ্বরী জাঙ্গলের চরিত্রে। ক্যামিওই বলা যায়, কিন্তু জুহি তার ছাপ রেখেছেন বড় করেই।
দ্য রেলওয়ে মেন সিরিজ হিসেবে ভারতের অনেক সিরিজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটি না-বলা এক গল্প বলে। এ ধরনের ঘটনা সাধারণত চেপে যাওয়া হয়। আর থ্রিলার সিরিজের রমরমা সময়ে এমন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সিরিজ বানানোর চিন্তাও সবাই করেন না। এছাড়া সিরিজের শেষ দৃশ্যে লাশের মিছিল ও বাস্তব চরিত্রদের যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা হিরোশিমা-নাগাসাকিকেই মনে করিয়ে দেয়।










