মানুষ বরাবরই স্মৃতিকাতর। একবিংশ শতাব্দীতে এসে অবশ্য বিজ্ঞান, পুঁজিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রবক্তারা স্মৃতিকে খুব একটা পাত্তা দিতে চান না। কিন্তু সত্যটা হলো মানুষ বাঁচে তার স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে। স্মৃতিহীন মানুষ জড়ের সমান। কিন্তু মানুষের শরীর এত বিচিত্র যে অনেক সময় স্মৃতিকে ধরে রাখতে চায় না। এ কথা সত্য যে মানুষের মন বহু স্মৃতি মুছতে চায়, কিন্তু শরীরও অনেক সময় স্মৃতি মোছে। ডিমেনশিয়া, অ্যালঝেইমারের নাম আমরা শুনেছি। এগুলো মানুষের মস্তিষ্ক থেকে তার চেনা জগৎকে মুছে দেয়। কেউ কেউ থাকেন, যারা বিষয়টা বুঝতে পারেন। তারা শেষ সময়ে ফিরে যান নিজের পরিচিত মহলে। তেমনই একজন মানুষ শৈলজা দেশাই।
শৈলজা একজন পরিপাটি গৃহিণী। একটি সন্তান ও স্বামী নিয়ে তার সংসার। চাকরিও একটা করেন এবং সেখানে জীবন কেটে গেছে প্রায় নিস্তরঙ্গ। এমনটা মনে হয় সিনেমা দেখলে। কেননা শৈলজা ক্যারিয়ারিস্ট না, আবার তার সহকর্মীরা তার জন্মদিন পালন করেন। বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশ। এর পরই আমরা বুঝতে পারি, শৈলজা পুরোপুরি সুস্থ নন। এমন অবস্থায় সে কিছুদিনের জন্য যেতে চায় তার শৈশব কাটানো মফস্বলে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ‘থ্রি অব আস’-এর গল্প।
অবিনাশ অরুণ পরিচালিত সিনেমা থ্রি অব আস। শৈলজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শেফালি শাহ। তার স্বামী দীপংকর দেশাইয়ের চরিত্রে ছিলেন ভারতের নামজাদা সংগীতকার সদানন্দ কিরকিরে। আর শৈলজার ছোটবেলার বন্ধু প্রদীপ কামাতের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়দীপ আহলাওয়াত। এ তিনজনকে নিয়েই থ্রি অব আস, যেখানে গল্পটা মূলত শৈলজার হলেও একটা সময় তা এ তিনজনের গল্প হয়ে ওঠে।
সিনেমার গল্পটা বেশ সাদামাটা। এমন অনেক সিনেমা ২০০০ সাল পরবর্তী সময়ে কলকাতায় হয়েছে। মারাঠি সিনেমায়ও এমন উদহারণ আছে। কিন্তু অবিনাশ একটা নতুন ছাপ রেখেছেন পুরো উপস্থাপনার মধ্যে। সেক্ষেত্রে প্রথমেই আসে সিনেমাটোগ্রাফির কথা। পুরো সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ। কোঙ্কণের উপকূলে ফিরে যায় শৈলজা। সেখানকার পুরনো বাড়ি, মন্দির, মেঘলা আবহাওয়া থেকে শুরু করে সমুদ্রের ঢেউ আর বাতাসের শব্দ আছে পুরো সিনেমায়। ব্যাপারটা এমন যে আর কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দরকার হয় না। তবু ফিরে আসা শৈলজার গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ডে যখন ‘যমুনা কিনারে’ বাজে তখন দর্শকও উদাস হবেন।
তিনজনের গল্পে অবিনাশ সত্যিই তিনজনকে স্পেস দিয়েছেন। শৈলজাকে দিয়ে যে গল্প শুরু হয়, সেখানে একটা সময় দর্শক প্রদীপকে খুঁজে পাবেন। প্রদীপের সংসার, মনোজগৎ সামনে আসে। নিপাট ভদ্রলোক বলা চলে তাকে। ভেতরে আছে কবিত্ব। অন্যদিকে একেবারেই বিপরীত লোক দীপংকর। ইন্স্যুরেন্স বিক্রেতা দীপংকর অতকিছু বোঝে না। একটা সময় আবিষ্কার করে, শৈলজা তার সঙ্গে খুব একটা সুখী ছিল না। অন্তত তার মনে হয়। কিন্তু আধুনিক সিনেমার মতো প্রদীপ-শৈলজার গল্প শেষ বেলায় বিচ্ছেদে ঠেকে না। বরং অবিনাশ দেখান, নাগরদোলা থেমে গেলে শৈলজা প্রদীপের কাছে নিজের দোষ স্বীকার করে। আর তখন প্রদীপ তাকে জানায়, শৈলজা ভুলে গেলেও প্রদীপ তাকে ভুলে যাবে না।
একবিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ গল্পই ভাঙার। কেউ সিস্টেম ভাঙছে, কেউ সম্পর্ক ভাঙছে, কেউ ভাঙছে রাষ্ট্র। এর মধ্যে অবিনাশ নিয়ে এসেছেন ফিরে আসার গল্প। এখানে সত্যিকার অর্থে ভাঙা বা গড়ার কিছু নেই। তবে তিনি এটা স্পষ্ট করেছেন, মানুষকে কখনো কখনো ফিরে আসতে হয় শেকড়ের কাছে। এ সিনেমায় প্রদীপ কবিতার মাধ্যমে সে কথা প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে শৈলজার অতীতকে যুক্ত করেন অবিনাশ।
শৈলজা ফিরে আসে প্রদীপকে দেখতে। শৈলজা ফিরে আসে সমুদ্রের পাড়ে থাকা কথিত ডাইনি বুড়ির কাছে। শৈলজা ফিরে আসে একটা কুয়ার কাছে, যা তার এক বড় ভুলের সাক্ষী। এ সবকিছুর মধ্যে শৈলজা, প্রদীপ আর দীপংকর নিজেদের খুঁজে পায় নতুন করে। এমনকি প্রদীপের স্ত্রী সারিকাও দেখে জীবন ও বাস্তবতার নতুন চেহারা। আর অবিনাশ আমাদের জানান, কখনো ফিরে যেতে খুব বেশি দেরি হয় না। চাইলেই একবার ফিরে যাওয়া যায়। এ সিনেমার অনেক সংলাপের মধ্যে সমুদ্রতীরের সেই নারীর বলা, ‘তুই ফিরে আসবি বলেই বেঁচে আছি’ দর্শককে বিহ্বল করে। আর সিনেমাটির পুরো সময় মনে হয় ভজন চলছে চারপাশে। আর মেঘ কেটে ওঠে এক ফালি রোদ।










